একদল পশুপালক আর কৃষিজীবী জাতির দৌঁড়!

:
জিউস তরুণি রুথ সোহানার সাথে আমার পরিচয় ভারতের বাঙালোরে। সেখানে সে ঘুরতে এসেছিল Ben-Gurion University of the Negev, ইসরাইল থেকে। দিন দশেক আগে তারা একটা গ্রুপে এসেছে ভারত ঘুরে দেখতে। এটা তাদের শিক্ষা সফরের অংশ! একই হোটেলে উঠেছি আমরা! কোন জিউস পরিবার সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার অনেক দিনের। তাই সম্পর্ক নিবিড় করতে চাইলাম রুথ সোহানার সাথে। মুসলমান নাম শুনে প্রথমে একটু এড়িয়ে যেতে চাইলো, ইসরাইলি তরুনি। কিন্তু যখন বললাম – আমি অসাম্প্রদায়িক মুক্তমনা মানুষ, কট্টর মুসলিম জঙ্গীবাদি নই, তখন কিছুটা নরম হলো জিউস কন্যার মন! দুতিন দিন পর যখন তারা ফিরে যাচ্ছে ইসরাইলে, তার আগেই সোহানার হোয়াটসআপ আর ফেসবুক এ্যাড্রেসে এ্যাড করলাম নিজেকে। ফিরে যাওয়ার পরও রুথ সোহানা যোগাযোগ রাখলো আমার সাথে। এক সময় তাকে জানালাম, একটা গল্প লিখতে চাই আমি তাকে নিয়ে। তাই সে যেন জানায় তার নিজের আর পরিবারের গল্প আমাকে, যা প্রকাশ করতে পারি আমি আমার পাঠকদের সামনে! যাতে বাঙালি পাঠকরা বুঝতে পারে জিউস মানুষদের জীবনচিত্র! মাস খানেক পর একদিন ইমেইলে রুথ সোহানা লিখে পাঠালো তার জীবনের গল্প, যা হুবহু পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম তার ভাষাতেই আমি, কেবল বাংলায় অনুবাদ করে!

আমার নাম রুথ সোহানা। একুশ বছরের জিউস তরুণী আমি। আজকের ইসরাইলের ‘সিকুন-ওলিন’ নামক ছোট্টগ্রামে আমার পরিবারের বসবাস। এ গ্রামটি ভূমধ্য সাগরের বেশ কাছাকাছি। আমাদের পাথুরে বাড়ি থেকে সমুদ্র ঢেউ দেখা যায় স্পষ্টভাবে। হাইফা বন্দরের সমুদ্রগামী জাহাজের শব্দও শুনি আমরা প্রায়শই। এ বাড়িতেই আজ থেকে একুশ বছর আগে আমার জন্ম। তবে আমার মা-বাবা ছিলেন সুইডিশ। ১৯৪৮ সনে সুইডেন থেকে বসতি গড়তে এখানে এসেছিলেন তারা। সুইডেনে কৃষি খামারে ভাল চাকুরী করতেন দুজনেই। ভাল একটা বাংলো বাড়িও ছিল আমাদের নাকি সেখানে। কিন্তু মা-বাবা দুজনেই ছিলেন বেশ ধার্মিক। তাদের বিশ্বাস, যিহোভা প্রদত্ত প্রতিশ্রুত পবিত্র ভূমিতে বসবাস না করলে, তাদের নাকি মারাত্মক ‘পাপ’ হবে। সুযোগ থাকার পরও ‘ইলহাতে’ না ঢুকলে যিহোভা নাকি ক্ষমা করবেননা তাদের কখনোই। এবং এ ধর্ম ভয় থেকে ১৯৪৮ এর মার্চ মাসে আমার মা-বাবা সু্ইডেনের বাড়ি, গাড়ি সব কিছু বিক্রি করে জাহাজে ওঠেন ইসরাইল পৌঁছাতে। হাইফা বন্দরের শরণার্থী শিবিরের প্রচণ্ড গরমে ৪-মাস কাটানোর পর ‘সিকুন-ওলিন’ গ্রামে জমি কেনেন আমার মা-বাবা যৌথনামে। এ ভূমিটি ছিল ইসরা হাকিম মোহাম্মদ নামের একজন মুসলমানের। তার পুরনো বাড়ি হলেও, তিনি এখানে থাকতেন না। জেরিকোতে তার বিশাল দোতলা আধুনিক বাড়ি ছিল। তাই মোটামোটি ভাল দাম পেয়ে নিজের প্রাক্তন বাড়িটি তিনি বিক্রি করে দেন, আমার পরিবার তথা মা বাবার কাছে!
:
সুইডেন থেকে আনা অর্থের প্রায় অর্ধেকটা খরচ হয়ে যায় ‘সিকুন-ওলিন’ গ্রামে বাড়ির জন্য জমি কেনা, পুরনো ভাঙা বাড়ি সংস্কার ইত্যাদি কাজে। এলাকাটা তখন বলতে গেলে পুরোই মরুভূমি ছিল। কয়েকবছর পর ইসরাইল সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় আমার মা-বাবা গ্রীন হাউজের মাধ্যমে একটা কৃষি খামার গড়ে তোলে এখানে। সরকার দুর্গম মরুভূমির মাঝ দিয়ে পাইপ লাইনে বিনে পয়সায় জল সরবরাহ শুরু করে কৃষি খামারের জন্য। খামার করার পর আবার আমাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসে। মা-বাবার কৃষির প্রতি আকর্ষণের কারণে আমাকেও তারা ভর্তি করান নাজারেথের জুনিয়র কৃষি স্কুলে। হাইস্কুলে পড়ার সময় সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয় আমাকে। পড়ার সাথে সাথে দুবছর বাধ্যতামূলক সামরিক ট্রেনিং নেই আমি। তখন বেথ-শিয়েন বর্ডারে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েছি আমি সামরিক বাহিনীর। এ বছর ‘ডেজার্ট এগ্রিকালচারে’ গ্রাজুয়েশন শেষ হয়েছে আমার। এখন আমিই আমার মা-বাবার কৃষি খামার দেখাশোনা করি। আমাদের খামারে আরো সাত জন ইহুদি মহিলা পুরুষ কাজ করে। যারা আফ্রিকান দেশ তাঞ্জানিয়া আর বুরুন্ডি থেকে ইসরাইলে এসেছে দুতিন বছর আগে। আমার পরিবারের মত কষ্ট হয়নি তাদের ইসরাইলে। আসার পরই সরকার নির্মিত বাড়িতে থাকতে দিয়েছে তাদের বিনামূল্যে। আবার কাজের সংস্থানও করে দিচ্ছে সরকার। যতদিন কাজ না পায় সরকার থেকে মাসিক ভাতা পায় তারা।
:
আমার মা-বাবা এখন বুড়ো হয়ে গেছেন। বয়সের ভারে ন্যুজ তারা দুজনেই! তারপরো বিকেলে লাঠিতে ভর দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত কৃষি খামারে আসেন তারা। নানাবিধ সব্জি আর ফুলের চারা ষ্পর্শ করে এক ধরণের সুখানুভূতি আচ্ছন্ন করে রাখে তাদের। শনিবার পাশের সিনাগগে যান তারা নিয়মিত। ইয়াউমুল কিপপুরের দিনে ঘরে রাখতে পারিনা তাদের। এটা ইহুদিদের কাছে খুব পবিত্র দিন। কদিন আগে পুরনো হিব্রু ভাষাতে লেখা কতগুলো বই দিয়েছেন বাবা আমাকে। এগুলো হিব্রু তথা জিউস জাতির ইতিহাসের পুরনো দিনের ইতিহাস বই। যেগুলো যুসিয়া, তাবিত, যুদিই আর ম্যাকাবেস নামে পরিচিত। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কৃষি খামারে বসে বইগুলো পড়া শেষ করেছি আমি। ইস্‌! কি দুখখোজনক আর ট্রাজিক হতভাগ্য ইহুদি জাতির ইতিহাস! বইগুলো না পড়লে হয়তো পুরোপুরি জানতাম না, আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি কতনা অত্যচার করেছে বিভিন্ন জাতি তার ধর্ম আর রাজনীতির নামে! অথচ আমাদের ইসরাইলিদেরকেই অনেক মানুষ বলে থাকে, আমরাই নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে সন্ত্রাসি আর অত্যাচারী জাতি, জোর করে দখল করেছি ফিলিস্তিনি ভূখন্ড! কিন্তু কথাগুলো কি সত্যি!
:
বাবার দেয়া যুসিয়া, তাবিত, যুদিই আর ম্যাকাবেস বইগুলো বারশো থেকে তেরশ বছরের পুরনো। সেখান থেকেই জানলাম, আমার প্রাক পূর্বপুরুষদের বসতি ছিল ইয়াসরিব শহরে, যার বর্তমান নাম মদিনা। ইয়াসরিবে অন্তত তিনটি বড় জনপদ ছিল জিউসদের। বাক্কা বা মক্কা থেকে ইসলামের নবী ইয়াসরেবে এসে আমাদের প্রফেট মোসেজকে ঘোষণা করেন বড় নবী হিসেবে। এবং আমাদের আব্রাহামকেও ঘোষণা করেন, তাদের জাতির পিতা বলে। যে কারণে জিউসরা তাদের পূর্বপুরুষদের কবরস্থান থেকে নিজেদের বাপ-দাদার লাশ সরিয়ে, ঐ যায়গাটা দিয়ে দেন ইসলামের নবীর নিজস্ব ঘর ও মুসলিম মসজিদ বানাতে, যার নাম এখন মসজিদে নববী। ইসলামি প্রফেট জিউসদের কাছে তার নতুন ধর্ম প্রচার করলে, প্রথমে জিউসরা কেউ কেউ গ্রহণ করে ইসলামের নবীর বাণী। এমনকি জিউসরা ইয়াসরেবের ‘প্রধান ইমাম’ তথা ‘বিচারক’ হিসেবেও নবী মুহাম্মদকে মেনে নেন। ইয়াসরেবের জিউসরা ছিল যুদ্ধ পরিহার করে শান্তিতে কৃষিকাজ আর ব্যবসা করা জাতি। তারা যুদ্ধ জানতো না। ইয়াসরিবে বসবাসকারী ইহুদিদের মোট গোত্র ছিলো ২০-টিরও বেশি। তবে এই ২০-টি গোত্র আবার বড় তিনটি গোত্রে সীমাবদ্ধ ছিলো। যেমন বনু নাজীর, বনু কুরাইজা ও বনু কাইনুকা। ইয়াসরিবের জিউস সম্প্রদায় আউস ও খাযরাজেরও বহু পূর্বে খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে মদিনায় আগমন করে। আমাদের ইহুদি পন্ডিত ড. ইসরাইল ওয়েলফিন্সনের মতে, “সত্তর খ্রিষ্টাব্দে ইহুদি ও রোমকদের যুদ্ধের পরিণতিতে যখন বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস হয়ে যায় এবং ইহুদিরা পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইহুদিদের বহু দল আরব দেশগুলোর দিকে মুখ ফিরায়”! বাক্কার কুরাইশদের সাথে নবী মুহাম্মদের খন্দক নামক যুদ্ধে যোগদানে বিরত থাকলে, মুহাম্মদ ক্ষেপে যান জিউসদের প্রতি। তাই খন্দক প্রান্তর থেকে ফিরেই বিনা উস্কানিতে তিনি অবরোধ করেন ইয়াসরিবের জিউস বসতি। অনেকদিন অবরুদ্ধ থাকার পর আত্মসমর্পণ করে ইয়াসরেবের ভীরু জিউসরা। কিন্তু সারেন্ডার করার পরও ইসলামের নবী জিউসদের ক্ষমা করেননি। নাভীর নিচে পশম গজিয়েছে এমন সকল পুরুষদের হত্যা করান তিনি। জিউস নারী আর শিশুদের বানানো হয় মুসলমানদের কৃতদাস।
:
এভাবে ইয়াসরিবের অদূরে খায়বর, ফদখ, বানু লিহায়েন, বানু আল মুসতালিক ও ওয়াদি আল কুরার জিউসদের যায়গা জমিও দখল করে নেন নবী মুহম্মদের অনুগত বাহিনী, কেবল আমরা ইহুদি বলে। জীবন বাঁচাতে জিউসরা পালিয়ে যান সিরিয়ার তাইমাতে। বিতাড়িত হয়েও জিউসরা কখনো প্রতিরোধ যুদ্ধ করেননি মুসলমানদের সাথে। সম্ভবত ঐ সময়ের জিউসরা দুর্বল কিংবা ভীরু কাপুরুষ ছিল। মুসলিম খিলাফত আমলে তাইমা থেকেও বিতাড়িত হয়ে জিউসরা আশ্রয় নেন যিহোভা প্রদত্ত তাদের পবিত্রভূমি জেরুজালেমে। যেখানে প্রফেট মোজেসের আমল থেকেই বসবাস করছিল অন্য ইহুদিরা যিহোভার দানকৃত ভূমি হিসেবে। কিন্তু মুসলমানরা সেখানেও থাকতে দিলোনা তাদের। ইসলামের নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর ৬৩৭-খ্রীস্টাব্দে ইসলামের খলিফা ওমর দখল করে নেন ইসরাইলিদের পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে। এখানেও কোন প্রতিরোধ যুদ্ধ করেননি ভীরু জিউসরা। জীবন বাঁচাতে জিউসরা ৬৩৭ সালে নিজ বাসভূমি ছেড়ে পাড়ি দেন ইউরোপে। তারা ছড়িয়ে পড়েন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। আমার মা-বাবার পূর্ব পুরুষরা ছিল ইয়াসরেবের নিকটবর্তী ফদখের বাসিন্দা। সেখানে কৃষি কাজ করে জীবন নির্বাহ করতো তারা। ফদখের কৃষিজীবী জিউসরা বছরে একবার জেরুজালেমে আসতো, আমাদের প্রধান সিনাগগ দ্য টেম্পল অব সলোমনে। প্রধান ইমামের সাথে ‘মারিত’ আর ‘আরভিত’ শেষ করে তারা আবার ফিরে যেতো ইয়াসরেব সন্নিহিত ফদখে!
:
আব্রাহামিক জিউসরা স্বর্গের জন্যে নয়, কিনান তথা ইসরাইল দেশ পাওয়ার লোভেই যিহোবার উপাসনা শুরু করেছিল। আব্রামের পর সাউল, দাউদ ও সোলেমান ইহুদীদের রাজা হয়েছিলো এ জেরুজালেমে। সুলেমানের মৃত্যুর পর কিনান ১-টি ইসরাইল, অন্যটি জুদিয়া নামে বিভক্ত হয়। ৭২১ খ্রীস্টপূর্বাব্দে ইসরাইল রাষ্ট্রের পতন ঘটলে, ইহুদী নবী হোসিয়া এই পতনকে ‘যিহোবা’র উপাসনা ভুলে থাকার পাপ বলে ব্যাখ্যা করেন। ৪৪৪ খ্রীস্টপূর্বাব্দে পারস্যরাজ ইহুদিদের তৌরাত পাঠের অনুমতি ও সামারিতানদের ইহুদি ধর্মে অন্তর্ভুক্তির অনুমতি প্রদান করলে, তোরাহ আধুনিকায়নে ‘মিদরাশ’ প্রণয়ন করা হয়। ১৯৮ খ্রীস্টপূর্বাব্দে গ্রীকরা ইহুদি রাজ্য দখলে নিলে ‘সোফেরিম’, ‘হাসডিম’, ‘সাদদুচি’ নামে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারী ইহুদী গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে।
:
মিসর থেকে বের হয়ে যাবার সময় জিউস প্রফেট যোসেফের কফিন পবিত্র ভূমি ইসরাইলে সমাধিস্থ করেন জিউসরা। জন্ম থেকে পোড় খাওয়া জাতিটিকে বহু বছর আগেও ব্যাবিলনের রাজা ‘নবুশ্যাড নেযার’ আক্রমণ করেছিল। ব্যাবিলনীয় সৈন্যরা তাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে হত্যা করে পুরুষদের! বাকি লোকজনকে বন্দী করে ইসরাইল জাতিটাকে ক্রীতদাসে পরিণত করে তাদের দেশ ব্যাবিলেনে নিয়ে গেলো। আর ইহুদিদের Temple of David ধ্বংস করলো তারা। ৭০-খ্রীস্টাব্দে রোমান টিটাস ইহুদিদের আক্রমণ করে তাদের পাইকারীভাবে হত্যা শুরু করলো, তাদের মেয়েদের নিয়ে গেলো, ধন-সম্পত্তি সব লুটে নিলো, ইহুদিদের ডেভিড মন্দিরসহ তাদের রাজধানী জেরুজালেম শহর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিলো রাজা। ১৩৫-সালে ইহুদিদের তোরাহ পাঠ ও পুরুষদের লিঙ্গচ্ছেদ ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করে ঐ রাজা। হাজার হাজার বছরের বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়ে ইহুদিরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে তখন বসতি স্থাপন করলো।
:
আমাদের পবিত্র ভূমিতে আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্টে জিহোভার নাম ছাড়াও স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে এলোহিম, এলোয়াহ, এল, এল শাদাই এবং সাবিওথের পবিত্র নাম। জেরুজালের প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা ‘কেতেফ হিনোমে’ পাওয়া রূপোর খন্ডেও রক্ষিত আছে এসব তথ্য। তাই জীবন দিয়ে হলেও, এসব রক্ষা করার দায়িত্ব সকল জিউসের। একজন জিউসও পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে এ নাম কাউকে মুছে দিতে দেয়া যায়না।
:
‘আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট’ হচ্ছে আমাদের জ্ঞানের সিন্দুক। এটা একটা সিন্দুক, যা যিহোভার নির্দেশে প্রফেট জ্যাকবের বারো বংশধর নির্মাণ করেছিল। অ্যাকাসিয়া নামের মিসরের একটি পবিত্র গাছের কাঠ দিয়ে নির্মিত সিন্দুকটি, পরে সোনা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়েছে। যখন ইহুদিরা ‘ল্যান্ড অব ক্যাননে’ এসে পৌঁছায়, তখন তাদের পথ দেখিয়েছিল এ সিন্দুক। এই সিন্দুকের জন্যই জর্দান নদী দুই ভাগ হয়ে রাস্তা করে দিয়েছিল তাদের। রাজা ডেভিড ও তাঁর ছেলে সলোমন জেরুজালেমে স্থানান্তর করে সিন্দুকটিকে জিউসদের প্রধান মন্দিরে রেখে দেন। আর সে সিন্দুকে তারা সযত্নে রেখে দিয়েছিল যিহোভার দেয়া ১০-টি অনুশাসনের বাণী, নবী মোজেদের লাঠি, স্বর্গীয় খাবার মান্না ও সালোয়া। জিউসরা মনে করে, যাঁর কাছে এ মহামূল্যবান ও পরম পবিত্র সিন্দুকটি থাকবে, তিনি মালিক হবেন পৃথিবীর সকল শক্তির। এটা এখন জেরুজালেমে। তা কি ত্যাগ করতে পারে জিউসরা? এখনো সিন্দুকটি রক্ষিত আছে জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্টে। যিহোভা প্রেরিত জিউসদের স্বর্গদূত সিরাফিম, চিরাবিম ও ওনাকিম এখনো ঘুরে বেড়ায় ইসরাইলের আকাশে!
:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন জিউস বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। ফলশ্রতিতে আনন্দিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন – কি ধরনের পুরস্কার চান তিনি! জিউসপ্রেমিক বিজ্ঞানীর উত্তর ছিল – “অর্থ নয় – নারী নয় – বাড়ি নয়! আমার স্বজাতির হারানো ভূমি ফিরে পেতে চাই আমি”! বৃটেন প্রতিশ্রুতি দেয়, যিহোভা প্রদত্ত জিউস জাতির হারানো ভূমি ফিরিয়ে দেবেন তাদেরকে একদিন! ঐ প্রতিশ্রুতির ধরাবাহিকতায় ১৯৪৮ সনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসারে, ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিসংঘ তখন ৪৫% ভূমি ফিলিস্তিনিদের এবং ৫৫% ভূমি জিউসদের দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ পর্যন্ত পৃথিবীর ১৭০-টি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও, ২৬-টি মুসলিম রাষ্ট্র এখনো ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বে মেনে নেয়নি। ১৯৪৮ সনে তৌরাত বর্ণিত ‘যিহোবা’ প্রতিশ্রুত ইসরাইল নামক ইহুদী রাষ্ট্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে, আরবদের সম্মিলিত মুসলিম বাহিনির সাথে জিউসদের যথাক্রমে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সনে যুদ্ধ লাগে। তারা যুদ্ধ করে জিউস জাতি তথা ইসরাইল দেশকে পৃথিবী থেকে বিলোপ করে দিতে চাইছে! আর জিউসরা চাইছে টিকে থাকতে।
:
মুসলমানদের সাথে আমাদের বিরোধ হয়তো ভূ-রাজনৈতিক ছিলো। কিন্তু জার্মান হিটলার আমাদের মারলো কেন? প্রায় ষাট লাখ ইহুদিতে হিটলার হত্যা করলো হাসোয়া বা হলোকষ্টের নামে। এ হত্যাকান্ডও করা হয়েছে কেবল ধর্মের নামে। তৃতীয় রাইখের সময় বিনা অপরাধে লাখ লাখ জিউসকে বন্দীশিবিরে কৃতদাস বানায় হিটলার বাহিনি। একপর্যায়ে মালবাহি ট্রেনের বগিতে তুলে বধ্যভূমিতে নেয়া হতো জিউসদের। নেয়ার পথেই কষ্টে মারা যেতো অর্ধেক, বাকি অর্ধেককে হত্যা করা হতো সেখানে নিয়ে!
:
কি বিস্ময়কর ব্যাপার দেখুন না! প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর থেকে মানে প্রফেট ‘মোসেজ’ যখন আমাদের পূর্ব পুরুষদের নিয়ে এলেন মিসর থেকে এখানে! পথে সিনাই পাহাড়ে গড যিহোভা নিজে দেখা করে, এ ভূমিতে বসবাস করতে নির্দেশ দিলেন আমাদের। তিনি এটা দান করলেন, ইসরাইল জাতিতে চিরদিনের জন্যে! এ পবিত্র ভূমির জন্য প্রায় চল্লিশ বছর নানা পাহাড় পর্বতে ঘুরে আমাদের পূর্ব পুরুষরা ফিরে এলো এখানে। ইয়াসরিবসহ সমগ্র আরব এলাকাতেও বসবাস করতো অনেক জিউস। মুসলমানরা বিনা যুদ্ধে আমাদের পূর্ব পুরুষদের হত্যা কিংবা দেশত্যাগে বাধ্য করেছে আরব উপদ্বীপ থেকে। পুরো আরব ভূমি ছেড়ে, জিউসরা এখন কেবল ইসরাইলে তাদের গড যিহোভা প্রদত্ত ক্ষুদ্র ভূমিতেই বসবাস করতে চাইছে। অন্য কোন ভূমি দাবী করছেনা জিউসরা। যেমন ইয়াসরেব, খায়বর, ফদখ বা সিরিয়ার তাইমার জমি! কিন্তু মুসলমানরা এখানেও থাকতে দিতে চাইছেনা আমাদের! কি অপরাধ করলাম আমরা এমন! এ পৃথিবীর কোথাও বা নিজ দেশেও আমরা থাকতে পারবো না! তবে যাবো কই আমরা? আর পৃথিবী ছেড়ে যাবোইবা কেন আমরা? ৬৩৭-সনে কেউ জোর করে দখল করে, আমাদের স্বজাতিকে উচ্ছেদ করলেই এ ভূমি তাদের হয়ে যাবে? “জোর যার মুল্লুক তার” এটাই যদি নীতি হয় মানুষের, তবে আমরা আমাদের পবিত্র ভূমিকে জোর করে দখল করতে পারবো না? আর জোর করে পূর্ব পুরুষের ভিটে দখল করার অধিকার থাকবে না আমাদের! আর যিহোভা প্রদত্ত আমাদের ভূমিতে মুসলমানদের বসবাস করতে তো নিষেধ করিনি আমরা! কেন ইসরাইলে কি ২০.৯৫% মানে ১৮,৯০,০০০ ফিলিস্তিনি মুসলমান বসবাস করছে না? তারা কি জিউস নাগরিকের মত সব অধিকার ভোগ করছেনা ইসরাইলে? সরকারি চাকরি, সামরিক, পুলিশ, সাংসদ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি কই নেই ফিলিস্তিনি মুসলমানরা? ৪০০ মসজিদ ইসরায়েলে থাকলেও কোন মুসলিম দেশে কি আমাদের “সিনাগগ” বানাতে দেবে? ইসরাইলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি মুসলমানরা কি বাইরের ফিলিস্তিনির থেকে ভাল নেই? তারা কি ইসরাইলের পাসপোর্ট ব্যবহার করেনা? ভোটাধিকার কি নেই তাদের? তারপরো মানুষ হিসেবে এ পৃথিবীতে বসবাস করতে পারবো না আমরা? বড়ই strange!
:
বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনা করি বলে, এখনো যুদ্ধের ডাক আসেনি আমার! মা-বাবা মারা গেলেই, বর্ডারে যুদ্ধে যেতে হবে আমাকে। অন্তত দুবছর বাধ্যতামূলক থাকতে হবে মুসলিম কোন দেশের বর্ডারে! যুদ্ধ কার ভাল লাগে বলুন! আমি কারো রক্ত ঝরাতে চাইনা হোক সে মুসলিম কিংবা ইহুদি! শান্তি সবারই প্রত্যাশা! ফিলিস্তিন কিংবা মুসলমান পরিবারগুলো যেমন শান্তিতে থাকতে চায়, তেমনি আমরা জিউসরাও থাকতে চাই আমাদের এ ছোট্ট ভূখন্ডে শান্তির মাঝে! ফিলিস্তিনি আর আমাদের রক্ত কি লাল নয়? তারা কষ্ট পেলে আমরা কি পাইনা? কিন্তু কে আমাদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেনা! কে ফিলিস্তিনিদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেনা! সেটা কি চিন্তা করেছি আমরা কখনো! আমি একুশ বছরের এক সুন্দরী জিউস তরুণি। আমার সামনে পড়ে রয়েছে পুরো জীবন! এখন যুদ্ধে গিয়ে মরতে চাইনা আমি। নিজে মারতে চাইনা কোন ফিলিস্তিনি মা-বোন বা শিশুকে! শান্তিতে বসবাস করতে চাই আমরা এ বিশ্বে! অনেক দৌঁড়েছি আমরা। ফিলিস্তিনিরাও দৌঁড়াচ্ছে। আর কত দৌঁড়াবো আমরা? আমাদের দৌঁড়ের কি শেষ হবেনা!
:
ইসরাইলের ‘সিকুন-ওলিন’ গাঁয়ের জিউস তরুণি রুথ সোহানার এসব কথার জবাব দিতে পারিনা আমি! এসব কথার জবাব কে দেবে এ বিশ্বে! মানুষতো নিজ আর অপরকে হননে ব্যতিব্যস্ত সারাক্ষণ! তারা কি একবার চিন্তা করবে, কিসব বলে গেলে রুথ সোহানা! যে পৃথিবীতে সে বসবাস করতে চায় শান্তির সাথে। ঘর বাঁধতে চায় শান্তিময় এক জগতে। যেখানে অলিন্দে ঘুরে বেড়াবে তার ফুটফুটে সন্তান। হয়তো তার অনাগত সন্তানও একদিন কৃষিজীবী হয়ে কাজ করবে তার মায়ের খামারে! যা প্রতিষ্ঠিত করেছিল তার কৃষিজীবী নানা আর নানী। যেমনটা তাদের পূর্বপুরুষ জিউসরা কৃষিজীবী ছিল মদিনা সন্নিহিত ‘ফদখ’ এলাকায়! যারা ঝুড়ি আর কোদাল হাতে একদিন ভোরবেলা বের হয়ে দেখলো, মুসলমানরা প্রবেশ করেছে তাদের শান্তির লোকালয়ে! এবং এভাবেই পরাস্ত হলো তারা! যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা দৌঁড়োতে থাকলো ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা আর এশিয়ার দেশে দেশে! তাদের দৌঁড় কি শেষ হবেনা! এ প্রশ্ন রুথ সোহানার মত আমারও! আমারো দাবী এ দৌঁড়ানোর ইতি টেনে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। রকেট নিক্ষেপ বন্ধ করুক হামাস। বিমান আক্রমণ বন্ধ হোক তেল আাবিব থেকে। কিন্তু কবে রক্তখেলার এ “বৈশ্বিক গেম”র সমাপ্তি ঘটবে তার জবাব জানিনা আমি! পাঠক কেউ কি জানেন এ কঠিন প্রশ্নের উত্তর?

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *