ঈদুল ফিতর ২০২০

ইসলামের কেবলা সৌদির ক্যাবলা বাবাদের চেয়ে বরাবরই পিছিয়ে থাকতে চাওয়া উপমহাদেশীয় মুসলিমরা ঈদ উদযাপন করেছে। পরিবার নিয়ে আনন্দ করেছে। আনন্দে শরিক হয়েছেন সাবেক মুসলিমরাও। কোরবানির ঈদের মতো এই ঈদে প্রাণী হত্যার মহোৎসব হয়না বলে এটি কাউকে পালন করতে দেখলে আমি তেমন উচ্চবাচ্য করি না। তবে ঈদ নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। আর তা হচ্ছে, এই ঈদ পালন করার এবং ইদের আনন্দে শরিক হওয়ার বৈধতা মুসলিম ছাড়া অন্য কারো জন্য ইসলাম দিয়েছে কিনা? উত্তর হচ্ছে, দেয়নি। ইসলামি শরিয়া আইন মোতাবেক ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদের দিনের করণীয় কাজ হচ্ছেঃ
১) খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা এবং মেসওয়াক করা
২) গোসল করা
৩) তিনটি বা পাঁচটি (বেজোড় সংখ্যায়) খেজুর খাওয়া
৪) ফেতরা আদায় করা (ইতিপূর্বে আদায় না করলে)
৫) নতুন জামাকাপড় পরা ও চোখে সুরমা ব্যবহার করা।
৬) তাকবীর পড়া, তওবা ইসতিগফার করা ও পায়ে হেঁটে ঈদগাহের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়া। এক পথে ঈদগাহে যাওয়া এবং ভিন্নপথে ফিরে আসা।
৭) ঈদের নামাজ আদায় করা। কোলাকুলি করা। কুশল বিনিময় করা। এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে দেখলে বলবেঃ তাকাব্বালল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকুম تقبل الله منا ومنكم (আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন)
৮) কবর জিয়ারত করা
৯) আতর মাখা

 

ইসলামের ঈদ কেবল মুসলিমদের জন্যই। ঈদ উদযাপনের জায়গা হচ্ছে ঈদগাহ (ঈদের নামাজ পড়ার স্থান)। ঈদগাহে মুসলিম ছাড়া অন্য কেউ যেতে পারে না। ইসলামের সবকিছু যেহেতু ইবাদত-বন্দেগি নির্ভর, তাই ঈদটাও মূলত এবাদত তথা উপাসনা নির্ভর একটি পর্ব। ঈদের দিন মেয়েদের ঘর থেকে বেরোনো, ঘোরাঘুরি করা, বোরকা না পরে থাকা ইত্যাদি কোনোকিছুর অনুমতি ইসলাম দেয়না। গানবাজনা, হৈ-হুল্লোড় করা, নাটক-সিনেমা দেখা ইত্যাদি অন্য সময় যেমন হারাম ঈদের দিনেও কেমনই হারাম। বলা হয় ঈদ মানে আনন্দ। এটি মডারেটদের মস্তিষ্কের আবিষ্কার। ঈদ মানে কি সেটা আরবি ডিকশনারি খুললেই দেখতে পাবেন। মুসলিমদের জন্য কেবলমাত্র দুটি উৎসব পালনের অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। অন্য কোন ধরনের উৎসব পালনের অনুমতি ইসলাম দেয়নি। আর তাই আমাদের দেশে পালিত ঈদে মিলাদুন্নবী, শবে বরাত, শবে মেরাজ, শবে কদর, ফাতেহা দোয়াজ দহম এই সকল কিছুকে উৎসব হিসেবে পালন করা ইসলামে হারাম। এরমধ্যে শবে বরাত, শবে কদর, শবে মেরাজ এসব কিন্তু উৎসবের রাত না। এসব হচ্ছে স্রেফ ইবাদত-বন্দেগির রাত। আর মিলাদ, কেয়াম, খতম, ইদে মিলাদুন্নবী, ফাতেহায়ে দোয়াজদহম, ফাতেহায়ে ইয়াজদহম এসব কিছুর তো অস্তিত্বই ইসলামে নেই। এসব একেবারেই বেদাত ও হারাম।
ইসলামের ঈদে আনন্দ করার নির্দিষ্ট জায়গা হচ্ছে ঈদগাহ। আর ঈদগাহে কোন অমুসলিমের প্রবেশ করার বৈধতা ইসলাম দেয়না। তবে হ্যাঁ, যদি দেশটি ভারত, কানাডা বা নিউজিল্যান্ড হয় তবে ভিন্নকথা। তখন তাকিয়া বা হেকমতের (কৌশলগত) কারণে কাফের দেশের কাফের প্রধামন্ত্রীদেরকে ঈদগাহে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে। পক্ষান্তরে দেশটি যদি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ হয় তবে ফতোয়া যথাস্থানেই থাকবে – কাফেররা কেউ ঈদগাহে ঢুকতে পারবে না!

 

আপনি যদি কোন আলেমকে জিজ্ঞেস করেন, ইসলাম কিভাবে ঈদের আনন্দ করার অনুমতি দেয়? প্রশ্ন করার পর আপনি যা উত্তর পাবেন তাতে বুঝতে পারবেন, আসলে একে উৎসব বলা চলে না। বড়জোর ঘরের মধ্যে ভালো ভালো রান্না করে খাওয়াদাওয়া করা, ঈদগাহে গিয়ে অনেক মানুষের একসাথে নামাজ পড়া এই-ই হলো ইসলামের ঈদের সারবত্তা। এমন উৎসবকে উৎসব না বলে অন্য কিছু বলাই সঙ্গত। তাছাড়া ইসলামের ঈদ কি সর্বজনীন? উত্তর হচ্ছে, না। ইসলাম এই উৎসবে অমুসলিমদের শামিল হওয়ার অনুমতি দেয়না। এমনকি মুসলিম নারীদেরও ঈদগাহে যেতে ইসলাম দেয়না। মুসলিম নারীদের আনন্দ করারও অনুমতি ইসলাম দেয়না। মুসলিম নারীদের জন্য জোরে হাসার অনুমতি সারাবছর যেমন নেই তেমনি ঈদের দিনেও নেই। ইসলামের ঈদ কেবল মুসলিম পুরুষদের সীমিত পরিসরের উৎসবের নাম। অমুসলিম এবং মুসলিম নারীরা সেখানে ব্রাত্য, অস্পৃশ্য!

ঈদের দিন মুসলিম পুরুষেরা পরস্পর পরস্পরের সাথে কুশল বিনিময় করবে, কোলাকুলি করবে, হ্যান্ডশেক (মুসাফাহা) করবে, মুসলিম পুরুষেরা অন্য মুসলিম পুরুষদেরকে তাদের বাড়িতে দাওয়াত দেবে; এরপর জমিয়ে খাবে। আর মুসলিম মেয়েদের কাজ হচ্ছে রান্না করে তার বরের, কিংবা ভাইয়ের কিংবা বাপের বন্ধু-বান্ধবদেরকে আপ্যায়ন করানো। কিচেন রুম টু বেডরুম, আর বেডরুম টু কিচেনেই যাদের জীবন সীমাবদ্ধ ঈদ তাদের জীবনের বাধা ছকে কোন পরিবর্তন আনে না। মুক্তমনাদের অনেকেই নিজের মতো করে ঈদ পালন করছেন। আমি আপনাদের ঈদ পালন নিয়ে সমালোচনা করব না, নিষেধও করব না; কেবল মোহাম্মদের আবিষ্কৃত ও নির্দেশিত ইসলামিক উৎসব ঈদ পালনের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিটা তুলে ধরলাম। আনন্দ হিসেবে যদি আপনি ঈদ পালন করেন, ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া করেন তবে সেটি আপনার সিদ্ধান্ত, কিন্তু ইসলাম অমুসলিমদের এবং নাস্তিক-মুরতাদদের ঈদ পালন করার অনুমতি দেয় না। আপনি ঈদ পালন করছেন মানেই ইসলাম মানছেন, জোর গলায় সে দাবিও আমি করছি না।

রমজান মাসে রোজা রাখার কারণে, তারাবির নামাজ পড়ার কারণে ঈদের দিন সকালে সব মুসলিমদের আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। ঈদের দিন সকালে ঈদগাহে যাওয়ার পথে এবং ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে আল্লাহর ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং প্রত্যাবর্তন করা মুসুল্লিদেরকে অভিনন্দন জানায়। তাদের সাথে হ্যান্ডশেক করে। তাদের সাথে কুশল বিনিময় করে। এমনকি বলা হয়, ফেরেশতারা তাদের ডানাও বিছিয়ে দেয় মুসল্লিদের জন্য। বিশ্বাসের ভাইরাস কত ভয়ানক! যে মুসলিমদের জন্য ফেরেশতারা তাদের ডানা বিছিয়ে দেয়, যাদের সাথে কুশল বিনিময় করে, সালাম দেয়, হ্যান্ডশেক করে সে মুসলিমদের কেউ কোনদিন কি ফেরেশতাদেরকে দেখেছে? ফেরেশতাদের হাতের ছোঁয়া কি কেউ পেয়েছে? ফেরেশতাদের সালামের আওয়াজ কি কেউ কোনদিন শুনেছে? শোনেনি, দেখেনি, ছোঁয়া পায়নি, কিন্তু তবুও একজন মুসলিমের বিশ্বাস করতে হবে যে, তার ঈদগাহে যাওয়া-আসার পথে ফেরেশতারা দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম দেয়, করমর্দন করে এবং শুভেচ্ছা জানায়। সারা রমজান মাস রোজা রাখার পর রোজাদার ও নামাজী মুসলিমের পাপমোচন হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং সার্টিফিকেট বিতরণ করে আল্লাহর ফেরেশতারা ঈদের দিন সকালেই। প্রত্যেক নামাজী মুসলিম সেদিন সেই সার্টিফিকেট গ্রহণ করার জন্যই ঈদগাহে যায়। কেউ কিন্তু কোনোদিন সার্টিফিকেটটা ছোঁয়নি এবং ফেরেশতাদের ঘোষণাটা নিজ কানে শোনেনি!

আপনি হিন্দু, মুসলিম, নাস্তিক যাই হোন দুর্গাপূজায় আপনি মন্ডপে ঢুকতে পারবেন। একইভাবে আপনি বড়দিনের উৎসবেও শামিল হতে পারবেন। যেকোনো শিশু সান্তাক্লজের কাছ থেকে গিফট নিতে পারবে। কিন্তু ইসলামের ঈদ অন্য সব ধর্মীয় উৎসবের চেয়ে আলাদা।

ঈদের দিন ইদের নামাজ শেষে আমাদের দেশের মসজিদসমূহে বিশেষ মোনাজাত (প্রার্থনা) হয়। দুনিয়ার সব মুসলিমের মঙ্গল কামনা করে এবং সব অমুসলিমের অমঙ্গল চেয়ে মোনাজাত হয়। মোনাজাত পর্ব সেরে ধনী, গরিব, সাদা, কালো, দেশি, বিদেশি সব মুসলিমরা সব ভেদাভেদ ভুলে একে অন্যের সাথে বুক মেলায়, হাত মেলায়। আর তাই দেখে আমাদের দেশীয় সাংবাদিক, বুদ্ধিপরজীবী এবং রাজনীতিবিদদের আবেগ উথলে ওঠে। এমন বৈষম্যহীনতা দেখে তারা যেন গেয়ে ওঠে – “গাহি ইসলামী সাম্যের গান!”
যারা বুকে বুক আর হাতে হাত মেলায় তারাই কিছুক্ষণ পর ভ্রাতৃত্ববোধ ভুলে গিয়ে পরষ্পর পরষ্পরের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাবেক পৈশাচিক রীতিতে। সমস্যা কোথায় তাহলে? কোথায় গেল ঈদগাহের মুসলিম ভ্রাতৃত্বের চেতনা? সমস্যা আসলে ঐ গোড়াতেই। আপনারা যেখানে সাম্য খুঁজে পেয়েছেন সেখানে সাম্য ছিল না। মুসলিম পুরুষে-পুরুষে সাম্যবাদ দিয়ে কি হবে যদি না সেই সাম্যবাদে মুসলিম নারী এবং অমুসলিমের অংশগ্রহণ না থাকে? সাম্যবাদের গোড়ায় যখন গলদ থাকে তখন ওই আবেগমাখা ফুলঝুরি-সর্বস্ব পুরুষতান্ত্রিক সাম্যবাদ দিয়ে কি হবে?

শেষ প্রশ্নঃ দুনিয়ার সব এক্স মুসলিমরা যদি ধর্মনিরপেক্ষ পদ্ধতিতে ঈদ পালন করে তাতে কি ইসলামের ঈদ পালনের খোলনলচে বদলে যাবে? তাতে কি ঈদ উদযাপনে ইসলামের যে সাম্প্রদায়িক (অমুসলিমদের বেলায়) ও বৈষম্যপূর্ণ (মুসলিম নারীদের প্রতি) দৃষ্টিভঙ্গি তার মধ্যে পরিবর্তন আসবে? হুজুররা কি তাদের ফতোয়া পাল্টাবে?

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *