মুক্ত কর হে বন্ধ- দ্বিতীয় পর্ব (প্রাচীন যুগ: লৌহ ও সাম্রাজ্য)

ইতিহাসের পাঠশালায় প্রাচীন যুগ

মানব সভ্যতার ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্ব নির্মাণ করে কৃষককুল ও পশুপালকেরা যারা সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্রগুলাে বা নগর গুলাের বাইরে জীবন যাপন করত। রাজা ও পুরােহিতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নগর বাসীরা এর কোন কৃতিত্বের দাবিদার নয়। নগর সভ্যতার অর্জনগুলি (যেমন তামা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার, চাকাকে কাজে লাগান, অক্ষর ব্যবহার করে নিজ নিজ ভাষার লিখিত রূপ তৈরী করা) থেকে শিক্ষা নিয়ে অগ্রগতির যে বন্ধ্যাত্ব নগর সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ আরােপ করেছিল, তা ভেঙ্গে এরাই। এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

ইউরােপ ও এশিয়ার একটি বিরাট অংশে অনেক মানবগােষ্ঠী বসবাস করত। তারা নগর সভ্যতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না। কিন্তু নগর সভ্যতার উদ্ভাবনসমূহ তারা কাজে লাগান শুরু করেছিল। এই মানবগােষ্ঠীসমূহ অপেক্ষাকৃত কম উর্বর জমির উপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের উদ্বৃত্ত ছিল কম। এই সমাজের শাসকেরাও অন্যান্য মানবগােষ্ঠীর মতাে উৎপাদনের উদ্বৃত্ত ভােগ করত। তাদের নিজেদের প্রয়ােজনেই নতুন উদ্বৃত্ত বাড়ানর জন্য নতুন উদ্ভাবনের চেষ্টা তারা উৎসাহিত করত। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে থাকলে এক পর্যায়ে তারা নগর সভ্যতা গুলাের উপর আগ্রাসন করতে সক্ষম হল। নগর সভ্যতাগুলাে ইতিমধ্যেই একদিকে শাসক অপরদিকে কৃষককুল, কারিগর, বণিক ও আঞ্চলিক রাজাদের মধ্যে সংগ্রামে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মােটামুটি এই ধারাতেই বড় নগর সভ্যতাগুলাে ভেঙ্গে পড়ল। দক্ষিণ পূর্ব ইউরােপ থেকে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত গােষ্ঠীগুলাে গ্রীসের মিসেনিয়ান সভ্যতা আক্রমণ করল। মিসর আক্রান্ত হল বাইরের “সামুদ্রিক গােষ্ঠী” নামে একদল মানুষের দ্বারা। হিট্টাইটরা দখল করল মেসােপটেমিয়া। চীনে “শাং” রাজবংশকে উৎখাত করল “চৌ”রা। আর কাস্পিয়ান সাগর এলাকা থেকে “আর্যরা” আগ্রাসন করল ক্ষয়িষ্ণু সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলিকে। এই আক্রমণগুলাে একই। সময়ে বা এক বারেই সম্পন্ন হয়েছে তা নয়, বহু বৎসর ধরে এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে।

মেসােপটেমিয়া, মিসর ও চীনে নগরগুলি ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত সভ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হল না। নতুন শাসক ও নতুন উদ্ভাবনের ফলে সভ্যতা আবার বেগবান হল। কিন্তু গ্রীসের মিসেনিয়ান সভ্যতা ও সিন্ধুর মহেঞ্জোদারাে সভ্যতার উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আক্রমণের ফলে ধ্বংস হল। সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হলেও আক্রমণকারীরা নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসল। গরুতে টানা লাঙ্গল দিয়ে চাষ শুরু করার ফলে উত্তর ভারতের শক্ত মাটি, যা আগে চাষ করা যেত না তাও চাষ করা সম্ভব হল। ফলে উৎপাদন আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল-উদ্বৃত্ত আগের চাইতেও বেশী থাকতে লাগল।

সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ বছরের কাছাকাছি সময়ে প্রথম আর্মেনিয়ার পাহাড়সমূহে। কয়েকশত বছর পরে এটা আবিষ্কার হয় পশ্চিম আফ্রিকায়।২,৩ সেটা হল আকরিক লােহা গলিয়ে ধাতু পৃথক করার প্রক্রিয়া (smelting)। এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে প্রায় সব স্থানে ছড়িয়ে পড়ল। এর ফলে বদলে গেল উৎপাদনের প্রক্রিয়া এবং বদলে গেল যুদ্ধের ধারা।

তামা এবং তার সঙ্গে টিনের সংমিশ্রণ তৈরী করার ফলে নগর সভ্যতার প্রথম দিক থেকেই ব্রোঞ্জের ব্যবহার হয়ে আসছিল। কিন্তু তামার আকর খুব কম স্থানেই পাওয়া যেত এবং এটা থেকে কিছু তৈরী করা ছিল ব্যয়বহুল। উপরন্তু তামা বা ব্রোঞ্জের তৈরী হাতিয়ারের ধার খুব সহজে নষ্ট হয়ে যেত। এ সব কারণে শাসক শ্রেণীর অলংকার এবং হাতিয়ার হিসাবেই এ গুলাে ব্যবহার হত। সাধারণ কৃষকেরা বা কারিগরেরা এ সব ধাতু দিয়ে প্রস্তুত হাতিয়ার বা অস্ত্র ব্যবহার করতে পারত না। তাই দেখা যায় সেই যুগে বড় বড় স্থাপনা যেমন-পিরামিড, যে শ্রমিক ও কারিগররা তৈরী করেছিল, তারা নগর সভ্যতা শুরু হওয়ার প্রায় ১৫০০ বছর পরেও পাথরের হাতিয়ারই ব্যবহার করত। কৃষকদের মধ্যেও তামা বা ব্রোঞ্জের হাতিয়ার ব্যবহার প্রচলিত ছিল না।

অন্ধকার যুগ

লােহার আকর তুলনায় আরও সহজে পাওয়া যেত। যদিও আকর থেকে ধাতব লােহা পৃথক করার পদ্ধতি আরও জটিল কিন্তু একবার শিখে নেওয়ার পর কামাররা লােহা থেকে লাঙ্গল এর ফলা, ছুরি, কুড়াল, তীরের ফলা, পেরেক ইত্যাদি তৈরী করা শুরু করল। এগুলাে সাধারণ কৃষকেরা ব্যবহার শুরু করায় কৃষি উৎপাদনে বিরাট পরিবর্তন আসল। কুড়াল দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার সহজতর হল, লােহার ফলার লাঙ্গল আরও শক্ত মাটিতে চাষ দিতে পারল। ফসলের উৎপাদন বাড়ল। লােহার তৈরী তরবারি ও বর্শার দাম কম হওয়াতে সাধারণ মানুষের হাতে অস্ত্র এসে গেল। এতে যুদ্ধের ধারা বদলে গেল।

খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে নতুন প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠল নতুন সভ্যতা। মধ্যপ্রাচ্যে আসিরিও সাম্রাজ্য নীল নদ থেকে পূর্ব মেসােপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মধ্যে অসংখ্য জনগােষ্ঠী ছিল। তাদের ভাষা ভিন্ন হলেও তারা একই হরফ ব্যবহার করা শুরু করল। উত্তর ভারতে এক নতুন সভ্যতা গড়ে উঠতে লাগল। বাণিজ্য আবার শুরু হল। নতুন নগর গড়ে উঠতে লাগল। প্রায় এক হাজার বছর পরে চীনে প্রায় ১৭০টি ছােট ছােট রাজ্য যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়ে অল্প কয়েকটি রাজ্যে বিকশিত হল। ভূমধ্যসাগরের ধার দিয়ে উত্তর আফ্রিকা, লেবানন, প্যালেষ্টাইন, এশিয়া মাইনর, গ্রীস ও ইতালিতে নগর রাজ্য ও সভ্যতা গড়ে উঠতে লাগল।

নতুন উৎপাদন পদ্ধতির সাথে সাথে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিও শুরু হল। ব্রোঞ্জ যুগে মেসােপটেমিয়া ও মিসরে, বিজ্ঞান বিশেষ করে অংক শাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানেও কিছু জ্ঞান অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু এই জ্ঞান চর্চা পুরােহিতদের হাতে থাকায় এগুলাে ধর্মীয় জালে ও আচার অনুষ্ঠানে আবদ্ধ হয়ে গেল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই শ্রেণীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিতে আগ্রহ ছিল না। লৌহ যুগে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এই পুরনাে অঞ্চলগুলাে, বিশেষ করে মেসােপটেমিয়ায় ও মিসরের নগর গুলিতে হল না। এটা মিসরের বাইরের যে সভ্যতা গড়ে উঠল যেমন-ভারত, উত্তর চীন, ও ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে হল।

এই উজ্জীবিত সভ্যতাগুলিতে লােহা ছাড়া আরও কয়েকটি বিশেষত্ব পাওয়া যায়। নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার শুরু হয়। দূরপাল্লার বাণিজ্যও এই সভ্যতাগুলিতে শুরু হয়েছিল। ব্যবসায়ী ও কারিগরদের প্রাধান্য আগের চাইতে বেশী ছিল। হয়েছিল মুদ্রার প্রচলন, এর ফলে সাধারণ কৃষক ও কারিগরদের জিনিষপত্র আদান প্রদান করা সহজতর হল। একমাত্র চীন ছাড়া অন্যান্য সভ্যতায় শব্দভিত্তিক অক্ষর প্রচলিত হল, যার ফলে আরও বেশী সংখ্যক মানুষ শিখতে পড়তে পারল। আবির্ভাব হল কয়েকটি ধর্মের যে গুলাের ভিত্তি হল ঈশ্বরের প্রাধান্য ও জীবন যাত্রার নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন। সবগুলি সভ্যতাই ছিল কৃষকের উৎপাদনের উদ্বৃত্ত দিয়ে শাসক ও শােষক শ্রেণীভিত্তিক। এই শাসন ও শােষণ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রূপে ছিল। পার্থক্য হল ভৌগলিক অবস্থান, গৃহপালিত পশু, জলবায়ু এ গুলাের উপর ভিত্তি করে মানুষের জীবন যাত্রার বিভিন্নতার কারণে এবং কিভাবে উদ্বৃত্ত আহরন করা হয় তার উপর। এগুলাের উপরই ইতিহাসের ঘটনাবলী নির্ধারিত হয়েছিল।

প্রাচীন ভারত

খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতাব্দীর কাছাকাছি যে সব “আর্য” মানবগােষ্ঠী সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করেছিল বলে মনে করা হয় তারা গােড়াতে ছিল যাযাবর ও পশুপালক। তারা পশুর মাংস ও দুধের উপর জীবন ধারণ করত এবং গােষ্ঠীপ্রধানদের দ্বারা চালিত হত। নগর সভ্যতার ব্যবহার তারা জানত না। আক্রমণ করে ধ্বংস করার পর তারা নগর পরিত্যাগ করে। লিখিত ভাষা সম্বন্ধেও তারা জানত না। আগের সভ্যতার লিখিত ভাষা ব্যবহার না হওয়ার কারণে বিলুপ্ত হয়।

লােহার ব্যবহার খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ শতাব্দী থেকে বাড়তে থাকে। লােহার ব্যবহার জীবন যাত্রা বদলে দেয়। লােহার কুড়াল দিয়ে গঙ্গা উপত্যকায় জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের এলাকা অনেক বাড়ল। এতে শাসক শ্রেণীর উদ্বৃত্ত ও শােষণের পরিমাণও বাড়ল। কাজেই শাসক শ্রেণী, যার মধ্যে ছিল যােদ্ধারা আর পুরােহিতরা-কৃষিকাজ বাড়াতে উৎসাহ দিতে থাকল। তবে তারা ফসলের এক তৃতীয়াংশ এবং কোন কোন স্থানে অর্ধেক কর হিসাবে প্রতিটি গ্রাম থেকে বলপ্রয়ােগ করে আদায় করে নিত। এটাতে তারা ধর্মীয় অনুশাসনের সাহায্য পেত। আর্যরা নিয়ে এসেছিল একটি ধার্মিক অনুশাসন যা ছিল “বেদ” ভিত্তিক। এর আচার অনুষ্ঠান দেবতাদের বিজয় ভিত্তিক কাহিনীকে ঘিরে শ্লোক নির্ভর ছিল। ক্রমেই এই বেদভিত্তিক ধর্ম বিশ্বাস পরিবর্তিত হয়ে শ্রেণী বিভাগ দেখা দিল। আগে যেটা ছিল পেশাভিত্তিক, সামাজিক পার্থক্যে তা হয়ে দাঁড়াল স্থায়ী

জন্মগত শ্ৰেণীবিভাগ। উৎপাদনের নিম্নপর্যায়ের শ্ৰেণীদের উপর উচ্চবর্ণের কর আদায়ের দাবীটি ধর্মীয় যৌক্তিকতাও পেয়েছিল। তবে এই শ্রেণীবিভাগ ধর্মীয় অনুশাসনভিত্তিক ছিল- ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর নির্ভর করে তা ছিল না।

কৃষির প্রসার এর সঙ্গে সঙ্গে ফসলের উদ্বৃত্তের পরিমাণ বাড়তে থাকল। উচ্চশ্রেণীর মানুষদের উন্নত বিলাস সামগ্রী ও অস্ত্রশস্ত্রের চাহিদাও বাড়তে থাকল। এটা পূরণ করার জন্য কারিগর শ্রেণীর (কামার, তাঁতী, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি ইত্যাদি) সংখ্যা ও কাজও বাড়ল। তারা নগরে তাদের কর্মকান্ড চালাত। উচ্চশ্রেণীর চাহিদা মেটানাের জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও উন্নতমানের জিনিষপত্র আনা নেওয়া শুরু হােল। দূরপাল্লার বাণিজ্যও তাতে অনেক বাড়ল। উপমহাদেশের বাহিরের এলাকার সঙ্গেও তাদের বাণিজ্য চলত। যােদ্ধাদলের নেতারা ছােট ছােট এলাকায় তাদের আধিপত্য স্থাপন করল। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ উত্তর ভারতে আনুমানিক ১৬টি বড় রাজ্য ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ শতাব্দীতে মগধ রাজ্য অন্য সব রাজ্যগুলি জয় করে সিন্ধু নদের পূর্ব থেকে সমস্ত উত্তর ভারত জুড়ে সাম্রাজ্য স্থাপন করে। এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (৩২৪-৩০১ খ্রিষ্টপূর্ব)। এই “মৌর্য” রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র (বর্তমান বিহারে)। একজন গ্রীক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিস এর মতে পাটলিপুত্র ছিল সেই সময় পৃথিবীর সবচাইতে চিত্তাকর্ষক নগর। তাঁর মতে মগধ সেনাবাহিনীতে ৬,০০০ হাতি, ৮০,০০০ অশ্বারােহী ও ২ লক্ষ পদাতিক সৈন্য ছিল। এটা অনেকটা অতিরঞ্জিত বলে পন্ডিতেরা মনে করেন। তারপরেও পরিব্রাজক যেটা বিশ্বাস করেছিলেন তাতে ধারণা করা যায় যে মগধ সাম্রাজ্যের শক্তি ও মহিমা উল্লেখযােগ্য ছিল। এই সাম্রাজ্য নগরগুলি আকারে ও কর্মকান্ডে বড় হল। ভারত থেকে স্থল পথে একদিকে ইরান ও মেসােপটেমিয়া এবং অন্যদিকে চীন পর্যন্ত বাণিজ্য সুরক্ষিত করা হয়েছিল। সমুদ্র পথে আরব, মিসর, পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলত। এই সময়কালে পৃথিবীব্যাপী (পুরনাে পৃথিবী বা old world) বাণিজ্যের প্রসারে এই পথগুলাে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য প্রয়ােজন হত বিরাট সম্পদের। এই সম্পদ যােগাড় করার জন্য বিরাট রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরী হয়েছিল। রাষ্ট্রই কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। খনিজ পদার্থ,লবণ এ গুলাের উপরও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরােপুরি। বিশাল সেনাবাহিনী ও কর্মচারীদের ভরণ পােষণের জন্য গ্রাম পর্যায় হতে কর আদায় করা হত। মূলতঃ কৃষকের উৎপাদিত ফসলের উদ্বৃত্তই সবকিছুর যােগান দিত। আমলাতন্ত্র গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ছিল কেন্দ্র থেকেই আঞ্চলিক শাসক ও কর্মচারী নিয়ােগ দেওয়া হত এবং সব ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা হত। কয়েকটি গ্রামে একজন করে হিসাবরক্ষক নিয়ােজিত থাকত যে জমির সীমানা, উৎপাদিত ফসল ও গৃহপালিত পশুর হিসাব ও মানুষের সংখ্যারও হিসাব রাখত। একজন আদায়কারী থাকত যে প্রতিটি কর্মকান্ডের কর আদায় করত। সমস্ত কর্মশক্তি পরিচালনায় সাহায্যের জন্য একটি বিস্তৃত গােয়েন্দা ব্যবস্থাও ছিল। তবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও উৎপাদনের উন্নতির জন্য কিছু কাজ করা হয়েছিল। রাষ্ট্র নতুন জমিতে চাষাবাদ শুরু করার জন্য নতুন গ্রাম তৈরী করা, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি করা, পানি বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করা-এটা তার কর্মচারীদের দ্বারা করাত। জমির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা স্থাপন করা এবং জমি বিক্রি করা এটা বন্ধ করা হয়েছিল কারণ এর থেকে স্থানীয় শাসকেরা লাভবান হত।

লৌহ যুগ

সম্রাট অশােকের রাজত্বকালে (২৬৪-২২৭ খ্রিষ্টপূর্ব) এই সাম্রাজ্যের গৌরব ছিল শিখরে। অশােকের মৃত্যুর পর এই সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ে। যে বিরাট সৈন্যবাহিনী ও প্রশাসনিক লােকবল সাম্রাজ্য চালাতে দরকার হত তার ভরণ পােষণের জন্য যে বিরাট সম্পদ লাগত, তার যােগান দেওয়া সাম্রাজ্যের শক্তির বাইরে চলে যাচ্ছিল। যােগাযােগ ব্যবস্থা তখনও ততটা উন্নত হয় নাই যে, স্থানীয় রাজাদের কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। তবে সাম্রাজ্য পতনের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতা ভেঙ্গে পড়ে নাই। কৃষি ভূমির বিস্তার অব্যাহত থাকল। দূরপাল্লার বাণিজ্য বাড়ল। দক্ষিণ ভারতে রােমান মুদ্রা ব্যবহার হত এবং নৌপথে ইথিওপিয়া, মালয় উপদ্বীপ, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও রােমান রাজত্বের সঙ্গে জিনিষপত্রের আদান প্রদান চলতে থাকল। বস্ত্র, বিলাস দ্রব্য, রেশম বস্ত্র ইত্যাদির উন্নতি হতে থাকল। ভারতের বণিকেরা গ্রীক-রােমক সাম্রাজ্যের বিলাদ্রব্যের সরবরাহকারী হয়ে দাঁড়াল।

খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত উত্তর পশ্চিম দিক থেকে আরও কয়েকটি নতুন মানুষের দল উত্তর ভারত আক্রমণ করে এবং যুদ্ধ বিগ্রহের পর সেখানে বসবাস করে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যায়। এদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হােল “শক” যারা মধ্য এশিয়া থেকে এসেছিল। আরেকটি দল মঙ্গোলিয়া অঞ্চল থেকে এসে “কুশান সাম্রাজ্য স্থাপন করে। কনিষ্ক ছিলেন কুশান রাজাদের অন্যতম। কুশানদের রাজ্য আফগানিস্তান ও ইরানের কিছু অংশ নিয়ে উত্তর ভারতের পাটলিপুত্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই রাজত্বে ভারত, পারস্য, চীন ও রােম সাম্রাজ্যের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময় উত্তর ভারত আবার একই শাসকের অধীনে আসে (৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ)। কিন্তু গুপ্ত সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল কম-বরং স্থানীয় পর্যায়ের শাসক ও কর্মকর্তাদের উপর কর্মকান্ড ছেড়ে দেওয়া হত। এই সময়কালে সংঘাত তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের জন্য এই এই সময়কে কেউ কেউ “সােনালী যুগ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই সময় হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন উপাদান পরিশীলিত রূপ নেয়। ৫০০ খ্রিষ্টাব্দে আবার মধ্যএশিয়ার আর এক আক্রমণকারী জাতিগােষ্ঠী যারা “হুন” নামে পরিচিত এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। একবার হর্ষবর্ধন অল্প সময়ের জন্য উত্তর ভারতে আবার একক সাম্রাজ্য স্থাপন করেন (৬০৬ থেকে ৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দ)।

এই সময়কালে অংকশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, তর্কশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদিতে উল্লেখযােগ্য উন্নতি হয়। সংখ্যা গণনা, ও লেখার পদ্ধতি-যেটা এখনও প্রচলিত, তা উদ্ভাবন হয় এখানেই। যদিও এটাকে আরব পদ্ধতি বলা হয়। আরবরা ভারত থেকেই এটা ইউরােপে নিয়ে যায়। দশমিক পদ্ধতিও এখানেই আবিষ্কার হয়। আর্যভট্ট ৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি থেকে সঠিক সৌর বৎসর গণনার রীতি উদ্ভাবন করেছিলেন।

ষষ্ঠ শতাব্দীর পর থেকে সাংস্কৃতিক অগ্রগতি কমে যেতে থাকে। উপমহাদেশ ছােট ছােট রাজ্যে বিভক্ত হয়, যে গুলি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত থাকত। এই কারণে ব্যবসা বাণিজ্যও কমে যেতে থাকে। আঞ্চলিক রাজারা অর্থনৈতিক দূর্বলতার কারণে রাজকর্মচারীদের কাজের জন্য অর্থ না দিয়ে একটি অঞ্চলের শাসনভার দিয়ে দিত-সাথে সাথে কর আদায়ের দায়িত্বও। সাধারণত এই অর্থনৈতিক শাসকেরা ব্রাহ্মণ হত। শাসকেরা বর্ণ প্রথাকে জোরালােভাবে প্রয়ােগ করে বিভিন্নগােষ্ঠীর উদ্ভাবনী শক্তি সীমিত করে দিত। জনসংখ্যার একটা বড় অংশ হল নিম্নবর্ণের যারা এই প্রথার কারণে সমাজের মূলধারা থেকে প্রায় বহিস্কৃত হয়ে গেল। প্রায় হাজার বছর ধরে ভারতে যে পরিবর্তন ও উদ্ভাবন হয়ে আসছিল তা একসময় স্থবির হয়ে গেল। ছােট ছােট রাজ্য যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হতে লাগল । গ্রামগুলি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। সামাজিক নিগড় ও অনুশাসন জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে আবদ্ধ করে রাখল। পরবর্তীকালে মুসলিম ও ইউরােপীয় বিজেতারা ভারতকে এই অবস্থাতেই পেয়েছিল।

প্রাচীন চীন

পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে সভ্যতা শুরু হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। তারপরে তা গ্রীস, রােম হয়ে ইউরােপে পূর্ণ রূপ নেয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হল একই সময়ে উত্তর চীনে এক সভ্যতার উত্থান হয়েছিল যা প্রায় ২০০০ বৎসর স্থায়ী হয়। এই সভ্যতা মানবজাতিকে দান করেছে অনেকগুলাে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত আবিষ্কার। তবে একেবারে আদিকাল থেকে বর্ণনা শুরু করা যায়।

মেসােপটেমিয়ায় যে সময় প্রথম কৃষিকাজ শুরু হয়, সেই সময়ের কাছাকাছি সময়ে উত্তর চীনে বজরা (millet) চাষ ও শূকর পালন করা শুরু হয়। দক্ষিণ চীনে ধান চাষ এবং মহিষ পালন করা শুরু হয়। ধান চাষের কৌশল বজরা চাষের তুলনায় পৃথক। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে নব্য প্রস্তর যুগের প্রযুক্তি ব্যবহার করে নগর গড়ে উঠে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৭শ শতাব্দীর শেষ দিকে তামার সঙ্গে টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরী করা হয়। ব্রোঞ্জের অস্ত্র উচ্চশ্রেণীর যােদ্ধারা ব্যবহার শুরু করে। উত্তর চীনে এই অস্ত্র ব্যবহার করে শাং (Shang) রাজবংশের পত্তন হয় (১৭০০ থেকে ১১২২ খ্রিষ্টপূর্ব)। এই উচ্চশ্রেণীর মানুষেরা শাসক, পুরােহিত ও যােদ্ধার ভূমিকা পালন করত।

এর পরের রাজবংশ ছিল “চৌ”(Chou),১০২৮ থেকে ২২২ খ্রিষ্টপূর্ব এই সময় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল শিথিল। একটি শহরকে ঘিরে কিছু গ্রাম, এই রকম ছােট ছােট অনেক রাজ্য ছিল। এর মধ্যে কিছু বড় রাজ্যও ছিল-যার রাজারা নামেমাত্র চৌ সাম্রাজ্যের আধিপত্য স্বীকার করত। এই সময় ইয়াংসী নদী অঞ্চলে বিস্তৃত সেচ ও পরিবহনের জন্য জালের মত পরস্পর ছেদী খাল খনন করা হয়। কৃষি উৎপাদন এই সময় রাজারা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রাখত। জমির ব্যক্তি মালিকানা ছিল না। কৃষকরা যেভাবে আদেশ দেওয়া হত সেভাবেই ফসল বুনত ও ফসল তুলত।’ চৌ যুগের শেষের দিক ছিল চৈনিক দর্শনের ঐতিহ্য তৈরীর যুগ। এই সময়ে বিখ্যাত দার্শনিক ও জ্ঞানী পন্ডিতের মধ্যে ছিলেন কনফুসিয়াস, লাও-জু এবং মেনসিয়াস। পরবর্তীকালে কনফুসিয়াস ও মেনসিয়াস এর অনুসারীরা তাঁদের অনুশাসনসমূহকে ভিত্তি করে একে এক ধর্মের রূপ দেয়-যা কনফুসিয়ানিজম (Confucianism) নামে পরিচিত। লাও-জুর অনুসারীরাও তাওয়িজম (Taoism)এর জন্ম দেয়।

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ ও তৃতীয় শতকে চীন পরস্পর বিবাদমান রাজ্যে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধের প্রয়ােজনে প্রযুক্তির উন্নতি হল। তরবারি আড় ধনু (cross bow) ব্যবহারের ফলে সাধারণ কৃষকদের দিয়ে রথ (chariot) আরােহী বাহিনীর প্রতিরােধে লাগান গেল। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ ও তৃতীয় শতক পরিচিত হল “যুদ্ধরত রাজ্যগুলির যুগ”(the age of the warring states)। তবে এই যুগে কৃষিজমির ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হয়। উত্তর চীনে জঙ্গল কেটে জমি তৈরী এবং জলাভূমির পানি সেঁচে জমি তৈরী করা হয়। ব্যাপক আকারে লােহা তৈরী করা হয় যা পৃথিবীতে সেই সময় অদ্বিতীয় ছিল। কুড়াল, কোদাল, লাঙ্গল এবং অস্ত্রশস্ত্র বিভিন্ন স্থানে বহু সংখ্যায় তৈরী হত। কৃষিরও প্রযুক্তিগত উন্নতি হল। বলদে টানা লাঙ্গল দিয়ে জমিতে গভীর কৰ্ষণ (deep ploughing),পশু ও মানুষের বর্জ্য সার হিসেবে ব্যবহার, বজরা ছাড়াও সয়াবিন ও গমের চাষ এগুলাে এই সময় শুরু হয়। জমির উর্বরতা বাড়ানর জন্য ডালজাতীয় ফসলের ব্যবহার শুরু হয়। এ সবের ফলে উৎপাদন বাড়তে থাকে।

গার্নেটের মতে “যুদ্ধরত রাজ্যগুলির যুগ” ইতিহাসে একটি অনন্য উদ্ভাবনের যুগ। ধাতব বস্তু, কাঠ, চামড়ার তৈরী জিনিষসহ সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়ােজনীয় জিনিষ যেমন কাপড়, শস্য, লবণ, ইত্যাদির ব্যবসাও এই যুগে ব্যাপক আকারে হয়। ধনী ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সাথে সাথে বড় আকারের শিল্পদ্রব্য উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত। তারা বহু শ্রমিক ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান করত এবং বড় বড় নৌকার বহর এর মালিক ছিল। রাজ্যের সম্পদ তৈরীতে এদের অংশ ছিল সবচেয়ে বড়। রাজ্যগুলির রাজধানী ও নগর হয়ে উঠেছিল বড় শিল্পকেন্দ্র ও ব্যবসায়ের আধার। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে যুদ্ধের একটা বড় কারণ ছিল এইসব শিল্প ও ব্যবসাকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ।

শাসকদের জন্য নতুন ব্যবস্থা সফলভাবে চালানর জন্য প্রয়ােজন ছিল প্রাচীন উচ্চশ্রেণীর ক্ষমতা খর্ব করা-কারণ এই শ্রেণী ব্যবসা ও শিল্পের প্রসারের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চিন (Chin) রাজারা এটা পেরেছিলেন বলেই অন্যান্য রাজ্য জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২২১ শতাব্দীতে চি’ন শি হুয়াং ইতিহাসের প্রথম সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। তারা একটা নতুন আমলা ও সৈনিক শ্রেণী তৈরী করল যারা প্রাচীন অভিজাত শ্রেণীর জায়গা নিল। এরা কৃষককে জমির মালিকানা দিল ও প্রত্যক্ষভাবে কর আদায় করা শুরু করল। এতে স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ভূমিকা খর্ব হল। এটা ছিল সামাজিক কাঠামাের একটা বিরাট পরিবর্তন যাকে কেউ কেউ “বৈপ্লবিক” বলেও আখ্যা দিয়েছেন। এই পরিবর্তন ঘটানাে হয় অস্ত্রের শক্তিতে এবং বহু মানুষ প্রাণ হারায়। একটি হিসাব অনুযায়ী খ্রিষ্টপূর্ব ৩৬৪ থেকে ২৩৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। সাম্রাজ্য স্থাপনের পর প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার প্রাচীন অভিজাত পরিবারকে নির্বাসনে পাঠানাে হয়। এই পরিবর্তন শুধু যে একজন রাজা ও তার সৈন্যবাহিনী করল তা নয়। প্রযুক্তি ও কৃষির পরিবর্তনের ফলে যে সামাজিক শক্তিগুলির উত্থান হল সেটাও এর কারণ ছিল।

ব্রোঞ্জ যুগ

কৃষি উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ও পুরাতন শাসকশ্রেণীর উদ্বৃত্ত বাড়ল। বিলাসদ্রব্যের চাহিদাও বাড়তে থাকল। ঘােড়া, রথ, অস্ত্রের চাহিদাও বাড়তে থাকল। কৃষকেরও প্রয়ােজন হল আরও বেশী পরিমাণে কৃষিতে ব্যবহৃত হাতিয়ারের। ফলে কারিগরদের সংখ্যা বাড়ল। নতুন উদ্ভাবনও হতে থাকল, ব্যবসা বাণিজ্যও বাড়ল। ব্যবসার প্রয়ােজনে একই মানের ওজন ও একই মানের মুদ্রার প্রয়ােজন হল এবং এগুলাে চালু করা হল। ব্যবসায়ী শ্রেণীর প্রভাব ও প্রতিপত্তিও অনেক বাড়ল। একজন ঐতিহাসিকের মতে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চদশ হতে তৃতীয় শতাব্দীতে যে সামাজিক গঠনের পরিবর্তন হয়েছিল তাতে এই সম্ভাবনা খুবই ছিল যে চীনে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা প্রধান না হয়ে শিল্প-ব্যবসা ভিত্তিক নগরকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও সভ্যতাই প্রধান হয়ে উঠবে। আরেকজন ঐতিহাসিক মনে করেন এই সময় চীনে মজুরি ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হওয়ার সম্ভাবনা ইউরােপের চাইতে অনেক আগে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আমলাতন্ত্র শাসন ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়ায় এটা আর হয়নি। আমলারা রাষ্ট্রের উৎপাদন উদ্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণ অভিজাতশ্রেণী, ব্যবসায়ী ও যােদ্ধাদের কাছ থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। ব্যবসায়ীরা রাজাকে অভিজাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিল,

কিন্তু যুদ্ধজয়ের ফল চলে গেল আমলাদের হাতে। এরপর ব্যবসায়ীদের উপর চাপ বাড়তে থাকে। এটা চিন যুগ ও পরবর্তী হান যুগেও দেখা যায়। রাজ্যের পক্ষ থেকে লােহা ও লবণ এই দুইটি প্রধান শিল্প নিয়ে নেওয়া হয়। তাদের উপর বার্ষিক হারে কর ধার্য করা হয়। কর ফাঁকি দিলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

চিন সাম্রাজ্যের অধীনে যত মানুষ বাস করত রােম সাম্রাজ্যের অধীনে এর চাইতে কম মানুষ ছিল। রােম সাম্রাজ্যের ৫৯৮৪ কিলােমিটার রাস্তার তুলনায় চিন সাম্রাজ্যের রাস্তা ছিল ৬৮০০ কিলােমিটার। রাস্তাগুলাে একই নকশায় করা হয়। গাড়ীর axle (যে দন্ডটি কেন্দ্র করে চাকা ঘােরে) তা সমস্ত রাজ্যে ছিল একই মাপের। এই রাজত্বে আনুমানিক তিন লক্ষ শ্রমিককে তিন হাজার কিলােমিটার বৃহৎ প্রাচীর (great wall) তৈরীতে লাগান হয়। খাল কেটে একটি নদীর সঙ্গে আরেকটি নদীর সঙ্গে সংযােগ করে সেচ ও নৌ পরিবহনের জন্য একটি বিরাট নৌপথ সৃষ্টি করা হয়েছিল-যা পৃথিবীর অন্য কোথাও সে সময় ছিল না।

এই রাজত্বগুলির রাজারা ব্যবসায়ী শ্রেণীর প্রাধান্য খর্ব করা ছাড়াও সাধারণ মানুষকে দমন করে রাখার অন্যান্য ব্যবস্থাও নিয়েছিল। এর মধ্যে একটা ছিল বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বন্ধ করা। একজন সম্রাট রাজ্যের সব বই পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। রাষ্ট্রীয় এই কঠোর নিয়ন্ত্রণের কোন বিরূপ প্রভাব অল্পকালের মধ্যে দেখা যায়নি। উৎপাদন ও ব্যবসা বাড়তে থাকে। সাম্রাজ্য বিস্তার হয়ে কোরিয়া, মধ্য এশিয়া ও ইন্দোচীন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিছু কিছু প্রযুক্তিও আবিষ্কার হয়। দ্বিতীয় খ্রিষ্টাব্দেই চীনে ইস্পাত তৈরী হতে থাকে-ইউরােপে যা প্রায় ১৫০০ বছর পরে হয়েছিল। পৃথিবীর প্রথম পানি শক্তিচালিত চক্রও উদ্ভাবন হল।

সাম্রাজ্যের কর এতই বেশী ছিল যে, কৃষকরা বাধ্য হত বিদ্রোহ করতে। বারে বারেই এ ধরনের বিদ্রোহ হয়েছে। যদিও মিসর, মেসােপটেমিয়া, ভারত, ও রােমের ক্ষেত্রে বিপ্লবের লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না, চীনে এসব যথেষ্ট পাওয়া যায়। কৃষক বিদ্রোহ কখনাে কখনাে ব্যাপক আকার ধারণ করে একটি প্রদেশ সম্পূর্ণ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, কখনাে তা রাষ্ট্রের রাজধানী দখল করার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। চিন রাজবংশ পতনের জন্য এরকম একটি বিদ্রোহ দায়ী। তবে এসব বিদ্রোহ কখনােই কৃষকদের পক্ষে যায় নাই। তাদের রাজ্য চালানর মত সংগঠন ছিল না। সব সময়ই শাসকশ্রেণীর এক অংশ এরকম বিদ্রোহের সুযােগ নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে যােগ দিয়ে ক্ষমতা দখল করত, তারপর তারা কৃষকদের দমন করত।

হান সাম্রাজ্য ইউরােপের আধুনিক যুগের সময়কাল যতটা এতটা সময় টিকে ছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান শােষণের ফলে কৃষক বিদ্রোহ তাদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দিয়েছিল। স্থানীয় শাসকেরা প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ১৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এক বিদ্রোহের ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ পুরােপুরি ভেঙ্গে পড়ে। নগরগুলাের অবনতি হয়। দূরপাল্লার বাণিজ্য কমে যায়। স্থানীয় শাসকেরা কৃষকদের নিয়ন্ত্রণভার নিয়ে নেয়। সেচ কার্য নিয়ন্ত্রণ করা, কর আদায় করা তারাই করতে থাকে। কৃষিকাজ, শিল্প ও ব্যবসা চলতে থাকে, কিন্তু দূরপাল্লার আদান প্রদান কমে যাওয়ায় তা মূলত স্থানীয় চাহিদা মেটাতে থাকে, এর ফলে চাহিদা কমে যায়, উদ্ভাবনও বন্ধ হয়ে যায়। একটা দীর্ঘকালের উন্নতি স্থবির হয়ে যায় এবং এটা প্রায় তিনশত বছর স্থায়ী হয়। ভারতে পঞ্চম শতকে এরকম স্থবিরতা এসেছিল। প্রায় এরকম সময়ে রােমান সাম্রাজ্যও ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু চীনে সভ্যতার কাঠামাে ভেঙ্গে পড়ে নাই এবং দ্রুত পুনর্গঠনের ভিত্তি রয়ে গেছিল।।

গ্রীসের নগর রাজ্য গুলির সভ্যতা

ভূমধ্যসাগর এ সভ্যতার আদিযুগে উল্লেখ করার মত প্রথম হয় মিনােয়ান সভ্যতা। গ্রীসের সবচাইতে বড় দ্বীপ ক্রীটে ছিল এর অবস্থান। নব্য প্রস্তরযুগে এখানে যারা বাস করত তারা খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সাল নাগাদ পাথর, ইট দিয়ে তৈরী নগর, ক্রীটের উপকূল অঞ্চলে গড়ে তুলেছিল। তাদের সঙ্গে গ্রীসের মূল ভূখন্ড, মিসর ও এশিয়া মাইনরের জিনিষপত্রের আদান প্রদান ছিল। তারা বড় বড় প্রাসাদও তৈরী করেছিল-সবচাইতে বড় প্রাসাদ ছিল নােসস (Knossos) এ। এই সভ্যতা প্রায় ছয়শত বছর স্থায়ী হয়। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে আগুনে নােসস পুড়ে যাবার পর থেকে এই সভ্যতার পতন হয়। মিনােয়ান প্রাসাদগুলি চিত্রকলায় ভরপুর ছিল। তাদের শৈল্পিক রীতি মিসর ও গ্রীসে পরবর্তীকালে অনুসরণ করা হয়। তাদের ধর্ম ও আচার আচরণ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা যায় নাই। কিন্তু আচার অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত ছিল বলেই চিত্রকলা থেকে ধারণা করা যায়।

তাদের লিখিত তথ্য সম্বলিত ফলক পাওয়া গেছে অনেক। এই যুগের শেষ দিকের ফলকগুলি গ্রীক লিপির আদি রূপ বলে মনে করা হয়।

মিসেনিয়ান (Mycanaeans) সভ্যতাঃ আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সাল থেকে গ্রীসে নতুন এক শ্রেণীর মানুষ উত্তরপূর্ব দিক থেকে আসতে থাকে। এরা ইন্দোইউরােপীয় ভাষায় কথা বলত। পরবর্তী গ্রীকেরা এদেরকেই তাদের পূর্ব পুরুষ বলে মনে করত। এরা ধীরে ধীরে আদি অধিবাসীদের সরিয়ে বসতি স্থাপন করল। সভ্যতার দিক দিয়ে এরা মিনােয়ানদের তুলনায় ছিল বর্বর। এরা ছিল পশু পালক, রথ চালানাের প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছিল ও যুদ্ধে পারদর্শী ছিল। কিছু বড় বড় প্রাসাদ ছাড়া এই সভ্যতার অবশিষ্ট তেমন কিছু নাই।

খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে মিসেনিয়ান সভ্যতার কেন্দ্রগুলি ধ্বংস হয়ে যায়। কারণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় নাই। উত্তর দিকে গ্রীসের মূল ভূখন্ড থেকে মানবগােষ্ঠী ক্রমাগতভাবে মিসেনিয়ানদের সরিয়ে তাদের এলাকায় বসতি স্থাপন করতে থাকে। এরা বিভিন্ন সময়ে পৃথক পৃথক গােষ্ঠী মূল ভূখন্ড থেকে ক্রীটস, রােডস ইত্যাদি দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। একটা উল্লেখযােগ্য ফল হল গ্রীক ভাষাভাষী মানুষ ইজিয়ান সাগরের তীর থেকে ও দ্বীপ সমূহে অনেকগুলাে বসতিতে ছড়িয়ে পড়ল। এর বেশীরভাগই আকারে ছােট ছিল। সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বাড়লেও অনেকগুলােতেই দশ হাজারের বেশী অধিবাসী ছিল না। তবে এই মানব বসতিগুলাে ছিল স্ব-শাসিত (autonomous) কোন রাজা বা সাম্রাজ্যের অংশ নয়। প্রথমদিকে এ গুলাে ক্ষুদ্র নৃপতি বা দলপতি শাসিত হলেও সময়ের সাথে সাথে এই বসতিগুলি ভূস্বামীদের পরিষদ দ্বারা শাসিত হত।

লৌহ যুগে দাত প্রতিস্থাপন

গ্রীক সভ্যতা

ইজিয়ান (Aegean) সমুদ্রের পশ্চিমে গ্রীস অবস্থিত। এটির মূলত: তিনটি ভৌগলিক বিভাগ রয়েছে। দক্ষিণ দিকটি একটি উপদ্বীপের মত-এটা পেলােপনিজ নামে পরিচিত। এটি একটি ছােট ভূখন্ড দ্বারা এর উত্তর আর একটি উপদ্বীপের সঙ্গে যুক্ত। সবচাইতে উত্তরে রয়েছে পর্বত অধ্যুষিত অঞ্চল মেসিডােনিয়া। গ্রীক আক্রমণ এই ভৌগলিক গঠনের কারণে উত্তরে স্থলভূমি থেকে কঠিন ছিল। সমুদ্রপথে আক্রমণ বরং এর চাইতে সহজ ছিল। এই সময় প্রায় সব অধিবাসীই সমুদ্রতীরের ৬০-৭০ কিলােমিটার এর মধ্যেই বাস করত। সমুদ্র পথে অন্যান্য স্থানের সঙ্গে যােগাযােগ রাখাও ছিল তুলনামূলকভাবে স্থলপথের চাইতে সহজ। গ্রীসের মূল ভূখন্ডে জমি তত উর্বর ছিল না। খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতাব্দীতেই জনসংখ্যাবৃদ্ধির জন্য বসতিগুলাে জমির প্রয়ােজন অনুভব করছিল। মানুষ মূল ভূখন্ডের দিকে না গিয়ে নৌপথে প্রথমে ইজিয়ান সাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে তারপর আরও দূরে দূরে নৌপথে গিয়ে নতুন বসতি স্থাপন করল। চারশত বছর পর দেখা গেল পূর্ব দিকে কৃষ্ণ সাগর থেকে পশ্চিমে ফ্রান্স ও সিসিলি এবং দক্ষিণে লিবিয়া পর্যন্ত গ্রীকদের উপনিবেশ ছড়িয়ে পড়েছে। কোন কোন উপনিবেশ উর্বর কৃষিভূমিতে প্রধানত ফসল উৎপাদনেই নিয়ােজিত হল। আবার কোন কোন উপনিবেশ প্রধানত ব্যবসা বাণিজ্যই করত। সিসিলি, ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল, উত্তর আফ্রিকায় কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপিত হল। সিসিলির সিরাকিউস সমৃদ্ধ শহরে পরিণত হল- খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৩৫০ পর্যন্ত এথেন্স ছাড়া একমাত্র এই শহরেই এক লক্ষের বেশী অধিবাসী ছিল। কৃষি উৎপাদন ভিত্তিক এই উপনিবেশগুলাে থেকে গ্রীস বা তার উপকূলীয় দ্বীপ সমূহে মূলবসতিতে খাদ্যশস্য পাঠান হত। সেখান থেকে আসত শিল্প দ্রব্য। মূল বসতিগুলাে সাধারণত পরবর্তী উপনিবেশ গুলাের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করত না। তারা স্ব-শাসিত ছিল। কিন্তু আত্মীয়তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তাদের কাছাকাছি রাখত। গ্রীসের মূল ভূখন্ড ও তার আশে পাশের দ্বীপগুলির বসতি এইভাবে শিল্পদ্রব্য উৎপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যে পারদর্শী হয়ে উঠল এবং এই কাজগুলিই তারা প্রধানত করত। জমি উর্বর না হওয়ায় শস্য উৎপাদন না করে জলপাই ও আঙ্গুর উৎপাদনই মূল ভূখন্ডে বেশী হত। জলপাই থেকে তৈরী তেল ও আঙ্গুর থেকে তৈরী সুরা মূল্যমানের দিক থেকে বেশী হওয়ায় পণ্যদ্রব্য হিসাবে আরও আকর্ষণীয় ছিল। এছাড়া মৃৎশিল্প ও ধাতু শিল্পের উৎপাদিত দ্রব্যাদিও তারা বাণিজ্য করত। নিজেদের উৎপাদিত পণ্য ছাড়াও মিসর ও এশিয়া মাইনরের জন্যও পণ্য গ্রীক বণিকেরা আনা নেওয়া করত।।

এথেন্স ও আরও কয়েকটি নগরে অর্থ ও ব্যবসা সংক্রান্ত কার্য ফলকের প্রারম্ভ পাওয়া যায়। ধাতব মুদ্রার প্রচলন ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ যুগের আগেও বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যকে মূল্যমান ধরে নিয়ে তার ভিত্তিতে ব্যবসা বাণিজ্য চালান হয়ে আসছিল। এর ভিত্তিতে বিণিময় বাণিজ্য (barter) ও ঋণদান (credit) এর অনেক আগেই চালু হয়েছিল। কিন্তু ধাতব মুদ্রার ব্যবহার এই কাজগুলােকে সহজতর করেছিল এবং অনেক বিস্তৃত করে দিয়েছিল। যে সমস্ত জায়গায় বা মানুষেরা বিণিময় বাণিজ্য ব্যবস্থায় অংশ নিতে পারত না। তারাও ধাতব মুদ্রার প্রচলনে ব্যবসা করতে পারত। ধাতব মুদ্রার আবিষ্কার ঠিক কোন সময়ে হয়েছিল তা বলা যায় না। প্রথম যে প্রাচীন মুদ্রা পাওয়া যায় তা ছিল খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর-এশিয়া মাইনর থেকে। তবে ব্যাপক প্রচলন গ্রীক নগরগুলিতে শুরু হয় বলে মনে করা হয়। সােনা ও রূপার মিশ্রণে ইলেকট্রাম নামে ধাতুর মুদ্রা, শুধু সােনার মুদ্রা বা শুধু রূপার তৈরী মুদ্রা, সবই ব্যবহার করা হয়। তবে রূপার মুদ্রাই বেশী ব্যবহার হয়, এর কারণ ছিল রূপা বেশী পাওয়া যেত ও তা ব্যবহার করা সহজতর ছিল। এথেন্সের রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত লরিয়াম (Laurium) নামক স্থানে রূপার খনি এথেন্সকে দিয়েছিল ঐশ্বর্য আর ট্রাইরেমস (triremes) নামক কার্যকর যুদ্ধজাহাজ তৈরীর ক্ষমতা। এই যুদ্ধ জাহাজ ব্যবহার করেই গ্রীকরা পারসিকদের পরাজিত করে এবং এর সাহায্যেই পূর্ব ভূমধ্যসাগরে। প্রধান শক্তি হিসাবে নিজেদের স্থাপন করে।

ব্রোঞ্জ যুগের ধ্বংসাবশেষ

আলেকজান্ডার এর বিজয়ের ফলে গ্রীক সংস্কৃতি একটি বিরাট এলাকায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য ভেঙ্গে গেলেও গ্রীকেরা অনেক এলাকায় থেকে যায়। তারা এসব এলাকায় প্রশাসন পরিচালনা থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। গ্রীস থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্রীক ভাষা বলা হত। রােমের উত্থানের আগে পৃথিবীর সবচাইতে বড় শহর ছিল সম্ভবত আলেকজান্দ্রিয়া, এর লােকসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ । আলেকজান্দ্রিয়া মিসরে অবস্থিত হলেও এটা ছিল কার্যত একটি গ্রীক শহর। এই শহরে মিসরের গম, প্যাপিরাস, লিনেনের কাপড়, কাঠের জিনিষ, আফ্রিকার হাতির দাঁত, উটপাখির পালক, আরব ও পারস্যের কার্পেট, ভারতের তুলা ও চীনের রেশম সবই আদান প্রদান হত।

জমির উর্বরতা গ্রীসের মূল ভূখন্ডে কম থাকার আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ফল হয়েছিল কৃষক ও তার পরিবারের ভরণ পােষণের পর শস্য উৎপাদনের খুব কমই উদ্বৃত্ত থাকত। উদ্বৃত্ত বাড়ানর একটা উপায় দেখা গেল যাদের পরিবার নাই তাদের কৃষিকাজে লাগান। এটা হল দাসশ্রম প্রসারের একটা ভিত্তি। দাসরা ফসল উৎপাদন করলে তাদের ভরণ পােষণের পর উদ্বৃত্ত বেশী থাকত। এই উদ্বৃত্ত দাস মালিকদের বিনা শ্রমে আয়েশী জীবন যাপনের ব্যবস্থা করল। যুদ্ধ বন্দীদের দাস হিসাবে ব্যবহার করা হত। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে একজন মুক্ত মানুষকে এক বছর খাটানর জন্য যে পারিশ্রমিক দিতে হত তার অর্ধেকের চাইতেও কমে একজন যুদ্ধবন্দী দাস কেনা যেত। দাসত্ব আগেও ছিল কিন্তু দাসেরা মূলত মালিকদের ব্যক্তিগত কাজই করত। এই প্রথম গ্রীসে তারপর রােমে ব্যাপকভাবে দাসদের উৎপাদন বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করার কাজে ব্যবহার করা শুরু হল। যদিও দাসেরা মােট মানুষের সংখ্যার অনুপাতে কম ছিল, কিন্তু কোন কোন গবেষকের মতে তাদের উদ্বৃত্ত উৎপাদন ছাড়া শাসক, কর্মচারী, কবি দার্শনিকদের শ্রম বিহীন জীবন যাপন সম্ভব হত না।

চীনে দাস বিদ্রোহ প্রায়ই হত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তেমন দাস বিদ্রোহ গ্রীসের ইতিহাসে দেখা যায় না। এর একটা কারণ হল দাসরা বিভিন্ন দেশ থেকে যুদ্ধ বন্দী হিসাবে আসত। তারা ছিল ভিন্ন ভাষাভাষী ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ এবং নিজেদের সংঘবদ্ধ করা কঠিন ছিল। তবে দাসদের উৎপাদন বাড়ানর কোন আগ্রহ স্বভাবতই ছিল না এবং প্রযুক্তিগত উন্নতিও তারা করার চেষ্টা করত না। বড় ভূস্বামী (যাদের অনেক দাস জমিতে কাজ করত এবং নিজেদের কোন কাজ করার দরকার হত না) আর ছােট ছােট খামার মালিক (যারা নিজেরা জমিতে কাজ করত এবং হয়ত দু একজন দাস রাখত), এই দুই এর দ্বন্দ্ব সমাজে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিল। বড় ভূস্বামীরা তাদের আগের সময়ের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র তুলে দিয়ে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নেয় যা অলিগার্কি (oligarchy) নামে অভিহিত। রাজ্যের কাজ চালান, যেমন প্রশাসনিক খরচ, সামরিক (নৌবাহিনী যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত) খরচ চালানর জন্য তারা ক্রমবর্ধমান হারে ছােট ভূস্বামীদের উপর কর ধার্য করত। কর দেওয়ার জন্য ক্ষুদ্র জমির মালিকেরা উচ্চবিত্তের কাছে ঋণ করত। এক পর্যায়ে ঋণ শােধ না দিতে পারার জন্য আদালতের মাধ্যমে উচ্চবিত্তরা তাদের জমি নিয়ে নিত। আদালত উচ্চবিত্তের পক্ষেই থাকত। উচ্চবিত্তদের মধ্যে কেউ কেউ ছােট ভূমি মালিকদের দুঃখ দুর্দশা পুঁজি করে তাদের নিয়ে তৎকালীন শাসকদের উৎখাতও করত। কিন্তু তাতে সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হত না। তবে কোন কোন স্থানে (যেমন এথেন্সে) এই ছােট ভূমি

মালিকদের (যাদের সংখ্যা ছিল বেশী) চাপে শাসন ক্ষমতায় একটা পরিবর্তন আনা হয়। একে বলা হত ডেমােক্র্যাসী (democracy) যার আভিধানিক অর্থ জনগণের শাসন। বাস্তবে সব জনগণের সমন্বয়ে এই শাসন ব্যবস্থা নির্ধারিত হত। দাস দাসী, মহিলা ও বহিরাগত ব্যবসায়ীদের এতে অংশ নিতে দেওয়া হত না। তবে এই ব্যবস্থায় সামগ্রিক অর্থনীতির বিন্যাসে পরিবর্তন না হলেও ছােট ছােট ভূমি মালিকরা বিত্তশালীদের শােষণ থেকে কিছুটা রক্ষা পেত। স্বভাবতই বিত্তশালীরা এই ব্যবস্থা পছন্দ করত না। বিভিন্ন সময়ে তারা এই ব্যবস্থাকে উৎখাত করে ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নিত। এতে তাদের একটা সুবিধা ছিল। অস্ত্র শস্ত্র ও বর্ম উচ্চমূল্যের হওয়ায় তারাই এগুলাে ব্যবহার করতে পারত এবং শক্তির দিক থেকে বেশী থাকত। গ্রীক নগর রাজ্যগুলির ইতিহাস তাই “ডেমােক্র্যাসী” ও বিত্তবানদের সংঘাতের ইতিহাসবেশীরভাগ স্থানে বিত্তবানেরা নিজেদের আধিপত্য কায়েম করত। এথেন্সে এটা সম্ভব হয় নাই। এর কারণ ছিল বাণিজ্যের উপর এথেন্সের নির্ভরতা। আর বাণিজ্য নির্ভর করত নৌবাহিনীর উপর। নৌবাহিনী চালাত বেশীরভাগ কম বিত্তবান শ্রেণীর লােক। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে “ত্রিশ বৎসর এর যুদ্ধ” নামে দুই নগর রাষ্ট্রপুঞ্জের যুদ্ধ হয়। একদিকে ছিল এথেন্স ও ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী অন্যান্য শহর- যারা নিম্নবিত্ত মানুষের উপর নির্ভরশীল ছিল এবং “ডেমােক্র্যাসী”র পক্ষে ছিল, অপরদিকে ছিল সম্রাট এবং মূল ভূখন্ডের অন্যান্য রাজ্য যারা বিত্তশালীদের দ্বারা পরিচালিত ছিল।

প্রাচীন যুগে গুহায় আঁকা ছবি

গ্রীক নগর সভ্যতার উত্থানের প্রেক্ষাপটে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান এর প্রভূত অগ্রগতি হয়। কয়েক শতক ধরে এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা হয়। অ্যারিষ্টোটল, প্লেটো, ডেমােক্রিটাস এবং আরও অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনের জন্ম দেন। এই সাংস্কৃতিক অর্জনই পরবর্তীতে ইউরােপের মধ্যযুগের “পুনর্জাগরণের ভিত্তি ছিল।

গ্রীসের নগর রাষ্ট্রগুলাের আর একটা সুবিধা ছিল-মেসােপটেমিয়া, মিসর বা পারস্যের রাষ্ট্রগুলাের মত বড় এবং স্থবির প্রশাসনের চাইতে গতিশীল ছিল ছােট গ্রীক রাজ্যগুলি। তাদের বড় ভূস্বামী এবং ছােট ভূস্বামীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকার পরেও জনসংখ্যার একটা বড় অংশ যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকত। এ কারণেই তারা সমন্বিতভাবে বহু শতাব্দী বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরােধ করেছে। এরই উপর ভিত্তি করে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মেসিডােনিয়ার রাজা আলেকজান্ডার এর বাহিনী মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্যের বিরাট সাম্রাজ্য জয় করতে পেরেছিল। আলেকজান্দ্রিয়াতে বিজ্ঞানের উৎকর্ষ ঘটতে থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ সালের কাছাকাছি সময়ে এখানে ইউক্লিড জ্যামিতি নামক গণিতের শাখার ভিত্তি স্থাপন করেন। এরাষ্টোথিনিস নামে এক বিজ্ঞানী এই রকম সময়ে এখানে পৃথিবীর ব্যাস (diameter) নির্ধারণ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০ সালের কাছাকাছি সময়ে হিপারকাস নামে আর এক বিজ্ঞানী ত্রিকোনমিতি নামে গণিতের আর এক শাখার মাধ্যমে পৃথিবী থেকে চন্দ্রের দূরত্ব গণনা করেন।

রােম সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনঃ

রােম সাম্রাজ্যের উত্থানকে প্রাচীন সভ্যতার শিখর বলে অভিহিত করা হয় আর এর পতনকে বলা হয় ঐতিহাসিক ট্রাজেডী (tragedy) বা বিয়ােগান্ত ঘটনা।১৭ রােম সাম্রাজ্য ছিল সত্যই বিরাট। ইতালির একটি ছােট নগর থেকে শুরু হয়ে এই সাম্রাজ্য ভূমধ্যসাগরের প্রায় সম্পূর্ণ এলাকা যা বিস্তৃত ছিল দানিয়ুব ও রাইন নদীর দক্ষিণে সমগ্র ইউরােপ সাহারা, মরুভুমির উত্তরের সমস্ত উত্তর আফ্রিকা, নীল নদের উত্তরে সমস্ত মিসর, ও এশিয়া মাইনর-এই বিস্তীর্ণ এলাকায় রােম সাম্রাজ্য আধিপত্য বিস্তার করে। এর পশ্চিম অংশ প্রায় ছয় শত বৎসর স্থায়ী হয় আর এর পূর্ব অংশ প্রায় ১৬ শত বছর টিকে থাকে। সাম্রাজ্যের সর্বত্র সর্বসাধারণের জন্য দালান ও উপাসনালয়, খেলার ষ্টেডিয়াম ও পানি সরবরাহের জন্য কৃত্রিম নালা, রাস্তাঘাট তৈরী করা হয়-যা পরবর্তী যুগের মানুষদের জন্য বিস্ময় হয়ে রয়েছে।

তবুও এই বিশাল কর্মকান্ডে মানুষের আগের যুগগুলিতে অর্জন করা জীবনযাত্রা পরিবর্তনের ক্ষমতা বা আগের যুগগুলিতে আহরিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান খুব বেশী বাড়ে নাই। প্রাচীন মেসােপটেমিয়া ও মিসর, গ্রীস, ভারত ও চীন সভ্যতায় যে গতিতে নতুন উদ্ভাবন হয়েছিল তা রােমান সাম্রাজ্যে দেখা যায় নাই। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে অল্প কয়েকটি বিষয়ে রােম সাম্রাজ্যে অগ্রগতি দেখা যায়। একটি ছিল রােমান স্থাপত্য ও প্রকৌশল। যে বড় বড় স্থাপনা তারা সাম্রাজ্যের সর্বত্র তৈরী করেছিল তা সত্যিই বিস্ময়কর। তারা একটি আরও উন্নত নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত আইন তৈরী করেছিল, বিশেষত সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার এর বিষয়গুলিতে। বিরাট সাম্রাজ্য ধরে রাখা ও পরিচালনা করার একটা প্রশাসনিক কাঠামাে তৈরী করাও তাদের কৃতিত্ব। সম্ভবত তাদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল আগের যুগগুলিতে মেসােপটেমিয়া, মিসর ও গ্রীসে যে অগ্রগতি হয়েছিল সেটা মধ্য ও পশ্চিম ইউরােপে ছড়িয়ে দেওয়া।

প্রগৌতিহাসিক শিল্পকলা

শুরুতে রােম অনেকটা গ্রীস নগর সভ্যতাগুলাের মত ছিল। আত্মীয়তার সূত্রে সম্পর্কিত কৃষিজীবীদের একটি বসতি থেকেই প্রথম শুরু বলে ধারণা করা হয়। অন্যান্য অঞ্চলের বাণিজ্যের পথে অবস্থিত হওয়ায় এর থেকে অতিরিক্ত আয়ও হত। জনসংখ্যা বাড়ে এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষে এটা একটা বর্ধিষ্ণু নগরে পরিণত হয়। এর আগে পর্যন্ত রােম শাসন করত উত্তর দিকের এস্কান (Etruscan) রাজ্য। এই সময় এস্কানদের তাড়িয়ে দেয় রােমানরা। পরবর্তী চারশত বছরে সামরিক অভিযানের দ্বারা রাজ্যের পরিধি বাড়তে থাকে। যুদ্ধে পদাতিক সৈন্য ছিল কৃষকেরা কিন্তু তারা সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত না এবং সামরিক অভিযানে পাওয়া ধনসম্পদের ভাগও পেত না। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল একটা অভিজাত শ্রেণীর সদস্যদের হাতে- যাদের প্যাট্রিসিয়ান (patrician) পরিবার বলা হত। সিদ্ধান্ত যেখানে নেওয়া হত সেই সিনেট, আঞ্চলিক প্রশাসক বা কনসালগণ, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী প্রিটর (praetor), বিচারকগণ-সবাই এই শ্রেণীর সদস্য ছিলেন। একটি পরিষদ ছিল (assembly)-যেটা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও বিচারক নিয়ােগের ক্ষমতা রাখত। কিন্তু এর ১৯৩ সদস্যের ৯৮ জনই আসত অভিজাতদের মধ্য থেকে। ক্ষুদ্র কৃষক বা প্লেবিয়ান (plebeian) দের মধ্য থেকে আগতরা সংখ্যায় এদের সঙ্গে পেরে উঠত না। সম্পত্তি নাই এমন রােমান যাদের বলা হত প্রােলেতারি (proletarii), এদের ছিল মাত্র এক ভােট। অভিজাত শ্রেণী তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করত ক্রমাগত ছােট কৃষকদের জমি গ্রাস করতে। এই শ্রেণীর লােকেরা সৈন্যবাহিনীর অধিপতিও হত, ফলে রাজ্যজয়ের পর বিজিত রাজ্যের জমির বড় অংশ তারাই দখল করত। এতে এই দুই শ্ৰেণীর মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরী হয়। পরবর্তীকালের এক ঐতিহাসিক এ সম্বন্ধে লিখেন- প্যাট্রিসিয়ানরা অন্যদের সঙ্গে দাসের মত আচরণ করত। তাদের জমি থেকে তাড়িয়ে দিত এবং তাদের শাস্তি ও মৃত্যুদন্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিত। তাদের এই আচরণ এবং তাদের চাপিয়ে দেওয়া দেনা, যুদ্ধের জন্য কর দেওয়া ও সৈন্য হিসাবে যুদ্ধে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ইত্যাদির কারণে অন্যরা বিদ্রোহ করে। বহু বছর ধরে এই দুই শ্রেণীর সংঘাত চলে, ফলে ক্ষুদ্র জমি মালিকেরা “ট্রিবিউন” নামে এক শ্রেণীর প্রতিনিধি রাখার অধিকার পায়। ট্রিবিউনের সদস্যরা অভিজাত শ্রেণীর শােষণ থেকে প্লেবিয়ানদের রক্ষা করার চেষ্টা করত। খ্রিষ্টপূর্ব ২৮৭ সালে দুই শ্রেণীর একটি বড় সংঘাতের পর প্লেবিয়ানরা সর্বস্তরে নিয়ােগ পাওয়ার অধিকারও আদায় করে।

নতুন ভূখন্ড জয় করায় রােমের ক্ষুদ্র কৃষকেরা এসব স্থানে আরও বেশী জমি চাষ করার অধিকার পায়। তবে রাজ্য জয়ের ফলে যে ধনসম্পদ লুট করা হত তার সিংহভাগই ভােগ করত অভিজাত শ্রেণী। এই শ্রেণী তাদের ধনসম্পদের একটা অংশ ব্যয় করত নতুন জমি কেনার জন্য। ক্ষুদ্র কৃষকেরা পদাতিক সৈন্য হিসাবে যুদ্ধরত থাকায় ফসল উৎপাদনে পূর্ণ সময় দিতে পারত না। তার উপর ছিল বাড়তে থাকা করের বােঝা। ঋণগ্রস্ত হয়ে তাদের জমি চলে যেত অভিজাত শ্রেণীর হাতে। এদিকে যুদ্ধ বন্দীদের সংখ্যা রাজ্য জয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। যুদ্ধ বন্দীরা হয়ে যায় দাস- দাসের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। উদাহরণস্বরূপ- তৃতীয় মেসিডােনিয়ার যুদ্ধের পরে ১৫০,০০০ যুদ্ধ বন্দীকে দাস হিসাবে বিক্রী করা হয়।২ খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে সাম্রাজ্যের দাসদের সংখ্যা ছিল ২০ লক্ষ আর অন্যান্য মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ লক্ষ। উপরন্ত যারা দাস নয় তাদের প্রতি আটজনে একজন ছিল সৈনিক ফলে সমাজে দাসদের অনুপাত ছিল আরও বেশী। বড় বড় ভূস্বামীদের জন্য দাস নয় এমন মানুষকে শ্রমিক হিসাবে কাজ করানাের চাইতে একজন দাস কিনে তাকে কাজে লাগান ছিল কম ব্যয় বহুল। একজন বড় ভূস্বামী তার দাসদের দিত বছরে একটি পােশাক, একটি কম্বল, আর খাবার থাকত মাংস ছাড়া। কম খরচে বড় খামারে দাসরা ফসল উৎপাদন করায় ছােট ছােট ভূস্বামীরা প্রতিযােগিতায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে এবং তারা আরও দরিদ্র হতে থাকে। অনেকে তাদের ছেলে মেয়েদের পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যারা পরে দাস হিসাবে বিক্রী হয়।২২ অভিজাত ধনীদের সঙ্গে ক্ষুদ্র গরীব কৃষকদের সংঘাত শুরু হয়। টাইবেরিয়াস গ্রাচ্চা (Tiberius Gracchus) ও তার ভাই গায়া গ্রাচ্চা (Gaius Gracchus) অভিজাত শ্রেণীর হলেও ট্রিবিউন নির্বাচিত হওয়ার পর তারা গরীব কৃষকদের জন্য বড় ভূস্বামীদের জমি বিতরণ ও আরও কিছু সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে। দুজনকেই অভিজাত শ্রেণীর লােকেরা হত্যা করে (খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক)। পরবর্তীতে আরও কয়েকজন সংস্কারক একই পরিণতির শিকার হয়। বিজিত রাজ্যগুলির। ধনসম্পদ অধিকার ও ক্ষমতা দখল নিতে শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন গােষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বও এইসময় বাড়ে। এই পটভূমিতে অনেক স্থানে দাসরাও বিদ্রোহ করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৮ থেকে ১৩২ সাল পর্যন্ত সিসিলিতে হাজার হাজার দাস বিদ্রোহ করে। স্পার্টাকাস নামে এক দাসের নেতৃত্বে আরও বড় এক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩ সালে। এই বিদ্রোহ দমন করা হয় এবং কোন

কোন ঐতিহাসিকের মতে প্রায় এক লক্ষ দাস মারা যায়। ক্ষুদ্র কৃষকদের বিদ্রোহ বা দাস বিদ্রোহ কোনটাই রােম সাম্রাজ্যের গঠনের কোন পরিবর্তন ঘটায় নাই। রােমান সাম্রাজ্যের অর্থনীতির ভিত্তি ছিল কৃষি। শাসক শ্রেণী ও সভ্যতা ছিল শহর ভিত্তিক। শহরে শিল্প উৎপাদন ছিল নগণ্য। ব্যবসা ও শিল্পের বাইরে কৃষি উৎপাদন প্রায় ২০ গুণ বেশী ছিল। সাম্রাজ্যের অধিকাংশ মানুষই ছিল কৃষক এবং সমাজের অভিজাত শ্রেণীর সম্পদ আসত কৃষকের ফসলের উৎপাদনের অংশ এবং তার উপর ধার্য কর আদায় থেকে। শহরগুলাে ছিল শাসনের কেন্দ্র ও অভিজাত শ্রেণীর বিলাসের জায়গা, শিল্প উৎপাদন বা ব্যবসার স্থান নয়। সাম্রাজ্যে যে সব রাস্তা তৈরী করা হয়েছিল তা ছিল সামরিক অভিযানের জন্য, এর মাধ্যমে পণ্যদ্রব্যের আদান প্রদান ছিল ব্যয় বহুল। উদাহরণস্বরূপ নির্দিষ্ট ওজনের গম ৩০০ মাইল দূরে নিতে হলে তার দাম দ্বিগুণ হয়ে যেত। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে নাই। একমাত্র আলেকজান্দ্রিয়াতেই শিল্প বাণিজ্যের বিকাশ ঘটেছিল। তুলনায় এই সময় চীনে রাস্তা ও খালের মাধ্যমে দূরপাল্লার ব্যবসা বাণিজ্য বিকশিত হয়েছিল। রােমের শহরগুলি তার চারদিকের এলাকার উপর নির্ভরশীল থাকত কৃষিকাজের জন্য আর শহরে ছােট ছােট কারখানায় কারিগররা শিল্পদ্রব্য তৈরী করত। শহরের অভিজাত শ্রেণী ও বড় ভূমি মালিকেরা গ্রামের কৃষি, কৃষক,কৃষি শ্রমিক ও দাসদের উৎপন্ন ফসলের ভাগ ও কর বাড়ানর জন্য চাপ বাড়াতে থাকত। কিন্তু উৎপাদন বাড়াতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য বিনিয়ােগ করত না। ফসলের উৎপাদন বাড়ালে তা অভিজাত শ্রেণী নিয়ে যাবে, এজন্য দাস ও কৃষি শ্রমিকেরা নতুন প্রযুক্তি উৎপাদনে উৎসাহ পেত না- তাদের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য বিনিয়ােগের সুযােগও ছিল না। কাজেই প্রযুক্তি উন্নত হয়েছিল কম। নতুন প্রযুক্তি আসলেও তা কাজে লাগান হয় নি। পানি চালিত চাকার উল্লেখ দেখা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫ সালে কিন্তু তা প্রায় দুইশত বছর তেমন ব্যবহার হয়নি, কারণ দাসদের দিয়ে অথবা গাধা দিয়ে টানা ভূমি চাষ বড় ভূ-স্বামীদের কাছে সুবিধাজনক মনে হয়েছে।

প্রাচীন যুগে মোজাইক শিল্প

রাজ্যজয় অভিযান শেষ হতে থাকল ফলে নতুন দাসদের সংখ্যাও কমতে লাগল। এদিকে ক্রমবর্ধমান শােষণের ফলে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ছােট কৃষক ও ভূমি শ্রমিকদের বিদ্রোহও বাড়ল। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায়ই বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। অনেক জায়গায় কৃষকেরা অতিরিক্ত শােষণের কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে আশ্রয় নেয়। কৃষি উৎপাদন কমে যায়। এজন্য কৃষকদের জমি না ছাড়ার জন্য আইন করা হয়। এই যুগে সাম্রাজ্যের আভ্যন্তরীন গােলযােগের সুযােগ নিয়ে বাইরে থেকে আক্রমণ করতে শুরু করে বিভিন্ন শক্তি। জার্মানী থেকে গথ (Goth)রা ও ফ্রান্সে গল (Gaul)রা বিভিন্ন সময় আক্রমণ করে। ব্রিটেনসহ সাম্রাজ্যের সীমানার দিকের রাজ্যগুলি হাতছাড়া হয়ে যায়। আভ্যন্তরীন বিদ্রোহ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ মােকাবিলা করার জন্য সৈন্যসংখ্যা বাড়াতে হয়। এজন্য বাইরে থেকে ভাড়াটে সৈন্যেরও দরকার হয়। চতুর্থ খ্রিষ্টাব্দে সামরিক বাহিনীতে প্রায় ৬৫০,০০০ মানুষ ছিল।২৫ এই বিরাট সৈন্যবাহিনী পালন করার জন্য বিপুল সম্পদ লাগত যা আসত কৃষকদের ফসল ও কর থেকে। এতে কৃষকেরা আরও দরিদ্র হতে থাকে। শহরের ব্যবসায়ী ও কারিগররাও বাড়তে থাকা করের ফলে কর্মকান্ড কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়। আঞ্চলিক সেনাপতিরা বিদ্রোহ করতে শুরু করে এবং কেউ কেউ রােম দখল করার জন্য অভিযান চালায়। ক্রমেই স্পেন, উত্তর আফ্রিকা হাত ছাড়া হয়ে যায়। পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দে গথদের আক্রমণে রােম সাম্রাজ্য তার গৌরব হারায়।

তথ্য সূত্র:

  1. Harman C A. People’s History of the World. London, 2008 p 45. < Cage JD (Ed). Cambridge History of Africa Vol.2. Cambridge, 1979 p 398 . Diamond J. Guns, Germs and Steel, London. 1977 p 394 8. Kosambi DD. An Introduction to the study of Indian History. Bombay, 1966 p 66 Q. Thapar R. A. History of India. Harmondsworth, 1966 p 86 y Basham Al. A Cultural History of India. Oxford, 1975 p 44 9. Maspero H. China in Antiquity. Folkestone, 1978 p 45,70 b. https://history.howstuffsworks.com/asian-history/history-of-china.htm.accessed on 20h

March, 2010 a. Gernet J.A. History of Chinese Civilisation. Cambridge, 1982 p 67,72 so. Cho-Yun Hsu. Han Agriculture. Washington, 1980 p 4-6 ss. Harman C. p 56 5. Chou Yun Hsu. P 3 so. Harman C. p 57 38. Roberts JM. A Short History of the World. New York, 1993 p 82-88 se. Cameron R. A Concise Economic History of the World. New York, 1997 p 37 sy. Osborne R. Greece in the Making. London, 1966 p 140-141 39. Harman C. p 71 Sb. Harman C, p 72 S. Sallust. The Histories vol.1. Oxford, 1992 p 24 20. Jones AHM. The Roman Economy: Studies in Ancient Economic and Administrative History.

Oxford, 1974 p 122 3. Brunt PA. Social Conflicts in the Roman Republic. London, 1971 p 33 23. Brunt PA. Italian Manpower. 225 B.C.-AD 14. Oxford, 1971 p 9 10. Harman C. p 79 18. Jones AHM. p 36 se. Jones AHM. p 129

ধন্যবাদ

মুক্ত কর হে বন্ধ-প্রথম পর্ব (আদিম সমাজ ও শ্রেণী বিভাগের উৎপত্তি)

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *