প্রাইমেটদের কালার ভিশনের বিবর্তন (প্রথম পর্ব)

শীর্ষছবি: শিম্পান্জ্ঞিরাও মানুষের মত নানা ধরনের রঙ্গের পার্থক্য করতে পারে,যা অন্য অনেক স্তন্যপায়ীরা দেখতে পায়না। কান্দিনিস্কির এই পেইন্টিংটাতে কোন একজন দর্শক প্রথমত যা দেখেন সেটি এই ক্যানভাসে ব্যবহৃত নানা ধরনের পেইন্টের রঙ্গের বৈশিষ্ট,ছবিতে পড়া আলোর উজ্জ্বলতার প্রকৃতি এবং যিনি দেখছেন তার কালার ভিশন সিস্টেমের একটি প্রতিফলন:ছবি সুত্র: GEOFFREY CLEMENTS /BOB ELSDALE/LUCY READING-IKKANDA/Scientific American, April 2009)

 

We have seen that parts many times repeated are eminently liable to vary in number and structure; consequently, it is quite probable that natural selection, during the long continued course of modification, should have seized on a certain number of primordially similar elements, many times repeated, and have adapted them to diverse purposes.  Charles Darwin (1859: On the Origin of Species)

মুল:  Gerald H. Jacobs   এবং Jeremy Nathans এর Evolution of primate color visions (Scientific American, April 2009) অবলম্বনে। ডঃ জেরাল্ড এইচ. জ্যাকবস  সান্টা বারবারার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার নিউরোসায়েন্স এবং সাইকোলজীর অধ্যাপক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আমাদের দৃষ্টি ক্ষমতা, ভিজুয়াল সিস্টেম এবং রঙ্গ এর অনুভুতি বোঝার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষনা করছেন। তিনিই প্রথম নিউ ওয়ার্ল্ড প্রাইমেটদের মধ্যে কেমন করে ট্রাইক্রোমাসি বা তিন রঙ্গ নির্ভর কালার ভিশনের  উদ্ভব হলো তার একটি জেনেটিক মেকানিজমটির ব্যাখ্যা করেন। ডঃ জেরেমি নাথানস, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্স ও অপথ্যালমোলজী এবং মলিক্যুলার বায়োলজী ও জেনেটিকস এর অধ্যাপক, মুলত তিনি কাজ করেন মানুষের চোখের ভিজুয়াল পিগমেন্টের জিন, তার ডিএনএ ও এর কোড কৃত প্রোটিন এর সিকোয়েন্স নিয়ে। আমাদের ভিজুয়্যাল পিগমেন্টের জিনটি তিনিই প্রথম শনাক্ত করেছিলেন।

 শুরুর কিছু কথা: রঙহীন কোন পৃথিবী কল্পনা করাটা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব কারন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের প্রায় সবার চোখে এই পৃথিবী অগনিত রঙে সাজানো। কিন্তু এই পৃথিবীকে অসংখ্য রঙে সাজানো দেখতে পাবার ক্ষমতা আছে কেবল প্রাইমেট পরিবারে কয়টি সদস্যদের, যাদের মধ্যে আছি আমরাও। এই বিশেষ ক্ষমতাটি কালার ভিশন নামে পরিচিত।  আলোর ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রামের ছোট একটি অংশ আমাদের চোখ শনাক্ত করতে পারে ( প্রায় ৩০৯ ন্যানোমিটার থেকে প্রায় ৭৫০ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ); যাকে বলা হয় ভিজুয়াল স্পেক্ট্রাম। ভিজুয়াল স্পেকট্রামের আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ অনুযায়ী রেটিনার ফটোরিসেপ্টর কোন (Cone) কোষগুলোর কোষঝিল্লিতে থাকা তিন ধরনের ভিজুয়াল পিগমেন্টকে সক্রিয় হয় এবং যা সূচনা করে বহুধাপ বিশিষ্ট একটি প্রক্রিয়া। যার ফলাফলে চোখের অপটিক নার্ভ এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ভিজুয়াল সংকেত পৌছে যায় আমাদের ব্রেনে।এই তিন ফটোপিগমেন্টের আলো শোষন করার ক্ষমতা অনুযায়ী তিনটি মুল রঙ: নীল,সবুজ, লাল  এবং তাদের সীমাহীন কম্বিনেশন আমাদের ব্রেনে অগনিত রঙের অনুভুতির জন্ম দেয়। মানুষ ও বেশ কিছু প্রাইমেটদের এই কালার ভিশন, নন-প্রাইমেট স্তন্যপায়ীদের কালার ভিশন অপেক্ষা বেশ ভিন্ন। প্রাইমেটদের এই কালার ভিশনকে বলা হয় ট্রাইক্রোম্যাসি ( Trichromacy: Tri = তিন, chroma= রঙ); কারন রেটিনার কোন কোষে থাকা তিনটি ভিন্ন ধরনের ফটোপিগমেন্টের (যারা ভিজুয়াল স্পেক্ট্রামের নির্দিষ্ট রেন্জের তরঙ্গ দৈর্ঘ শোষন করতে পারে) উপর তা নির্ভর করে। বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে এই পিগমেন্টগুলোকে এনকোডকারী জিনগুলো নিয়ে গবেষনা করে আসছেন, এবং তাদের গবেষনায় বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ ধারনা পাওয়া গেছে, যেমন: কেমন করে নন-প্রাইমেট স্তন্যপায়ীদের দুইটি ফটোপিগমেন্ট নির্ভর কালার ভিশন (ডাইক্রোম্যাটিক) থেকে প্রাইমেটদের ট্রাইক্রোম্যাটিক ভিশন বিবর্তিত হয়েছে। জেরাল্ড এইচ. জ্যাকবস এবং  জেরেমি নাথানস তাদের এই প্রবন্ধটিতে কালার ভিশনের বিবর্তন, তাদের জেনেটিক উৎপত্তির ব্যাখা সংক্রান্ত তাদের নিজেদের এবং  সমকালীন নানা গবেষনার কথা তুলে ধরেছেন। এই প্রবন্ধটি তারা শেষ করেছেন তাদের একটি যৌথ গবেষনা দিয়ে, যেখানে একটি ল্যাবরেটরি ইদুরের জিনোমে মানুষের ফটো পিগমেন্ট জিন যুক্ত করে তারা দেখেছেন স্তন্যপায়ী প্রানীদের ব্রেন কত সহজে নতুন সেন্সরী সংকেত ব্যবহারে অপ্রত্যাশিত নমনীয়তা বা প্লাস্টিসিটি প্রদর্শন করতে পারে। মুল লেখাটির ভাষাগত বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে, তারপরও এই লেখাটিতে অনেক শব্দই রুপান্তর করা হয়নি, যেমন কালার ভিশন, ফটোপিগমেন্ট ইত্যাদি। এ কারনে আশা করছি যারা আগ্রহী তারা মন্তব্যের ঘরে প্রশ্নগুলো রেখে যাবেন।

ভূমিকা: ট্রাইক্রোম্যাসি 

আমাদের চোখে, অসংখ্য রঙ্গের সমারোহে সাজানো মনে হয় এই পৃথিবীটাকে; গাদা ফুলের সুর্য হলুদ কমলা থেকে গাড়ীর চেসিসের ধাতব বা গানমটাল ধুসরতা, মধ্য শীতের আকাশের ‌উজ্জল নীল থেকে পা্ন্নার ঝলমল করা সবুজ; একারনেই সবচেয়ে অবাক করে যে বিষয়টি, তা হচ্ছে,  বেশীর ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই মাত্র তিনটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘর আলোকে নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশ্রন করার মাধ্যমে যে কোন রঙ্গের অনুভুতি সৃষ্টি করা সম্ভব। মানুষের দৃষ্টি ক্ষমতার এই বিস্ময়কর বৈশিষ্টটির নাম ট্রাইক্রোম্যাসি ( Trichomacy)।  ট্রাইক্রোম্যাসির কারন, এই রঙ্গীন দৃষ্টি অনুভুতির বা কালার ভিশনের জন্য আমাদের রেটিনা -চোখের ভেতরে স্নায়ুকোষের যে স্তরটি আলো শনাক্ত করে এবং প্রক্রিয়াগত কিছু পর্যায়ের মাধ্যমে দৃষ্টির তথ্য সংকেতগুলো চোখ থেকে ব্রেনে পৌছে দেয়-মাত্র তিন ধরনের আলো শোষনকারী  ফটোপিগমেন্ট ব্যবহার করে।এই ট্রাইকোমাসির একটি প্রধান ফলাফল বা ব্যবহারিক অ্যাপ্লিকেশন হলো কম্পিউটার ও টেলিভিশনের ডিসপ্লে, যারা  মাত্র তিনটি : লাল (R), সবুজ (G) ও নীল (B) রঙ্গের পিক্সেল মিশ্রনের মাধ্যমে, আমরা অনুভব করতে পারি এমন সব রঙ্গই সৃষ্টি করতে সক্ষম।

ছবি: কালার ভিশনের ব্যাবহারিক এবং নন্দনতাত্ত্বিক সুবিধা: উপরের ছবিটি হেমন্তের গাছের পাতার রঙ পরিবর্তনের একই ফটোগ্রাফর রঙসহ আর রঙহীন দুটি রুপ (রঙসহ আর রঙহীন); আমাদের কালার ভিশন প্রতিফলিত আলোর ক্রোমাটিক গঠন, যা আমাদের ব্রেনে রঙের অনুভুতি সৃষ্টি করে বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করতে আমাদের সাহায্য করে। সুত্র : জেরেমি নাথানস (Neuron, Vol. 24, 299–312, October, 1999)

 

যদিও ট্রাইক্রোম্যাসি প্রাইমেটদের মধ্যে প্রায়শই দেখা যায়, কিন্তু প্রানী জগতে এ্ই বৈশিষ্টটি কিন্তু সর্বজনীন নয়। প্রায় সব  নন-প্রাইমেট স্তন্যপায়ী প্রানীরা হলো ডাইক্রোম্যাট, অর্থাৎ তাদের কালার ভিশন বা রঙ্গীন দৃষ্টি ক্ষমতা নির্ভর করে শুধুমাত্র দুই ধরনের ভিজুয়াল পিগমেন্টের উপর। কিছু কিছু নিশাচর স্তন্যপায়ীদের কেবল একটাই ফটো পিগমেন্ট আছে। আবার কিছু পাখি, মাছ আর সরীসৃপ আছে, যাদের চোখে থাকে  চার ধরনের ফটোপিগমেন্ট এবং এরা মানুষের চোখে অদৃশ্য আল্ট্রা ভায়োলেট বা অতিবেগুনী রশ্মি শনাক্ত করতে পারে। সেকারনেই বিজ্ঞানীদের ধারনা প্রাইমেটদের ট্রাইক্রোম্যাসি ব্যাপারটা খানিকটা অসাধারন একটা বৈশিষ্ট।

ছবি:  স্তন্যপায়ীদের দুই ধরনের কালার ভিশন:  বেশীর ভাগ স্তন্যপায়ী প্রানী ডাইক্রোম্যাট; অর্থাৎ তাদের কালার ভিশনের কারন শুধুমাত্র  দুই ধরনের ভিজুয়াল পিগমেন্ট (উপরের প্যানেল):একটি ফটোপিগমেন্ট ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ বিশিষ্ট আলো শোষন করে সবচেয়ে বেশী (গ্রাফের নীল কার্ভ)এবং আরেকটি যা বেশী সংবেদী অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘ বিশিষ্ট আলো শোষন করার জন্য (গ্রাফের সবুজ কার্ভ); কিন্তু মানুষ এবং কিছু প্রাইমেট প্রজাতির কালার ভিশনটি ট্রাইক্রোম্যাটিক (নীচের প্যানেল); ট্রাইক্রোমাটিক কালার ভিশন যাদের আছে তারা আরো বেশী রঙ দেখতে পারে কারন তারা তিনটি ভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো শোষন ক্ষমতা সম্পন্ন পিগমেন্ট ব্যবহার করে: ছোট দৈর্ঘর (গ্রাফের নীল কার্ভ),আর অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ দৈর্ঘর আলো শোষন ক্ষমতা সম্পন্ন পিগমেন্ট (গ্রাফের সবুজ এবং লাল কার্ভ);সুত্র:  GAIL SHUMWAY/LUCY READING-IKKANDA Scientific American, April 2009)

 

তাহলে কেমন করে ট্রাইক্রোম্যাটিক কালার ভিশন বিবর্তত হলো? ট্রাইক্রোম্যাসি নিয়ে বহু বছরের গবেষনার উপর ভিত্তি করেই সাম্প্রতিক কালের প্রাইমেট কালার ভিশন সংক্রান্ত জেনেটিক্স, মলিক্যুলার বায়োলজী এবং  নিউরোফিজিওলজীর গবেষনায়  বিজ্ঞানীরা খুজে পেয়েছেন এই প্রশ্নের বিস্ময়কর ও  অপ্রত্যাশিত কিছু উত্তর, এছাড়া তাদের পর্যবেক্ষন প্রমান করেছে আমাদের প্রাইমেট ব্রেনের নমনীয়তা আর অভিযোজনের বিস্ময়কর ক্ষমতা।

ফটোপিগমেন্ট এবং ‍তাদের অতীত:

মানুষের রঙ্গীন দৃষ্টি ক্ষমতার সাথে জড়িত তিনটি ভিজ্যুয়াল পিগমেন্টের (ফটোপিগমেন্ট) স্পেক্ট্রাল সেনসিটিভিটি বা আলোক বর্ণালীর কোন রেন্জের তরঙ্গ দৈর্ঘের  আলো তারা শোষন করতে পারে তা প্রথম পরিমাপ করা হয়েছিল প্রায় ৫০ বছর আগেই এবং বর্তমানে আরো সুক্ষতার সাথে সেটি পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেকটি ফটোপিগমেন্ট বর্ণালীর একটি নির্দিষ্ট অংশের আলোকে শোষন করে, এবং ঠিক যে তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো তারা সবচেয়ে বেশীমাত্রায় শোষন করে তা দিয়ে এদের বৈশিষ্টকে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। যারা শর্ট ওয়েভ লেন্থ পিগমেন্ট (S) বা স্বল্প তরঙ্গ দৈর্ঘর পিগমেন্টবি সবচেয়ে বেশী মাত্রায় শোষন করে ৪৩০ ন্যানোমিটার দৈর্ঘর আলোক তরঙ্গ ( এক ন্যানো মিটার হলো ১ মিটারের এ বিলিয়ন ভাগের একভাগ বা ১ X ১০-৯  মিটার), মিডিয়াম ওয়েভ লেন্থ পিগমেন্টরা (M) সবচেয়ে বেশী মাত্রায় শোষন করে ৫২০ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো এবং লঙ্গ ওয়েভ লেন্থ পিগমেন্টরা (L) সবচেয়ে বেশী মাত্রায় শোষন করে ৫৬০ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো ( প্রসংঙ্গ ক্রমে , ৪৭০, ৫২০ ও ৫৬০ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো, একজন স্বাভাবিক মানুষ যথাক্রমে নীল, সবুজ এবং হলুদ রং হিসাবে অনুভব করতে পারে)।

ছবি: ছবিতে রেটিনা, স্নায়ুকোষের যে পর্দাটা আমাদের চোখের ভিতরের স্তরটাকে আবরণ করে রাখে। অপটিক নার্ভের মাধ্যমে রেটিনার স্নায়ুকোষগুলো আমাদের ব্রেনে ভিজুয়াল সংকেত প্রেরণ করে। কালার ভিশন বা আমাদের রঙ দেখার ক্ষমতা নির্ভর করে কোন (Cone) কোষের উপর, কোনের মত দেখতে এই ফটোরিসেপ্টর কোষগুলোর মধ্যে আলোক সংবেদী ফটোপিগমেন্ট থাকে। অন্য যে ফটোরিসেপ্টরটি রেটিনায় থাকে তার নাম রড (Rod), এরা আমাদের স্বল্প আলোয় দেখতে সহায়তা করে, সাধারনতঃ কালার ভিশনে অংশ নেয় না। রড এবং কোন কোষগুলো যাদের ফটোরিসেপ্টর বলা হয়, থাকে রেটিনায় অবস্থিত অন্য সব সহযোগী কোষের পেছনে। ANDREW SWIFT (retina illustrations); Scientific American, April 2009)

ছবি: রেটিনার প্রস্থচ্ছেদ এর একটি স্কিমাটিক ডায়াগ্রাম। (http://mm.hightechhigh.org/bloodbank/rods_cones.gif)

এই পিগমেন্টগুলো প্রত্যেকটির মুল উপাদান হচ্ছে একটা প্রোটিন, যা যুক্ত থাকে আলোশোষন কারী একটি যৌগ বা ক্রোমাটেফোর, যার উৎপত্তি হয় ভিটামিন এ থেকে।  ফটোরিসেপ্টর কোন কোষের পর্দায় এই পিগমেন্টগুলো অবস্থান করে। ফটোরিসেপ্টর কোষগুলোর নাম এসেছে এদের আকৃতির জন্য, কোন কোষগুলো কোন আকৃতির আর রড কোষগুলো লম্বাটে রড আকৃতির। যখনই কোন ফটোপিগমেন্ট  অনু আলোর সংস্পর্শে আসে, একটি বহু ধাপ বিশিষ্ট একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সুচনা হয়, যা এর ধারনকারী কোন কোষকে উত্তেজিত ও সক্রিয় করে তোলে। এই উত্তেজনা এবং সক্রিয় হয়ে ওঠা কোন কোষ নিউরোট্রান্সমিটার নি:সরণের মাধ্যমে সংকেত পাঠায়  সংযুক্ত রেটিনার নিউরোনগুলোকে , যারা অবশেষে ভিজুয়াল সংকেত ব্রেনে পৌছে দেয় অপটিক নার্ভ এর সাহায্যে।

ছবি: কোন পিগমেন্টের একটি স্কিমাটিক ডায়াগ্রাম:কোন ফটোরিসেপ্টর দের কোষঝিল্লীর ডিস্কের মতো ভাজে ভাজে থাকে ফটোপিগমেন্টগুলো। পিগমেন্ট অনুগুলো তৈরী ট্রান্সমেমব্রেন অপসিন অনু যা একটি ক্রোমাটোফোর,11-cis-retinal ( Vitamin A এর অ্যালডিহাইড)  এর সাথে সংযুক্ত থাকে। অপসিন অংশটি প্রোটিন। সুত্র: Lindsay T. Sharpe, Andrew Stockman, Herbert Jägle, and Jeremy Nathans: Opsin genes, cone photopigments, color vision, and color blindness; in color vision; Karl R. Gegenfurtner & Lindsay T. Sharpe; Color Vision: From genes to perception Cambridge University Press,New York, 1999

যদিও কোন ফটোরিসেপ্টরগুলোর কোষঝিল্লীতে থাকা ফটোপিগমেন্টগুলোর আলো শোষণ স্পেক্ট্রা অনেকদিন থেকেই আমাদের জানা, কিন্ত আশির দশকে জেরেমি নাথানস প্রথম মানুষের রেটিনার ফটোপিগমেন্টগুলোর জিনগুলো শনাক্ত করেন। নানা প্রানীদের মধ্যে এইসব জিনগুলোর ডিএনএ অনুক্রম এবং এদের কোড করা  ‌পিগমেন্ট প্রোটিনগুলোর অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলোর অনুক্রম নিয়ে তুলনামুলক গবেষনায় দেখা যায় এম(M) এবং এল (L) পিগমেন্ট প্রোটিনগুলো সামান্য কিছু পার্থক্য ছাড়া প্রায় হুবুহু এক রকম। এর পরবর্তী পরীক্ষাগুলোয় বিজ্ঞানীরা আরো বুঝতে পারেন এই দুটি প্রোটিনের বর্ণালী শোষনের প্যাটার্ণে যে পার্থক্যটি দেখা যায় তার কারন আসলে এদের মোট ৩৬৪ টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের মধ্যে মাত্র ৩টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের ভিন্নতা।

এছাড়া গবেষনাগুলোতে আরো যা জানা যায়, তা হলো, এম (M) এবং এল (L) পিগমেন্টগুলো X ক্রোমোজোমে পাশাপাশি অবস্থান করে। এই X ক্রোমোজোম আমাদের দুই ধরনের সেক্স ক্রোমোজোমের একটি  ( ছেলেদের একটি X  ক্রোমোজোম ও সাথে একটি Y ক্রোমোজোম থাকে আর মেয়েদের দুটি সেক্স ক্রোমোজোমই হলো X)। এই X ক্রোমোজোমে অবস্থানটি বিজ্ঞানীরা আগেই ধারনা করতে পেরেছিলেন, কারন সচরাচর যে কালার ব্লাইন্ডনেস এর যে সমস্যটা সচরাচর দেখা যায় (Red-Green বা লাল সবুজ কালার ব্লাইন্ডনেস), তা মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যেই বেশী দেখা যায়, আর সমস্যাটা যেভাবে উত্তরাধিকার সুত্রে ছেলেরা পায় সেটা দেখে অনেক আগেই বিজ্ঞানীরা ধারনা করেছিলেন এর  জন্য যে দায়ী জিনটির অবস্থান X  ক্রোমোজোমে হবার সম্ভাবনাই বেশী। অন্যদিকে এস(S) পিগমেন্টটির (ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো শোষনকারী পিগমেন্ট) জিনটি থাকে ৭  নং ক্রোমোজোম এ এবং এর ডিএনএ সিকোয়েন্স এর সাথে এম এবং এল পিগমেন্টের তুলনা করলে দেখা যায় খুব সামান্যই তাদের সাদৃশ্য।

ছবি: কালার ব্লাইন্ডনেস শনাক্ত করতে জাপানের বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডঃ শিনোবু ইশিহারা’র(১৯০৫-১৯৬৩) কালার পারসেপশন টেস্ট প্লেটের একটি। যাদের কালার ভিশন ঠিক আছে তারা এখানে ইংরেজী  ’74’ সংখ্যাটি দেখতে পাবেন। যাদের ডাইক্রোম্যাসি আছে বা ট্রাইক্রোম্যাসির কোন সমস্যা আছে তারা হয়তো দেখতে পাবেন  ’21’; আবার যাদের অ্যাক্রোমাটোপ্লাসিয়া আছে তারা কোন সংখ্যাই দেখতে পারবেন না এখানে। (সুত্র: Wikipedia)

 

নব্বই দশকের মাঝামাঝি, এই তিনটি পিগমেন্ট জিনগুলোর সাথে অন্যান্য প্রাণীদের জিনগুলোর ডিএনএ সেগমেন্টের তুলনামুলক গবেষনাগুলো এই পিগমেন্ট জিনগুলোর উৎপত্তির ইতিহাস ও বিবর্তন সম্বন্ধে বেশ গুরুত্বপুর্ণ তথ্য যোগান দেয় বিজ্ঞানীদের।  প্রায় সব মেরুদন্ডী প্রানীদের  আমাদের এস (S) পিগমেন্টের জিনটির মত একটি জিন আছে, যাদের ডিএনএ অনুক্রমের সাদৃশ্য লক্ষনীয়; এই বিষয়টি প্রমান করে যে এস(S) পিগমেন্টের কোন একটি সংস্করণ কালার ভিশনের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় একটি আদি উপাদান। ট্রাইক্রোম্যাটিক ভিশনের ব্যবহৃত বাকী দুটি দীর্ঘতর তরঙ্গ দৈর্ঘর পিগমেন্ট জিনের ( এম(M) আর এল (L)) সমগোত্রীয় জিনও মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে বেশ ব্যাপকহারেই বিদ্যমান, যা ইঙ্গিত করে এরাও বেশ প্রাচীন। কিন্ত শুধুমাত্র স্তন্যপায়ী প্রানীদের মধ্যে এম এবং এল, এই দুটি পিগমেন্টের জিন কেবল একসাথে উপস্থিত থাকে  শুধুমাত্র কিছু প্রাইমেট প্রজাতিদের মধ্যে –যা স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে এই বৈশিষ্টটির উদ্ভব অপেক্ষাকৃত নিকট অতীতে কোন সময়ে।

বেশীর ভাগ নন-প্রাইমেট স্তন্যপায়ীদের  শুধুমাত্র একটি দীর্ঘতর তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো শোষনকারী পিগমেন্ট থাকে; এই পিগমেন্টটি প্রাইমেটদের দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো শোষনকারী পিগমেন্টগুলোর এর সাথে বেশ সাদৃশ্য আছে। এবং স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রেও এই পিগমেন্ট জিনটির অবস্থান এর  X ক্রোমোজোমে। এই বৈশিষ্টগুলো গবেষকদের এদের সম্ভাব্য উৎপত্তি সম্বন্ধে যে ধারনাটা দেয়, তা হলো, প্রাইমেটদের ফটোপিগমেন্টের এই দুটি দীর্ঘতর তরঙ্গ দৈর্ঘর পিগমেন্ট জিনগুলোর প্রথম আবির্ভাব হয়েছে প্রাইমেটদের লিনিয়েজ এর শুরুর দিকে জিন ডুপ্লিকেশন (Gene duplication) প্রক্রিয়ায়: এই প্রক্রিয়ায় কোন একটি X ক্রোমোজোম রিকম্বিনেশন প্রক্রিয়ার সময় ক্রোমোজোমাল সেগমেন্ট সোয়াপিং (জিন সেগমেন্ট আদান প্রদান) এর সময় দীর্ঘতর তরঙ্গ দৈর্ঘর ম্যামালিয়ান এই জিনটির আরো একটি অনুরুপ কপি অর্জন করেছিল বা ডুপ্লিকেটেড হয়েছিল; এবং পরবর্তীতে একটি বা উভয় X ক্রোমোজোমে অবস্থিত এই কপি হওয়া আদি জিনগুলোয় মিউটেশনের ফলে দুটি প্রায় একই রকম ‍পিগমেন্ট জিন ও তাদের প্রোডাক্ট পিগমেন্টের আবির্ভাব ঘটে, যাদের গঠনগত বৈশিষ্ট প্রায় এক, তবে তারা বর্ণালী শোষন করার ক্ষমতায় ভিন্নতা পরিচয় দেয়। এই দুটি পিগমেন্ট হলো এম (M) এবং এল (L) পিগমেন্ট।

এধরনের জিন ডুপ্লিকেশনের পরিচিত মেকানিজমটা দেখা যায় ডিম্বানু এবং শুক্রানু তৈরীর সময়। যে কোষগুলো থেকে ডিম্বানু বা শুক্রানু তৈরী হবে, তারা যখন বিভাজিত হয় জোড় বাধা ক্রোমোজোমগুলো কখনো কখনো তাদের জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালগুলোর অংশ পারস্পরিক আদান প্রদান করে নিতে পারে, যে প্রক্রিয়াকে বলে রিকম্বিনেশন এবং কোন কোন সময় অসম পরিমান জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল এই আদান প্রদান পক্রিয়ায় ঘটে যায়, যার ফলে এক বা ‍ একাধিক জিনের অতিরিক্ত কপি কোন একটি ক্রোমোজোমে সৃষ্টি হতে পারে।  পরবর্তী সময়ে ‍ এই সব ডুপ্লিকেট জিনে প্রবেশ করা উপকারী মিউটেশনগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে সুরক্ষিত হতে পারে। অর্থাৎ বেচে থাকার জন্য সহায়তাকারী এই সব উপকারী মিউটেশণ পরবর্তী প্রজন্ম এবং জনসংখ্যার মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করে।

এই ‘নতুন’ এম (M) এবং এল (L) পিগমেন্ট ( আগের এস (S) পিগমেন্ট সহ) নির্ভর প্রাইমেটদের এই কালার ভিশন বা ট্রাইক্রোমাসি, ধারনা করা হয় কিছু কিছু পরিবেশে ডাইক্রোমাটিক প্রানীদের চেয়ে একটি ‍ বেচে থাকার সংগ্রামে একটি বাড়তি নির্বাচনী সুবিধা বা সিলেক্টিভ অ্যাডভানটেজ দিয়েছিল। যেমন, পাকা ফলের রঙ্গ, যা প্রায়শই ‍তার আশে পাশের পাতার রঙ থেকে ভিন্ন, কিন্ত‍ু সেই পার্থক্য বুঝতে ট্রাইক্রোমাটদের তুলনায় ডাইক্রোমাটরা অপেক্ষাকৃত ছিল বেশ অদক্ষ কারন আলোক বর্ণালীর লাল, হলুদ আর সবুজ রঙ্গের (দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘর আলো) পার্থক্য করার ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ক দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘর পিগমেন্টটির সংবেদনশীলতা অনেক কম। সহজে খাবার ‍ উপযোগী পুষ্টিকর ফল খুজে বের করার এই ক্ষমতা ট্রাইক্রোমাসির ‌ মিউটেশন সম্পন্ন প্রানীদের বেচে থাকতে বিশেষ সহায়তা করেছে বলেই ধারনা করা হয় এবং তাদের মাধ্যমে তাদের পরবর্তী প্রজন্মে  ও তাদের জনসংখ্যায় এই  ট্রাইক্রোমাসির পরিবর্তিত জীনটি ক্রমশ: বিস্তার লাভ করেছে।

ছবি: বিবর্তনীয় সুবিধা: পাকা ফলের রঙ প্রায়শই তার আশে পাশের পাতা আর ডালের থেকে ভ্ন্নি হয়। এবং ট্রাইক্রোমাটিক কালার ভিশন যাদের আছে তারা ডাইক্রোম্যাটদের তুলনায় এদের সহজেই পার্থক্য করতে পারে। প্রাইমেটদের সফলভাবে বেচে থাকার জন্য উপযোগী বৈশিষ্টগুলোর মধ্যে একটি ছিল, পাকা ফলকে আলাদা করে শনাক্ত করার এই উন্নত ক্ষমতা; সেকারনে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রাইমেটদের মধ্যে ট্রাইক্রোমাটিক কালার ভিশনের জিনগুলোর বিস্তৃতিতে সহায়তা করেছে। সুত্র: JUSTIN LIGHTLEY/ Getty Images (raspberries); Scientific American, April 2009)

 

বিজ্ঞানীরা প্রাইমেটদের কালার ভিশন বিবর্তনের ব্যাখার ক্ষেত্রে  এই প্রক্রিয়াটিকে:  প্রথমে জিন ডুপ্লিকেশন তারপর মিউটেশন যা ডিএনএর অনুক্রমকে বদলে দিয়ে দুটি স্বতন্ত কিন্ত সদৃশ জিন, এম(M)এবং এল(L) পিগমেন্ট জিনের উৎপত্তি করে;একটি যুক্তি সঙ্গত ব্যাখা বলেই মনে করেন। কারন এধরনের ধারাবাহিক ঘটনার অনুক্রম অন্যান্য জিন পরিবারের ক্ষেত্রেও ঘটতে দেখা গেছে। যেমন, হিমোগ্লোবিন জিনের ফ্যামিলি, এর কোড করা হিমোগ্লোবিন প্রোটিনটি আমাদের রক্তে লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে থাকে এবং এবং আমাদের রক্তে এটি অক্সিজেন বহন করে। ভ্রুনাবস্থায় ২ মাসের শুরুতে যে জিনটি ফিটাল হিমোগ্লোবিন তৈরী করে, ‍আর পরবর্তীতে যে জিনটি অ্যাডাল্ট হিমোগ্লোবিন তৈরী করে তাদের উৎপত্তির কারনও মনে করা হয় এদের আদি একটি জিনের ডুপ্লিকেশন; এই আদি জিন, যেটি ডুপ্লিকেটেড হয়েছে প্রথমে, পরে তারা মিউটেশনের মাধ্যমে আলাদা দুটি ভ্যারিয়ান্ট জিনে রুপান্তরিত হয়েছে, এবং তাদের কোড করা হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেনের প্রতি আকর্ষনও ভিন্ন। এছাড়া যেমন ইমিউনোগ্লোবিউলিন, যে প্রোটিনগুলো আমাদের ইমিউন সিস্টেমের অ্যান্টিবডি রেসপন্সের জন্য দায়ী, তাদের মধ্যেও ব্যাপক বিচিত্রতা আছে এবং বহু ভ্যারিয়ান্ট বিদ্যমান, এবং এদের সবার উদ্ভব হয়েছে প্রথমে একটি আদি পুর্বপুরুষ জীনের ডুপ্লিকেশন এর ও পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে।

চলবে…

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *