মহাবিস্ফোরন তত্ত্ব!

ডারউইন এর বিবর্তনবাদ থেকে আমাদের  উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে প্রচুর রহস্য। হয়েছে অনেক কিছুর রুপান্তর। এ যেন বিরাট একটা গল্পের মত। একটা মোটামুটি উন্নত মস্তিষ্ক কিন্তু সব রহস্যের পেছনে সেই আদিকাল থেকেই ছুটে চলেছে। সময়ের সাথে সাথে আমরা অনবরত চলেছি কিন্তু সব রহস্য উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়েই। করছি আমরা আমাদের জীবন যাপন। সক্রেটিস এর সেই মহৎ উক্তি “নিজেকে জানো” ।  নিজেদের প্রতিই না রয়েছে কত রহস্যের। সময়কে অবলম্বন করে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। মানুষের মনই হল প্রশ্ন তৈরির বিরাট একটা কারখানা। সেখান থেকেই একটা প্রশ্ন কিন্তু বারবার চলেই আসে আমাদের মনে। আমাদের এই চিরসঙ্গি সময় ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল? আমাদের চারপাশের এই সুন্দর প্রকৃতির  আসলে কোথা থেকে উৎপত্তি হয়েছে? কিভাবে হয়েছে? এমন হাজারো প্রশ্ন। এরকম প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে সেই সময়কে আশ্রই করে যেতে হবে আমাদের পিছনের দিকে। অনেক পিছনে। যেতে হবে এই সময়  উৎপত্তির ও আগে। যখন সময় বলে কিছুই ছিলনা। এই সুন্দর মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে হলে চিন্তা করতে হবে সেই একদম শুরুর  এক সেকেন্ড সময় এর কয়েক হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ সময় কে নিয়েও। হ্যা, এক বিরাট মহাবিস্ফোরন থেকেই উৎপত্তি হয়েছে এই মহাবিশ্বের। যাকে আমরা বিগব্যাং ও বলে থাকি।  বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে প্রথম যে প্রশ্নটা মাথাই আসে সেটা হল “ কিভাবে সৃষ্টি হয়ছে আমাদের মহাবিশ্বের ? কেন হয়েছে সৃষ্টি এই মহাবিশ্বের ?” শুধু বিজ্ঞান নয়, ধর্ম, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, দর্শন , বিবর্তনবাদ সব ক্ষেত্রেই সব চাইতে বেশি রহস্যমন্ডিত প্রশ্নই হল এটা। হবেই বা না কেন, আপনার শরীর এ বহমান প্রতিটা রক্তকনিকা ই যে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে এই বিগব্যাং কে। কারন আপনি এই বিরাট মহাবিস্ফোরন থেকেই সৃষ্ট।

বিগব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের কসমোলোজিকাল মডেল হিসেবে প্রতীয়মান। এই মডেলে উচ্চ ঘনত্ব এবং উচ্চ তাপমাত্রায় মহাবিশ্বের প্রসারনতা, মহাবিশ্বের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে। বিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে যদি আমরা বিশাল পরিধিতে ব্যাখ্যা করতে যায় তাহলে দেখতে পারব যে বিগব্যাং কথাটির সাথে সিংগুলারিটি শব্দটা জড়িত। সিংগুলারিটি থেকেই যে আমাদের এই  মহাবিশ্বের উৎপত্তি তা আমাদের বর্তমান জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা এখনো সম্ভব না। আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর । অর্থাৎ ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগেই ঘটেছিল বিরাট এই মহাবিস্ফোরন।

জর্জ লেমাটাইয়ার ১৯২৭ সালে উল্লেখ করেন যে, অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পারিযে একটা সিংগেল পয়েন্ট থেকে উৎপত্তি  আমাদের এই মহাবিশ্বের। এই তত্তের উপর নির্ভর করেই বিজ্ঞানীরা কসমিক প্রসারনের ব্যাখ্যা করেছেন। ১৯২৯ সালে এডুইন হাবল তার গ্যালাকটিক রেডশিফট বিশ্লেষন এর সময় পর্যবেক্ষন করেন গ্যালাক্সি গুলা ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। ১৯৬৪ সালে CMBR(Cosmic Microwave Background Radiation) আবিস্কৃত হয়। যা বিগব্যাং মডেলের সত্যতা প্রমান করে। সম্প্রতি সুপারনোভা গুলার রেডশিফট পরীক্ষাগুলা করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে যে , একটা হারে মহাবিশ্ব প্রসারিতে হচ্ছে। যে গ্যালাক্সির দুরত্ব বেশি সেটা আরো বেশি তাড়াতাড়ি দূরে সরে যাচ্ছে। আর এই পর্যবেক্ষনই ডার্ক এনার্জির উপস্থিতি প্রমান করেছে। এই পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোই উচ্চতর ঘনত্ব এবং উচ্চতর তাপমাত্রার মহাবিস্ফোরন কে ব্যাখা করতে পারে।

Figure: Accelerated Expansion of Universe

Figure: Accelerated Expansion of Universe

বিজ্ঞানীরা অবশ্যই বিগ ব্যাং এর সেই চরম সত্য ঘটনা গুলো এখনো পরিষ্কারভাবে আবিষ্কার করতে পারেননি কিন্তু বিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিপথ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রচেষ্টা একটা মোটামুটি মস্তিষ্ক সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে অনুসন্ধান করে যাচ্ছি  আমরা। হ্যা, শূন্য থেকেই এই মহাবিশ্বের উৎপত্তি। সময় বলে এক সময় কিছুই ছিল না।

আগেই বলা হয়েছে যে ,বিগ ব্যাং  তত্ত হল আমাদের এই বিরাট মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে আলোচিত একটা মডেল । আদি অবস্থায় পুরো মহাবিশ্ব “একটা কিছু” অসীম ঘনত্বের এবং অসীম তাপমাত্রার একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভুত ছিল। হ্যা একটা কিছু কে আমরা নোট করেই রাখলাম। উওর খুজতে হবে বিজ্ঞানপ্রেমীদের এই একটা কিছুর ই আসলে। যাই হোক আমরা জানি অসীম তাপমাত্রায় কোন কিছুই ভর হিসেবে থাকতে পারেনা। তা থাকে শক্তি হিসেবে। মহাবিশ্বের বয়স যখন এক সেকেণ্ডের কয়েক হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ ,তখন বস্তুকণা এবং প্রতিবস্তুকনার জোড়া উৎপন্ন হতে শুরু করে। মানে ম্যাটার কোয়ার্ক এবং এন্টিম্যাটার কোয়ার্ক । কোয়ার্ক হল মৌলিক কণিকা যারা প্রোটন ও নিউট্রন উৎপন্ন করতে পারে।

শক্তি থেকে ইলেক্ট্রন পজিট্রন এর উৎপত্তি হয়ে থাকে। মূলত তাদের জোড়া তৈরি হয়। কিন্তু ইলেক্ট্রন পজিট্রন পরস্পরকে ধ্বংস করতে পারে। প্রতিকণা হল কনার বিপরীত চার্জবিশিষ্ট কনা । এদের ভর একই কিন্তু বিপরীত চার্জধর্মী। তারা একসাথে জড় হলে সংঘর্ষ বাধিয়ে  ধ্বংস করে দেয় নিজেদেরকে আর তৈরি করে শক্তি। তাহলে কনা এবং প্রতিকনা থেকে শক্তির সৃষ্টি হয়।আবার শক্তি থেকেই কনা প্রতিকনা ।

মহাবিস্ফোরন এর সময় শক্তির বিকিরন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তখন কনা প্রতিকনার উৎপত্তি হচ্ছিল আর আবার তারা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। সবকিছু  বিরাজমান ছিল কিন্তু শক্তি হিসেবে। আর শক্তি দেখা যায় না । তাহলে মহাবিশ্বে যা কিছু ভর রূপে প্রতীয়মান সেগুলা এল আসলে কোথা থেকে? আরেকটা প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায় যে বস্তু জগতে যা কিছু সৃষ্টি তা যদি কনা থেকে সৃষ্টি হয় তবে প্রতিকনা গুলা কোথায় গেল ? প্রতিকনাদের নিয়ে তৈরি কি তাহলে আলাদা জগত রয়েছে?  এর উওর কিন্তু একটু অন্য ভাবে চিন্তা করা যায়। আসলে যদি প্রতিকনা জগত থাকত তাহলে ঠিক আপনার মত আর একটা আপনি ও থাকতেন প্রতিকনার জগতে। দুই জনের যদি কখনো দেখা সাক্ষাত হত তাহলে কিন্তু দুইজন ই ধ্বংস হয়ে যেতেন এবং শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে যেতেন। তা কিন্তু বাস্তবে হচ্ছেনা। আপনি কিন্তু কখনো আপনার মত অবিকল একজনকে দেখবেন আপনার সামনে তা কিন্তু আপনি চিন্তা ও করতে পারেন না। তাহলে প্রতিকনা গুলা কোথাই গেল ? আবার প্রশ্ন এসে গেছে ।আসলে বিংব্যাং এমন একটা মডেল যেটা ব্যাখা করতে গেলে আপনাকে এত এত প্রশ্ন গুলার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে যে আপনি আপনার আঙ্গুল দিয়ে গননা করে রাখতে পারবেন না। যাই হোক কনা প্রতিকনাদের সৃষ্টি বা বিনাশ ঘটছিল অর্থাৎ যা থেকে কনা প্রতিকনা দের সৃষ্টি হল সেখানেই তারা  ফিরে যাচ্ছিল।মানে একটা সিমেট্রিক বা প্রতিসম ঘটনা ঘটছিল। কিন্তু সাথে সাথে অ্যাসিমেট্রিক বা অপ্রতিসম ঘটনা ও কিছু ঘটছিল সেখানে কীভাবে যেন। প্রায় তিন কোটি জোড়া কোয়ার্ক এন্টিকোয়ার্ক সৃষ্টি  ও বিনাশের ফলে একটি করে কনা কোয়ার্ক “কীভাবে যেন “ থেকেই যাচ্ছিল। আর এমন ভাবে আস্তে আস্তে থেকে যাওয়া কনাগুলা অর্থাৎ কনা কোয়ার্কগুলো আদি মহাবিশ্বের একমাত্র জিনিস টিকে রয়েছে এখনও।তৈরি করেছে মহাবিশ্বের যাবতীয়  বস্তু। আমি, আপনি, আমাদের চারপাশে বিদ্যমান সকল আশ্চর্য বস্তু গুলো ,সমস্তকিছুই এই কনা কোয়ার্ক থেকে তৈরি।

যে বাড়তি কোয়ার্কগুলো থেকে যাচ্ছিল তারা আরো সংঘবদ্ধ হয়ে প্রথমবারের মত প্রোটন ও নিউট্রন এর মত ভারী কনা তৈরি করে ।মহাবিশ্বের বয়স যখন ঠিক দুই মিনিট তখন প্রোটন ও নিউট্রন মিলে তৈরি হয় ডিউটেরিয়াম । এক সেকেন্ড থেকে তিন মিনিট বয়স অবদি ডিউটেরিয়াম , প্রোটন ও নিউট্রন মিলে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি হতে থাকে। তারা বা নক্ষত্রগুলো তে হিলিয়াম তৈরি হয় বলে সেগুলাকে আমরা জলজল করে জলতে দেখি সূদুর আকাশে।

Figure: Evolution of the Universe

Figure: Evolution of the Universe

তারপর হয়ত কয়েক হাজার বছর পরে নিউক্লিয়াস তৈরি হবার পরে ইলেক্ট্রন এসে যুক্ত হয়ে চার্জ নিরপেক্ষ পরমানু গঠন করে। যা সবকিছুরই মুল উপাদান। আর দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে ভরের। আর ভরের কারনেই দৃশ্যমান এই মহাবিশ্ব।ভর সৃষ্টির পর  উৎপত্তি হয়েছে নানা বৈজ্ঞানিক তত্তের।  এর মধ্যে  জন্ম নিয়েছেন নিউটন ,আইনস্টাইন ,স্টিফেন হকিং এর মত বিজ্ঞানিগন। দিয়েছেন তাদের বিভিন্ন সূত্র এই ভর কে কেন্দ্র করেই। রহস্য কিন্তু তবুও থেকেই গেছে, সেই “একটা কিছু” খোজের পিছনে পড়ে রয়েছে সকল জ্যোতিপদার্থ বিজ্ঞানীগন। শেষ হয়নি ভরের উৎস খোজার প্রচেষ্টা। মহাবিস্ফোরন তত্তের গবেষনা চলছে এখনো। কনা কোয়ার্ক থেকে তৈরি হয়েছিল ভরের। কিন্তু এর আসল উৎস কোথায় তাহলে?

১৯৬৪ সালে ব্রিটিশ তাত্তিক পদার্থবিজ্ঞানবিদ  পিটার হিগস প্রবর্তন করলেন ভরের উৎস সন্ধানে নতুন ধারনা। সাথে ছিলেন রবার্ট ব্রট এবং ফ্রাংকায়িস এংলার্ট এর মত বিখ্যাত বিজ্ঞানীগন। তারা হিগস বোসন কনা নামে একটা কনার কথা বললেন। বললেন যে, ভর সৃষ্টির জন্য দায়ী কনাটি হল হিগস বোসন। ঈশ্বর কনা বলতে আমরা যে কনাটি সম্পর্কে জানি সেটা এই হিগস বোসন। এই কনাটি  খুজে পাওয়া কষ্টের ব্যাপার তার জন্য হয়ত এটাকে নাম দেওয়া হয়েছিল ঈশ্বরকনা হিসেবে। মহাবিশ্বের মহাবিস্ফোরন এর অনেক কিছুই পরিষ্কার করবে  এই কনাটি । কিন্তু কিভাবে? ,মহাবিস্ফোরন এর সময় যখন মহাবিশ্ব খুব তাড়াতাড়ি সম্প্রসারিত হয়ে যাচ্ছিল তখন একসাথে  এটা  ঠান্ডা ও হয়ে যাচ্ছিল।  তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট মানের নিচে আসলে একটা অদৃশ্য সর্বত্র পরিব্যপ্ত ফিল্ডের উৎপত্তি হয়, যার নাম দেওয়া হয় হিগস ফিল্ড। আর এই কনাটির সাথে যুক্ত কনাটির নাম হল হিগস বোসন। যেসব কনা মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে হিগস বোসন এর সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছিল তারা হল ইলেকট্রন ,প্রোটন এবং নিউট্রন। আর যারা যুক্ত হয় নি তারা হল ফোটন। ২০১২ সালে পিটার হিগস এর হিগস বোসন কনা সত্যি পাওয়া গেল পরীক্ষাগারে। ২০১৩ সালে এই কাজের জন্য পিটার হিগস কে দেওয়া হয় নোবেল পুরস্কার। ঈশ্বর কনার খোজ না হয় পাওয়া গেল ঠিক ই কিন্তু সব রহস্যের সমাধান কিন্তু আসে নি এখনও।

মহাবিশ্বের মহাবিস্ফোরন এর সময় ঘটে যাওয়া বিষয় নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন। অনেক রহস্যের গোড়াপত্তন এখনও হয় ই নি। ঠিক জিনের মধ্যে জিনের মধ্যে জিনের প্রকৃতি বিশ্লেষন করার মত। এই মহাবিস্ফোরন থেকে উদ্ভুত হাজার রকমের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হয়ত আপনাকে কখনো আশ্রয় নিতে হবে অধিবিদ্যার।  কি দরকার ছিল এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির ? কি দরকার ছিল এই দৃশ্যমান চোখ জুড়ানো প্রকৃতির? কেউ হয়ত এগুলার উওর  দিতে  আশ্রয় নেবেন প্রকৃতির। কারন ব্যাপারটা যে আসলেই অনেক রহস্যের। হয়ত প্রকৃতির নিয়মে নিজেকে দৃশ্যমান করার জন্য প্রকৃতি সৃষ্টি করেছে সব সৌন্দর্য। হয়ত এই জন্য ঘটেছিল ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগের মহাবিস্ফোরন।

 

তথ্যসূত্রঃ

1 en.wikipedia.org

www.nasa.gov

www.space.com

ধন্যবাদ

রাতুল কুমার ঘোষ

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *