২০২১ সনের নববর্ষ ও ইহুদি মুসলমান স্বাপ্নিক চুক্তি

স্বপ্নময় বিশ্ব নাগরিক হিসেবে পৃথিবীর সকল দেশেই আজ উৎসবের আমেজ। মহাকাশে আলোকজ্জ্বল রাতে নক্ষত্রের চাঁদেরা শুরু করেছে আনন্দ কেলি। আগামীকাল পহেলা জানুয়ারি সকল দেশেই পালিত হবে এক অনন্য নববর্ষ। বিশ্বশান্তির জন্যে এ নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। দীর্ঘ ৭০-বছর ব্যাপি ফিলিস্তিন -ইসরাইলী তথা ইহুদি-মুসলমানরা নিজেদের মানবিক রাক্ষসকে ঝেড়ে ফেলে শুভ্রতায় ফিরে আসছে আজ এক মায়াবতী জ্যোৎস্নায়। যা করাতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে একান্ত আন্তরিকতায় কাজ করতে হয়েছে। ইহুদি-মুসলমান ২-পক্ষই নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যত শান্তির পৃথিবী গড়ার মানসে সব অতীত ক্লেদ ভুলে একটি শান্তিচুক্তির ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছে। আজ ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ রাত ১১.৫৯ মিনিটে তা স্বাক্ষর করা হবে এবং পৃথিবীর সকল মানুষ এই চুক্তিকে নববর্ষের উৎসব হিসেবে পালন করবে বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীর ১০-টি দেশের ১০-জন রাষ্ট্রপ্রধান ও ২-পক্ষের ২-জন এটোর্নী দীর্ঘ ২০-দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে বিবাদমান ২-পক্ষের মধ্যে যে সম্প্রীতির সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, তাতে তাদের ধারাবাহিক ২০-দিনের ক্লান্তিকর কর্মযজ্ঞের মাঝেও সবাই এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে। কিন্তু এ অসম্ভব কাজটি কি দুরূহ পথেই না তাদের সম্পন্নের দিকে এগুতে হয়েছে ক্রমান্বয়ে, যা চিন্তা করলেও অনেকেই এখন বিস্ময়ে বিমুঢ় হন, পেছনে ফিরে তাকান কেউ কেউ।

২০২০ সনের প্রথম দিকে কাকতালীয়ভাবে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিধর সকল রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে চিন্তাশীল শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো নির্বাচিত হয়। পৃথিবীর দীর্ঘদিনের অশান্তি পর্যবেক্ষণে তারা অনুধাবন করেন যে, ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা বিশ্বের উন্নয়নের অন্তরায় ও মানবিকতার পরিপন্থী। যে কোন ভাবে এ সমস্যাটির সমাধান করতে পারলে ২০২১ সালের পৃথিবী হবে একটি শান্তির বিশ্ব। ইজরায়েল-ফিলিস্তিনসহ বিশ্ব নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই অধিকার আছে পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাসের। এ চিন্তা থেকে পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো সম্পূর্ণ সৎদৃষ্টিভঙ্গীতে ৫-টি নিরপেক্ষ মুসলমান ও ৫-টি নিরপেক্ষ অমুসলমান দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে। ১০-টি দেশের ১০-সদস্য ছাড়াও ইজরায়েল-ফিলিস্তিনের পক্ষে তাদের বক্তব্য, অভিযোগ ও দাবীনামা পেশ করার জন্যে ২-জন এটোর্নীর নাম চাওয়া হয়, যারা স্ব-স্ব দেশের পক্ষে যৌক্তিক অভিযোগ ও দাবীনামা পেশ করবে এবং বিপক্ষের দাবীর খন্ডন করবে বা পাল্টা যুক্তি দাঁড় করাবে। যুক্তিতর্ক পেশের পর কমিটির নিরপেক্ষ ১০-সদস্য তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে এবং উভয় পক্ষের জন্যে তা মেনে চলা বাধ্যতামূলক হবে।

মুসলমান দেশের পক্ষে ৫-জুরি হিসেবে ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, বাংলাদেশ, মরক্কো ও আলজিরিয়া এবং অমুসলমান দেশ হিসেবে বেলজিয়াম, সুইজ্যারল্যান্ড, কোরিয়া, বেলিজ ও নিউজিল্যান্ডকে মনোনীত করা হয়। ফিলিস্তিনের পক্ষে এটোর্নী হিসেবে বাংলাদেশের মুসলমান নাগরিক ড. কামাল হোসেন এবং ইজরায়েলের পক্ষে বেলজিয়ামের ইহুদি নাগরিক ড. ইজরায়েল ওয়েলফিন্সন-কে নির্বাচন করে দু’টো দেশ। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে জাতিসংঘের সদর দফতরে বসে বিশেষ এ ‘শান্তি চুক্তি আদালত’। অনুষ্ঠানটি সকল মানুষই যাতে দেখতে পারে, তার জন্যে বিশ্বের সকল দেশেই সরাসরি টিভিতে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয় নিউইয়র্ক থেকে। ১০-দেশের রাষ্ট্রপ্রধান জুরি হিসেবে ২-পক্ষের এটোর্নীকে তাদের অভিযোগ, দাবী ও প্রস্তাবনা পেশের আহবান জানান। লটারীতে প্রথম বক্তব্য পেশের সুযোগ পান ফিলিস্তিনি এটোর্নী ড. কামাল হোসেন। কারিগরী শৈল্পিকতায় ভাষা প্রয়োগ দক্ষতায় বক্তব্য শুরু করেন তিনি –

আরব ও ইহুদিরা উভয়ই ঐতিহাসিকভাবে নুহের ছেলে শামের সেমিটিক জাতির বংশধর। প্রফেট ইব্রাহিমের ছেলে ইসমাইলের বংশধারা থেকে আরব ও ইসহাকের বংশধারার লোকেরা ইজরায়েল নামে পরিচিত, সে হিসেবে প্রকৃত পক্ষে উভয় জাতিই ভাই-ভাই। ফিলিস্তিন রাজ্যটি ১৩’শ খ্রী.পূর্ব থেকে ১ম শতাব্দী পর্যন্ত ইহুদিরা, এরপর রোমানরা, বাইজান্টাইনরা, পারস্যের সাসানিয়রা ও মুসলমান খলিফা ওমরের শাসনামলে ৬৩৭ খ্রী. মুসলমানরা নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরবর্তীতে ক্রুসেডারদের যুদ্ধে খ্রীস্টানদের কাছে যায়। পুন. ১১৮৭ সনে আবার মুসলমানরা দখলে নেয়। ১৩০০ সালের পর আবার খ্রীস্টানদের হাতে যায় ফিলিস্তিন। ১৯১৮-১৯৪৮ পর্যন্ত বৃটিশ শাসনে থেকে তা ইহুদিদের শাসনে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনের আয়তন ছিল ১০,৪২৯ বর্গমাইল। ১৯৪৮ সনে ফিলিস্তিন এলাকার পরিমান ছিল ২৬,৩২৩ বর্গকি.মি। মোট জনসংখ্যা ছিল ৭৭-লাখ, যার ৭৬% ছিল ইহুদি, ২১% আরব মুসলমান। বর্তমানে গাজার আয়তন ৩৬০ বর্গকিমি, দৈর্ঘ্য ৪১-কিমি। পশ্চিমতীর ২,৩৯০ বর্গকিমি। ইউরোপে হিটলার ও খ্রীস্টানরাও ইহুদিদের হাজার বছর ধরে নির্যাতন করেছিল। আমরা জানি হলোকষ্টে ইউরোপে ৬০-লাখ ইহুদি নিধন হয়, তার জন্যে মুসলমানরা বা ফিলিস্তিনিরা দায়ী নন। ১ম বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান আবিস্কৃত কৃত্রিম ফরফরাসের বিনিময়ে তিনি বৃটিশদের কাছে ‘নিজ মাতৃভূমিতে বসবাস’ তথা ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে প্রকাশ করলে বৃটেন তা সমর্থন করে কিন্তু তা স্থাপনের কথা ছিল আফ্রিকায়, ফিলিস্তিনে নয়। ১৯১৭ সনে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.জে বেলফোর দখলকৃত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে একটি ইহুদি রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। ফলে বেলফোর ঘোষণা মোতাবেক ইউরোপ থেকে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে যেতে শুরু করে, যার সংখ্যা তখন ছিল মাত্র ২০,০০০ কিন্তু ১৯৪৮-এ তা ৬-লাখে উন্নীত হয়। ইহুদিরা ১৯১৮ সনে গঠন করে ‘হাগানাহ’, ‘ইরগুন’ ও ‘স্ট্যার্ন গ্যাং’ নামে ৩-টি সন্ত্রাসী বাহিনি। যারা ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত থাকতো সব সময়। ১৯৪০-সনে ‘হানাগাহ’ ফিলিস্তিনিদের নামে হাইফা বন্দরে প্যাটৃয়া জাহাজে ২৭৬-ইহুদি হত্যা ও ১৯৪২ সনে ফিলিস্তিনে আগত ৭৬৯-জন ইহুদিকে হত্যা করে তার দায় চাপায় ফিলিস্তিনিদের উপর, যাতে বিশ্ব জনমত ফিলিস্তিনিদের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে মনে করে। ১৯৪৭-সনে জাতিসংঘ ১৮১-নং প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের ৫৫% স্থান নিয়ে ইজরায়েল ও ৪৫% স্থান ফিলিস্তিনীদের জন্যে বরাদ্দ করে। যদিও ফিলিস্তিনিরা ইহুদিদের চেয়ে তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, সে কারণে তারা নিজেদের রাষ্ট্র বলে দাবী করতে থাকে বসবাসকারী রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের দাবী অগ্রাহ্য হলে, আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ হয় কমপক্ষে ৩-টি।

১৯৪৮ সনে আরব ইজরায়েল যুদ্ধে ইহুদিরা ফিলিস্তিনী ‘দাইর ইয়াসিন’ গ্রামে ৬০০ অধিবাসীর মধ্যে ১২০-জন মুসলমানকে হত্যা করে। ইহুদিরা ফিলিস্তিনের ৫০০-গ্রামের মধ্যে ৪০০-টি জনশূন্য করে ফেলেছিল। এই যুদ্ধে সকল আরব মিলে ৬৮,০০০ ও ইজরায়েল একাই প্রায় ৯০,০০০ সৈন্য সমাবেশ ঘটায়, তাদের সকল যুবকের যুদ্ধ যোগদান বাধ্যতামূলক ছিল। ১৯৪৮-এর যুদ্ধে ইসরাইলী ৮০০০ ও আরব ৮০০০-১৫০০০ সৈন্য নিহত হয় ও ৪-লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হয়ে পাশের দেশে যায়। পক্ষান্তরে ইজরায়েল তার সীমানা বাড়িয়ে চলে নানাভাবে। ১৯৬৭-সনে ইসরাইলী আক্রমণে ৪,০০,০০০ ফিলিস্তিনি বাস্ত্তহারা হয়। এ যুদ্ধে ইজরায়েল সিরিয়ার গোলান, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, জেরুজালেমের পূর্বাংশ দখল করে নেয়। ফলে জাতিসংঘ রবাদ্দকৃত ৪৫% ফিলিস্তিনী ভূখন্ড ইজরায়েলি দখলে চলে যায়। এ যুদ্ধে জেরুজালেম ভাগ হয়ে পশ্চিম জেরুজালেম ইজরায়েলের ভাগে ও পূর্ব জেরুজালেম জর্ডানের পশ্চিম তীরে পড়ে। ওখানের ফিলিস্তিনিরা লেবানন, জর্ডান, সিরিয়ায় শরণার্থী হিসেবে মানবেতর জীবন কাটাতে থাকে। ১৯৬৭-এর যুদ্ধে ১ম আক্রমণকারী হিসেবে ইজরায়েল মিশরের ৫০% যুদ্ধ বিমান যুদ্ধ শুরুর আগেই ধ্বংস করে দেয়। মিশর থেকে সিনাই ও গাজা, জর্ডানের পশ্চিম তীর ও জেরুজালেম, সিরিয়া থেকে গোলান উপত্যকা দখল করে। ঐ যুদ্ধে ইহুদি যোদ্ধা ছিল ২,৬৪,০০০, আর আরব যোদ্ধা ছিল ৫,০০,০০০-জন। আরব পক্ষে ২০,০০০ যোদ্ধা ও ৪৫০টি যুদ্ধ বিমান ধ্বংস হয়। ইহুদি পক্ষে ১,০০০ যোদ্ধা ও ৪৬-টি বিমান ধ্বংস হয়। পুনরায় ১৯৭৩-এ আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ লাগে। ইহুদি ধর্মের যুদ্ধহীন সাবাতের দিনে মিশর ও সিরিয়া একত্রে ইজরায়েল আক্রমণ করে। আরব পক্ষে ৮০০০-১৫০০০ নিহত, ৩৫০-৫০০ যুদ্ধ বিমান ধ্বংস; ইহুদি পক্ষে ৩০০০ নিহত, ১০২-টি যুদ্ধ বিমান ধ্বংস হয়। ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তির আওতায় মিশর ‘সিনাই’ ও সিরিয়া ‘গোলান’ মালভূমি ফিরে পায়। ১৯৮২ সনে লেবাননে যুদ্ধ করে ইজরায়েল ১৭,৫০০ মানুষকে হত্যা করে। ঐ সময়ে লেবাননের ‘শাবরা-শাতিলা’ শিবিরে হামলা চালিয়ে ইজরায়েল ১,৭০০ নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে। ১৯৮৬ সনে তিউনিসে আক্রমণ চালিয়ে ইজরায়েল হাজারো মানুষকে হত্যা করে। ১৯৯৬ সনে আবার লেবাননে আক্রমণ করে হত্যা করা হয় ১০৬-জন ফিলিস্তিনিকে। ২০০৮ সালে গাজায় আক্রমণে ৪১০ ফিলিস্তিন শিশু, ১৩০০ নারীসহ বহু লোক নিহত হয়। ২০১১ সনে মানবিক সাহায্য নিয়ে আসা একটি তুর্কী জাহাজে হামলা করে ইজরায়েল ৯-জন তুর্কী নাগরিককে হত্যা করে। এই গত নভেম্বর’১২-তে গাজায় অব্যাহত ১-সপ্তাহের ইসরাইলী হামলায় নিহত হয়েছে ফিলিস্তিন শিশু-নারীসহ শতাধিক নিরস্ত্র মানুষ। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ৭৫-হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করেছিল গাজার নারী-শিশুদের হত্যার জন্যে। ৬৩-বছরের বাস্ত্তচ্যুত ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ের অন্তহীন কান্না এখন শুনতে হবে ইহুদিদের। ইসরাইলী পলিসিতে এখন ২-টুকরো ফিলিস্তিন গাজায় হামাস ও পশ্চিম তীরে ফাতাহ নিয়ন্ত্রিত। গাজার গরিব ফিলিস্তিনিদের সাথে পশ্চিম তীরের তুলনামূলক ভাল অবস্থানের ফিলিস্তিনিদের কোন বৈবাহিক সম্পর্ক বা কোন আদান প্রদান নেই। ইজরায়েলে ৭.১ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে বর্তমানে ১.৬ মিলিয়ন আরব মুসলমান বাস করে। গাজা আর পশ্চিম তীরসহ মোট আরবের সংখ্যা ৫.৫-মিলিয়ন, যা ইসরাইলী মোট জনসংখ্যা ৫.৫ মিলিয়নের সমান। ১৯৭৪ সনে জাতি সংঘ ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষক হিসেবে মর্যাদা দেয়, যার ধারাবাহিকতায় পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক মর্যাদা পায় ২০২১সনের নভেম্বরে। ১৯৮৮ সনে আলজিয়ার্সে ফিলিস্তিন প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। বর্তমানে দেশ হারিয়ে অনেক ফিলিস্তিনিরা নানাবিধ মনোরোগ ও হতাশায় ভুগছে। আমেরিকা এ পর্যন্ত ইজরায়েল বিরোধী ৫০-টি প্রস্তাবে জাতিসংঘে ভেটো প্রদান করেছে। ১৯৪৮-সনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ইজরায়েল এখন বিশ্বে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে অনেক। আমেরিকা, রাশিয়া, বৃটেনসহ অনেক দেশই ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইহুদি হলেই ইজরায়েলী নাগরিকত্ব পাওয়া যায় ইজরায়েলে কিন্তু মুসলমান হলে বিদ্বেষী ভাব কেন?

বর্তমান বিশ্বে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ১৫৭-কোটি। প্রধান আরব দেশগুলো হচ্ছে মিশর, আলজিরিয়া, মরক্কো, ইরাক, সুদান, সৌদি আরব, ইয়ামেন, সিরিয়া, তিউনেশিয়া, সোমালিয়া, সংযু্ক্ত আরব আমিরাত, লিবিয়া, জর্ডান, লেবানন, মৌরিতানিয়া, ওমান, কুয়েত, কাতার, বাইরাইন, জিবুতি, কমোরস। ৩৫-টি দেশ মুসলমান জনসংখ্যা প্রধান। অপরদিকে পৃথিবীতে ইহুদি মাত্র ১-কোটি ৪-লাখ। ১৫০-জন মুসলমান : ১-জন ইহুদি। ২৮টি দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। ফিলিস্তিনিরা যেহেতু ইহুদিদের কারণে তাদের দেশছাড়া হয়েছে ও তাদের উপরে বর্ণিত হত্যা ও জুলুম অব্যাহতভাবে চলছে, সে কারণে এ বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখার অনুরোধ জানাবো জুরি বোর্ডের কাছে, ফিলিস্তিনিরা যেন তাদের পিতৃভূমিতে ফিরে গিয়ে, শান্তিতে বসবাস করতে পারে।

:

ফিলিস্তিনি এটোর্নীর প্রথম পর্বের বক্তব্য শেষে ইজরায়েলী এটোর্নী ড. ইজরায়েল ওয়েলফিন্সন ঝরঝরে অনাবিলতায় তার সূচনা বক্তব্যে বলেন-

প্রফেট ইয়াকুবের অপর নাম ছিল “ইজরায়েল” এর অর্থ ‘আল্লাহর বান্দা’। ইয়াকুবের সন্তানরাই বনী-ইজরায়েল। ইয়াহুদীরা তাওরাত পাঠের সময় দুলতে থাকে বিধায় এদের ‘ইয়াহুদ’ বলে। ইয়াকুব কিনান তথা ফিলিস্তিনে বসবাস করতেন। ইয়াকুবের ১২-ছেলের ১-ছেলের নাম ইয়াহুদা হিসেবে ‘ইহুদি’ শব্দটি আসে। ফেরাউন থেকে মুক্তিদাতা হিসেবে প্রফেট মুসাকে বনী ইসরাইলীদের ভেতর প্রেরণ করা হয় ও তাঁরা ইসরায়েলে ফিরে আসে। ইহুদিরা বেহেস্তী খাবার পেতো ও সরাসরি ঈশ্বর থেকে বাণী পেয়েছে তারা এবং গড যিহোভার সাথে সরাসরি দেখা করেছেন আমাদের প্রফেট মোসেস। ‘তোরাহ’ মতে স্বয়ং যিহোভা এই দেশকে দান করেছেন ইহুদিদের জন্যে। কিনান ছিল ইহুদিদের প্রতিশ্রুত সেই পবিত্র ভূমি। ১০৯৫-৯৭৫ খ্রী.পূর্বে ইহুদিরা এখানে তাদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। প্রফেট দাউদ ও রাজা সলোমনের আমলে ইহুদিরা হেবরন ও জেরুজালেম রাজধানী স্থাপন করেছিল। গড বা যিহোভা ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাওরাতে। প্রফেটর নামে রাখা ‘ইজরায়েল’ হচ্ছে ইহুদি ধর্মের ইতিহাস ও সভ্যতার সুতিকাগার। জেরুজালেমে মুসার আমলেই ইহুদি রাজত্ব ছিল। আমাদের পবিত্র শক্তির উৎস ark of covenant এখানেই প্রথিত। যিহোভা এদেশ দিয়েছেন বনী ইসরায়েলকে। তো আমরা আফ্রিকা যাব কেন? মুসলমানরা কি মক্কা মদিনা ছেড়ে হাওয়াই বা বুরুন্ডি যাবে? তা ছাড়া নাজারেথ ও বেথেলহামে মুসলমানদের অধিকার কি ছিল? আমাদের প্রফেট মোজেস বনি ইসরাইলীদের মিশর থেকে ফিলিস্তিনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যেই বের করেছিলেন। আধুনিক হিব্রু ও আরবি ইসরাইলী রাষ্ট্রের সরকারি ভাষা। হিটলারের গণহত্যা কি সমর্থন যোগ্য? নিজ রাষ্ট্র না থাকার পরও ইহুদিরা জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন আর ব্যবসায় জার্মানদের ছাড়িয়ে গেলে হিটলার ভয়ে আমাদেরকে হত্যা করেছিল। অধিকাংশ ইহুদি ফিলিস্তিনে এসে জমি কিনে ঘরবাড়ি বানাতে শুরু করেছিল। জলাভূমি ভরাট করে ইহুদিরা তেলআবিব শহর গড়ে তোলে। হাজার বছর পর পাওয়া জন্মভূমি আমরা ছাড়বো আবার? বর্তমান ইহুদিদের অপরাধ কি? ইউরোপে হিটলার ও খ্রীস্টানরাও ইহুদিদের হাজার বছর ধরে নির্যাতন করে। মুসলমানরা শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে কি ইহুদি রাষ্ট্র বিদ্বেষী হবে? ১৮৭৮-সনে প্যালেস্টাইনে ৪,৬২,৪৬৫ জন মুসলমান, খ্রীস্টান ও ইহুদিরা একত্রে বসবাস করতো। তাহলে এখন একসাথে বসবাসে সমস্যা কোথায়? বর্তমানে ইজরায়েলে বসবাসকারীদের মধ্যে ২১% কি মুসলমান নেই? তাদের অধিকার কি ইহুদিদের সমান নয়? মসজিদুল আকসাসহ ৪০০ মসজিদ কি নেই ইজরায়েলে? এখনো ১৭০০ মুসলমান ইসরায়েলের সেনাবাহিনিতে কাজ করে! একজন ইহুদি কি কোন মুসলমান দেশের আর্মিতে আছে? বা কোন “সিনাগগ” কি আছে কোন মুসলমান দেশে?

১৯৪৮ সনে হাজার বছর পর যিহোভা প্রতিশ্রুত নিজ দেশে ইহুদিরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে, মুসলমানরা তা মেনে না নিয়ে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্দান একত্রে ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নামে। ১৯৭২-সনে মিউনিখ অলিম্পিকে ফিলিস্তিনিরা ইহুদি প্রতিযোগিদের হত্যা করে। তারা ভূমধ্যসাগরে ‘আকিলে লারু’ জাহাজটি দখল করে মার্কিন ইহুদিদের হত্যা করে। ১৯৯৩ সনে ইয়াসির আরাফাত অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৭-তে ফিলিস্তিনিরা ‘ইন্তিফাদা’ আন্দোলন শুরু করে। ফিলিস্তিনিরা আত্মঘাতী গেরিলা আক্রমণ চালাতে থাকে ইহুদিদের উপর। ১৯৮১-মিশরের আনোয়ার সা’দাত শান্তিচুক্তি করে সিনাই গাজা ফিরে পান কিন্তু শান্তি চুক্তির কারণে তাকে হত্যা করে কারা ইহুদি না মুসলমানরা? এখন আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে ইহুদিদের শক্ত রাজনৈতিক শক্তি বিদ্যমান। বর্তমানে আমেরিকায় প্রায় আড়াই লাখ শক্তিশালী ইহুদির বসবাস। বৃটিশ পার্লামেন্টেও কমপক্ষে দেড়শো ইহুদি সদস্য বর্তমান। আমেরিকার আইপ্যাক শক্তিশালী ইহুদি লবিং গ্রুপ। আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার, আইন ও শক্তিশালী নিবার্হী বিভাগ বর্তমান। ছোট্ট দেশটিতে ‘নেগেভ’ নামে মরুভূমি বিদ্যমান এখনও। লোহিত সাগরে যেতে আছে মাত্র এক চিলতে সরু পথ। ইজরায়েল এখন পারমাণবিক শক্তিধর একটি দেশ। আমাদের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ বিশ্বখ্যাত। প্রায় সকল মুসলমান দেশগুলোতে প্রবল ইহুদি বিদ্বেষী মনোভাব বিদ্যমান। আমরা বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী দেশ, যদিও বাংলাদেশ তা প্রত্যাখান করে। আমরা জেরুজালেমে মুসলমানদের যাওয়া নিষিদ্ধ করিনি কিন্তু আমাদের প্রাক্তন পিতৃভূমি মদিনা নিজ জন্মভূমিতে ইহুদিরা কি যেতে পারে? তোরাহ-এর ভাষা হিব্রু। আমরা ‘এলিয়েজের বিন ইয়েহাদা’ নামক রুশ ইহুদির প্রচেষ্টায় বিলুপ্ত হিব্রু ভাষাকে ইজরায়েলে চালু করেছি, যদিও আমাদের অনেকের মুখের ভাষা তখন ছিল আরবী, রুশ, ইউরোপীয় নানা মিশ্র ভাষা। এভাবে তিনি মৃত হিব্রু ভাষাকে আবার জীবন্ত ভাষায় পরিণত করেছেন। ১৯২২-সনে হিব্রু বৃটিশ পার্লামেন্টের সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়। ইসরাইলী সরকারি ভাষা হচ্ছে হিব্রু, আরবি ও ইংরেজি। সরকারি স্কুলগুলোতে হিব্রু বা আরবি ভাষায় শিক্ষা দেয়া হয়। রাস্তার সকল বোর্ড হিব্রু আর আরবিতে লেখা। আমরা পৃথিবীতে অনেক আবিস্কারের জনক ও মুসলমানদের তুলনায় অনেক বেশি নোবেল পুরস্কার জয় করেছি। আমাদের ১০০% ইহুদি শিক্ষিত, ধর্মপ্রাণ ও দেশপ্রেমিক। এ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের অবকাশ রাখে আমরা কি রকম পরিশ্রমী, শিক্ষিত ও কার্যক্ষম জাতি! বিশ্বকে আমরা যা দিয়েছি তার সিকি ভাগ কি মুসলমানরা দিয়েছে?

ধর্মীয় ব্যাপারে ইহুদিদের সাথে মুসলমানের সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য দৃশ্যমান। ইহুদিরা খতনা করে, টুপি-দাঁড়ি রাখে, আজান দেয়, রোজা রাখে, নামাজ পড়ে, শুকর খায়না, চুরিতে হাত-কাটা, পাথর মেরে হত্যা সবই তাওরাতে বিদ্যমান। ইহুদিদের সিনাগাগে কারো মূর্তি থাকেনা। ২-গ্রুপই নিরাকার যিহোভা তথা আল্লাহর উপাসনা করে। কিন্তু তারপরও মুসলমানদের সঙ্গেই আমাদের চির বিবাদ কেন? জুরি বোর্ডকে অনুরোধ করবো এই বিদ্বেষ ও বিবাদের উৎস বের করতে। মুসলমানদের কাছে বর্তমানে পবিত্র শহর মদিনায় ৩-টি ইহুদি গোত্র ছিল বনু নজির, বনু কাইনুকা ও বনু কুরাইজা, যারা খ্রীস্টীয় ১ম শতাব্দী থেকে মদিনায় বসবাস করতো। মদিনায় বসবাসকারী বনু কুরাইজা, বনু নাজির, বনু কাইনুকা গোত্র ছাড়াও ফদখ, খায়বর, বনু লিহায়েন, তাঈমা, বানু আল মুসতালিক, ধাতুল রিকা, নাটায় ইহুদি দুর্গ, ওয়াদি আল কুরায় ইহুদি বসতি ছিল। সেখানে ইহুদি কবি আবু আফাক, আসমা বিনতে মারোয়ান, কাব বিন আশরাফ, আবু রাফি, উম্মে কিরফাকে হত্যা করেছিল মুসলমানরা কেবল ইসলামি প্রফেটর সমালোচনা করে কবিতা লেখার কারণে! তাদেরকে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয় কিভাবে তা আমি উদাহরণ হিসেবে মুসলমানদের হাদিস গ্রন্থ থেকেই উল্লেখ করছি। আশা করি জুরি বোর্ড নিচের হাদিসগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন আমাদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কি-

‘‘মুসলমানদের হাতে ইহুদিদের চূড়ান্ত পরাজয় বা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত হবেনা। যুদ্ধের চূড়ান্তপর্বে মুসলমানদের ভয়ে ইহুদিরা পাথর ও গাছের আড়ালে আত্মগোপন করলেও, সকল গাছ ও পাথর বলে দেবে ‘আমার মধ্যে ইহুদি লুকিয়ে আছে, তাকে হত্যা কর’ কেবল কাঁটাযুক্ত ‘গারকাদ’ গাছ ছাড়া, কারণ গারকাদ হচ্ছে ‘ইহুদিদের গাছ’ (মুসলমান, রিয়াদুস সালেহীন)। ইহুদিদের বসতি ‘খাইবার’ মুসলমান কর্তৃক জয় করার পর, ইসলামি বিধি অনুসারে সেখানের ইহুদি ভূমি আল্লাহ, তাঁর রসুল ও মুসলমানদের হয়ে যায়। মুসলমানদের প্রফেট ঐ জমি বর্ণিত ইহুদিদের কাছেই অর্ধেক ভাগ-চাষে বর্গা দেন এবং শেষ পর্যন্ত খলিফা উমর ‘নিজ জমিতে বর্গাচাষী’ ইহুদিদেরকে সিরিয়ার তাইমা ও আরীহায় বহিষ্কার করেন (বুখারী-২১৭০)।

খায়বরের খবর শুনে ফদখের ইহুদিরা খায়বরের শর্তে [জীবন রক্ষার্থে ভাগ চাষে] আত্মসমর্পণ করে (আবু দাউদ-৩০০৬), ইহুদিদের ৪০,০০০ খেজুর গাছ সমৃদ্ধ ‘কুতায়বা’কে শক্তি প্রয়োগে দখল করা হয় (আবু দাউদ-৩০০৭), নানা ঘটনার প্রেক্ষেতে ইহুদি বনু নযীর গোত্র এইমর্মে মুসলমানদের প্রফেটকে প্রস্তাব দেয় যে, ৩০-জন ইহুদি ও ৩০-জন মুসলমান আলেম ধর্মীয় ব্যাপারে বসে সত্যাসত্যা নির্ধারণ করবে। ৩০-ইহুদি আলেম মুহম্মদকে ‘প্রফেট’ হিসেবে মানলে, ইহুদি গোত্র প্রধানসহ সবাই মুসলমান হবে। কিন্তু পরদিন প্রফেট তাদের দূর্গ আক্রমণ ও অবরোধ করেন এবং তাদেরকে অঙ্গীকার করতে বলেন। ইহুদিরা অঙ্গীকারে অস্বীকৃতি জানালে মুসলমানরা যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। পরদিন বনু নযীর গোত্রকে অব্যহিত দিয়ে, মুসলমানরা বনু কুরায়যার উপর আক্রমণ করে। বনু কুরায়যা মুসলমানদের প্রফেটর সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলে, প্রফেট কুরায়যাকে ছেড়ে বনু নযীরকে পুন. আক্রমণ করেন। বনু নযীরের লোকেরা ‘ইহুদি ধর্মপ্রেমে’ বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করে ও বনু নযীরের খেজুর বাগান মুসলমানদের দখলে যায় (আবু দাউদ-২৯৯৪), পরবর্তীতে মতবিরোধের কারণে বনু কুরায়যার সাথে মুসলমানদের আবার যুদ্ধ লাগে এবং যুদ্ধের পরিণতি হিসেবে ইহুদি পুরষদের হত্যা, মহিলা+শিশু+মালামাল মুসলমানদের মধ্যে গনিমাতের মাল হিসেবে বন্টন করা হয় (আবু দাউদ-২৯৯৫)। মুসলমানদের প্রফেট বলেন, ইহুদি ও নাসারাদের আরব থেকে বের করে দেব, এখানে মুসলমান ছাড়া কেউ থাকবেনা (আবু দাউদ-৩০২০), খলিফা ওমর নাজরান ও ফিদকের ইহুদিদের আরব ভূমি থেকে বহিস্কার করেন (আবু দাউদ-৩০২৪), প্রফেট বলেন, আরব উপদ্বীপ থেকে ইহুদি-নাসারাদের অবশ্যই বের করে দিব (তিরমিযী-১৫৫৪), প্রফেট নুযায়ের গোত্রের খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন (বোখারী-২৭৯৯), মুসলমানদের প্রফেট বনু নাযীর গোত্রের খেজুর বাগানে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন (তিরমিযী-১৪৯৪), খায়বর বিজয়ের পূর্বে মুসলমানগণ পেটপুরে খেতে পারতোনা (বুখারী-৩৯১৫), দীর্ঘ অবরোধের পর দুর্গদ্বার খোলা হলে ইহুদি বনী কুরাইযা গোত্রের যুদ্ধ সক্ষম পুরুষদের হত্যা ও গোত্রের শিশু+নারীদের গণিমাত হিসেবে বন্দী করা হয় (বুখারী-২৮১৬), জনৈক ইহুদি ইসলাম গ্রহণের পর নিজ ধর্মে ফিরে গেলে হাত-পা বেঁধে তাকে হত্যা করা হয় (বুখারী-৪০০০)।

মৃত্যুর আগে রোগশয্যায় প্রফেট বলেছিলেন, “হে আল্লাহ ইহুদিদের ও নাসারাদের উপর লানত বর্ষণ করুন” (বুখারী-৪০৯১-২), প্রফেট ইহুদিদের এজন্যে ধ্বংস হওয়ার বদদোয়া করেছেন যে, তারা গরু ও শুকরের চর্বি গলিয়ে বিক্রি করে (বুখারী-৪২৭২), মদিনায় প্রথম মসজিদ বানানোর জন্য প্রফেট বনী নযীর গোত্রের পুরণো পূর্ব পুরুষের কবরসমূহ খুঁড়ে ফেলেন ও খেজুর গাছ কেটে সমতল করে তাতে মসজিদ বানান (বুখারী-৩৬৪২), প্রফেট ইহুদিদের এলাকা বায়তুল মিদরাসে গিয়ে বললেন, তোমাদেরকে এই ভূখন্ড থেকে বহিস্কার করতে চাই, জেনে নাও এ পৃথিবী আল্লাহ্ ও তার রসুলের এখতিয়ারভূক্ত (বুখারী-২৯২৯), মৃত্যুর প্রাক্কালে প্রফেট উপস্থিত সাহাবাদের উপদেশ দিয়েছিলেন যে, ‘‘আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বহিষ্কার করবে’’ (বুখারী-২৮২৫), ইহুদিদের নিখোঁজ একদল লোককে প্রফেট ইঁদুর [বিবর্তিত আকৃতিতে] বলে সনাক্ত করেন, কারণ ইঁদুর উটের দুধ পান করেনা কিন্তু ছাগলের দুধ পান করে (বুখারী-৩০৬১), বনী ইজরায়েল না হলে মাংসে পচন ধরতো না, কারণ তারা ‘সালওয়া’ নামক পাখির মাংস জমা করেছিল (বুখারী-৩০৮৪), প্রফেট বলেছেন, তোমরা ইহুদি ও নাসারাদের পদে পদে অনুসরণ করবে, এমনকি তারা যদি গুই সাপের গর্তেও ঢুকে থাকে তোমরাও তাতে ঢুকবে (বুখারী-৩১৯৮), তাওরাতের বিধান মোতাবেক যেনাকারী ২-ইহুদি নরনারীকে প্রফেট পাথর মেরে হত্যার নির্দেশ দিলে হত্যা কার্যকরের সময়, পুরুষটি মহিলাটির উপর ঝুকে পড়ে মহিলাটিকে প্রস্তরাঘাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করে (বুখারী-৩৩৬৪), ইহুদি-খ্রীস্টানদের প্রথমে সালাম দিওনা, রাস্তায় দেখা হলে তাকে রাস্তার পাশে ঠেলে দিও (তিরমিযী-১৫৪৯), হেযাজের ইহুদি ব্যবসায়ী আবু রাফে’কে প্রফেটর নির্দেশে ঘুমন্ত অবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনে আতিক ও বনী কুরাইযা গোত্রের ইহুদি কবি কা’ব ইবনে আশরাফকে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা ধোকার আশ্রয় নিয়ে হত্যা করেন। সরল বিশ্বাসে ইহুদি কবি কা’ব মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামার সামনে এলে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা তার চুলের সুগন্ধির প্রশংসা করে তার চুলের ঘ্রাণ নেয়ার অনুমতি চান। কবি কা’ব সরল বিশ্বাসে ঘ্রাণ নিতে সম্মতি দিলে ধোকায় ফেলে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা তার চুল আকড়ে ধরেন এবং সঙ্গীদের সহায়তায় তাকে হত্যা করেন (বুখারী-২৮০০-১,৬,৩৭৩৫-৬), [ঐ সময়ের ঈহুদীদের প্রধান পেশা ছিল কৃষি, যে কারণে] এক কৃষকের ঘরে কৃষিকাজের লাঙ্গল-জোয়াল দেখে প্রফেট মুহাম্মদ বলেছিলেন, এটা (কৃষি যন্ত্রপাতি) যে জাতির ঘরে প্রবেশ করে আল্লাহ সেখানে হীনতা ও নীচতা ঢুকিয়ে দেন (বুখারী-২১৫৩), জিহাদ পরিত্যাগ করে কৃষিকাজে নিমগ্ন থাকলে আল্লাহ তাকে অপমান করবেন (আবু দাউদ-৩৪২৬)।

প্রফেটের নির্দেশে যায়েদ ইবনে ছাবিত হিব্রু ভাষা শিখেছিলেন ইহুদিদের সঙ্গে দোভাষী হিসেবে পত্রালাপ করার জন্যে (তিরমিযী-২৭১৫), ইহুদি মহিলাদের মসজিদে যাওয়া নিষেধ ছিল, মুসলমান মহিলাদের ঘরের কোণে নামায আদায় উত্তম (আবু দাউদ-৫৭০), কোরানে ‘ইহুদি ও খ্রীস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ করা হয়েছে’ (কোরান-৫:৫১), বনী ইসরাঈলকে বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম (কোরান-৪৫:১৬), ইহুদি-খ্রীস্টানরা চুল রঞ্জিত করেনা সুতরাং তোমরা তাদের বিপরীত করো (বুখারী-৫৪৭০), একজন ইহুদি ওমরকে বলেছিল, ‘আজ আমি তোমার দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম’ এমন আয়াত আমাদের সম্পর্কে নাযিল হলে ঐদিনকে আমরা ‘ঈদ’ হিসেবে পালন করতাম (বুখারী-৪২৪৫), আমাদের প্রফেট মুসার মর্যাদা প্রসঙ্গে প্রফেট মুহম্মদ বলেছেন, ইস্রাফিল কর্তৃক ২য়-বার সিঙাধ্বনির পর পৃথিবীর সকল মৃত মানুষের মধ্যে ১ম জেগে ওঠার পর আমি দেখবো, হযরত মুসা আল্লাহর আরশ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি জানিনা, সকল বেঁহুশ [মৃত] ব্যক্তিদের মধ্যে সে ছিল কিনা কিংবা আমার আগেই তার চেতনা ফিরেছিল বা আল্লাহ তাকে বেহুঁশ হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন (বুখারী-২২৩৪), প্রফেট মুহম্মদ নাজরানের খ্রীস্টানদের সাথে চুক্তি করেন যে, খ্রীস্টানদের গীর্জা ধ্বংস ও পাদ্রীদের বের করে দেয়া হবেনা কিন্তু বিনিময়ে প্রফেটকে ১০০০-জোড়া কাপড় সফর মাসে ও ১০০০-জোড়া রজব মাসে খ্রীস্টানরা পাঠাবে; তা ছাড়া ৩০টি বর্ম, ৩০টি ঘোড়া, ৩০টি উট এবং সব ধরণের যুদ্ধোপকরণ ধার হিসেবে মুসলমানদের দিতে হবে কিন্তু খ্রীস্টানরা সুদ খাওয়া শুরু করলে, তাদেরকে নাজরান থেকে বহিস্কার করা হয় (আবু দাউদ-৩০৩১)।

কিন্তু তারপরও আমরা শান্তির জন্যে জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নেবো। উভয় পক্ষের এটোর্নী নিজ নিজ পক্ষে আরো নানা যুক্তিতর্ক, পাল্টা-যুক্তি উপস্থাপন করলো টানা ২০-দিন পর্যন্ত। যুক্তি পাল্টা যুক্তিতে জাত্যাভিমান ছেড়ে বোধোদয়ের পাল্লা ভারী হলো তাদের। কিন্তু অবশেষে নিজ নিজ নাগরিকদের ভবিষ্যত শান্তিপূর্ণ ও এক সুন্দর দিনের প্রত্যাশা রেখে জুরি বোর্ডের সিন্ধান্তের অপেক্ষায় রইলেন। ১০-সদস্যের জুরি বোর্ড ২-জাতির একে অপরকে হত্যার ধারাবাহিকতা চিরতরে বন্ধ ও বিশ্বকে এ যুদ্ধের দামামা থেকে রক্ষার জন্যে নিম্নরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

চুক্তির পরদিন অর্থাৎ ২০২১ এর নববর্ষের দিন থেকেই ইজরায়েল ও ফিলিস্তিনি জাতিরা একত্রে মিলে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ইজরায়েলে বসবাস করবে। সেখানে প্রত্যেকের ধর্মীয়, শিক্ষা, মৌলিক অধিকারের পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় থাকবে। কেউ কারো ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবেনা ও বিদ্বেষ পোষণ করবেনা। সাংবিধানিকভাবে দেশটির সরকারি ভাষা হবে হিব্রু ও আরবি। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের অধিকার হবে সমান। গণতান্ত্রিক রীতিতে গণভোটের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা হবে। অবিলম্বে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র এই গণতান্ত্রিক নতুন ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে। বিশ্বের সকল দেশ ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলীদের নিজ দেশে পুনর্বাসনে সহায়তা করবে। ২০২১ সনের পহেলা জানুয়ারি নববর্ষের দিন থেকে বিশ্বের সকল দেশ নবতর এই রাষ্ট্রের জন্যে প্রার্থনা ও আনন্দ উৎসব করবে।

জুরি বোর্ডের এমন শান্তিময় সিদ্ধান্তে হাততালি দিয়ে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে গুণিতক ভুলে জীবনের দীর্ঘশ্বাসের পান্ডুলিপি পাঠ করা ২-দেশের এটোর্নীদ্বয়। সঙ্গে live এ থাকা বিশ্ববাসী প্রচন্ড করতালিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশে তাদের সংহতি প্রকাশ করে। বিশ্বময় বিরামহীন করতালির বিকীর্ণ শব্দে ঘুম ভাঙলে স্বপ্নময়তার আবেশেও টিভির প্রভাতি সংবাদের হেডলাইন শুনতে পান লেখক -‘‘গাজায় ইসরাইলী বিমান আক্রমণে ২৩২ শিশু-নারীসহ ফিলিস্তিনি নিহত এবং হামাস কর্তৃক গাজা থেকে ইজরায়েলে ১৫০০-রকেট নিক্ষেপে অন্তত ১৪-ইহুদি নিহত! যার মধ্যে একজন ভারতীয় মহিলা। গাজা যেন এক মৃত নগরী”!

:

নোট :

এ লেখাটি লিখতে ইহুদি ও মুসলমান বিষয়ক অংশের জন্য “রেফারেন্স” ব্যবহার করেছি সহীহ বুখারী, সহীহ আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সহীহ মুসলমান, সহীহ তিরমিযী, মুয়াত্তা ইমাম মালিক, ইবনে ইশাকের “সিরাত রাসুল আল্লাহ”, ইবনে হিশামের “সিরাত”, আল তাবারীর “তারিখ আল রাসুল ওয়াল মুলক”, আল ওয়াকিদির “কিতাব আল মাগাজি”, মুহাম্মাদ ইবনে সা’দের “কিতাব আল তাবাকাত আল কবির”, Raficq S Abdulla & Mohammed M Keshavjee রচিত “Understanding Sharia Islamic Law in a Globalised World”। এ ছাড়া ইহুদি বিষয়ক তথ্যের জন্যে তোরাহ, তালমুদ, কিতাবুল মুকাদ্দাস, ওল্ড এন্ড নিউ টেস্টামেন্ট, জেনেসিস-পুরাতন খন্ড, তোরাহর হলাকখা ও হাগগাদা অংশ, জবুর, মেসাল, মিশনা, গেমারা প্রভৃতি ইহুদি বিষয়ক ধর্ম পুস্তক এবং গুগল, উইকি ও সোস্যাল মিডিয়া থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *