আমেরিকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অর্থায়ন বন্ধ করা কি সঠিক পদক্ষেপ?

আমেরিকান দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে এটি একটি সঠিক এবং অবশ্যম্ভাবী পদক্ষেপ। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্ত ও সময়োপযোগীতা নিয়ে আলোচনা করাই যায়, কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অপদার্থতা নিয়েও বিশদে আলোচনা প্রয়োজন।

গ্রেট হল অফ পিপল এ রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এর পাশে বসে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের অধিকর্তা টেড্রস অ্যাধানম গেব্রিওসিস চীনের ভূয়সী প্রংশসায় এই ব্যক্তব্যটি রাখেন…..”We appreciate the seriousness with which China is taking this outbreak, especially the commitment from top leadership, and the transparency they have demonstrated.” এমন একটা সময়ে এই প্রশংসার মালা গাঁথা হচ্ছিল যখন চীনের উহান ও হুবেই প্রদেশে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তান্ডবনৃত্য চলছে, আর সাথে সাথে চলছে চৈনিক কমিউনিস্ট পার্টির নিপুন হাতে তথ্য লুকানোর শিল্পকর্ম। আমরা ডক্টর লি এর গল্প জানি। সত্য বলার অপরাধে কিভাবে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান ও পরে তাঁকে করোনা ভাইরাসে মৃত বলে ঘোষনা করা হয়।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৮ সালে সদ্য তৈরি হওয়া রাষ্ট্রসংঘের অধীনে। গুটিবসন্ত ও পোলিও ওপর কাজ করে যুগান্তকারী সাফল্য পায় হু। কিন্তু ২০১৩ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকার যে ইবোলা আউটব্রেক হয় সেখানে পাঁচ মাস সময় লেগে যায় পাবলিক হেলথ এমার্জেন্সি অফ ইন্টারন্যাশানাল কনসার্ন হিসেবে উক্ত ইবোলা প্যানডেমিককে স্বীকৃত করতে। প্রথমবারের জন্য হু এর অযোগ্যতা সামনে আসে। হু মূলত ছটি এলাকাভিত্তিক উয়িং দ্বারা পরিচালিত হয়, জেনিভার কেন্দ্রীয় অফিসের নিয়ন্ত্রন সংগঠনের ওপর খুবই কম। সংগঠনটি ভীষনভাবে ব্যুরোক্রাটিক রেড টেপের শিকার।

২০১৭ সালে ডক্টর গেব্রিওসিস যখন হু এর কর্তা হিসেবে নিযুক্ত হন তখন তিনি কথা দেন যে এই ব্যবস্থার একটা সুস্থ সমাধান তিনি করবেন। এই গেব্রিওসিসের হু এর প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি ভীষনভাবে সন্দেহজনক। গেব্রিওসিস একমাত্র হু কর্তা যে পেশায় কোনো চিকিৎসক নয়, বরং একজন রাজনীতিবিদ। ইথিওপিয়ার মন্ত্রীসভায় সে স্বাস্থ্য ও বিদেশ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছে এর আগে। গেব্রিওসিস প্রথম আফ্রিকান হু অধিকর্তা এবং প্রথম অ চিকিৎসক প্রধান( কমিউনিটি হেলথে পি এইচ ডি)। এনার নির্বাচনের সময় চীন এনাকে ব্যাপক সমর্থন করে। চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এর স্ত্রী বতর্মানে হু এর গুডউইল অ্যাম্বাস্যাডর। এই গেব্রিওসিস একবার জিম্বাবুয়ের প্রয়াত একনায়ক ও বিতর্কিত শাসক রবার্ট মুগাবেকে হু এর গুডউইল অ্যাম্বাস্যাডর হিসেবে নিয়োগ করার প্রস্তাব দেয়, যাতে বিতর্ক চরমে ওঠে, প্রসঙ্গত মুগাবের সবচেয়ে বড় সমর্থক চীন, ১৯৭০ সাল থেকে মুগাবের স্বৈরাচারী শাসনের প্রতি চীন অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়ে এসেছে। তাই হয়ত চীনের প্রিয় মুগাবের নাম প্রস্তাব করে চীনের গুড বুকে থাকতে চেয়েছিল গেব্রিওসিস। চীনের থেকে ইথিওপিয়া প্রায় তেরো বিলিয়ন ডলার ঋন নেয়, যার ফলে দেশটি চীনের আগ্ৰাসী ঋনের জালে আটকে পড়ে, এর জন্য প্রধানত গেব্রিওসিস কেই দায়ী করা হয়। এই ঘটনার পর গেব্রিওসিসের সাথে চীনের সাঁটপাটের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ইথিওপিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালীন গেব্রিওসিসের বিরুদ্ধে কলেরা মহামারী চাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এবারে করোনার ভাইরাস নিয়ে নির্লজ্জ চীন তোষনে হু অধিকর্তার নোংরা রূপটা সবার সামনে বেরিয়ে এসেছে।

এবারে চলে আসি হু এর রাজনৈতিক যোগের আলোচনায়। প্রথম থেকেই চীন হু কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে তাইওয়ান এর বিরুদ্ধে। ২০০৩ সালে যখন প্রথম SARS-COV এর আউটব্রেক হয় তখন তাইওয়ানকে তথ্য দিতে অস্বীকার করে হু। তাইওয়ানকে চিরশত্রু চীনের কাছে তথ্য পাওয়ার জন্য ভিক্ষা করতে বলা হয়। আর আজও যখন চীনের দান করোনা নামক বৈশ্বিক মহামারীতে গোটা বিশ্ব আক্রান্ত তখনও নোংরা রাজনীতির খেলা খেলে যাচ্ছে হু। ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে যখন সেন্ট ভিনসেন্টের স্বাস্থ্যমন্ত্রী লিউক ব্রাউনে তাইওয়ানকে হু এ অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানায় তখন চীনের নুন খাওয়া কিছু ছোটো ছোটো দেশের উদ্যোগে ও চীনের লবিবাজির জেরে সেই প্রস্তাব পিছনে চলে যায়। আজ হু এর থেকে কোনরকম সাহায্য না পাওয়া স্বত্ত্বেও করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসম্ভব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে তাইওয়ান। সাথে সাথে উন্নত মানের দ্রব্য রপ্তানি করে সাহায্যও করছে অন্যান্য দেশগুলিকে। সবথেকে নিম্ন মানসিকতার কাজ বোধহয় তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ আনা। গত সপ্তাহে গেব্রিওসিস তাইওয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, তাইওয়ান নাকি তাকে রেসিয়াল অ্যাটাক করেছে। অর্থাৎ নিজের অপদার্থতা ঢাকা দিতে শেষ সম্বল ভিকটিম কার্ডটি খেলে দিলেন গেব্রিওসিস।

চীনের কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস করা হু এর সবথেকে বড় অপরাধ। চীন বলেছে সবকিছু স্বাভাবিক, মানুষ থেকে মানুষে এই ভাইরাসের সংক্রমণের আশংকা নেই, নির্ধিদ্বায় বিশ্বাস করেছে হু, আর তার মূল্য চোকাতে হচ্ছে গোটা বিশ্বকে। যখন ভারত আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশ একে একে চীনের থেকে আগত ফ্লাইটগুলিকে নিষিদ্ধ করছে তখন চীনের সাথে গলা মিলিয়ে বিভিন্ন দেশের সমালোচনা করেছে হু।

আমেরিকা হু এর সবথেকে বড় অর্থ সাহায্যকারী। গত বছর আমেরিকা হু এর খাতে প্রায় ৬০০( অষ্ট্রৈলিয়ান স্কাই নিউজের তথ্য অনুযায়ী) মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করে যা হু এর আর্থিক যোগানের ১৫%। এমতবস্থায়, যখন চীনের তাঁবেদারি করতে করতে হু এর বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে তলানিতে তখন এই আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে আমেরিকা সঠিক কাজ করেছে বলেই আমার বিশ্বাস। বরং আমেরিকান করদাতাদের ট্যাক্সের টাকাগুলো মিথ্যে অপচয় না করে যদি সরাসরি আমেরিকা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিকে আর্থিক সাহায্য প্রদান করে, তবে সেটা অনেক যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ হবে। সবার আগে এই চৈনিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট মেরুদণ্ডহীন সরীসৃপটির পদত্যাগ সর্বতোভাবে কাম্য।

ধন্যবাদ।

You may also like...

1 Response

  1. neam says:

    চিন্তার বিষয়!!!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *