ইহুদিদের ঘৃণা করে মুসলমানরা কি পেল? [ পর্ব-১ ]

চলমান বিশ্বের ১৫০-কোটি মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত জাতি সম্ভবত ‘ইহুদি’। ইসলামি সমাজে এটি এখন ‘গালি’ হিসেবেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত। আরবরা কোন খারাপ মুসলমানকে গালি দিতে ‘এন্তে ইয়াহুদ’ বা তুমি ইহুদি শব্দ ব্যবহার করে যত্রতত্র। ইসলাম ধর্মের প্রফেট (স.) মদিনা বসবাসকালীন সময় থেকেই ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের বিরোধ শুরু হয়, যা অদ্যাবধি চলছে নানা অনুসঙ্গে ও দেশ-কালে। বাংলাদেশী মুসলমানদের চেয়েও আরব মুসলমানগণ ইহুদিদের বেশী ঘৃণা করে মনেপ্রাণে। বাংলাদেশীদের সঙ্গে ইহুদিদের কোনকালে কোন সংশ্রব না ঘটলেও, কেবল মুসলমান হওয়ার কারণে না দেখেই ইহুদিদের যারপরনাই ঘৃণা করে বাঙালি মুসলমানগণও।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) তথা ‘আব্রাহামিক’ ধর্ম অনুসারীদের মধ্যে মুসলমান, খৃস্টান ও ইহুদি অন্যতম। ইহুদিরা নিজেদের হযরত মুসা (আ.) এর অনুসারী বলে মনে করে, যিনি ৩,৭৬০-বি.সি.তে এ বিশ্বে আগমন করেছিলেন বলে তাদের দাবী। ইজরায়েল ছাড়াও ইহুদিরা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, হলান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনিয়া, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়াতে বাস করে। ইহুদিদের মুসলমানদের মত যাকাত দিতে হয়, ছেলেদের খতনা করানো এবং যেনা ও শুকর খাওয়া তাদের ধর্মেও ‘হারাম’। তাদের কোরবানী পদ্ধতি অনেকটা মুসলমানদের মত। তবে তাদের প্রধান প্রার্থনার দিন শুক্রবারের বদলে শনিবার। প্রার্থনার আগে তারা মুসলমানদের মত অযু বা ‘এবলুশন’ করে। হিব্রু ভাষায় লিখিত তাদের ধর্মীয় কিতাব হচ্ছে তোরাহ ও তালমুদ। বর্তমানে এদের রাষ্ট্রীয় ভাষাও হচ্ছে ‘হিব্রু’। মুসলমানেদের শিয়া-সুন্নীর মত এদের উপদলগুলো হচ্ছে, পোলান্ড ভিত্তিক ‘হাসিদিক’, জার্মান ভিত্তিক ‘ইদ্দিশ’, স্পেন ভিত্তিক ‘শেপারডিক’, পূর্ব ইউরোপ ভিত্তিক ‘আসখাজেনিক’ ইহুদি। অর্থডক্স ইহুদি মেয়েদের পোষাকের ব্যাপারে ‘পর্দা’ প্রথা তথা খুবই রক্ষণশীলতা মানতে হয় গোড়া মুসলমানদের মত। বিশ্বের ধর্মীয় ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে, ইহুদিরাই বিশ্বে প্রথম একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রবর্তক, যে কারণে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর রাশিয়াতে ব্যাপক ইহুদি হত্যার ঘটনা ঘটে। কোরআনে বর্ণিত প্রফেট মুসা (আ.)-ই হচ্ছেন ইহুদিদের প্রফেট ‘মোসেস’। মুসলমানগণ তাদের অন্যতম প্রফেট হিসেবে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তার পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে মনে করলেও, ইহুদিরা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর অপর পুত্র হযরত ইসহাক (আ.)-কে তাদের অন্যতম প্রফেট হিসেবে মান্য করেন। অর্থাৎ মুসলমানগণ হচ্ছেন হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কেন্দ্রিক এবং ইহুদিগণ হচ্ছেন হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর অপর পুত্র হযরত ইসহাক (আ.) কেন্দ্রিক। ইহুদিদের মতে হযরত ইসমাইল (আ.)-হচ্ছেন হযরত ইব্রাহিমের প্রকৃত স্ত্রী বিবি সারার ‘কৃতদাসী’ হাজেরা-পুত্র, সে হিসেবে সে কৃতদাসপুত্র, যা মুসলমানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ও অবমাননাকর। ইহুদিদের ভাষ্যমতে, বিবি সারার গর্ভজাত সস্তান ৩-বছরের হযরত ইসহাক (স.)-কে কোন এক ভোজসভায় ‘ভেংচি’ কাটেন বিবি হাজেরার গর্ভজাত কিশোর দাসীপুত্র (তাদের ভাষ্যমতে) হযরত ইসমাইল (আ.)। এতে দাসীপুত্রের প্রতি বিবি সারা রাগান্বিত হন এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে বলেন, ‘‘এই দাসী ও তার ছেলেকে ঘর থেকে বের করে দাও, ইসমাইল কখনো ইসহাকের উত্তরাধিকারের ভাগীদার হবেনা’’। এর পরবর্তী ঘটনাক্রম আমাদের সবার জানা, মানে অসহায় মা ও ছেলেকে মক্কার নির্জন মরুতে বনবাস, জমজম কুপের সৃষ্টি, কোরবানী এবং মক্কা কেন্দ্রিক নতুন জনধারার আগমন ইত্যাদি।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *