মুক্ত কর হে বন্ধ- অষ্টম অধ্যায় (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর)

Leadership, innovation and the Versailles Peace Treaty in 1919

যুদ্ধের পর গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তিটি হয় প্যারিস এর শহরতলী ভার্সাই-এ। এই চুক্তির ফলে ফ্রান্স Alsace-Lorraine অঞ্চল ফেরত পেল, এবং জার্মানীর কয়লা সমৃদ্ধ Saar অঞ্চল ১৫ বৎসর দখলে রাখার অধিকার পেল। নতুন সৃষ্ট রাষ্ট্র পােল্যান্ডকে পশ্চিম প্রশিয়া ও সাইলেশিয়ার এক অংশ দেওয়া হল। আরও কিছু ক্ষুদ্র অংশ জার্মানীর হাত ছাড়া হল। এতে জার্মানী তার যুদ্ধপূর্ব এলাকার প্রায় ১৩% হারাল ও জনসংখ্যা কমল ১০% । খনিজ সম্পদের মধ্যে লৌহ আকরের তিন চতুর্থাংশ, কয়লার এক চতুর্থাংশ, প্রায় সম্পূর্ণ দস্তা এবং প্রায় ১৫ শতাংশ চাষযােগ্য জমি জার্মানী হারাল। যুদ্ধকালেই আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জার্মানীর যেসব উপনিবেশ ছিল তা মিত্রশক্তির সদস্য রাষ্ট্রগুলি (জাপান সহ) দখল করে নিয়েছিল। শান্তিচুক্তি এগুলােকে অনুমােদন দিল। এছাড়াও জার্মানীকে তার নৌবাহিনী ছেড়ে দিতে হল মিত্রশক্তির হাতে। আরও ছেড়ে দিতে হলাে তার অসামরিক নৌবহরের প্রায় সবটাই, ৫০০০ রেল ইঞ্জিন, দেড় লক্ষ রেল বগি, ৫০০০ ট্রাক এবং বিপুল পরিমাণ গােলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র। মিত্রশক্তিকে রাইনল্যান্ড পনের বছর দখল করে রাখতে দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হল জার্মানীকে। জার্মানীকে তার সৈন্যবাহিনীকেও সীমিত করে রাখার অঙ্গীকার করতে হল। জার্মানীর জন্য সবচাইতে অবমাননাকর ছিল চুক্তির একটি অংশ যেখানে জার্মানী ও তার মিত্রদের যুদ্ধের সমস্ত ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী করা হলাে। মিত্রশক্তি জার্মানীর কাছ থেকে যুদ্ধের জন্য যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবী করেছিল, তার যৌক্তিকতা দেখানর জন্য এই অনুচ্ছেদের দরকার ছিল।

কিন্তু ক্ষতিপূরণের প্রকৃতি ও পরিমাণ সম্বন্ধে মিত্রশক্তির দেশগুলির মধ্যে বড় মতপার্থক্য ছিল। এই কারণে মিত্রশক্তির দেশগুলি চুক্তি সই করার সময়ে এ ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌছাতে পারে নাই। এজন্য একটা কমিশন (Reparation Commission)গঠন করে দেওয়া হয় এবং ১লা মে ১৯২১ এর মধ্যে সুপারিশ দিতে বলা হয়। এতে জন মেইনার্ড কেইনস (John Maynard Keynes) যিনি বৃটিশ সরকারের প্রতিনিধিদের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন তিনি পদত্যাগ করেন। তারপর তিনি একটি বিখ্যাত বই লিখেন “The Economic Consequence of Peace”। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এর শর্তগুলি বদলানাে না হলে তা ইউরােপের জন্য আবার বিপর্যয় নিয়ে আসবে বলেন তিনি। পরবর্তী বছরগুলিতে তার ভবিষ্যৎ বাণী অনেকার্থে সঠিক প্রমাণিত হয়।

যুদ্ধের শেষে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়ান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায়। অয়া ও হাঙ্গেরী নামে দুটো নতুন দেশের সৃষ্টি হয়। এ দুটো এলাকা ছিল আগে এই নামে সাম্রাজ্যের ভিতরে অবস্থিত অংশের অনেক ছােট। চেকোশ্লোভাকিয়া এই সাম্রাজ্যের প্রদেশ নিয়ে তৈরী করা হয়। পােল্যান্ড সৃষ্টি করা হয় জার্মানী, অষ্ট্ৰীয়া ও রাশিয়ার কিছু কিছু অংশ নিয়ে। সার্বিয়া অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের কিছু অংশ ও মন্টেনিগ্রো সমন্বয়ে যুগােস্লাভিয়া নামে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করল। ইতালী অস্থয়ার কয়েকটি প্রদেশ পেল। অটোমান সাম্রাজ্য ইউরােপে ইস্তাম্বুলের আশেপাশের কিছু জায়গা ছাড়া তার সমস্ত এলাকা হারাল।।

যুদ্ধের আগে অস্ট্রো-হাঙ্গেরী সাম্রাজ্যের একটা সুবিধা ছিল। এই সাম্রাজ্যের ভিতরে বাণিজ্য ছিল অবাধ। এই সাম্রাজ্য ভেঙ্গে কয়েকটা দেশের সৃষ্টি হওয়ায় এই দেশগুলাের মধ্যে পণ্য আদান প্রদানে শুল্ক আরােপ করা হল। অবিশ্বাস এই পর্যায়ে পৌছেছিল যে যুদ্ধের অব্যবহিত পরে ট্রেন ও মালগাড়ী এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে দিচ্ছিল না- বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া প্রত্যেকটা দেশই যতটা সম্ভব স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছিল। দেশগুলাে ছােট ছােট হওয়াতে এই চেষ্টা তাদের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন কঠিন করে তুলল।

নিজ নিজ জাতির অর্থনীতিকে প্রতিযােগিতা থেকে রক্ষা করে উৎপাদন বাড়ানাের চেষ্টায় শুধু নতুন নতুন রাষ্ট্রগুলােই যুদ্ধের পর ব্যবস্থা নিয়েছিল তাই নয়, আগের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রগুলােও সংরক্ষণমূলক অর্থনীতি চালু করে। রাশিয়ায় বিপ্লবের পরে তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই দেশে রাষ্ট্রই হয় অন্যান্য দেশের পণ্যের ক্রেতা। রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে দেশের জন্য কি পণ্য কেনা উচিত। অন্যান্য অনেক দেশ যারা যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর অনেকটা নির্ভর করত, তারাও বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ আরােপ করল। এর মধ্যে ছিল আমদানী পণ্যের উপর শুল্ক আরােপ, আমদানী পণ্যের পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া এবং কোন কোন পণ্যের আমদানী পুরাপুরি বন্ধ করে দেওয়া। অন্যদিকে রপ্তানী বৃদ্ধির জন্য

রপ্তানী যােগ্য পণ্যে ভর্তুকী দেয়া হতে লাগল। গ্রেট বৃটেন ছিল যুদ্ধের আগে অবাধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় সমর্থক। যুদ্ধের সময় রাজস্ব বাড়ানাে প্রয়ােজন ও অন্যান্য কারণে বিদেশী পণ্যের বাণিজ্যের উপর গ্রেট বৃটেন কর আরােপ করেছিল। যুদ্ধের পর কর তাে থাকলােই, অনেক ক্ষেত্রে তা বাড়ান হল। এটা প্রথম বৎসর গুলিতে সাময়িক বলা হলেও ১৯৩২ সালের পর তা স্থায়ী সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতি হয়।

The Fordney-McCumber Tariff Act

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের আগেও আমদানীর উপর তুলনামূলকভাবে উচ্চ শুল্ক ছিল। যুদ্ধের পর তা এতটা বাড়ানাে হল যা অতীতে কোন সময়ই ছিল না। ১৯২১ সালে নতুন আইন করে জার্মানীতে তৈরী dyestaff (রাসায়নিক রং) আমদানী বন্ধ করা হল। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের আগে কোন dyestaff তৈরী হত না। যুদ্ধের পর জার্মানীর রং এর patent এর বা সত্ত্বাধিকার ছিনিয়ে নিয়ে dyestaff তৈরী শুরু করা হয়। আর এই বাজার প্রতিযােগিতামুক্ত রাখতে আমদানী বন্ধ করা হয়। ১৯২২ সালে একটি শুল্ক আইন (The Fordney-McCumber Tariff Act) আমদানী করা পণ্যের উপর গড়ে প্রায় ৩৮.৫ শতাংশ বাড়িয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার কৃষিপণ্য ও অন্যন্য পণ্যের বাজার ও মূল্য নিশ্চিত করা। পাঁচ বৎসরের মধ্যে ফ্রান্স মটরগাড়ীর উপর শুল্ক বাড়াল। জার্মানী ও ইতালি আমেরিকার গমের উপর শুল্ক বাড়াল। ১৯৩০ সালে আবার শুল্ক বাড়ান হল (The Smoot Hawly Tariff Act)। পৃথিবীর অর্থনীতিতে যখন মন্দা শুরু হচ্ছিল, তখন আমেরিকা তার নাগরিকদের চাকুরী ও কৃষকদের খাদ্য রক্ষা করার জন্য এই আইন করে। এই আইনে সই না করার জন্য এক হাজার এর বেশি অর্থনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট হুভার এর কাছে আবেদন করে। অল্প দিনের মধ্যেই অন্যান্য দেশ পাল্টা শুল্ক বৃদ্ধি করে। ১৯৩০ সালের মে মাসে আমেরিকার সঙ্গে সবচাইতে বেশী পণ্য আদান প্রদান কারী দেশ কানাডা প্রায় ১৬টি জিনিষের উপর শুল্ক বাড়ায়। ফ্রান্স ও বৃটেনও প্রতিবাদে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ায়। আমেরিকার রপ্তানী ১৯২৯ সালে ৫.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৯৩৩ সালে ২.১ বিলিয়ন ডলার হয় (৬১% কম)। আমদানী ১৯২৯ সালে ৪.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৯৩৩ সালে ১.৫ বিলিয়ন ডলার হয় (৬৬% কম)। ম্যাডসেন ১৭টি দেশের বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩২ পর্যন্ত সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ৩৩% কমে যায়। বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের দুই দশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দুইগুণ বেড়ে ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী দুই দশকের বেশীর ভাগ সময়েই এর পরিমাণ বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিমাণের চেয়ে কম ছিল। বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যে এই সংরক্ষণ নীতির ফলে দেশগুলিতে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে ও মানুষের আয় বাড়বে-এটাই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবে এর বিপরীত ফল হল।

আর্থিক ও মুদ্রা ব্যবস্থার যে গােলযােগ যুদ্ধের ফলে দেখা দিল, এবং যে সমস্যা শান্তি চুক্তির ফলে আরও তীব্র হল-তাতে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ল। এর একটা অন্যতম কারণ ছিল যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বা reparation। ক্ষতিপূরণের সঙ্গে জড়িত ছিল মিত্রশক্তির একটি দেশের সঙ্গে অপরটির আরােপিত দেনা এবং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা। আমেরিকার সরকার এই উপাদানগুলির মধ্যে সম্পর্ক আছে, তা মানতে রাজী ছিল না। এতে বিপর্যয় বাড়ে।।

১৯১৭ সাল পর্যন্ত মিত্রশক্তির যুদ্ধের খরচের বড় অংশটাই দেয় বৃটেন। ঐ সময় পর্যন্ত বৃটেন তার মিত্রদের প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। বৃটেনের টাকা দেওয়ার ক্ষমতা এই সময় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে। যুদ্ধে যােগ দেওয়ার পর আমেরিকা টাকা ধার দেওয়ার দায়িত্ব নেয়। বৃটেন ধার দিয়েছিল সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার, যা বৃটেনের আমেরিকার কাছে ধার নেওয়া টাকার দ্বিগুণ। ফ্রান্স ধার দিয়েছিল আড়াই বিলিয়ন ডলার আর নিয়েছিল প্রায় সমপরিমাণ টাকা। ইউরােপে মিত্রশক্তির একটি দেশ অপর দেশকে যে টাকা ধার দিয়েছিল তাদের ধারণা ছিল যুদ্ধশেষ হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। আমেরিকার কাছ থেকে নেওয়া ধারও বাতিল হবে-এটা তারা মনে করেছিল। এটা মনে করার আরও কারণ হল আমেরিকা অনেক পরে যুদ্ধে যােগ দেওয়ায় তাদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়েছিল। ইউরােপীয় দেশগুলির তুলনায় তাদের মানুষ ও অন্যান্য সম্পদ ও অনেক কম দিতে হয়েছিল। কিন্তু আমেরিকা এই টাকা ঋণ বলেই গণ্য করল যদিও যুদ্ধের পরে তারা সুদের হার কমাল ও পরিশােধের সময় বাড়িয়েছিল। কিন্তু ঋণের টাকা পুরােটাই শােধ দিতে হবে বলে তারা বলল।

যুদ্ধের পর ক্ষতিপূরণ (reparation) এর সঙ্গে ঋণের সম্পর্ক প্রকাশ পেল। ফ্রান্স ও বৃটেন দাবী করল জামানী তাদের যে ক্ষতিপূরণ দিবে তা শুধু বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির জন্যই নয় (reparation proper), এর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য যত খরচ হয়েছে তাও দিতে হবে (indemnity)। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উইলসন জার্মানীর কাছে এই দাবী করেন নি- এবং অন্যদেরও এতটা দাবী না করার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু তিনি আমেরিকার ঋণ ফেরৎ দেওয়ার দাবী ছাড়লেন না। কিছুটা

আপােষ করে ইউরােপীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলি জার্মানীর যতটা দেওয়ার ক্ষমতা আছে মনে করল, তাই ক্ষতিপূরণ হিসাবে আদায় করতে সিদ্ধান্ত নিল।

জার্মানীর কাছ থেকে শান্তিচুক্তি হওয়ার আগেই ক্ষতিপূরণ নেওয়া শুরু হয়ে ছিল। টাকা ও পণ্য (কয়লা, রাসায়নিক দ্রব্য, অন্যান্য) দুইভাবেই ক্ষতিপূরণ আদায় হচ্ছিল। ১৯২১ সালে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে জার্মানীকে Reparation Commission জানায় যে ক্ষতিপূরণ বাবদ তাকে ৩২ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে। এটা ছিল জার্মানীর জাতীয় আয়ের দ্বিগুণ। আন্তর্জাতিক ও ইউরােপীয় দেশগুলির অর্থনীতি তখন এমন দুর্বল অবস্থায় ছিল যে, জার্মানীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ পেলেই কেবল বৃটেন ও ফ্রান্সের পক্ষে আমেরিকার ঋণ পরিশােধ করা সম্ভব ছিল। আবার জার্মানী যদি উৎপাদিত পণ্য রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারত তবেই ক্ষতিপূরণ দিতে সক্ষম হত। কিন্তু জার্মানীর উৎপাদনের দূর্বলতা ছাড়াও রপ্তানী বাণিজ্যের উপর বিভিন্ন নিষেধ আরােপ করার জন্য প্রয়ােজনীয় উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব হচ্ছিল না। ১৯২২ সালে ক্ষতিপূরণের চাপে জার্মানীর মুদ্রামূল্য বিপদজনকভাবে কমে গেল। সেই বছরের শেষে জার্মানী ক্ষতিপূরণ দেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হল। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সৈন্যরা ১৯২৩ সালের জানুয়ারীতে জার্মানীর শিল্পসমৃদ্ধ Ruhr অঞ্চল দখল করে নেয়। তারা জার্মানীর খনি ও রেল শ্রমিকদের জার্মানী থেকে বেলজিয়ামে কয়লা পাঠাতে বাধ্য করে। জার্মান সরকার Ruhr অঞ্চলের মালিক ও শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য বিরাট অঙ্কের টাকা ছাপল, এইভাবে শুরু হল মুদ্রাস্ফীতি। যুদ্ধের শুরুতে জার্মানীর মুদ্রা মার্ক এর মূল্য ছিল ৪.২ ডলার প্রতি। যুদ্ধের শেষে তা হয়েছিল ১৪ ডলার প্রতি। ১৯২২ সালে সেটা হয় ৪৯৩ আর ১৯২৩ সালে জানুয়ারীতে হয় ১৭৭৯২, এরপর অর্থনীতি এতই দ্রুত অবনতি হয় যে, ১৫ই নভেম্বর ১৯২৩ শেষ রেকর্ড করার সময় ডলার প্রতি মার্ক হয় ৪,২০০,০০০,০০০,০০০। যে কাগজে মার্ক ছাপা হত সে কাগজের দামের চাইতেও এর দাম অনেক কম ছিল। এই সময় নতুন মার্ক চালু করা হয়। এক মার্কের মূল্য ছিল আগের এক লক্ষ কোটি মার্কের সমান।

মুদ্রাস্ফীতি জার্মানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাবেক অস্ত্রীয় সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রগুলিতেও (বুলগেরিয়া, গ্রীস, পােল্যান্ড) নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রাস্ফীতি হল। কেইনসএর ভবিষ্যত্বাণী অনেকটা সত্য প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হল। ফ্রান্স ১৯২৩ সালের শেষদিকে Ruhr অঞ্চল থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করল। যদিও এর উদ্দেশ্য (জার্মানীকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা) সফল হল না। তাড়াহুড়া করে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করে সমঝােতা করা হলাে। ক্ষতিপূরণের বাৎসরিক কিস্তি কমান হলাে। আর জার্মানীকে ক্ষতিপূরণ দিতে সাহায্য করার জন্য আমেরিকা ২০ কোটি ডলার ধার (Dawes loan) দিল। এর পর থেকে আমেরিকার বেসরকারী ব্যক্তি পুঁজি জার্মানীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পৌর সভা এগুলিকে ব্যাপকভাবে ধার দেওয়া শুরু করল। জার্মানী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়ােজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা পেল। ১৯২৪ সালে জার্মানীর মুদ্রা স্বর্ণমানে (gold standard)ফিরে আসল। বিপর্যয়কারী মুদ্রাস্ফীতি জার্মান সমাজে একটা বিরাট প্রভাব ফেলল। জনসংখ্যার বেশীরভাগ মানুষ, যেমন নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট বেতনে চাকুরী করা লােক ও পেনশনভােগীদের জীবনের সঞ্চয় অল্পসময়ের মধ্যে মূল্যহীন হয়ে পড়ল। তাদের জীবনযাত্রার মান কমে গেল। অলস কিছু ফাটকাবাজ (speculator) মানুষ রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হল। এই পরিবর্তন বেশিরভাগ মানুষকে চরমপন্থী রাজনৈতিক মতবাদ সমূহের সমর্থক হওয়ার ক্ষেত্র তৈরী করল। এটা পরবর্তীতে নাৎসী দলের প্রতি তাদের সমর্থনের পটভূমি। ১৯২৮ সালের নির্বাচনে সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটরা জয়ী হল। হিটলারের নাৎসী দল পেল মাত্র শতকরা ২ ভাগ আর কমিউনিষ্ট দল পেল শতকরা ১০.৬ ভােট।

গ্রেট বৃটেনেও অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল। যুদ্ধের আগে বৃটেনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীলতা ও যে সব শিল্প অপ্রচলিত হয়ে যাচ্ছিল সেগুলাে ধরে রাখার চেষ্টার জন্য বিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রবৃদ্ধি বাধা পাবে তা অবধারিত ছিল। যুদ্ধের সময় বৃটেন তার বিদেশের বাজার হারাল, বিদেশের বিনিয়ােগ করা পুঁজিও অনেকটা হারাল, অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ নষ্ট হল এবং অন্যান্য বৈদেশিক আয়ের সূত্রও বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামালের জন্য বিদেশ থেকে আমদানীর উপর নির্ভরশীলতা কমেনি। উপরন্তু ইউরােপে যুদ্ধে বিজয়ীদের প্রধান শক্তি হওয়ায় তার অতিরিক্ত দায়িত্ব বহন করতে হল। শিল্পকারখানা পুরােপুরি উৎপাদন করতে পারছিল না, আবার বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল। ১৯২০ এর দশকে বেকারত্বের হার বেশীরভাগ সময়ই ১০ শতাংশের বেশী ছিল। বেকারদের ভাতা দেওয়া হত, কিন্তু তা

জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। অর্থনীতিকে গতিশীল করার সরকারী প্রচেষ্টা ছিল অকার্যকর। সরকারী ব্যয় কমিয়ে ফেলা হল, তাতে প্রয়ােজনীয় অবকাঠামাে গঠন ব্যহত হল। রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল অপ্রতুল রইল। প্রধান যে পদক্ষেপ নেওয়া হলাে, তাতে বিপর্যয় আরও বাড়ল।

১৯১৪ সালে যুদ্ধের শুরুতেই বৃটেন স্বর্ণমান (gold standard)থেকে বের হয়ে এসেছিল। কারণ যুদ্ধের খরচ যােগান দেওয়ার জন্য অর্থের ব্যবস্থা স্বর্ণমানে থেকে করা যেত না। বৃটেন যেহেতু তকালীন পৃথিবীর financial market এর কেন্দ্র ছিল, তাই যুদ্ধের পর স্বর্ণমানে ফিরে আসার জন্য চাপ ছিল। এজন্য প্রয়ােজনীয় মজুদ স্বর্ণ (gold reserve) ১৯২৫ সাল নাগাদ জোগাড় হয়েছিল। তবে যুদ্ধের সময় মুদ্রাস্ফীতির কারণে বৃটিশ মুদ্রার মান আমেরিকান ডলার এর তুলনায় কমে গিয়েছিল। আমেরিকান মুদ্রা যুদ্ধের সময়ও স্বর্ণমান ছিল। বৃটিশ মুদ্রা যুদ্ধের আগের স্বর্ণমানে ফিরে গেলে আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশ যারা স্বর্ণমান ছেড়ে যায় নাই-তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বৃটেন প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হত। তৎকালীন বৃটিশ অর্থমন্ত্রী (Chancellor of Exchequer) উইনস্টন চার্চিল এরপরও বৃটিশ মুদ্রা যুদ্ধপূর্ব স্বর্ণমানে ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু বৃটিশ শিল্পজাত পণ্য অন্য দেশের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযােগিতায় টিকিয়ে রাখার জন্য পণ্যের দাম কমাতে, শ্রমিকদের মজুরী কমানরও সিদ্ধান্ত নিলেন। এর সামগ্রিক ফল হল শ্রমের ফসল শ্রমিকদের কাছে না গিয়ে পুঁজিপতিদের ঘরে উঠল।।

কয়লাখনি শ্রমিকেরা এই মজুরী কমাতে বেশী বিক্ষুদ্ধ হল। ১৯২৬ সালে ১লা মে তারা ধর্মঘট করল ও অন্যান্য শ্রমিক ইউনিয়নকেও তাদের সমর্থনে ধর্মঘট করতে রাজী করাল। সারা বৃটেনের শ্রমিক ইউনিয়ন সদস্যদের প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ ধর্মঘট করল। সরকার শক্ত অবস্থান নেওয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ায় ঝুঁকি দেখা দিল- শ্রমিকেরা পিছিয়ে আসল। আন্দোলনের নেতাকর্মীদের উপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেমে আসল আর একটার পর একটা শিল্প কারখানায় শ্রমিক সংগঠনগুলাে ভেঙে দেওয়া হলাে। কিন্তু এতে শ্রমিক ও অন্যান্য শ্ৰেণীর মধ্যে যে তিক্ততা সৃষ্টি হল, তাতে সরকারের পক্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে ঐক্যমতের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ল।

এরপরও ইউরােপ ১৯২৪ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছিল। যুদ্ধের ফলে যা ধ্বংস হয়েছিল তা পুনর্গঠন করা হল, উৎপাদন বাড়ল। আমেরিকা ও প্রায় সব ইউরােপীয় দেশে আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুরু হল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ mass production পদ্ধতিতে নতুন নতুন ভােগ্যপণ্য পেলেন-এরকম একটা ধারণা হল শ্রমিক শ্ৰেণী সুফল পাবে। রাজনীতিকেরা বলা শুরু করলেন, সামাজিক সংঘাতের দিন শেষ। এমনকি সমাজতন্ত্রবাদী রাজনৈতিক এডুয়ার্ড বার্নষ্টেইন বল্লেন, একচেটিয়া উৎপাদন ব্যবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা সরকারী মালিকানায় চলে আসবে। শ্রমিক আন্দোলনে পরাজয়ের পরও বৃটেনে শ্রমিক নেতারা সহযােগিতার মাধ্যমে শ্রমিকদের উন্নতির জন্য সরকারের সঙ্গে আলােচনায় বসলেন। সােভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দও অনুরূপ ধারণা করলেন। ১৯২৫ সালে দুইজন নেতা জোসেফ ষ্ট্যালিন ও নিকোলাই বুখারিন বলেন পশ্চিমা দেশগুলিতে organized capitalism চলছে এতে এই দেশগুলিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ও অর্থনৈতিক সংকটের সম্ভাবনা কমে যাবে। এটা দীর্ঘমেয়াদী বলে তারা মনে করলেন। এটা তাদের এক দেশে সমাজতন্ত্র গড়া সম্ভব, এই মতবাদের পক্ষে একটা যুক্তি হল।

এক দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ, বিপ্লব ও অর্থনৈতিক দুর্দিনের পর ১৯২৭ সাল থেকে পুঁজিবাদী দেশগুলাের শাসক শ্রেণীর বিশ্বাস হল যে দুঃসময় শেষ। ১৯২৮ সালে আমেরিকার প্রেসিডন্ট কুলিজ (Coolidge)বলেন, “এখন যে সুখকর ভবিষ্যতের দিকে আমরা যাচ্ছি তা আমেরিকার আর কোন কংগ্রেস পায় নাই”। তার সঙ্গে দ্বিমত করার মত লােক তখন তেমন ছিলনা। কিন্তু সমস্ত প্রবৃদ্ধিও প্রক্রিয়া একটা দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা হল অব্যাহতভাবে আমেরিকা থেকে জার্মানীতে অর্থ বিনিয়ােগ। সমস্ত পৃথিবীর মােট পুঁজি রপ্তানীর প্রায় অর্ধেকটাই ১৯২৮ সালে জার্মানীতে পাঠান হয়েছিল। জার্মানী ২০ হাজার বিলিয়ন মার্কের বেশী ধার করেছিল এই সময়, যার অর্ধেকটাই ছিল স্বল্পমেয়াদী ঋণ। খুব কম মানুষই ধারণা করতে পেরেছিল কি বিপর্যয়ের সম্মুখীন ছিল পশ্চিমা দেশগুলি।

The Great Depression

বিরাট বিশ্বমন্দা ১৯২৯ ইউরােপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকা যুদ্ধ শেষে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হিসাবে আবির্ভূত হয়। যুদ্ধের আগেও আমেরিকার অবস্থান ভাল ছিল। ১৯১৩ সালেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে গেল আমেরিকা- পৃথিবীর মােট শিল্প উৎপাদনের এক তৃতীয়াংশ ছিল সেই দেশের । ১৯২৯ সাল নাগাদ তার শিল্প উৎপাদন দাঁড়াল সারা পৃথিবীর ৪২ শতাংশ। সেই সময় বৃটেন, ফ্রান্স ও জার্মানীর যৌথ শিল্প উৎপাদন ছিল মােট পৃথিবীর ২৮ শতাংশ।

যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকা অন্যান্য দেশের কাছে ঋণগ্রস্ত ছিল। যুদ্ধের পর আমেরিকা হল ঋণদাতা দেশ। ইউরােপীয় দেশগুলির বাজার দখল করল আমেরিকা। দ্রুত নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও বিশাল বাজার এমন এক অনুভূতির সৃষ্টি করেছিল যে স্থায়ী প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি পাওয়া গেছে। ১৯২০-২১ সালে কিছুটা মন্দা হলেও তা কাটিয়ে উঠে আমেরিকার অর্থনীতি বাড়তে থাকে। গ্রাম ও শহরে দরিদ্র জনগণের চিত্র, ক্রমেই বাড়তে থাকা সামাজিক অসাম্য, এগুলাের কথা কেউ তুললেও বিত্তশালী শ্রেণী তা গুরুত্ব দেয়নি।

১৯২০ এর দশকের শেষের দিকে অর্থনীতির বৃদ্ধি হলেও এর ভিত্তি ছিল দুর্বল। আমেরিকায় কৃষিতে মন্দা চলছিল, শ্রমের মজুরি বাড়েনি বল্লেই চলে। এর ফলে উৎপাদনের মুনাফার বড় অংশ বিত্তশালীদের কাছে যাচ্ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় না বাড়ায়, পণ্যসামগ্রীরও চাহিদা বাড়ছিল না। উৎপাদন ও চাহিদার এই ব্যবধান অর্থনীতিতে মন্দা নিয়ে আসল। চাহিদা বাড়ানর জন্য ব্যাংকগুলাে বাড়ি, গাড়ি ও অন্যান্য পণ্যদ্রব্য কেনার জন্য ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ও আকারে মানুষকে ধার দেওয়া শুরু করল। এই ঋণের একটা বড় অংশ দেয়া হয়েছিল এমন লােকদের যাদের শােধ করার ক্ষমতা ছিল না। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলাে নতুন ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিল আর পুরাতন ঋণও refinancing কমিয়ে ফেলল। ১৯৩৩ সালে বাড়ি কেনার জন্য ঋণ নিয়েছিল এমন অর্ধেক মানুষই ঋণ খেলাফি হল। প্রতিদিনই প্রায় এক হাজার বাড়ি ঋণ শােধ দিতে

পারার জন্য ব্যাংক দখলে নিচ্ছিল। এরপরও টাকার অভাবে হাজার হাজার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যেতে লাগল।১৩ (আমেরিকার নিয়মনীতির কারণে সেই সময় সারা দেশব্যাপী শাখা আছে এমন বৃহৎ ব্যাংক ছিল না। বেশিরভাগ ব্যাংক ছিল স্থানীয় ভিত্তিক আর কিছু ছিল রাজ্য (state) ভিত্তিক- তাই তাদের পুঁজি ছিল কম।)

১৯২৮ সালে আমেরিকার ব্যাংক ও অন্যান্য বিনিয়ােগকারীরা ইউরােপের দেশসমূহের (বিশেষতঃ জার্মানী) বন্ড কিনে টাকা খাটান প্রায় বন্ধ করে দিল। এর বদলে তারা নিউইয়র্কের স্টক মার্কেটে টাকা খাটান বাড়িয়ে দিল। ফলে নিউইয়র্কে স্টকের দাম দ্রুত বাড়তে থাকলাে। এই “bull market” বা চাঙ্গা বাজারে অনেকেই টাকা ধার করে বিনিয়ােগ করতে লাগল। বছর খানেকের মধ্যেই ইউরােপে বিনিয়ােগ খুব কমে গেল ও ব্যবসার জন্য দরকারী টাকা পেতে কষ্ট হতে লাগল । আমেরিকার অর্থনীতির গতিও ধীর হয়ে গেল। ১৯২৯ সাল থেকে আমেরিকার মােট জাতীয় আয় কমতে লাগল। ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে আমেরিকা গাড়ি তৈরী করেছিল ৬২২০০০টি, সেই বছর সেপ্টেম্বর মাসে তৈরী গাড়ির সংখ্যা কমে হল ৪১৬০০০টি। বৃটেন, জার্মানী ও ইতালীতে অর্থনীতির বৃদ্ধি আগেই কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু স্টকের দাম তখনও বাড়ছিল। আমেরিকার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকরা বা বিনিয়ােগ কারী কেউই এই বিপদ সংকেত আমলে নেয়নি। ১৯২৯ সালের ২৪শে অক্টোবর ছিল বৃহস্পতিবার-এটা ইতিহাসে “কালাে বৃহস্পতিবার” নামে পরিচিত। সেদিন কিছু বিনিয়ােগকারী স্টকের দাম কমে যাবে এই আশংকায় বিক্রি করা শুরু করল। স্টকের দাম সত্যিই কমতে শুরু করল। আরও অনেকে ভয় পেল এবং ব্যাপকভাবে স্টক বিক্রি করা শুরু হল, তাতে দাম আরও কমতে থাকল। এর পরের সপ্তাহে “কালাে মঙ্গলবার এ আরও বিক্রি শুরু হল। স্টকের দামের সূচক ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯২৯ ছিল ৩৮১ (১৯২৬ সালের দাম ১০০ ধরে) -১৩ই নভেম্বর হল ১৯৮ এবং আরও পড়তে থাকল। যারা স্টক কিনেছিল এমন বহু মানুষ অল্পদিনের মধ্যে সর্বস্বান্ত হয়ে গেল। অনেকেই তাদের জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে ফেলল। যারা টাকা ধার নিয়ে স্টক কিনেছিল, তাদের আর টাকা শােধ দেওয়ার উপায় থাকল না। ব্যাংকগুলাে তাদের ধার দেওয়া টাকা ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকল। তাতে যারা টাকা ধার নিয়েছিল তারা শােধ দেওয়ার জন্য তাদের স্টক বিক্রি করতে বাধ্য হলাে। যে সব আমেরিকান ইউরােপে টাকা বিনিয়ােগ করেছিল, তারা তা ফিরিয়ে আনতে লাগল; নতুন বিনিয়ােগ বন্ধ করে দিল আর তাদের সম্পদ বিক্রি করে ফিরিয়ে আনা শুরু করল।

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা আগেই শুরু হয়েছিল- স্টক মার্কেটের ধ্বস মন্দার কারণ নয়, তবে এটা মন্দার একটা পরিষ্কার বহিঃপ্রকাশ ছিল। মধ্য ইউরােপের সবচাইতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক ভিয়েনার Austrian Creditanstalt ১৯৩১ সালের মে মাসে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিল। অষ্ট্ৰীয়ার সরকার ব্যাংকের সব সম্পদ অবরুদ্ধ (frozen) করল। তা সত্ত্বেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল অন্যান্য দেশে। জার্মানী, পােল্যান্ড, হাঙ্গেরী, এইসব দেশে ব্যাংকে যাদের টাকা ছিল তারা তা তুলে নেওয়া শুরু করল। অনেক ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে জুলাই এর ১ তারিখ জার্মানীর এক কিস্তির টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হুভার প্রস্তাব করলেন, এক বৎসরের জন্য সব ক্ষতিপূরণ বন্ধ রাখার জন্য। কিন্তু আতঙ্ক দূর করা সম্ভব হল না। ফ্রান্স গড়িমসি করলেও বৃটিশ সরকার ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডকে স্বর্ণের মাধ্যমে প্রদেয় শােধ বন্ধ করার অনুমতি দিল।

কাচামালের দাম কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই অষ্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা ও চিলি স্বর্ণমান পরিত্যাগ করেছিল। ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে আরও ২৪টি দেশ স্বর্ণমান ছেড়ে দিল। আরও কয়েকটি দেশ প্রকাশ্যে স্বর্ণমান না ছাড়লেও প্রকৃতপক্ষে স্বর্ণের মাধ্যমে কোন আদান প্রদান করছিল না। আন্তর্জাতিক মানদন্ড এভাবে চলে যাওয়ায় প্রতিটি দেশের মুদ্রামান চাহিদা ও সরবরাহ অনুযায়ী বিশৃঙ্খলভাবে উঠানামা করতে লাগল। বিনিয়ােগ তুলে নেওয়া হতে থাকল, প্রায় প্রত্যেক দেশই নিজেদের পণ্যের বাজার রক্ষা করার জন্য শুল্কের দেয়াল তুলে দিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পতন হল। ১৯৩১ সালের প্রথম ভাগে মােট বহির্বাণিজ্য ১৯২৯ সালের তুলনায় প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কমে গেল। সাথে সাথে কমে গেল পণ্য উৎপাদন, চাকুরী ও মাথাপিছু আয়। ১৯২৫ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত পণ্য উৎপাদনের গড় বাৎসরিক উৎপাদন ১০০ ধরে ১৯৩২ সালে তা দাড়াল আমেরিকায় ৬০ এর নীচে আর জার্মানীতে ৭০ এর নীচে। ১৯৩৭ সালের চাকুরীরত মানুষের সংখ্যাকে ১০০ ধরে ১৯৩২ সালে আমেরিকায় তা হল ৭৫ ও জার্মানীতে ৭০ এর কম। এই সময়ে মাথাপিছু গড় আয় আমেরিকায় কমল ২৫ শতাংশ ও জার্মানীতে ২০ শতাংশ।

একে অপরের সঙ্গে আলােচনা না করে রাষ্ট্রসমূহ স্বর্ণমান পরিত্যাগ করা ও আমদানী রপ্তানীর উপর শুল্ক আরােপ করার ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ছিল ও পরিস্থিতির অবনতি ঘটছিল বলে মনে করা হল। ইউরােপের রাষ্ট্রগুলাে ১৯৩২ সালের জুন মাসে সুইজারল্যান্ডের লুসান শহরে সভা ডাকল। সেখানে আলােচনা হল যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ জার্মানী কখন কতটা দিবে আর ইউরােপীয় দেশগুলাে আমেরিকার কাছে তাদের দেনা কিভাবে শােধ করবে। এখানে ইউরােপীয় দেশগুলাে ও আমেরিকার মতপার্থক্য হয়।

সংকট উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সহযােগিতার শেষ চেষ্টা হয় ১৯৩৩ সালে। লীগ অব নেশনস এর প্রস্তাবনায় World Monetary Conference ডাকা হয়। আলােচ্য বিষয় ছিল স্বর্ণমানে ফিরে যাওয়া, আমদানী শুল্ক কমান এবং নানাভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়ান। তখন আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছিল। দুজন প্রার্থী, হুভার ও রুজভেল্ট কেউই এই সময় আগাম কোন অঙ্গীকার করতে রাজী ছিলেন না। ফলে সম্মেলন পিছান হল। নির্বাচনে রুজভেল্ট জিতলেন এবং তাকে প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দিতে আবার পিছন হল। শেষ পর্যন্ত যখন ১৯৩৩ সালের জুন মাসে লন্ডনে সম্মেলন হল তখন রুজভেল্ট না এসে খবর পাঠালেন, তার নিজের দেশের অর্থনীতি পুর্ণগঠন করাই তার প্রাথমিক কাজ। তিনি অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে অঙ্গীকার করতে চান না। ফলে অর্থহীন বক্তৃতার মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হল।

Great Depression Causes, Effects and Timeline

মন্দার কারণ

পুঁজিবাদী অর্থনীতির গতি কখনােই মসৃণ হয় না। অর্থনীতির উঠানামা এই ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা উঠানামার ব্যপ্তি ও দৈর্ঘ্য হয় বিভিন্ন। কখনও কখনও তা তীব্র আকার ধারণ করে। উনবিংশ শতাব্দীতে ব্যবসায়ীরা trade cycle অর্থাৎ ব্যবসা বাণিজ্যে চাঙ্গা ভাব ও মন্দার সঙ্গে পরিচিত ছিল। বলা হত প্রতি সাত থেকে এগার বছর ব্যবধানে মন্দা দেখা দেয়। আরও কিছুটা দীর্ঘসময় অন্তর অন্তর ঘটতে থাকা চক্র ঊনবিংশ শতাব্দীতে লক্ষ করা যায়। ১৮৫০ থেকে ১৮৭০ সালে পর্যন্ত স্থায়ী এক বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পর প্রায় বিশ বৎসর যাবৎ মন্দা চলছিল । এরপর আবার প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছিল। কোন্দ্রাতিয়েভ নামে একজন রাশিয়ান অর্থনীতিবিদ “long wave” নামে ৫০ থেকে ৬০ বৎসর স্থায়ী প্রবৃদ্ধি ও মন্দা চক্র বর্ণনা করেন।

অতীতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মন্দা ব্যবসায়ীরা ভালাে বা খারাপ আবহাওয়ার মতােই মনে করতে অভ্যস্ত ছিলেন। এর কারণ জানা ছিল না। এগুলাে হয় উন্নতির সুযােগ সৃষ্টি করতাে অথবা বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসত। তবে কার্ল মার্কস বলেছিলেন এই প্রবৃদ্ধি-মন্দা চক্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত এবং এই দ্বন্দ্বের ফলে শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা গভীর সংকটে পড়বে যা উত্তরণ করা সম্ভব হবে না। সমস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই এই অর্থনৈতিক মন্দা ঝুঁকিতে ফেলবে এটা তিনি ও অন্যান্য সমাজতন্ত্রীরা মনে করতেন। এর আগের ১০০ বৎসরে প্রবৃদ্ধি মন্দা চক্র ঘটতে থাকা স্বত্বেও সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর অর্থনীতি অগ্রসর হয়েছে। পুঁজিবাদের ইতিহাসে এবারই প্রথম পুরাে ব্যবস্থাই মন্দার কারণে ধ্বংসের সম্মুখীন হলাে। “বিরাট বিশ্ব মন্দার” আশি বৎসর পরেও এর কারণ সম্বন্ধে ঐক্যমত্যে পৌছানাে যায় নাই। অনেকের মতে কারণ ছিল একাধিক। আমেরিকায় পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংক সমূহের খেলাপী ঋণের বােঝা, স্টক মার্কেটের অবাস্তব স্ফীতি শেষ পর্যন্ত স্টকের মূল্য পতন ঘটায়। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের কারণে জার্মানী, ও আমেরিকার কাছে যুদ্ধের ঋণ শােধ দেওয়ার জন্য ইউরােপের অন্যান্য দেশ, আমেরিকার উপর নির্ভরশীল ছিল। ইউরােপ থেকে বিনিয়ােগ করা অর্থ আমেরিকা তুলে নেওয়ায় ইউরােপেও ধ্বস নামল। কাচামালের দাম পড়ে যাওয়ায় যেসব দেশের অর্থনীতি কাচামাল রপ্তানীর উপর নির্ভরশীল ছিল সেসব দেশও মন্দার কবলে পড়ল। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ, যার মধ্যে প্রধান ছিলেন জন মেইনার্ড কেইনস, অর্থনীতির মন্দার বড় কারণ হিসেবে ভােগ্য পণ্যের চাহিদার অভাবকে চিহ্নিত করেছেন।

The Pittsburgh Press newspaper cover on October 29,1929,Photo credit from Old Pittsburgh photos and stories The Digs

মন্দা পরবর্তী

মন্দা যখন তুঙ্গে তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হল ১৯৩২ সালের শেষে। ডেমক্র্যাট দলের প্রার্থী ফ্র্যাংকলিন ডেলানাে রুজভেল্ট নতুন অর্থনৈতিক নীতি (যার নাম দেওয়া হল New Deal) চালু করার অঙ্গীকার করলেন তার নির্বাচনী প্রচারণায়। তিনি জয়ী হলেন এবং ডেমােক্র্যাটিক পার্টি কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। সে সময় ডেমােক্র্যাটিক দল ছিল আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের শ্বেতকায় বর্ণবাদী ভূমিমালিক আর উত্তর এর পুঁজিবাদীদের দল। কিন্তু মন্দার মধ্যে মানুষ তখন বেপরােয়া। মােট শিল্পশ্রমিকদের প্রায় অর্ধেক (দেড় কোটি শ্রমিক) তখন বেকার। জার্মানীতে বেকারত্বের হার ছিল ৪৪ শতাংশ, বৃটেনে ২২ শতাংশ, নরওয়ে ও ডেনমার্কে ৩১ শতাংশ। অনেক শিল্প কারখানা ছিল বন্ধ। ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় শিল্প উৎপাদন ছিল এক-তৃতীয়াংশ কম, জার্মানীতেও প্রায় একই মাত্রায় উৎপাদন কমল। বেকার ও দরিদ্র মানুষেদের জন্য কোন ভাতা বা সামাজিক নিরাপত্তা তখনও চালু হয় নাই। হাজার হাজার লঙ্গর খানা (soup kitchen) খােলা হল ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য। ১৯৩২ সালে ১৫০০০ বেকার যুদ্ধফেরত প্রাক্তন সৈনিক ওয়াশিংটনে বিক্ষোভ দেখালে জেনারেল ম্যাক আর্থারের নেতৃত্বে খােলা বেয়নেট নিয়ে ২৫ হাজার সৈন্য পাঠান হয় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে। এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রশাসন অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনার জন্য অতীতে কখনও নেওয়া হয়নি এমন পদক্ষেপ নিল। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট জরুরী ক্ষমতা বলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরােপ করলেন।১৭ এই ব্যবস্থাগুলাের মধ্যে ছিল: ফেডারেল রিজার্ভ ফান্ড সমস্ত ব্যাংকের আমানতের গ্যারান্টি দেবে; সরকারী টাকায় শস্য কিনে তা বিনষ্ট করে ফেলা যাতে দাম না কমে; ২৩ লক্ষ বেকার মানুষকে কাজে লাগানর জন্য সরকারী অর্থ মঞ্জুরী, শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার সীমিত অধিকার দেওয়া যাতে তারা মজুরী বাড়াতে পারে এবং তাতে বাজারে পণ্য চাহিদা বাড়তে পারে। শিল্প উৎপাদনকারীদেরও সীমিত ভাবে পণ্য ভিত্তিক গােষ্ঠী করে উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের সুযােগ দেওয়া হল।

দ্রুততার সঙ্গে এই সব নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা হল। যদিও অত্যন্ত কম মজুরীতে কাজ দেওয়া হল, তারপরও অনেকেই রুজভেল্ট এর পদক্ষেপের প্রশংসা করলেন। তবে এই পদক্ষেপ গুলাে যতটা কার্যকর হবে বলে মনে করা হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত হয় নাই। রুজভেল্ট একটি জায়গায় রক্ষণশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন-তা হল তিনি ঘাটতি বাজেট দিয়ে অর্থ খরচ করে অর্থনীতি চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন নাই। বরং তিনি সরকারী খাতে চাকুরীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধফেরত শ্রমিকদের অবসর ভাতা কমিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থ বিনিয়ােগ ১৯২৯ সালে ছিল ১৬ বিলিয়ন ডলার-১৯৩২ সালে তা কমে হয়ে গিয়েছিল এক বিলিয়ন ডলার। রুজভেল্ট ধারণা করেছিলেন এত নিম্ন পর্যায় থেকে এটা এক সময় বাড়বেই। তা আসলেই বাড়া শুরু করেছিল। শিল্প উৎপাদন ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে ছিল শতকরা ৫৯ ভাগ (মধ্য ১৯২০ এর দশকের তুলনায়)- জুলাই মাসে বেড়ে হল শতকরা ১০০ ভাগ। বেকার মানুষের সংখ্যা ১৯৩৩ সালে ছিল ১ কোটি ৩৭ লক্ষ, ১৯৩৫ সালে হল ১ কোটি ২০ লক্ষ। অনেকেই মনে করলেন রুজভেল্ট এর New Deal আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর হয়েছে।

অনেকে এখনও তা বিশ্বাস করেন। কিন্তু ১৯৩৭ সালে যখন উৎপাদন ১৯২৯ সালের পরিমাণে আবার উন্নীত হল, তখনও বেকারত্বের হার শতকরা ১৪ ভাগের উপরে ছিল। ১৯৩৭ সালের আগষ্ট মাসে আমেরিকার ইতিহাসে সবচাইতে দ্রুত অর্থনৈতিক অবনতি ঘটল। ১৯৩২ সাল থেকে অর্থনীতি যতটুকু পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল-তার অর্ধেক আবার কমে গেল। চার মাসের মধ্যে ইস্পাত উৎপাদন কমে গেল দুই-তৃতীয়াংশ, সূতীবস্ত্র উৎপাদন কমল শতকরা ৪০ ভাগ। কোন কোন ক্ষেত্রে New Deal উন্নতি আনলেও অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিকার হিসেবে তা ইউরােপীয় দেশগুলাের গ্রহণ করা ব্যবস্থার মতই অকার্যকর প্রমাণিত হল।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যে সবচাইতে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ফ্রান্স। পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ হয়েছিল ফ্রান্সের সবচাইতে সমৃদ্ধ অঞ্চলে-যা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ফ্রান্সের শিল্প উৎপাদনের বড় অংশ (ইস্পাত শিল্পের ৬০ শতাংশ ও কয়লা শিল্পের ৭০ শতাংশ) এবং কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গুলাে ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। জীবনহানিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষম পুরুষদের প্রায় অর্ধেক (১৫ লক্ষ) যুদ্ধে নিহত হয়। আরও ৭ লক্ষের উপর মানুষ পঙ্গু হয়ে যায়। কাজেই এটা আশ্চর্য নয় যে ফ্রান্স জার্মানীর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করবে। কিন্তু জার্মানী দাবী অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে পারেনি। আদায় করার জন্য ফ্রান্স জার্মানীর শিল্পসমৃদ্ধ Ruhr অঞ্চল দখল করে নিল। তাতে ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব তাে হলই না, উপরন্ত এই দখল করা ও দখলে রাখার খরচও হল অনেক। যুদ্ধের সময় ফ্রান্সের মুদ্রার মূল্য যা কমেছিল তার চাইতে অনেক বেশী কমে যুদ্ধ পরবর্তী সাত বৎসরে। শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালে ফ্রান্সের মুদ্রা ফ্রাঙ্কের এর মূল্য যুদ্ধপূর্ব মূল্যের এক – পঞ্চমাংশ স্থির করা হল। কর বাড়ান হল অনেক। ধনী ব্যক্তিদের সম্পদের মূল্য চার-পঞ্চমাংশ কমে গেল। শ্রমিক শ্রেণী অধিক কর দিতে বাধ্য হল। দুই শ্ৰেণীই হল ক্ষুদ্ধ। এতে উগ্র বাম ও ডান উভয়েরই সমর্থন বাড়ার সুযােগ হল। ১৯৩৬ সালে তিনটি বাম দল (কমিউনিষ্ট, সােশ্যালিষ্ট ও র্যাডিক্যাল) যুক্ত ভাবে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করল। শ্রমিকদের জন্য সহায়ক কিছু আইন প্রণয়ন করা হল। যেমন সপ্তাহে ৪০ ঘন্টার কাজ সীমিত করা, শ্রমিকদের সঙ্গে বিরােধ হলে বাধ্যতামূলক সালিশ নিস্পত্তির ব্যবস্থা, শ্রমিকদের পূর্ণ বেতনে ছুটি। তারা Bank of France ও রেলওয়ে জাতীয়করণ করেছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিফল হওয়ায় ১৯৩৮ সালে সরকার ভেঙ্গে যায়। এই সময় বৈদেশিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। মধ্য ও পূর্ব ইউরােপে এবং স্পেনে রাজনৈতিক ঘটনাবলী – বিশেষতঃ ফ্যাসীবাদী একনায়কতন্ত্রের উত্থান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চাইতে বেশী দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু ফ্যাসীবাদের উত্থানেরও অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল।।

১৯১৯ ও ১৯২০ সাল ইতালীর ইতিহাসে “the two red years” নামে পরিচিত। অর্থনৈতিক দূরবস্থার কারণে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ল এবং কারখানায় ধর্মঘটের সংখ্যা বাড়তে থাকল। শ্রমিক সংগঠন ও সমাজতন্ত্রপন্থী দলগুলাের সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকল। ১৯১৯ সালে বিপ্লবী রাশিয়ার সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করে তিনদিন সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হল। ১৯২০ সালে তুরিন এ metal worker রা মালিক পক্ষ তাদের ইউনিয়নকে স্বীকৃতি দিক এই দাবীতে ধর্মঘট পালন করল। কিন্তু সফল হয়নি। সেই বছরই মিলানে lock out এর প্রতিবাদে ইঞ্জিনিয়ারিং শ্রমিকরা কারখানা দখল করে। কয়েকদিনের মধ্যেই আন্দোলন সারা দেশে metal worker দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। চার লক্ষ metal worker এবং এক লক্ষ অন্যান্য শ্রমিক তাদের কারখানা দখল করে। কারখানা রক্ষার জন্য তারা অস্ত্র তৈরী করে এবং জমা করে রাখে। দক্ষিণাঞ্চলে যুদ্ধ ফেরত সৈন্যরা কৃষি ভূমি দখল করে নিতে লাগল। পরিস্থিতি বিপ্লবের অনুকূলে ছিল। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক দলগুলির নেতৃবৃন্দ শ্রমিক সংগঠন গুলিকে সমর্থন দিল না। এই অবস্থায় প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের সভায় বিপ্লবের পথে যাওয়ার প্রস্তাব অল্প ভােটের ব্যবধানে পরাজিত হয় এবং কারখানা মালিকদের সঙ্গে আপােস করার সিদ্ধান্ত হয়।

এই সময় মুসােলিনী যদিও জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিল কিন্তু তার সমর্থক বা অনুসারী বেশী ছিল না। সে সমাজতান্ত্রিক দল থেকে বেড়িয়ে এসে কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী ও বিক্ষুব্ধ যুদ্ধফেরত সৈন্য নিয়ে Fascio decomattimento নামে একটি ক্ষুদ্র দল গঠন করেছিল। ১৯১৯ সালের নির্বাচনে তারা খুব কম সমর্থন পেয়েছিল। শ্রমিকদের আন্দোলনে ভাটা পড়ায় মুসােলিনীর ভাগ্য খুলে গেল। পুঁজিপতি শ্ৰেণী চাইছিল শ্রমিকদের সংগঠন ও আন্দোলনের মানসিকতা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দিতে যাতে তারা ভবিষ্যতেও বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরী করতে না পারে। প্রধানমন্ত্রী Giolitti বামদলগুলাের একটি প্রতিপক্ষ দাঁড় করতে চাইছিলেন। মুসােলিনী তাদের এই প্রয়ােজন মেটাতে এগিয়ে এলেন। Giolitti সরকার গােপনে আর পুঁজিপতিরা প্রকাশ্যে মুসােলিনীকে তহবিল সরবরাহ করল। সরকার ঘােষণা দিল সামরিক

দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া ৬০০০০ যুদ্ধফেরত সৈন্য যদি মুসােলিনীর দলে যােগ দেয় তাহলে তারা সামরিক বাহিনীতে থাকা অবস্থায় বেতনের শতকরা ৮০ ভাগ পাবে। Giolitti মুসােলিনীর দলকে সঙ্গে নিয়ে ১৯২১ সালের মার্চ মাসে নির্বাচন করে তাদের ৩৫টি সংসদীয় আসন পাবার ব্যবস্থা করল। বিনিময়ে মুসােলিনীর দলের সশস্ত্র সদস্যরা পরিকল্পিত ভাবে সারা দেশে শ্রমিক সংগঠন গুলাে ও বামপন্থী দলগুলাের উপর আক্রমণ চালাতে শুরু করল। পঞ্চাশ ষাট জনের সশস্ত্র দল এক একটি এলাকায় গিয়ে অফিস ভাংচুর ও শ্রমিক বা বামপন্থী দলগুলাের কর্মীদের মারপিট করে চলে আসত। পুলিশ আসত তারা চলে যাবার পর, এমনকি তারা হত্যাকান্ড, নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও অপরাধী ধরার ব্যবস্থা নিত না।” আক্রমণকারী ফ্যাসিষ্ট দলগুলাের সংখ্যা অক্টোবর ১৯২০ সালে ছিল ১৯০, ১৯২১ সালের অক্টোবরে তা হল ২৩০০। শ্রমিক সংগঠনগুলাে ও বামপন্থী দলগুলাে এই আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তােলার চেষ্টা করল। তারাও সশস্ত্র দল গড়ে তুলল arditi del popolo নামে। এই সশস্ত্র দলগুলাের পাল্টা আক্রমণে ফ্যাসিষ্টরা প্রথমে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন ও বামপন্থী দলগুলাের মধ্যে বিভক্তি তাদের আবার সুযােগ এনে দিল। তারা আবার আক্রমণ শুরু করল। সােশ্যালিষ্ট দলের এক অংশ এবং প্রধান শ্রমিক ইউনিয়ন ফেডারেশন ফ্যাসিষ্ট দলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করল। কমিউনিষ্টদের নেতা বলল ফ্যাসিষ্ট ও অন্যান্য ডানপন্থী দলগুলাে একই। তারা নিষ্ক্রিয় রইল। সােশ্যালিষ্টদের আর এক অংশও কোন অবস্থান না নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকল।

শেষ পর্যন্ত বামপন্থী দল ও শ্রমিক ইউনিয়ন গুলাে একত্রিত ভাবে ফ্যাসিষ্টদের প্রতিহত করার উদ্যোগ নিল। কিন্তু ফ্যাসিষ্ট দলগুলােকে পরাজিত করার মতাে যথেষ্ট সংখ্যায় শ্রমিকদের সংগঠিত করে রাস্তায় নামাতে তারা পারল না। ফলে মুসােলিনীর শক্তি বাড়তেই থাকল। শক্তিশালী হয়ে ওঠায় Giolitti তাকে সরকারে স্থান দিতে চাইল। এবার মুসােলিনী তাদের পরাজিত করতে চাইল। সে দাবী করল তাকে ক্ষমতা না দিলে সে তার ফ্যাসিষ্ট বাহিনী নিয়ে রােম দখল করবে। পুঁজিপতিরা চাইলে সৈন্যবাহিনী ব্যবহার করে তখনও মুসােলিনীকে আটকাতে পারত। কিন্তু তারা সেটা করল না। রাজা মুসােলিনীকে প্রধানমন্ত্রী নিয়ােগ করল-আর মুসােলিনী বিজয়ীর বেশে মিলান থেকে রােমে প্রবেশ করল। লিবারেল দল যারা এর আগে ক্ষমতায় ছিল, তারা মুসােলিনীকে সমর্থন দিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিল। তারা তার প্রথম মন্ত্রী সভায় পদও গ্রহণ করল। সমস্ত রাজনৈতিক দল এমনকি সােশ্যালিষ্ট দল হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মনে হল হানাহানি ও গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটবে। একমাত্র কমিউনিষ্টরা তা মনে করেনি। বাস্তবে দুঃস্বপ্নের শুধু সূচনা হল। মুসােলিনী ক্ষমতায় থাকায় পুলিশ ও ফ্যাসিষ্টরা সমবেত ভাবে শ্রমিক সংগঠন গুলাে ভেঙ্গে দিল। ফ্যাসিষ্টদের কর্মকান্ড প্রতিরােধ করার মত আর কোন শক্তি থাকল না। ১৯২৪ সালে মুসােলিনীর দুবৃত্তেরা একজন সােশ্যালিষ্ট সংসদ সদস্য মাত্তেওত্তিকে হত্যা করল। দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সম্ভাবনা ছিল ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ালে মুসােলিনী ক্ষমতাচ্যুত হত। বিরােধী সংসদ সদস্যরা শুধু সংসদ অধিবেশন বর্জনেই তাদের প্রতিবাদ সীমিত রাখলেন, কিছুদিন পর আবার ফিরেও গেলেন। মুসােলিনী তখন অপ্রতিহত একনায়কতন্ত্র চালু করলেন। বৃটিশ রক্ষণশীল নেতা উইনষ্টন চার্চিলও মুসােলিনীর প্রশংসা করেছিলেন। ইউরােপের অন্যান্য নেতারাও মুসােলিনীর পদ্ধতি অনুসরণ করলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন মিউনিখের উঠতি জাতীয়তাবাদী এডলফ হিটলার।

The political situation after the First World War

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি

জোসেফ ষ্ট্যালিন এর “এক দেশে সমাজতন্ত্র” (socialism in one country) এর নীতির ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কমিউনিষ্ট পার্টিগুলির কর্ম পদ্ধতি প্রভাবিত হয়। বৃটেনে মিত্র সৃষ্টির জন্য বৃটিশ ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস বা TUC র সঙ্গে Anglo-Soviet Trade Agreementকরা হয়, যদিও TUC শ্রমিকদের সাধারণ ধর্মঘটের সঙ্গে প্রতারণামূলক আচরণ করেছিল।২২ প্রাচ্যদেশে চিয়াং কাইশেক এর সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করার জন্য চীনের কমিউনিষ্টদের তার সঙ্গে সহযােগিতা করতে বলা হয়। যদিও এর আগে চিয়াং কাইশেক শ্রমিক সংগঠন গুলাের উপর হামলা করেছিল।

১৯২৮ সালে সােভিয়েত ইউনিয়নে দ্রুত শিল্পায়নের কর্মসূচি শুরু করা হল। অন্যান্য দেশের কমিউনিষ্ট দলগুলিকে আবার কর্মপদ্ধতি বদলাতে বলা হল। এতদিন যাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তােলার প্রচেষ্টা চলছিল সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট দলসমূহের ভিতরে বাম অংশগুলিকে এখন শত্রুপক্ষ বলা হল। এই রাজনৈতিক গােষ্ঠীকে অতি ডানের মত বিপদজনক আখ্যায়িত করে

তাদের সঙ্গে রাজনীতি না করার উপদেশ দেওয়া হল। অন্যান্য দেশের কমিউনিষ্ট দলগুলাের নেতৃত্ব এই উপদেশ না মানলে নেতৃত্বে পরিবর্তন করা হল।

১৯২৯ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণীর এক অংশ আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে এবং পুঁজিবাদের ক্ষতিকর দিক সম্বন্ধে কমিউনিষ্টদের প্রচারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এর মধ্যে বেকার ও বয়ােকনিষ্ঠ শ্রমিকরাই ছিল প্রধান। কিন্তু শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পুঁজিবাদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেললেও এই দুঃসময়ে তারা প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক ইউনিয়ন ও সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট দলের ছত্রছায়ায় থাকা নিরাপদ মনে করল।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরবর্তী বৎসর গুলােতে জঙ্গি আন্দোলন হয় দেশে দেশে। স্পেনে ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলন হয় ও রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। ফ্রান্সেও আন্দোলনের ফলে popular front সরকার ক্ষমতা নেয়। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও প্রচন্ড আন্দোলন হয় এবং অনেক শ্রমিক ইউনিয়নের গােড়া পত্তন হয়, এক আন্দোলনের ফলে তখন পৃথিবীর সব চাইতে বড় মােটর গাড়ি কারখানা জেনারেল মােটরস শ্রমিকরা সাময়িকভাবে দখল করে। কিন্তু প্রায় সব দেশেই সােশ্যাল ডেমক্র্যাট দলগুলি শ্রমিকদের উপর তাদের প্রভাব বজায় রাখল। জনপ্রিয় বামপন্থী স্লোগান দিয়ে অনেক দেশে তারা প্রভাব বাড়াতে পারল। ফলে কমিউনিষ্টরা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের বড় অংশের সমর্থন হারাল। কমিউনিষ্ট পার্টিগুলাে ছয় বৎসর এই নীতি অনুসরণ করেছিল। অনেক স্থানেই তারা আন্দোলন শুরু করে, কিন্তু শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় আন্দোলন ব্যর্থ হয়। তাতে তাদের সমর্থকদের সংখ্যা কমতে থাকে। ফ্রান্সের কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা ১৯২৮ সালে ছিল ৫২০০০, ১৯৩১ সালে তা হয় ৩৬০০০। আমেরিকায় কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা এই। সময়ে ১৪০০০ হাজার থেকে কমে ৮০০০ হয়। বৃটিশ পার্টির সদস্য সংখ্যা ৫৫০০ থেকে কমে ২৫০০ হয়।

জার্মানীতে কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা বাড়ে। ১৯২৮ সালে ১২৪০০ থেকে ১৯৩১ সালে ২০৬০০ হয়। অর্থনৈতিক বিপর্যয় সমাজকে এখানে আমেরিকার চাইতে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেকেই সাত বৎসর আগে মুদ্রাস্ফীতির জন্য তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছিল। তারা এখন চাকুরীও হারাল। কিন্তু এখানেও কমিউনিষ্টরা হিটলারের নাৎসী উত্থান রুখে দিতে চাইলেও সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটদের সহযােগিতা না পাওয়ায় কার্যকর কিছু করতে পারল না।

অ্যাডলফ হিটলার

হিটলারের ক্ষমতা দখল

১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে যখন অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়, তখন জার্মানীতে সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট দলের নেতা মুলার অন্যান্য দলের সমন্বয়ে ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৩০ সালে মন্দা শুরু হয়-সরকারের এই মন্দা থেকে কিভাবে উদ্ধার পাওয়া যায় তার কোন ধারণাই ছিল না। বেকারদের সংখ্যা বাড়ায় তাদের ভাতা দিতে খরচ বেশী হতে লাগল। অন্য দিকে শিল্প উৎপাদন কমায় সরকারের কর হতে আয় কমতে থাকল। সরকারের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে থাকল। আমেরিকা যে অর্থ Dawes plan এর আওতায় জার্মানীকে দিয়েছিল তা ফেরত নিতে চাইল। এই টাকাই জার্মান অর্থনীতিকে গতিশীল করে রেখেছিল, তাই জার্মান অর্থনীতি ও শ্লথ হয়ে গেল। ফলে সরকারের পতন ঘটল।

অন্যান্য পশ্চিম ইউরােপীয় দেশের তুলনায় জার্মানীর অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র ছিল। তুলনায় দেখা যায় বৃটেনের চাইতে জার্মানীতে ঐ সময় বেকারত্বের হার পঞ্চাশ শতাংশ বেশী ছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীও সংকটের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অর্থনৈতিক মন্দার ফলে হিটলারের National Socialist Party বা নাৎসী পাটির সমর্থন বাড়তে থাকল। ১৯২৭ সালের দিকে এই দল আট লক্ষ ভােট পেয়েছিল। ১৯৩২ সালে তা হল ৬০ লক্ষেরও বেশী। ১৯৩৪ সালে তা ৮০ লক্ষের উপরে গেল। তবে নাৎসী পার্টি সাধারণ রাজনৈতিক দল ছিল না। এদের ছিল একটি আধা-সামরিক সংগঠন যার নাম ছিল “Storm Troopers”। এই সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা অর্থনৈতিক সংকটের জন্য নেতারা যাদেরকে দায়ী বলে চিহ্নিত করতেন, তাদের আক্রমণ করত। সাধারণতঃ ইহুদী ব্যবসায়ী ও সমাজতান্ত্রিক মনােভাবাপন্ন শ্রমিক সংগঠন গুলাে ছিল তাদের আক্রমণের লক্ষ্য। ইতালীতে মুসােলিনী যেভাবে সশস্ত্র সংগঠনের মাধ্যমে তার দলকে শক্তিশালী করছিল, হিটলার তারই অনুসরণ করেছিল। তবে ইতালীর ফ্যাসিষ্ট দল শুরুতে ইহুদী বিরােধী ছিল না। ১৯৩০ এর দশকের শেষের দিকে হিটলারের সঙ্গে মৈত্রী করার পর তারা ইহুদী বিরােধী হয়।

১৯২৩ সালে ফ্রান্স জার্মানীর Ruhr অঞ্চল দখল করে নেওয়ার সময় হিটলারের দল প্রাধান্য অর্জন করে। বাভারিয়ার মিউনিখ শহরে উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসী দলগুলাের মধ্যে এটি ছিল একটি। কিন্তু ১৯২৩ সালে মিউনিখের মেয়র এর পদ দখল করার চেষ্টা বিফল হওয়ার পর এই দলটি শক্তি হারায়। অর্থনৈতিক সংকট ঘটায় এটা আবার প্রাণ ফিরে পায়। মধ্যপন্থী দলগুলাে এই সময় ক্ষমতায় ছিল। অর্থনৈতিক সংকট মােকাবিলা করতে না পারায় এই দল গুলাে থেকে মানুষ নাৎসী দলে আসতে থাকে। অর্থনৈতিক সংকটে শুধু যে শ্রমিক ও দরিদ্রশ্রেণীর মানুষ দুর্ভোগে ছিল তাই নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণীও অর্থকষ্টে ছিল এবং অনেকে দেওলিয়া হয়ে যাচ্ছিল। ইতালীর ফ্যাসীবাদের মত জার্মানীর নাৎসী দল ছিল মূলতঃ মধ্যবিত্তদের নিয়ে গঠিত। শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।* প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষেরা নিজেদের শ্রমিকদের চাইতে শ্রেয় মনে করত এবং শ্রমিকদের আন্দোলন এবং সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ঘৃণা পােষণ করত। এটা নাৎসী দলের প্রতি মধ্যবিত্তদের একটা আকর্ষণের কারণ ছিল। আর একটা কারণ ছিল বামদলগুলাের ভ্রান্ত ধারণা। এই দলগুলাের নেতৃবৃন্দ মনে করতেন জার্মানীতে ইতালীর মত উগ্র ডানদলের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা ছিল কম। ১৯২৭ সালে কার্ল কাউৎস্কী বলেছিলেন জার্মানীর মত শিল্পোন্নত দেশে যথেষ্ট সংখ্যায় নিম্নবর্গের মানুষকে পুঁজিপতিদের স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।২৫ ১৯৩৩ সালের জানুয়ারীতে হিটলারের ক্ষমতা দখলের অল্প কিছুদিন আগেও হিলফারদিং বলেছিলেনসােশ্যাল ডেমােক্র্যাটরা শাসনতান্ত্রিক রাজনীতি অনুসরণ করে নাৎসীদেরও এই পথে থাকতে বাধ্য করেছে এবং নাৎসীদেরও পতন ঘটবে। ১৯৩০ সালে ক্ষমতা হারানাের পর পরবর্তী সরকার গুলাের আমলে অর্থনৈতিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি সত্ত্বেও সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট নেতারা সহনশীল মনােভাব দেখাচ্ছিলেন। যদিও এই সরকার গুলাে ক্রমেই শ্রমিক ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর শােষণের মাত্রা বাড়াচ্ছিল। এই বিক্ষুদ্ধ শ্ৰেণীগুলির সমর্থন পাওয়ার পথ করে দিয়েছিল সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট দলের নিস্ক্রিয়তা।

নাৎসীদের সশস্ত্র হামলা প্রতিরােধ করার জন্য সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটরা Reichsbanner নামে একটি আত্মরক্ষামূলক সংগঠন করেছিল। এই সংগঠনকে ব্যাপক জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নাৎসীদের হামলা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট দলের নেতারা এই সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিলেন না। সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটরা প্রুশিয়া রাজ্যে সরকারের ক্ষমতায় ছিল এবং এই রাজ্যের ছিল একটি অস্ত্রসজ্জিত পুলিশ বাহিনী। বার্লিনে ১৯২৯ সালের মে দিবসে কমিউনিষ্টদের নেতৃত্বে শােভা যাত্রায় গুলি চালানর জন্য তারা এই পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করেছিল। এতে ২৫ জন নিহত হয়েছিল। তারা নাৎসীদের কর্মকান্ড প্রুশিয়াতে বন্ধও করেছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত শাসনতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করায় নিজেদের টিকিয়ে রেখে নাৎসীদের প্রতিরােধ করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৩১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা কোন প্রার্থী দেয়নি। তারা হিন্ডেনবার্গকে সমর্থন দিয়েছিল। হিন্ডেনবার্গ তার প্রতিদান দিয়েছিল নাৎসীদের সহযােগীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে, প্রুশিয়ার সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট সরকারকে বরখাস্ত করে। সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটরা বিনা প্রতিবাদে তা মেনে নেয়। এতে নাৎসীরা আরও অপ্রতিহত ভাবে তাদের নিপীড়ন মূলক তৎপরতা চালানর সুযােগ পায় । এতে এরকম মনে হয় যে, তারা একমাত্র ক্ষমতাধর এবং তারাই অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম এটা মনে করেছিল। ১৯৩৩ এর জানুয়ারীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন নাসীরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল, তখন সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটরা কোন সভা করেনি। কাজেই মানুষ বিভ্রান্ত হল, এটা আশ্চর্য নয়।

কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিষ্ক্রিয়তা হিটলারকে একছত্র ক্ষমতা দিয়েছিল তা নয়। হিটলার চ্যান্সেলর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন পীড়ন করার পরও ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে নাৎসীরা ভােট পেয়েছিল ৪৩.৯ শতাংশ। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হিটলার তখনই পেল যখন পুঁজিপতিরা এটা তাকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অনেক আগে থেকেই তারা শ্রমিক সংগঠনগুলাের বিরুদ্ধে দাঁড় করানাের জন্য নাৎসীদের অর্থ দিয়ে আসছিল। কিন্তু ১৯৩২ সাল পর্যন্ত পুঁজিপতিরা বড় সমর্থন দিয়ে আসছিল দুটি দলকে, যারা ছিল তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা সমর্থন করত জার্মান পিপলস পার্টিকে আর বড় ভূ-স্বামীরা সমর্থন করত জার্মান ন্যাশনাল পার্টিকে। এই দুই গােষ্ঠীর অনেকেই নাৎসী দলের উপর পুরােপুরি আস্থা রাখতে পারত না। কারণ শ্রমিক সংগঠনগুলাে ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলিকে আক্রমণ করার সাথে সাথে নাৎসীরা বড় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সােচ্চার ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা যতই তীব্র হতে থাকল ততই উচ্চ শ্রেণীর নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল যে, ভার্সাই চুক্তি বাতিল করতে হবে, ক্ষতিপূরণ দেওয়া বন্ধ করতে হবে আর শ্রমিক সংগঠন গুলাের ক্ষমতা খর্ব করতে হবে, তা না হলে মন্দা থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে না। ১৯৩১ সালের গ্রীষ্মকালে পুঁজিপতিদের প্রতিনিধিরা মনে করেছিল জার্মান প্রজাতন্ত্রের তখনকার অবস্থা ছিল ‘অবমাননাকর” এবং “জাতীয় একনায়কতন্ত্র” স্থাপন করার আহবান জানিয়েছিল।

Ruhr অঞ্চলের শিল্পপতিরা, বড় ভূস্বামীরা ও সেনাবাহিনীর অধিকাংশ অফিসার এর সঙ্গে একমত ছিলেন। নাৎসীদের মধ্যে যে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে ছিল, Otto Strasser,তাকে হিটলার বহিষ্কার করল। ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরে হিটলার National Party, Peoples Party,পুঁজিপতি ও ভূস্বামীদের সঙ্গে হার্জবার্গ (Harzberg) এ মতবিনিময় করল। ১৯৩২ সালে হিটলার Ruhr এর শিল্পপতিদের সঙ্গে সভা করল। এভাবে হিটলার পুঁজিপতি, ব্যবসায়ী, ভূস্বামীদের আশ্বস্ত করতে লাগল যে নাৎসীরা তাদের সাহায্যই করবে।

১৯৩২ সালে পুঁজিপতিরা এই সিদ্ধান্তে পৌছুল যে তাদের পক্ষে সরকারের নীতি পরিচালনার জন্য নাৎসীদের সরকার তারা চায়। কিন্তু কতটা ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে সে ব্যাপারে দ্বিধা ছিল। বেশীরভাগই তাদের আস্থাভাজন মধ্যপন্থী দলগুলােকে ক্ষমতার প্রধান অংশীদার করে হিটলারকে ছােট অংশীদার রাখার পক্ষে ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন Von Schleicher এর সরকার তাদের চাহিদা মেটাতে যতই ব্যর্থ হল, ততই তারা হিটলারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করল, যদিও অনেকেই এই সাবেক কপোরাল, যার বক্তব্য প্রায়ই ছিল উচ্ছঙ্খল, তার উপর তারা আস্থা রাখতে পারছিল না। পুঁজিপতি ও বড় ভূ-স্বামীদের নেতৃত্বের চাপে প্রেসিডেন্ট হিডেনবার্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর নিয়ােগ দেন। শিল্পপতিদের অনেকেরই এতে পুরাে সম্মতি না থাকলেও তারা কোন বাধা দেয়নি। বরং হিটলার চ্যান্সেলর হয়ে সংসদে তার শক্তি বাড়ানর জন্য যে নির্বাচন ডাকল তাতে তারা আর্থিক সমর্থন দিল। হিটলার মধ্যবিত্তদের তার সমর্থনে নিয়ে আসতে পেরেছিল বলেই শাসকগােষ্ঠী তাকে শাসন ক্ষমতায় বসিয়েছিল। শাসক গােষ্ঠীর কাছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার চাইতে হিটলারের ক্ষমতায় আসাও ছিল ভাল, জার্মানীর রাজনীতিতে বামপন্থীদের উত্থানের চাইতে ভাল তাে অবশ্যই। নির্বাচনে নাৎসীদল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় নাই, তারা শতকরা ৪৪ ভাগ ভােট পেল। অন্যান্য মধ্যপন্থীদলগুলাের সহযােগিতায় তারা সরকার গঠন করল।

জার্মানীর কমিউনিষ্টরা সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নাৎসীদের মােকবিলা করে নাই। তারা ধরে নিয়েছিল নাসীরা স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে না ও তাদের পতন হবে।২৭ তারাও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনীতির পথে চলছিল। কিন্তু নাৎসীরা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করছিল না। শ্রমিক শ্রেণীর নেতাদের আক্রমণ করা, বিরােধীদের খুঁজে বের করে তাদের শায়েস্তা করা, পুলিশের সহযােগিতায় বিরােধীদের নির্যাতন করা, এসব নাৎসীদের নিত্যদিনের কাজ ছিল। ক্ষমতা নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে নাৎসীদের আধা-সামরিক সংগঠনগুলিকে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করে ফেলা হল। ১৯৩৩ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী জার্মানীর সংসদ ভবন (Reichstag) এ আগুন ধরে যায়। কমিউনিষ্ট পার্টিকে এইজন্য দোষারােপ করে এই দলকে নিষিদ্ধ ঘােষণা করা হয়। এই দলের সব সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ঐ আসনগুলি শূন্য করা হয়। ফলে হিটলারের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারে। কমিউনিষ্ট পার্টির প্রায় দশ হাজার সদস্যকে concentration camp এ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সােশ্যাল ডেমােক্র্যাট দলের নেতারা তখনও মনে করছিলেন তাদের উপর আক্রমণ আসবে না। এমনকি দলের মধ্যে যারা প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল তাদের বহিষ্কার করা হয়। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ১লা মে উদযাপনে সহায়তা করে। তার পরদিন এদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে concentration camp এ দেওয়া হয়। ক্ষমতা দখল থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত প্রায় ২২৫০০০ মানুষকে রাজনৈতিক কারণে কারারুদ্ধ করা হয়। প্রায় দশ লাখ জার্মানকে concentration camp এ পাঠানাে হয়। এরপর মধ্যপন্থী দুটি দল যারা পুঁজিপতি ও ভূ-স্বামীদের স্বার্থ দেখাশােনা করত (ন্যাশনাল পার্টি ও পিপলস পার্টি) তাদের বিলুপ্ত করা হল। সকল পেশাজীবী সংগঠন এমনকি বয়স্কাউটদেরও স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করা হল। কেউ আপত্তি জানালে তাকে গেষ্টাপােরা (জার্মান গুপ্ত পুলিশ বাহিনী) ধরে concentration camp এ পাঠিয়ে দিত। এইভাবে হিটলার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করল। এক বৎসর পর হিটলার প্রেসিডেন্টের পদও দখল করল। শুধুমাত্র পুঁজিপতিরা ও সামরিক অফিসাররা তার নির্যাতনের বাইরে রইল।

Stock-Market-Crash-of-1929

আমেরিকার সংকটকাল

১৯৩৩ সালের পর আমেরিকায় শিল্প উৎপাদন বাড়ল, বেকারত্বের হারও কমল। অনেকেই মনে করলেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেওয়া পদক্ষেপের ফলেই অর্থনীতি আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু ১৯৩৭ সালে আবার অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিল। আমেরিকার অর্থনীতির ইতিহাসে সবচাইতে গভীর মন্দা ছিল এটি। ২৮ অর্থনীতি যতটুকু পুণরুজ্জীবিত হয়েছিল

তার অনেকটাই আবার হারিয়ে গেল। ইস্পাতের উৎপাদন চার মাসের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশের বেশী কমে গেল, তাঁতবস্ত্রের উৎপাদন শতকরা ৪০ ভাগ কমল।

অর্থনীতি কম সময়ের জন্য আবার সচল হয়েছিল। এই সময় শ্রমিকরা সংগঠন করার অধিকার কিছুটা ফিরে পেয়েছিল। শ্রমিক ইউনিয়ন সদস্য সংখ্যাও বেড়েছিল। কিন্তু ধর্মঘট করলে মালিকপক্ষ ও পুলিশ তখনও শ্রমিকদের উপর হিংস্র হামলা করত। রুজভেল্টের New Deal আমলের প্রথম ছয় মাসে ১৫ জন ধর্মঘটকারী শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছিল, ২০০ জন আহত হয়েছিল আর শত শত গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকরা সাহস হারায়নি তা ১৯৩৪ সালে তিনটি ধর্মঘটে বােঝা গেলঃ তলেদোর গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরীর কারখানায়, সান ফ্রানসিসকোতে বন্দর শ্রমিকদের আর মিনেয়াপলিসে ট্রাক শ্রমিকদের ধর্মঘটে। তারা কোর্টের আদেশ উপেক্ষা করে পুলিশ ও গুন্ডাদের আক্রমণ প্রতিহত করল ও দাবী আদায় করল। তিন ক্ষেত্রেই বামপন্থীরা (কমিউনিষ্ট ও ট্রটস্কীপন্থী) ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়েছিল।

বড় শ্রমিক সংগঠনগুলাের নেতৃবৃন্দ এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত বােধ করলেন। এর আগের দশকে তাদের সংগঠনগুলাের সদস্য সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে এসেছিল, ১৯২০ সালে চল্লিশ লক্ষ থেকে ১৯৩৩ সালে তা বিশ লক্ষ হয়। এতে সরকারী সিদ্বান্তের উপর প্রভাব খাটানর ক্ষমতা তাদের অনেক কমে যায়, পুঁজিপতিরাও তাদের অবজ্ঞা করতে থাকে। শ্রমিকদের শিল্পভিওিক ইউনিয়নে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে সংগঠনগুলাের উদ্যম ফিরে আসতে শুরু হয়। ১৯৩৫ ও ১৯৩৬ সালে গুডইয়ার ও ফায়ার ষ্টোন কোম্পানীর আকরন (Ohio) এর রাবার কারখানার শ্রমিকেরা অবস্থান ধর্মঘট করে । অন্যান্য শ্রমিকেরা কারখানা ঘিরে রাখে পুলিশ ও গুন্ডা বাহিনীকে আটকানর জন্য। অন্যান্য শিল্পেও ধর্মঘট হয়। সেই বৎসর প্রায় ৪০ টি অবস্থান ধর্মঘট হয় । সবচাইতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মঘট হয় জেনারেল মটরস এর ফ্লিন্ট (Michigan) এর কারখানায়। এক পর্যায়ে কোম্পানীর ১৫০০০০ শ্রমিকের মধ্যে ১৪০০০০ শ্রমিকই ধর্মঘট করেছিল। তারা কোর্টের আদেশ অমান্য করে ও সশস্ত্র পুলিশকে প্রতিরােধ করে ধর্মঘট চালায়। শেষ পর্যন্ত শ্রমিক ইউনিয়নকে স্বীকৃতি দিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। ক্রাইসলার ও ওয়েষ্টার্ন ইউনিয়ন এসব বড় কোম্পানীর শ্রমিকদের থেকে শুরু করে রেষ্টুরেন্ট শ্রমিক এমনকি আবর্জনা সংগ্রাহকরা ধর্মঘট করে। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১৮ লক্ষ শ্রমিক ধর্মঘট করে। শ্রমিক সংগঠন গুলাের সদস্য সংখ্যা চার বৎসরের মধ্যে ২০ লক্ষ থেকে ৭০ লক্ষ হয় ।

এই শ্রমিক আন্দোলনগুলাের মাধ্যমে আমেরিকার পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় যে পরিবেশ তখন ছিল তা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। যেখানে ধর্মঘট সফল হয়েছিল সেখানেই শ্রমিকদের মধ্যে যৌথ সংগ্রামের মনােভাব সৃষ্টি হচ্ছিল এবং বর্ণবাদ কমে যাচ্ছিল। একটা সমস্যার কারণে এই সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত পূরণ করা গেল না। এই সময়ের আগে শ্রমিক আন্দোলনের নেতারা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে সবচাইতে ভাল মেনে নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সাথে সমঝােতা করে অবস্থান করতেন। ১৯৩৩ পরবর্তী শ্রমিক নেতারা সিদ্ধান্ত নিলেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও ডেমােক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে মিত্রতাই শ্রমিক স্বার্থের অনুকূল। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নির্বাচনে শ্রমিকদের সমর্থন নিতে রাজী ছিলেন। কিন্তু তিনি শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে যেতে রাজি ছিলেন না, তা বােঝা গেল ১৯৩৭ সালের শেষ দিকে ইস্পাত শ্রমিকদের ইউনিয়নভুক্ত করা নিয়ে। জেনারেল মটরস এ সফল ধর্মঘটের পর ছােট ছােট শিল্প মালিকেরা শ্রমিকদের ইউনিয়নভুক্তি মেনে নিলেও বৃহৎ পুঁজিপতিরা তাতে রাজী ছিল না। ১৯৩৭ সালের মে মাসে প্রায় ৭৫০০০ ইস্পাত শ্রমিক ইউনিয়নকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ধর্মঘট করল। মালিক পক্ষ পুলিশ ও গুন্ডাদের দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে ১৮ জন শ্রমিককে হত্যা করল। আর অনেক আহত ও গ্রেফতার হল। শ্রমিক নেতাদের ধারণা ছিল ডেমােক্র্যাটিক পার্টি থেকে নির্বাচিত গভর্নর, মেয়র এরা তাদের পক্ষে, শ্রমিকদের তাই ধারণা দেওয়া হয়েছিল। এ রকম দমন পীড়নের জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। তাদের মনােবল ভেঙ্গে গেল। শ্রমিক নেতারা যখন রুজভেল্টের সমর্থন চাইলেন, তিনি শ্রমিকদের নিন্দা করলেন। অর্থনৈতিক মন্দা আবার শুরু হওয়ার সময়ই এইভাবে শ্রমিকদের সংগঠিত করার একটা বড় উদ্যোগ ব্যর্থ হল। পরবর্তী দুই বছরে ইউনিয়নগুলােতে মাত্র ৪ লক্ষ সদস্য যােগ হল। ১৯৩৯ সাল নাগাদ ধর্মঘটের সংখ্যা ১৯৩৭ সালের তুলনায় অর্ধেক কমে গেল। শ্রমিক নেতারা পুঁজিপতিদের সঙ্গে সহযােগিতা করা শুরু করল এবং শ্রমিকদের দাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলন কমিয়ে আনল। কমিউনিষ্ট পার্টি ১৯৩৪-৩৭ সালের শ্রমিক আন্দোলন গুলােতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাদের সাহসী ভূমিকার জন্য তারা অনেক শ্রমিককে তাদের মতবাদে আকৃষ্ট করেছিল। ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত কমিউনিষ্টদের বক্তব্য ছিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পুঁজিপতিদের প্রতিভূ আর তার “New Deal” কর্মসূচী হল ধোকাবাজী।

এরপর হঠাৎ তারা নীতি পরিবর্তন করে ডেমােক্র্যাটদের সঙ্গে যৌথ ফ্রন্ট গঠন করে এবং শ্রমিক আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত করে। এই নীতি দশ বৎসর স্থায়ী থাকে। ইউনিয়ন নেতারা ধীরে ধীরে কমিউনিষ্টদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে থাকে এবং ১৯৪০ এর দশকে তাদের প্রভাব একদমই বিনষ্ট হয়।

এইসব ঘটনাবলির একটা আদর্শগত প্রতিফলন হল। ১৯২৯ সালে শুরু হওয়া বিশ্বমন্দা শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীদের উপর বিরাট প্রভাব ফেলে। যে শাসকশ্রেণী ছিল আত্মবিশ্বাসী, এই সময়ে তাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখা গেল। অর্থনৈতিক সংকটের আঘাতে শ্রমিক, মধ্যবিত্ত সবারই জীবনধারা বিপর্যস্ত হল। এই সময় ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলন সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নাড়া দেয়। বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা কমে আসতে লাগল। নতুন মূল্যবােধের খোঁজে সাহিত্য ও শিল্পকর্মের ধারা পরিবর্তন হল। John Steinbeck, Richard Wright, John Dos Passos, Ralph Ellison প্রমূখ লেখক, Charlie Chaplin, Joseph Losey,Nicholas Ray, Eliza Kazan প্রমূখ চলচ্চিত্র নির্মাতা, Paul Robson, Aaron Copeland, Woody Guthrieপ্রমুখ সঙ্গীত শিল্পী তাদের সৃষ্টিতে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ভাঙ্গন তুলে ধরার সাথে সাথে নতুন পথ খোঁজার সূচনা করলেন। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের New Deal তাদেরকে পুরনাে চিন্তাধারার পরিবর্তনের একটা সুযােগ করে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা সরকারী প্রকল্পে চাকুরী, পত্রিকায় ও রেডিওতে প্রচার এর সুবিধা, হলিউডের চিত্রজগতে সুযােগ পেতে পারতেন। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত এই প্রলােভন অধিকাংশ শিল্পী, সাহিত্যিক প্রত্যাখ্যান করলেন। তাদের সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে যে দৃষ্টিভঙ্গী তারা তুলে ধরলেন তার সঙ্গে রুজভেল্টের লক্ষের পার্থক্য পরিষ্কার ছিল। শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম, সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট ও প্রত্যাশা গুলাে তাদের কাজে ফুটে উঠল। এসবই ধাক্কা খেল যখন কমিউনিষ্ট পাটি রুজভেল্টকে সমর্থন করা শুরু করল। যেসব সংস্কৃতিকর্মীরা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজ পরিবর্তনের কথা বলতে শুরু করেছিলেন তাদেরকে নিরুৎসাহিত করে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে বলা হল। কমিউনিষ্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল শিল্পী, সাহিত্যিকদের তাদের দৃষ্টিভঙ্গী নমনীয় করে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান গুলােতে কাজ করার জন্য উপদেশ দেয়া হল। সংস্কৃতির ধারা বদলানাের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তার অগ্রগতি শ্রমিকদের আন্দোলনের মতই বন্ধ হয়ে গেল।

তথ্যসূত্র

  1. Cameron R. A Concise Economic History of the World. New York, 1997 p 349 2. http//en.wikipedia.org/wiki/Fordney/E2/80/93/McCumber_Tariff. Accessed 18 March, 2013 0. http://en.wikipedia.org/wiki/Smoot/E2/80/93/Hawley-Tariff-Act accessed 18 March 2013 8. Madsen JB. Trade Barriers and the Collapse of World Trade During the Great Depression

Southern Economic Journal, 2001;67:,848-868 (. Cameron Rp 351 6. Cameron R. p 352 9. Harman C. A People’s History of The World. London, 2008 p 466 b. Day RB. The “Crisis” and the“Crash”. London, 1981 p 80-81 d. Cameron R. P 355 Jo. Hobsbawm E. The Age of Extremes. London, 1994 p 91 ss. Hobsbawm E. p 97 33. Historical Statistics of the United States: Colonial Times to 1970, part Ic, Washington DC,1975 p

105 so. Hobsbawm E. p 100 38. Cameron R. p 356 se. Cameron R. p 357 sy. Hobsbawm E. p 86 39. Harman C. p 513 3b. Kindelberger CP. The World of Depression. London, 1973 p 272 sa. Cameron R. p 360 20. Rossi A. The Rise of Italian Fascism. London, 1938 p 82,99,126 33. Carrocci O. Italian Fascism, Harmondsworth. 1975 p 27 83. Harman C. p 479 20. Harman C. p 481 18. Noakes J and Pridham G. Nazism 1919-45. Volume-1. The Rise to Power 1919-34 Exeter, 1983 p

84 16. Beetham D. Marxists in the Face of Fascism. Manchester, 1983 p 248 Ry. Schweitzer A. Big Business in the Third Reich. Bloomington, 1963 p 95 39. Merson A. Communist Resistance in Nazi Germany. London, 1986 p 29 86. Kindelberger CP. p 272 19. Harman C. p 514 go. Preis A. Labor’s Giant Step. New York, 1982 p 61 os. Widick BJ. Detroit, City of Race and Class Violence, Chicago, 1972 p 74 02. Harman C. p 516 vo. Preis A. p 57 08. Harman C. p 518

https://www.shottershondhane.com/মুক্ত-কর-হে-বন্ধ-সপ্তম-অধ্/

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *