মানুষের ইতিহাস, আজকের পর্ব – হোমো ইরেক্টাস

হাজার বছর আগের আমাদের পূর্ব পুরুষেরা কেমন ছিল তা জানার আগ্রহ সবারই থাকে, বিবর্তনের পথ ধরে সেই সব পূর্ব পুরুষদের আমরা হয়তো পুরোপুরি জানতে পারবো না কিন্ত তাদের সম্পর্কে বিজ্ঞানের বদৌলতে অনেক কিছুই আমরা আবিষ্কার করতে পারি , যেমন ধরুন না হোমো ইরেক্টাসদের কথা, প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগের আমাদের অনেক পূর্বপুরুষের মধ্যে একটি প্রজাতি ছিলেন তারা, আমাদের আজকের মস্তিষ্কের এবং শরীরের গঠন এবং আয়তন অনেকটাই আমরা পেয়েছি এই হোমো ইরেক্টাসদের কাছ থেকে।

হোমো ইরেক্টাস (ইংরেজি ভাষায়: Homo erectus, লাতিন ভাষায় যার অর্থ: “উন্নত মানব”) হোমো প্রজাতির একটি বিলুপ্ত প্রজাতি যা আর্কায়িক হোমো স্যাপিয়েন্স-এর পূর্বপুরুষ যে আর্কায়িকরা আবার আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষ। খুব সম্ভবত আফ্রিকাতেই হোমো ইরেক্টাসদের বিবর্তন লাভ করেছিল, আনুমানিক ১৭ লক্ষ বছর পূর্বে এই প্রজাতির সদস্যরা আফ্রিকা , ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে ইরেক্টাসদের ফসিল পাওয়া গেছে। কিছু স্থানে আবার সরাসরি জীবাশ্ম পাওয়া না গেলেও তাদের ব্যবহার্য বিভিন্ন সামগ্রী যেমন, পশুর ভাঙা হাড় এবং পাথরের উপকরণ পাওয়া গেছে।

হোমো ইরেক্টাসের প্রথম ফসিল পাওয়া যায় ১৮৯১ ও ১৮৯২ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে ফরাসি বংশোদ্ভূত ওলন্দাজ সামরিক চিকিৎসক “ওজেন দুবোয়া ” কর্তৃক। দুবোয়া আসলে মানুষের পূর্বপুরুষদের জীবাশ্ম আবিষ্কারের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই ইন্দোনেশিয়া গিয়েছিলেন। তার প্রথম আবিষ্কৃত জীবাশ্ম ছিল একটি খুলির ঊর্ধ্বাংশ (স্কাল-ক্যাপ), যা সোলো নদীর তীরে অবস্থিত ত্রিনিল নামক স্থানে পাওয়া যায়। এ কারণে জীবাশ্মটির নাম Trinil 2। এর কয়েক বছর পর একই জায়গা থেকে একটি ফিমার খুঁজে পান। খুলি ও ফিমার থেকে প্রমাণিত হয় যে, তারা দুই পায়ে হাঁটত। তবে প্রথমদিকে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন নি এরা মানুষ কি-না, তাই নাম দিয়েছিলেন Pithecanthropus erectus

আমাদের এই দাদার দাদার দাদার দাদার অনেক আগের দাদুরা কিন্তু কথা বলার জন্য আজকের মত ভাষা মোটেই জানতেন না, কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথা তো বলতে হবে, তাই তারা একধরনের সাংকেতিক ভাষার আদান প্রদান শিখেছিলেন, যাকে বলে প্রোটো ল্যাংগুয়েজ, আবশ্য ২ মিলিয়ন বছর আগের হোমো ইরেক্টাসরা আগুনকে সেইভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি যেভাবে হোমো সেপিয়ান্স বা নিয়ান্ডারথালেরা ৬০ হাজার বছর আগে করতে পেরেছিলেন,ভাষার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে মানুষের ভাষার ব্যাবহারের জন্য যে সব জিনের দরকার হয় যেমন মর্ডান হোমোস্যাপিয়েন্সদের ক্ষেত্রে সেই জিনের নাম FOXP2 জিন, এই জিন আমাদের ভাষার ব্যাবহার এবং ভাষার উন্নয়নের জন্য দরকার হয়, সেটা হোমো ইরেক্টাসদের ছিল না ফলে তারা শুধুই সংকেত ব্যাবহার করতে জানতো বলে বৈজ্ঞানিকেরা ধারনা করেন।

হোমো ইরেক্টাসরাই মূলত সবচাইতে প্রাচীন প্রজাতির একটি যাদের আধুনিক মানুষের সাথে অনেক মিল ছিল,যেমন সোজা হয়ে হাটার সক্ষমতা , (bipedality)তার মধ্যে অন্যতম, হোমো ইরেক্টাসদের বেশিরভাগ ছিল যাযাবরের প্রকৃতির, প্রথম আফ্রিকা ছেড়ে ইউরো-এশিয়ার যাত্রা করে এই প্রজাতি , হাতিয়ার ব্যাবহার করতে জানতো এবং ইতিহাসে প্রথম বারের মত এরাই পাথর দিয়ে সুচারু হাতিয়ার তৈরি করে বলে বৈজ্ঞানিকেরা দাবি করেন, আজ থেকে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন বছর আগের ফসিল রেকর্ড যাচাই-বাছাই এর পরে দেখা গেছে হাতল সহ পাথরের কুঠারের প্রমান পাওয়া যায়।

হোমো ইরেক্টাসেরা আসলেই বৈচিত্র্যময় ছিল, এরা শুধু যাযাবর ছিল না নিয়মিত স্থায়ী ভাবে বসবাসও করতো এদের মধ্যে অনেকেই , এর কারন এদের প্রজাতিটি অনেকটাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পৃথিবীব্যাপী, যা কিনা কেনিয়ার লেক টুরকানা বেসিনের পাওয়া ২ মিলিয়ন বছর আগের ফসিলে মধ্যমে জানা যায়, প্লাইস্টোসিনের যুগের শেষে পর্যন্ত হোমো ইরেক্টাসের জনসংখ্যা অব্যাহত ছিল।

ইন্দোনেশিয়ার জাভায় এবং চায়নাতে এদের ফসিলের যথাক্রমে নাম করা হয় জাভা ম্যান এবং পিকিং ম্যান নামে, সম্প্রতি হোমিনিন গোত্রের ইরেক্টাসদের থাকার আরো কিছু প্রমান মিলেছে চায়নাতে, এসব ফসিলের বয়স আনুমানিক ২.১ মিলিয়ন বছর, যারা কিনা এশিয়ায় প্রায় ৪ মিলিয়ন বছর ধরে বসবাস করতো৷

আগেই বলেছি হোমো ইরেক্টাসরা দেখতে কেমন ছিল,তারাই প্রথম প্রজাতি যারা দেখতে আমাদের কাছাকাছি ছিল, লম্বা, এবং তাদের মগজ ও বড় ছিল, তাদের আগের হোমিনিন প্রজাতি এস্ট্রালোপিথেকাস বা হোমো হ্যাবিলিসদের চাইতে, লম্বা পা তাদেরকে দাঁড়িয়ে হাটতে সাহায্য করেছিল, তাদের চেহেরা আমাদের চাইতেও চাপা ছিল।

হোমো ইরেক্টাসদের আরেকটি গুন ছিল এরা ছিল স্কাভেঞ্জার (scavenger) মানে অন্য প্রানী শিকার করে ফেলে গেলে তারা সেই প্রানীর অবশিষ্ট

হাড়, গোড় থেকে Bone Marrow বের করে খাওয়া শিখেছিল, যেহেতু এরা পাথরের হাতিয়ার বানাতে জানতো, সেই পাথরের সরু হাতিয়ার ব্যাবহার করে এরা অন্য প্রানীর ফেলে যাওয়া অংশ খেতে জানতো, যেমন আজকের দিনের হায়েনারা করে। যদিও তারা মূলত মাংসাশী ছিল না তৃনভোজী ছিল তা নিয়ে অনেক হাইপোথিসিস আছে,

ইরেক্টাসরা বুদ্ধিমান ছিল তাদের আগের হোমিনিনদের থেকে, আগুন জ্বালানো, পাথর থেকে হাতিয়ার তৈরি এবং দলবন্ধভাবে শিকার তাদের কে আলাদা ভাবে বুদ্ধিমান করেছিল তাদের পূর্ববর্তী প্রজাতির থেকে।

কিন্তু ভাষার ব্যাবহারে তারা খুব সীমিত ছিল, হোমো ইরেক্টাসরা বিলুপ্ত হয়ে যায় আধুনিক হোমো সেপিয়ান্সরা আসার পর,তবে কোন কোন জীব বিজ্ঞানের গবেষকদের মতে আজ থেকে প্রায়

৬০০০০ হাজার বছর আগেও ইরেক্টাসরা, হোমো সেপিয়ান্সদের সাথেই ছিল নিয়ান্ডারথালদের মত, অথাৎ অনেকগুলো হোমিনিন প্রজাতি আজ থেকে ৫০০০০ বছর আগে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়িয়েছে একি সময়ে, এদের থেকে কেউ টিকে যায় এবং নতুন ভাবে বিবর্তিত হয়ে আর কেউ বিলুপ্ত হয়ে যায় পুরোপুরি ।

তথ্যসূত্রঃ

1- https://www.nature.com/scitable/knowledge/library/homo-erectus-a-bigger-smarter-97879043/

2 – https://en.m.wikipedia.org/wiki/Control_of_fire_by_early_humans

3- https://www.google.com/amp/s/amp.theguardian.com/science/2018/feb/20/homo-erectus-may-have-been-a-sailor-and-able-to-speak

4- https://www.newscientist.com/article/mg21829124-200-stone-tools-helped-shape-human-hands/

5 -https://phys.org/news/2019-01-snapshot-mysterious-ancestor-homo-erectus.html

ধন্যবাদ

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *