“প্রাগৈতিহাসিক” গল্পের “ভিখু, ইরিনা এবং তারপর”

[মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বখ্যাত শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প “প্রাগৈতিহাসিক” গল্পের শেষাংশ হিসেবে এটি লিখিত। যারা মূল গল্পটি পড়েননি, তাদেরকে আগে মূল গল্পটি পড়ার অনুরোধ করছি, যাতে এটি বুঝতে সুবিধা হয়। মূল গল্পের লিংক:
:
http://www.ebanglalibrary.com/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6…/
:
এই ২০২১ সনেও ভিখুর সাহসিকতা, অমানবিকতা, প্রতিশোধস্পৃহা, জীবনদ্রোহ এতটুকুও কমেনি। এক অসাম্য আর অগ্রহণযোগ্য সমাজের বিরুদ্ধে যাহা তাহার দ্রোহ আর বিপ্লবেরই নামান্তর। ভিখুর বিচারে অবিচার, ব্যধি ও দারিদ্র্য তাঁহাকে আমৃত্য ঠ্যাঙ্গাইয়াছে যত্রযত্র। পাঁচীকে পিঠের উপর বহন করিতে করিতে জীবনের নৌকাটি টালমাটাল হইয়া পড়িয়াছে। এখন তাহাকে নোঙর করিতে হইবে কোন এক নৌকো ঘাটে। ভিখু শত অসামর্থ ও বাঁধা উপেক্ষা করিয়া বাঁচিবার দুদান্ত স্বপ্নে আবার বিভোর হয়। পাঁচীর প্রাক্তন প্রেমিক বসিরকে হত্যা করিয়া উপার্জিত ’শ টাকা পুঁজি লইয়া পাঁচীকে কাধে বহিয়া দক্ষিণ বাংলার নানান দ্বীপে সে ঘুরিয়া ঘুরিয়া অনেকটাই ক্লান্ত শ্রান্ত এখন সে। অবশেষে মেঘনা তীরবর্তী “পাতারহাট” বন্দরে একটি খেয়া নৌকা বাগাইয়া তাহার উপার্জনে নতুন সংসার চালাইতে মনস্থির করিল ভিখু। এ জগৎ-সংসারে কতই না কিছু ঘটিতেছে, যাহা সচরাচর সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে, অনুধাবনের উর্ধে থাকিয়া যায়। ভিখু সেই মানুষের প্রতিভূ, যে পরাস্ত হইতে জানেনা। কখনোই সে পরাস্ত হইবে না ধর্মে অবিশ্বাসী নিচু শ্রেণিভুক্ত ভিখু ডাকাত।
:
এরই মধ্যে আকস্মিক দ্বীপাঞ্চলের সহায়হীন মানুষের চিকিৎসার জন্য পাতারহাট ঘাটে ভেড়ে বিদেশি ভাসমান হাসপাতাল “জীবন তরী”। ভিখু নদীতে হরেক মানুষ পারাপার করে, আর অবসরে হাসপাতাল ‘জীবন তরী’র দিকে হাঁ-করিয়া তাকাইয়া থাকে। ৩-তলা জাহাজের রেলিংয়ে দাঁড়ানো বিদেশি শ্বেতাঙ্গী রূপশ্রী মনোলোভা নার্স-ডাক্তারগণ ভিখুর পলকহীন লোভনীয় দৃষ্টি এড়াইতে পারেনা কখনোই। জাহাজটিতে উঠিবার প্রবল ইচ্ছা জাগে ভিখুর মনে। সময় পরিক্রমায় ঈশ্বর বোধহয় সদয় হয় ঈশ্বর অবিশ্বাসি ভিখুর প্রতি। একদিন বিকেলে ২-ডাক্তার নৌ-বিহারে ওঠে ভিখুর পারাপারের নৌকোয়। নিজেদের মধ্যে অবোধ্য ভাষায় কথা বলে, হাসাহাসি করে ডাক্তারদ্বয়। ভিখু হাঁ করিয়া তাহাদের কথা বুঝিবার চেষ্টা করে। পুরুষ ডাক্তারটি বয়স্ক, মোটা, তামাটে ও কদর্য অনেকটা। মনে হয় নিগ্রো আফ্রিকান হইবে। সঙ্গের মেয়েটি অল্পবয়স্কা, সুন্দরী, নিলাক্ষী, সোনালী চুলের। সোনালী চুল আর চেহারায় বোঝা যায়, লল্ডনি কন্যা হইতে পারে। নদীর উজানে অনেকদূর যাওয়ার পর ভিখুর অসাড় হাতটির দিকে চোখ পড়ে শ্বেতাঙ্গী মেয়েটির। সে ভাঙা বাংলায় তাহার হাতের অবশতার কথা জানিতে চাহে ভিখুর নিকট। ইশারায় তাহাকে জাহাজে যাইতে বলে পরেরদিন। জানায়, তাহার নাম ডা. ইরিনা পেত্রাইকা। বেলজিয়াম নামক একটি দেশে তাহার বাড়ি। বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষদের সেবা করিতে আসিয়াছে ৩-মাসের জন্যে।
:
ইরিনা পরম যত্নে পরীক্ষা করে ভিখুর অবশেন্দ্রিয় ডানহাত খানি। হাতে আঘাত করিয়া, চিমটি কাটিয়া নানারূপ পরীক্ষায় পুলকিত হয় ক্ষুধাতুর ভিখুর আদিম পৌরুষদীপ্ত শরীর। একটা যন্ত্রে হাত ঢুকাইয়া তাহাতে ক্রমাগত উত্তাপ দিতে দিতে, ক্রমান্বয়ে একসময় অবশায়িত হাতটি ফিরিয়া পায় তাহার অবলুপ্ত শক্তি। ভিখুর জিনের জন্মগত প্রবৃত্তির প্রজন্ম পরম্পরার ধারাবাহিকতা সত্য হিসেবে ভিখুর সামনে উপস্থাপিত হয় একদিন। ডা. ইরিনার প্রতি কৃতজ্ঞতার বদলে ভোগষ্পৃহা আর কামলোলুপতা ভিখুর বিচিত্র জীবনের অন্ধিসন্ধিতে হানা দিতে শুরু করিয়াছে। অনিষ্টসাধক ক্ষুধাতুর ভিখু কাউকেই ক্ষমা করেনি এই জীবনে। বসন্তপুরের বৈকুণ্ঠ সাহা, চিতলপুরের পেহলাদ, বিন্নু মাঝির চালা, ভিক্ষুক বসির বা পঁচা পা-যুক্ত পাঁচী সকলের থেকেই চরম প্রতিশোধ নিয়াছে জিঘাংসু ভিখু। পাঁচীর দূরারোগ্য ঘায়ের যন্ত্রণায় শেষাবধি তাহাকে মাঝ নদীতে ডুবাইয়া দিয়াছে ভিখু রাতের অন্ধকারে। প্রতিশোধ নিতে গিয়াছিল পেহলাদের স্ত্রীরও কিন্তু খুঁজিয়া পায় নাই ভাগ্যবতী বাগ্দীকন্যাকে এ ত্রিভূবনে। পাইলে প্রথমে ধর্ষণের পর হত্যা করিতে একটুও দ্বিধা করিতো না কামুক ভিখু!
:
ঘটনাক্রমে ডা. ইরিনার সহিত ভাব জমিয়াছে ভিখুর। তাহার জন্য প্রতিবেশীর গাছের চুরি করা ডাব, পাকা পেঁপে, কচি লাউ সমেত সে ঢুকিয়া পড়ে জাহাজে সরাসরি ইরিনার কেবিনে যখন-তখন। ইসিভুক্ত দেশের সরলমনা তরুণী ডাক্তার ইরিনা এক দরিদ্র মাঝির এমন আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়! এক প্রগাঢ় বিশ্বাসে বিদেশী ডাক্তার ইরিনা এক গ্রামীণ মাঝির আন্তরিকাতায় মুগ্ধ, পুলকিত ও আনন্দিত হয়। ভিখু নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে তাহার কক্ষ, আসবাব, বিছানা, প্রবেশ আর বহির্গমন পথ ইত্যাদি। প্রায় মাসাধিকাল হইয়া গেলো এই দ্বীপবন্দরে “জীবন তরী”র। ইরিনা জানাইয়াছে, শীঘ্রই চলিয়া যাইবে তাহারা ঢাকার উদ্দেশ্যে। তাহার পর স্বদেশ বেলজিয়ামে। সেখানে উচ্চতর ডাক্তারি পড়ালেখা করিবে সে আরো! আবারো হয়তো মানব সেবায় যাইবে আফ্রিকান কোন দরিদ্র দেশে কিংবা পৃথিবীর অন্য কোথাও!
:
“জীবনতরী”র বদৌলতে ২-হাতে ক্ষমতাধর ভিখু আর সময় ক্ষেপণ করিতে চাহেনা। আপন পরিকল্পনা মোতাবেক এক ঘন ঘুট-ঘুটে রাতের অন্ধকারে নিজ নৌকো জাহাজের সঙ্গে লাগাইয়া, তরতর করিয়া উঠিয়া যায় দোতলায় ইরিনার কক্ষে। সন্তর্পণে দরজা ঠেলিয়া ভেতরে ঢুকিয়া আলো আঁধারীর আবছা আলোয় ঠাহর করে ঘুমন্ত বিদেশীনি ছিপছিপে ইরিনাকে। নদীর খোলা বাতাসে ফিনফিনে একটা সাদা টিসার্ট আর ছোট একটা ট্রাউজার পরিয়া গভীর ঘুমে নিমগ্ন বিদেশী কন্যা ইরিনা। ভিখু কালবিলম্ব না করিয়া নিখুঁত দক্ষতায় গামছায় বাঁধিয়া ফেলে ইরিনার মুখ আর হাত-পা। পাতলা ছিপছিপে ইরিনাকে নিয়া রেলিং বাহিয়া নৌকায় নামিতে তেমন বেগ পাইতে হয়না, শক্তিধর দক্ষ প্রাক্তন ডাকাত ভিখুর। কিন্তু নিচতলায় জাহাজের রাতের পাহারারত রক্ষীরা টের পাইয়া চিৎকারে জাগাইয়া দেয় পুরো জাহাজকে। সাহসে অপরাজেয় ভিখু নানাবিধ চিৎকার আর হৈ-চের ভিতরেই পাটাতনে ইরিনাকে ছুড়িয়া নৌকা ছাড়িয়া দেয় প্রবল ভাটির টানে সোজা দক্ষিণমুখী। অন্ধকারে আলো জ্বালাইয়া জাহাজীরা ওপরে রক্ষিত ছোট লাইফবোট খুঁজিতে থাকে ভিখু-ইরিনা অনুসরণে! অন্ধকারে জগৎ চরাচরের প্রক্রিয়ায় অমানবীয় আর অবিশ্রান্ত আদিম ভিখু নির্জীব ইরিনাকে লইয়া এক অনন্তের পথে যাত্রা করে ঈশ্বরের নাক্ষত্রিক ছায়াঘেরা জলস্রোতে!
:
প্রবল জলকল্লোলে নৃত্যরত মেঘনার তীব্র ঘোলা ঘুর্ণিবর্তে অন্ধকার মায়াবী আকাশে নানাবিধ নক্ষত্রের আলোতে ভর করিয়া প্রবল স্রোতে এক নির্দোষ বিদেশিনীসহ নৌকা আগাইয়া যায় ভাটির প্রবল স্রোতে। নদীতীরের গাছগাছালির আবছা আলোয় দূরগ্রামে ক্ষীণমান চাঁদ পূর্ব দিগন্তে উঁকি মারে ডুব সাঁতারের প্রাকলগ্নে! প্রবল মেঘনায় বিরামহীন জলস্রোতের কলধ্বনি ছাড়া ঈশ্বরের পৃথিবীতে শান্ত নীরবতা এই কালরাত্রিতে। ঘনান্ধকার মেঘনার প্রবল স্রোতে নৌকোর পাটাতনে হাতমুখ বাঁধা ক্ষীণতনুর বেলজিক কন্যা হরিণচোখা ডা: ইরিনা পেত্রাইকা। আর দক্ষ নৌকো চালক পেশীবহুল আদিম ডাকাত ভিখু। ছুটিয়া চলিয়াছে অন্ধকার নক্ষত্রকে সাক্ষী করিয়া এক অজানা গন্তব্যে। হয়তো ঐ নক্ষত্র, মহাকাশ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে কিন্তু যে অন্ধকার জগতের জিন বহন করিতেছে ভিখুর এক ঋণাত্মক আবেষ্টনি! তাহা অনন্ত, চিরন্তন আর প্রাগৈতিহাসিক! মহাজাগতিক কোন আলো আজ পর্যস্ত তাহার সন্ধান পায় নাই! কোনো দিন পাইবে কিনা তাহা ভিখু-ইরিনা কেহই জানেনা। কেবল কালচক্রই বলিতে পারে, মানুষের এই অন্ধকার আদিমতার শেষ কবে আর কোথায়!
 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *