কালিপদ জলদাসের জন্মোৎসব ও মৃত্যুকথন

কালিপদ জলদাসের জন্মোৎসব ও মৃত্যুকথন
:
হরিপদ জলদাসের ঘরে যখন প্রথম সন্তান জন্ম নিলো, তখন সে ছিল দূর নদী মোহনায় মাছ শিকাররত। সারারাত আর সারাদিন মাছ ধরে যখন ঘাটে ফিরলো সে, তখন নদীতীরে অন্য জেলেরা খবর দিলো তার প্রথম সন্তান জন্মের। এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে ছেলের মুখ দেখেই ফের দৌড়ালো বাড়ি সংলগ্ন বাজারের দিকে। প্রাকসন্ধ্যার খোলা বাজারের সব জিলিপি কিনলো সে। কলাপাতায় মোড়ানো গুড়ের জিলিপি খুলে নদী সংলগ্ন ঘাটের সব কৃষক আর জেলেদের খাওয়ালো ইচ্ছেমত। ছেলের নাম রাখলো কালিপদ। নাম রাখার দিনও একটা উৎসবের মত করলো হরিপদ। বিকেলে হরিপদের বাড়িতে ঢোল করতালের শব্দে আমরা প্রতিবেশী মুসলিম ছেলেপুলেরাও উপস্থিত হলাম জেলে হরিপদের বাড়িতে। আমাদের সবাইকে মোয়া আর সন্দেশ দিয়ে আপ্যায়ন করেছিল হরিপদের মা। সে কথা অনেকদিন মনে ছিল আমাদের। বাজারে এলে ছেলে কালিপদকে ঘাড়ে করে নিয়ে আসতো তাগড়া জোয়ান হরিপদ। ৫/৬ বছর বয়স হলেই পিচ্চি ছেলে কালিপদকে নদীর জলে ছুঁড়ে মারতো হরিপদ। যাতে সাঁতরে ছেলে ফিরে আসতে পারে বাবার হাতে। আমরা নদীতীরে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে দেখতাম – বাবা ছেলের সাঁতার শেখার এ কসরৎ।
:
আমরা যে দূরের স্কুলে পড়তাম, সেখানে প্রাইমারি সেকশনে ভর্তি হয়েছিল কালিপদ। কিন্তু কদিন স্কুলে যেতেই সে ফিরে গেল বাবার নৌকোয় মাছ শিকারে। সম্ভবত হরিপদও মনে করেছিল, জলদাসের ছেলেতো আর জজ ব্যারিস্টার হবেনা, তারচেয়ে এখনই বাবার সাথে শিখুক মাছ ধরা, জাল গাাওয়া আর নৌকো চালানো বিদ্যে। নানাবিধ সমস্যায় হরিপদ ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাড়ি আসতো মায়ের কাছে। বিশেষ করে যখন মাছের আকালে টাকা পয়সা ধার লাগতো তার। কখনো কোন মুসলমানের সাথে বিরোধ লাগলে তার নালিশ জানাতো মাকে। ওদের বিশ্বাস ছিল, মা তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুষ্ঠু বিচার করবে হিন্দু মুসলমান সমস্যার।
:
কালের ধারায় একসময় পরিপূর্ণ যুবকে পরিণত হলো জলদাস কালিপদ আর বুড়িয়ে গেল বাবা হরিপদ। বাবার নৌকো জাল আর পেশাকে আপন করে নিলো নদী সংলগ্ন জলমগ্ন জলজীবনের মানুষ কালিপদ। নদীর ওপারের দূরের এক গাঁয়ে বিয়ে ঠিক হলো কালিপদের। বুড়ো হরিপদ মায়ের কাছে আব্দার করলো, বরযাত্রী হিসেবে আমিও যেন যাই কালিপদের বউ আনতে। আমি বন্ধুদের ছাড়া একাকি কোথাও যাইনা, তাই বায়না ধরলাম নিলে আমাদের ১১-বন্ধুকেই নিতে হবে, যার মধ্যে দুজন আবার হিন্দু। অবশেষে বিয়ের বড় গয়না নৌকোর ছাদে বসে বরযাত্রী হলাম আমরা ১১-বন্ধু! প্রতিবেশী হিন্দুদের অনেক বিয়ে দেখেছি আমি ইতোমধ্যে। কিন্তু সরাসরি বরযাত্রী এই প্রথম। দরিদ্র কৃষক কন্যার বাড়িতে নানাবিধ উৎসব শেষে মাটিতে হোগলা পাতার আসনে বসে খেলাম আমরা সকল বরযাত্রী। বউ নিয়ে ফেরার পথে আকস্মিক কালবোশেখী ঝড়ে পড়লো আমাদের বরযাত্রীর নৌকো। হরিপদ, কালিপদসহ আমরা সকল বরযাত্রী লাফিয়ে জলে পড়ে নৌকো টেনে নিয়ে গেলাম অল্প পানির চরে। রক্ষা পেলো নতুন বউসহ সকল বরযাত্রী আর নৌকো। বউ ঘরে তোলার সময় হরিপদের স্ত্রী আর আত্মীয়দের সাথে আমার মা-ও উপস্থিত রইলো হরিপদের বাড়িতে। রাতে আবার খোল করতাল ঢোল সারিন্দা বাজিয়ে উৎসব করলো সকল জেলে আর প্রতিবেশী কৃষকরা। আমার মা কালিপদের বউকে আগেই একটা দামি বেনারশী শাড়ি উপহার দিয়েছিল শহর থেকে এনে। যা পরিয়েই মূলত বউকে তোলা হয়েছিল নতুন ঘরে।
:
কালচক্রে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখো হলাম আমি। দেশের বাইরেও কাটিয়ে দিলাম বেশ কবছর। হরিপদ আর তার স্ত্রী কবে মারা গেলো জানতেও পারলাম না আমি! নদীভাঙনের পর কালিপদ কই সংসার পাতলো তাও জানা ছিলোনা আমার। তবে এটা জানতাম, আমাদের যে একটা সুন্দর গ্রাম ছিল, যাতে বসবাস করতো কয়েক হাজার কৃষক মুসলমান আর হিন্দু জেলেরা, যারা কখনো হিংসা দ্বেষ পোষণ করতো না একে অন্যের প্রতি। ধর্মীয় কোন বিভাজনই ছিলনা আমাদের গাঁয়ের দরিদ্র মানুষের মাঝে। সবাই রত ছিল জীবন সংগ্রামে। ধর্মীয় রাজনীতি বুঝতো না তারা। বর্ষাকালে হিন্দু জেলেরা দুটো চারটে করে ইলিশ উপহার দিতো মুসলিম কৃষকদের। আর পৌষ মাসে কৃষাণরা পিঠে খাওয়ার ধান দিতো জেলেদের এক পরম আনন্দে! যে কারণে কখনো ধর্মীয় দাঙ্গা হয়নি আমাদের এলাকায়!
:
আমার মা তার বাবার সূত্রে অনেক জমি পেয়েছিল ভাগে। যা নদীতে ভেঙে নিয়েছিল প্রায় পনের কুড়ি বছর আগে। তিন চার বছর আগে চর জাগাতে ঐ জমি দেখতে গেলাম একদিন এলাকার পুরনো দিনের বন্ধুদের সাথী করে। হাঁটতে হাঁটতে চরের মাঝে এক কুঁড়ের সামনে বসা দেখতে পেলাম কালিপদকে। কালিপদ বয়সে আমার অন্তত ৭/৮ বছরের ছোট হলেও, রোগ শোক কি কারণে সে যেন বুড়িয়ে গেছে তার বাবার মতোই। আমাদের ডেকে পিঁড়ি পেতে বসতে দিলো কালিপদ। ঘোমটা দেয়া তার বউকেও দেখলাম, যার বিয়েতে গিয়েছিলাম আমরা কবন্ধু। কথা প্রসঙ্গে কালিপদ জানালো – নিজের ছেলে মেয়ে কেউ নেই সাথে তার। মেয়েরা স্বামীর বাড়ি আর ২-ছেলে থাকে মনপুরা দ্বীপে সাগর মোহনায় জেলে জীবনে। চর পড়ার পর এ পৈত্রিক ভিটেতে কুঁড়ে নির্মাণ করেছে অসুস্থ্য কালিপদ। স্ত্রীকে নিয়ে একাকি থাকে এ রাস্তাঘাট, হাঁটবাজারহীন বিরাণ জনপদে। এ চরে কেবল তার মতো দরিদ্ররাই কুঁড়ে নির্মাণ করে বসবাস করছে, যাদের যাওয়ার আর কোন যায়গা নেই। বর্ষাতে এখনো পুরো চর জলমগ্ন থাকে। শুকনোর দিনে বিলকে মেঠো্পথ হিসেবে ব্যবহার করে তারা। অনেকদিন থেকে জ্বর-কাশিসহ নানাবিধ রোগে ভুগছে কালিপদ। স্বাস্থ্যগত কারণে এখন আর মাছ ধরতে বড় নদীতে যেতে পারেনা সে। ঘরের কাছাকাছি খাল ডোবাতে কোন রকমে ছোট মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে এককালের তাগড়া যুবক হরিপদপুত্র কালিপদ জলদাস!
:
ইচ্ছে হলো কালিপদকে শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাই। কিন্তু ঢাকা মন্ত্রণালয়ের হেড অফিস থেকে জরুরী ফোন পেয়ে ঐদিনই ফিরে আসতে হয় ঢাকাতে আমার। অতএব চাপা পড়ে যায় কালিপদের চিকিৎসা বিষয়ক চিন্তা। ৭/৮ মাস পর কুরবানীর ঈদ এলে সব ভাইবোনেরা প্লান করি, এবার ঈদ পালন করবো আমাদের গাঁয়ের বাড়িতে। ঈদের দুদিন আগে সব ভাইবোন একত্রিত হই মা বাবার স্মৃতিঘেরা গ্রামের বাড়িতে। ভাইবোনের প্রবাসী ছেলেমেয়েরা আব্দার করে – বালির চরে পিকনিক করতে যাবে তারা। চরের বালিতে রৌদ্রস্নান করে, নদীতে সাঁতরে দুপুরের খাবার খাবে তারা বালুভূমিতে। বেলা দশটার দিকে নতুন জেগে ওঠা বালির চরে নামলাম আমরা নানাবিধ তৈজসপত্র সাথে করে। ছেলেমেয়েরা তাবুর মত বানিয়ে তাতে শতরঞ্জি পাতলো বিশ্রামের জন্য। নানাবিধ খাবার উপকরণ দিয়ে সাজালো চরে দুপুরের খাবার। বালুচরে বালিতে বসে খেলাম আমরা! হঠাৎ অনেক দূরে চোখে পড়লো কতগুলো কুঁড়েঘর, যার মধ্যে একটি হয়তো কালিপদের। যার কথা প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম আমি। ইচ্ছে হলো এখনই কালিপদের কুঁড়েতে গিয়ে দেখে আসি তাকে। কিন্তু ভাইবোন ছেলে মেয়ে সবাইকে ছেড়ে যেতে পারলাম না একাকি কালিপদের কুঁড়েতে। পরিকল্পনা করলাম পরদিন যাবো বন্ধুদের নিয়ে।
:
বাজারে খবর নিলাম – রোগে শয্যাশায়ী কালিপদ অনেক দিন থেকে। খুব কষ্টে সংসার চলছে তার। বাজার থেকে কিছু জিলিপি আর কৃত্রিম ফলের রসের বোতল কিনে বন্ধু জয়নাল আর রফিককে নিয়ে উপস্থিত হলাম কালিপদের বাড়িতে। কিন্তু কিছুই খেতে পারলো না রোগাক্রান্ত কালিপদ! শুকিয়ে কাঠ হয়েছে তার পুরো শরীর। স্ত্রী জানালো দূর চরের এনজিও কর্মীরা ব্লাড নিয়ে ‘টিবি’ সনাক্ত করেছে কালিপদের। ফ্রি বিদেশী টিবির ঔষধও দিয়েছে কালিপদকে খেতে। প্রতিদিন খেতে হয় নটি ট্যাবলেট ক্যাপসুল। নমাস নাকি খেতে হবে এ ঔষধ। কিন্তু কদিন থেকে কিছুই গিলতে পারছে না কালিপদ। তাই ভাতসহ ঔষধ খাওয়াও বন্ধ তার! স্ত্রী অশ্রুসজল কণ্ঠে বললো – এনজিও কর্মীরা জানিয়েছে, তার স্বামী নাকি আর বেশীদিন বাঁচবে না। তাই আশা ছেড়ে দিতে বলেছে তারা। কথা বলতে পারছে না কালিপদ, দুচোখ বন্ধ তার!
:
এককালের আমার প্রতিবেশী তাগড়া যুবক কালিপদ জলদাস এখন বিলুপ্ত পাখির ঠোঁটে শিলালিপির এক এপিটাফ যেন। অনেকক্ষণ পর তাকে ভাঙা কুঁড়েতে একাকি ফেলে উঠে দাঁড়াই আমরা! স্ত্রীর হাতে কটা টাকা গুজে দিয়ে এ দম বন্ধ হওয়া পরিস্থিতি থেকে পালাতে চাই যেন আমি! ওঠার আগে কালিপদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলি – তুমি সেই দুখের শিলালিপি পাঠ করে গেলে প্রিয়বন্ধু, আমৃত্যু! আমাদের ওঠা দেখে ওর স্ত্রীর ঘোলাটে চোখে বৃষ্টিধোয়া নিরুচ্চার শব্দগুলো গুমরে মরে বার বার! ঘাসময় চরে বুনো পাখিদের উড়ে চলা পাখার অশ্রুত শব্দের কথামালা ভেঙে পা রাখি মেঠোপথে আমরা। শূন্যঘরে কালিপদ জলদাস ব্যথাময় ভেঙেপড়া পাথরের বুকে ঘুমিয়ে থাকে নিশব্দে! ফেরা পথে মৃত্যুর মতো অন্তহীন স্তব্ধতায় শব্দরাশি গুঞ্জন তোলে চারদিকে আমাদের! এ কুঁড়েকে ফেলে শব্দহীন তিরতির গ্রামীণ বহতা নদীর কাছে ফিরে যাই আমরা! পুরো পথের জলচরে মৃত তিতিরের করুণ শব্দের রেশ ভেসে বেড়ায় সারাক্ষণ আমাদের মননে! এ দ্বীপের অন্ধকার রাতে তারাহীন নীল অন্ধকারে বেঁচে থাকে কালিপদরা এভাবেই!

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *