প্রতি মুহূর্তে বিবর্তন

বিবর্তন তত্ত্ব অস্বীকার কারীরা প্রায়ই এর বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন করেন, প্রশ্ন করা খারাপ কিছু না কিন্তু সেই প্রশ্ন যদি হয় স্ট্র-ম্যান ফ্যালাসি (Straw-man fallacy) তাহলে এর উত্তর তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। এরকম বহুল প্রচলিত অনেকগুলো কুযুক্তির একটি হচ্ছে স্পেসিয়েশান বা নতুন প্রজাতির উদ্ভব।

তারা তাদের বিবর্তন তত্ত্ব বিরোধী ইউটিউব ভিডিও, ওয়াড প্রেস ব্লগ,বইমেলার হট সেলিং পাকোড়া টাইপ বইয়ে অথবা ফেইসবুকের বিভিন্ন পেস্টে প্রায়ই বলেন,।দেখান আমাদেরকে যে ব্যায়াম করতে কর‍তে মানুষ হাতি হয়ে গেছে, বাঘ অনেক বছর ব্যাবধানে জিরাফ হয়ে গেছে,অথবা হরিন বনে লাফাতে লাফাতে কুমির হয়ে গেছে, এবং আরো দাবি করেন যে নতুন প্রজাতির উদ্ভবের কোন উদাহরণ নাকি নেই।

বিবর্তনের ভিত্তি হচ্ছে জিনের আদান প্রদান, কোন প্রজাতির মধ্যে অল্প কিছু জেনেটিক পার্থক্য সেই প্রজাতির মধ্যে যে বিশাল ভিন্নতা তৈরি করতে পার তা অকল্পনীয়। উদাহরণ হিসাবে কুকুর বা Canidae ফ্যামিলির কথাই ধরি, হাজার বছরের ব্যাবধানে নেকড়ে থেকে আসা এই প্রজাতিটির মধ্যে এত পার্থক্য এসেছে যে তা বিশ্বাস করার মত নয়, কিন্তু বিবর্তন বিরোধীদের সেই একি প্রশ্ন কুকুররের মধ্যে যত পার্থক্যই থাকুক তারা কিন্ত এখনো কুকুরই আছে। তাহলে কুকুর কি চিরকাল কুকুরই ছিল, কুকুর যদি চিরকাল কুকুর থাকে তাহলে কুকুরের এত গুলো প্রজাতির হলো কিভাবে। যদিও এটি ক্ল্যাসিক জবাব।

নতুন প্রজাতির উদ্ভব বলতে আমরা বুঝি একি প্রজাতি দুটি আলাদা আলাদা প্রজাতিতে ভাগ হয়ে যাওয়া। আলাদা হওয়ার পরে তাদের কি লেজ গজায় না পাখা গজায় সেটা নির্ভর করে তাদের আগের প্রজাতির উপর। সুতরাং হাতি থেকে মানুষ হওয়া বা মানুষ থেকে জিরাফ হওয়া প্রশ্নটি একটি অবান্তর প্রশ্ন বায়োলজিতে। আর কিভাবে এক প্রজাতি দুটি আলাদা প্রজাতিতে ভাগ হয়ে থাকে সেটা বুঝলে এই ধরনের প্রশ্ন না করাই স্বাভাবিক। পৃথিবীতে প্রানের উদ্ভব থেকে শুরু করে আজ অবধি কুকুর,বিড়াল,বাঘ সিংহ কি একরকমই আছে ? ডারউইনের গ্যালাপাগোসের ১৩ প্রজাতির প্রায় একি রকম দেখতে ফিঞ্চ পাখির ইতিহাস কি ভুয়া? নাকি ৭ প্রজাতির বাঘ আমরা ভুল দেখছি ? হতে পারে তাদের নিজেদের সংজ্ঞায় মাইক্রো ইভুলেশানের আর মেক্রোইভুলেশান আলাদা, হতে পারে বির্বতন বিরোধীরা সম্ভবত আমাদের চাইতেও ভালো চোখে দেখেন।

প্রথমেই জেনে নেই স্পিশিজ বা প্রজাতি বলতে কি বুঝায়, বায়োলজিতে প্রজাতি বলতে বৈজ্ঞানিকদের ভাষায় অনেক কিছুই বোঝায় , ভাইরাস বা অন্যান্য পরজীবি থাকায় প্রজাতির সংজ্ঞা সাধারণ ভাবে দেওয়া একটু কঠিন, বাংলাদেশের অনেক বিবর্তন বিরোধী লেখকরা এই কাজটি করে থাকেন, তারা সায়েন্টিফিক ডিসপিউটের (dispute) সুযোগ নিয়ে থাকেন , কারন তাদের উদ্দেশ্য থাকে অন্য কিছু, যেহেতু প্রজাতির বর্ণনায় ঐক্যবদ্ধ কোন সংজ্ঞা আপাতত নেই সেই কারনে বিবর্তন ভুয়া এই ধরনের একটি মনোভাব থাকে তাদের , আপাতদৃষ্টিতে কোন কিছুর ২০ ধরনের সংজ্ঞা থাকলেও সব সংজ্ঞা যে সঠিক হবে এমনটি না, আবার সব সংজ্ঞাই যে ভুল তাও না, আমি Occam’s razor ধরে সবচাইতে সহজ সংজ্ঞাটাই নিব এই ক্ষেত্রে।

প্রজাতি, বলতে জীববিজ্ঞানে যা বোঝায় তা হলো একি ধরনের সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যগত একদল জীব, যারা নিজেদের মধ্যে প্রজননের মধ্যমে উর্বর সন্তান উৎপাদন করতে সক্ষম। আবার জেনেটিক ভাবে যদি প্রজাতির সংজ্ঞা দিতে চাই তাহলে দাঁড়াবে যে সাধারণ জিন পুলের মধ্যেকার পার্থক্য অথবা কোন প্রজাতি মধ্যে জেনেটিক পার্থক্য।

একটা উদাহরণ দিলে ভালো হয়

একটি পুকুরে ৫ ধরনের ব্যাঙ বাসবাস করে, এখন আপনি চাচ্ছেন জেনেটিক ভাবে তাদের প্রজাতিকে ব্যাখ্যা করতে। এই ৫ ধরনের মধ্যে কেউ আবার তাদের নিজস্ব প্রজাতি ছাড়া অন্য কারো সাথে যৌন প্রজনন করে না, কিন্তু তাদের সবার মধ্যেই ব্যাঙের সাদৃশ্যতা আছে, আপনি দেখলেন ৫ ধরনের ব্যাঙের ৩ ধরনের ব্যাঙের মধ্যে বিভিন্ন জিনগত মিল বেশি এবং অন্য ২ ধরনের ব্যাঙের জিনের সাথে অমিলই বেশি। এই মিল,অমিল এবং যৌন প্রজননের এর উপর ভিত্তি করে আপনি তাদেরকে আলাদা আলাদা স্পিশিজ বলে ঘোষণা দিতে পারবেন, মূলত পপুলেশান জেনেটিক্সে এভাবেই একটি প্রজাতির ব্যাখ্যা এবং নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে কিনা তা ব্যাখ্যা করা হয়।

আগেই বলেছি স্পেসিয়েশান নিয়ে স্ট্র ম্যান ফ্যালাসি করা হয়, এবং এটি একটি বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন। বলতে পারেন বিবর্তনের সেন্ট্রাল কুয়েশ্চেন , যদিও বেশিরভাগ স্পেসিয়েশানের ঘটনা আমাদের জীবন-কালে আমরা দেখি না, আমাদের কে নির্ভর করতে হয় পূর্বের ডেটা বা ম্যাথমেটিক্যাল ক্যালকুলেশান, ডিএনএ,প্রোটিন,হোমোলজিক্যাল স্ট্রাকচার ,এন্যাটমি, মরফোলজি বা জিওগ্রাফিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশানের উপর, তারপরও অনেক স্পেসিয়েশান ঘটনা আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে, ছোট কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বিশাল আকারে তিমিরও স্পেসিয়েশান হচ্ছে। তেমনি কিছু স্পেসিয়েশান নিয়ে আলাপ করছি আজকে।

উদাহারন ১। নতুন প্রজাতির উদ্ভবের ক্ল্যাসিক উদাহরণের মধ্যে একটি হচ্ছে আমেরিকান দুটি নতুন প্রজাতির ফুলের গাছের উদাহরণ। মূলত এই প্রজাতির গাছদের মজা করে ডাকা হয় গোটস ‘বিয়ারড (goatsbeard). অথবা সেলসাফিস (sasafies). এদের হচ্ছে Genus Tragopogan. ১৯০০ সালের প্রথম দিকে এই বন্যপ্রজাতির ফুল গাছ মূলত তিন ধরনের ছিল।

Western salsify

The meadow salsify

Oyster salsify

১৯৫০ এর দিকে আরো দুটি নতুন প্রজাতির Goats Beard এর গাছ আমেরিকায় দেখা যেতে শুরু করে, গবেষণায় দেখা যায় এই দুটি নতুন প্রজাতি অন্যদুটি প্রজাতির হাইব্রিড হলেও এদের বীজ (Sterile) না বরং তারা তাদের নতুন প্রজাতির সাথে রিপ্রোডিউসে সক্ষম, কিন্তু পূর্বের ৩ টি প্রজাতির সাথে রিপ্রোডিউস করতে পারছে না। বিজ্ঞানীরা এটিকে বলছে Polyploidy.মানে মিউটেশানের ফলে কোন ভাবে জেনেটিক ইনফরমেশন ডাবল হয়ে গেলে উদ্ভিদে এই ধরনের স্পেসিয়েশান দেখা যায়।। Goats beard ছাড়াও অন্যান্য গাছের মধ্যে এই ধরনের হাইব্রিড স্পেসিয়েশান লক্ষ করা গিয়েছে।

উদাহরণ ২। আপেলের ম্যাগট ফ্লাই (Apple maggot fly) ২০০ বছর আগে আমেরিকায় এই ফলখেকো মাছি, যারা কিনা মূলত howthorns নামের একজাতীয় ফল খেয়ে বাঁচতো, কিন্ত ইউরোপীয়রা আমেরিকায় যাওয়ার পরেই মাছিগুলো নতুন খাদ্য (আপেলের) সন্ধান পায়। কিছু মাছি ধীরে ধীরে আপেল গাছে বসবাস করতে শুরু করে, ফলসরুপ তারা Howthorns ফলের গাছের মাছিদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। বিংশশতাব্দীর গবেষণকরা যখন এই দুইগ্রুপের মাছিদের allele frequency পরীক্ষা করে তখন দেখা যায় তাদের Allele frequency আলাদা।

আমাদের নাকের সামনে দিয়ে নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে কিন্তু আমরা তা জানিনা।

উদাহরণ ৩।। অরকাস (Orcinus orca) হত্যাকারী তিমি হিসাবে মূলত পরিচিত, এই তিমি গুলো দেখতে মোটামুটি একি রকম, কালো এবং সাদা প্যাচযুক্ত ডলফিন ফ্যামিলির এই তিমিরা একসাথে বসবাস এবং শিকার করে, কিন্ত আচরণগত গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই তিমিদের আচরণ বিভিন্ন রকমের, তাদের খাদ্যভাস আলাদা, আলাদা উপায়ে শিকার ধরে এমনকি শব্দ করে আলাদাভাবে । behavioral researcher রা এটি বুঝতে পারেননি এদের আলাদা আচরনের কারন,জিনতত্ত্ববিদরা যখন এই তিমিদের প্রজনন নিয়ে গবেষণা করেন তারা অবাক হন ফলাফল দেখে। প্রায় ১৩৯ টি তিমির মাইটোকন্ড্রিয়াল জিন নিয়ে গবেষনা করে দেখেন এই সব কিলার হোয়েলের মধ্যে অন্তত ৩ ধরনের প্রজাতি আছে। এবং মাত্র ১,৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০০ বছরের ব্যাবধানে এরা এদের মূল প্রজাতি থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে।

উদাহরণ ৪।।

শেষ করছি পাপুয়ানিউগিনির দুটি প্রজাতির পাখির স্পেসিয়েশান নিয়ে , যার নাম Monarch flycatchers, এরা ছোট আকারের কীটপতঙ্গ ভোজী পাখি, এই দুই প্রজাতির পাখির অমিল হচ্ছে তাদের পালকের রং, এক প্রজাতির পাখির গায়ের রং পুরোপুরি কালো , অন্য প্রজাতিটির আছে কালো এবং পেটের দিকে বাদামী রয়ের মিশ্রণ। কোন একটা পর্যায়ে একটি প্রজাতির মধ্যে সিংগেল এমিনো এসিডে মিউটেশান হয়,যার ফলে মেলানিন প্রোটিন স্থায়ী হয় একটি প্রজাতির মধ্যে। এই দুটি প্রজাতি নিজেদের মধ্যে প্রজনন করতে না পারলেও তাদের নিজেদের প্রজাতির মধ্যে প্রজনন খুব স্বাভাবিক ভাবেই করতে পারছে ।

ছোট পোকামাকড় থেকে শুরু করে শ্বেত ভাল্লুক, বা অতি বিশালকায় তিমির মধ্যেও বিবর্তন হচ্ছে, প্রতিনিয়ত নতুন প্রজাতি উৎপত্তি হচ্ছে আমাদের চারপাশে, বিবর্তন শুধু হাজার বছর আগেই ঘটেনি, বিবর্তন এই মূহুর্তেও হচ্ছে।

Reference

Soltis, D., & Soltis, P. (1989). Allopolyploid Speciation in Tragopogon: Insights from Chloroplast DNA American Journal of Botany, 76 (8) DOI: 10.2307/2444824

McPheron, B., Smith, D., & Berlocher, S. (1988). Genetic differences between host races of Rhagoletis pomonella Nature, 336 (6194), 64-66 DOI: 10.1038/336064a0

Uy, J., Moyle, R., Filardi, C., & Cheviron, Z. (2009). Difference in Plumage Color Used in Species Recognition between Incipient Species Is Linked to a Single Amino Acid Substitution in the Melanocortin?1 Receptor The American Naturalist, 174 (2), 244-254 DOI: 10.1086/600084

Phillip A Morin1, Frederick I Archer, Andrew D Foote, Julie Vilstrup, Eric E Allen, Paul Wade, John Durban, Kim Parsons, Robert Pitman, Lewyn Li, Pascal Bouffard, Sandra C Abel Nielsen, Morten Rasmussen, Eske Willerslev, M. Thomas P Gilbert, & Timothy Harkins (2010). Complete mitochondrial genome phylogeographic analysis of killer whales (Orcinus orca) indicates multiple species Genome Research

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *