অর্ক আবিস্কৃত “হজ্জ সম্পাদনের ডিজিট্যাল রোবটিক যন্ত্র”

(হজ্জ সম্পাদনের রূপকল্পের একটি রূপক গল্প)
[২ পর্বের লেখার ১ম পর্ব]
:
অনেক বছর আগে মার সাথে হজ্ব সম্পাদনের কষ্ট আর পরিশ্রমের কথা ফিরে এসে শেয়ার করেছিলাম বর্তমানে বেলজিয়ামে অবস্থানরত তরুণ ভাইপো অর্কের সাথে। বিজ্ঞান মনস্ক অর্ক তখন নটরড্যামে ইন্টারে পড়তো। সে সম্প্রতি “ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে” তার গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে ইসিভুক্ত বেলজিয়াম থেকে । কিছুদিন আগে ঢাকা বেড়াতে এসেছে অর্ক। ব্রাসেলস ভার্সিটিতে Pilgrim-দের সুষ্ঠুভাবে হজ্জ সম্পাদনের একটা ডিজাইন উপস্থাপন করে “চমৎকার ক্রেডিট” পেয়ে সম্পন্ন করেছে অর্ক তার graduation। তার উপস্থাপিত ডিজাইনটি ভার্সিটির সবার এমন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে, ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ তাকে তার লিখিত ডিজাইনের একটি বাস্তব মডেল তৈরি ও প্রদর্শন করার জন্যে ১০,০০০ ডলার অনুদান দিয়েছে। এবং অর্ক কদিন আগে তার ডিজাইনটিসহ দেশে ফিরেছে আমাদেরকে তা দেখানোর জন্যে।
:
আমি আমার মায়ের সাথে হজ্ব করেছিলাম অনেক বছর আগে। হজ্বের সপ্তপদি আনুষ্ঠানিকতায় বেশ কষ্ট করতে হয় সবাইকে। লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কাবা ঘরে তাওয়াফ, সাফা মারোয়ায় ৭-বার দৌঁড়াদৌঁড়ি, জমজম কুপের কাছে গমন ও পানিপান, ওমরা শেষে চুল কর্তন, আরাফাতে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান, মুজদালিফায় গমন করে রাতে অবস্থান, মুজদালিফায় নিজ তাবু কিংবা সেডে অবস্থান করে ৪২-টা পাথর সংগ্রহ, জামরাতে নিজে গিয়ে ছোট-মেঝ-বড় শয়তানকে উদ্দেশ্য করে সংগৃহীত পাথরগুলো নিক্ষেপ, নিজ হাতে কুরবানী করা, এরপর মাথামুণ্ডণ, মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা, নবী (স.) এর কবর তথা রওজা মুবারক জিয়ারত, নবী (স) বর্ণিত “রিয়াদুস জান্নাহ” বা বেহেস্তের টুকরোতে অবস্থান করে নামাজ আদায়ের ধাক্কাধাক্কি, নবীর বাড়ি-কাম মসজিদের মিম্বার ও খুঁটিগুলো স্পর্শ করার প্রতিযোগিতা, সাহাবাগণের কবর তথা “জান্নাতুন বাকি” কবরস্থানে গমন করে কবর জিয়ারত শেষে আবার জেদ্দা বিমানবন্দরের হজ্জ টার্মিনালে এসে বিমানে আরোহণ লক্ষ লক্ষ হাজীদের মধ্যে রীতিমত যুদ্ধের সমতুল্য। আমার বৃদ্ধা মাকেসহ এসব কর্মকাণ্ড সম্পাদনে আমাকে তরুণ বয়সেও অনেক কষ্ট পোহাতে হয়েছিল। অনেকেই শয়তানকে পাথর মারতে গিয়ে মানুষের চাপে পদপৃষ্ঠ হয়ে ওখানে মারা যান। টয়লেটের জন্যে মিনা-আরাফাতে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন হাজারো আল্লাহর মেহমান তথা হাজি।
:
সুতরাং নিজ মুসলিম ভাইপো আবিস্কৃত হজ্জ সম্পাদনের আধুনিক ডিজাইনটি দেখার জন্যে সঙ্গত কারণেই উৎসুক ছিলাম আমিসহ ঢাকায় অবস্থানরত পরিবারের সকল সদস্য। ঘটনা শুনে আমার দ্বীপগাঁয়ের বেশ কজন আত্মীয় আমাদের ঢাকার ফ্লাটে উপস্থিত হলেন, যারা আগামি বছর হজ্ব সম্পাদন করবে বলে মনস্থির করেছেন। শিশুদের ব্যাটারি চালিত রেলগাড়ির মডেলের মত তৈরিকৃত মডেলে ব্যাটারি ও বিদ্যুৎচালিত “হজ্জ সম্পাদনের ডিজিট্যাল রোবটিক যন্ত্র” চালু করলো অর্ক। চাক্ষুস দেখার পর যার বর্ণনা অনেকটা নিম্নরূপ :
:
মডেলটি শুরু হয়েছে জেদ্দা এয়ারপোর্টের হজ্জ টার্মিনাল থেকে। একটা ম্যাগনেটিক ট্রেন। যেখানে বিমান থেকে নামা ঐ ফ্লাইটের সব হাজীদের তুলে দেয়া হচ্ছে সরাসরি ঐ ট্রেনে। মানে এয়ারক্রাফট থেকেই তারা সরাসরি ট্রেনে বসে যাচ্ছে। বসা শেষ হতেই ট্রেনটি এক দৌঁড়ে চলে গেলো পবিত্র মক্কার কাবা ঘর সন্নিহিত “আবু জাহেলের বাড়িতে নির্মিত টয়লেটে”। মানে টয়লেট ও অযু সম্পাদনের জন্যে। ট্রেন থেকে নামামাত্র প্রত্যেককে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে টয়লেট শেষে অজু করানো হলো। “তালবিয়া” পাঠ শুরু হতেই (লাববায়িকা আল্লাহুম্মা লাববাইক, লা-শারিকালাকা লাববায়িক, ইন্নাল হামদা ওয়াননিয়মাতালাকাওয়াল মুলক, লা-শারিকালাক) এবার ঐ গ্রুপের সবাইকে বসানো হলো চক্রাকার একটা যন্ত্রে (শিশুপার্কে শিশুদের ঘোরোনো হয় এমন যন্ত্র)। যেন পরে না যায় তাই চক্রটির সাথে বেল্ট দিয়ে সবাইকে বাঁধালো রোবটেরা খুব দ্রুত। শেষে মাত্র ৭ সেকেন্ডে সকল হাজীকে কাবাঘরের চারদিকে ৭-বার ঘোরানো তথা “তাওয়াফ” করানো হলো ঐ যন্ত্রটিতে, যাকে আরবিতে “তাওয়াফ কুদুম” বলে। প্রত্যেকবার ঘোরার সময় ঘুর্ণন যন্ত্রটি “রোকনে ইয়ামেনির” কাছে এলেই প্রত্যেক হাজিকে ছোঁয়ার সুযোগ দেয়া হল রোকনের কর্নারের কা’বার খোলা গিলাফে। এবং শেষ ঘুর্ণনে রোবটচালিত ঘুর্ণন যন্ত্রটি ক্ষণিকের জন্য হাজির ঠোঁটকে নিয়ে গেল একদম “হাজরে আসওয়াদ” (কালো পাথর) চুম্বন করতে। ৭-চক্র শেষ হলে যন্ত্রটি “হাতিমে” দু’রাকাত নামাজের সুযোগ করে দিল সবাইকে ক্রমানুসারে। এবং শেষে মাকামে ইব্রাহীমের একটু দূরে। ৭-সেকেন্ডে ৭-বার তাওয়াফ শেষে রোবট চালিত ঐ যন্ত্র সকল হাজীকে আলতোভাবে সম্মানের সাথে নিক্ষেপ তথা সমর্পণ করলো ৩০০-আসনের আরেকটি স্বচালিত চেয়ারের মত যন্ত্রে। বসা মাত্র ৩০০ হাজী নিয়ে যন্ত্রটি “সাফা” ও “মারোয়া” পাহাড়ে খুব দ্রুত গতিতে ৭-বার আসা যাওয়া করলো চোখের পলকে। সাফা মারওয়ার মাঝখানে সবুজ চিহ্নের মধ্যবর্তী স্থানে-পুরুষদের জোরে কিন্তু মহিলাদের স্বাভাবির গতি রাখলো ঐ যন্ত্রটি। কি বিস্ময়কর আবিস্কার জেন্ডার তথা সেক্স দেখে বিশেষ স্থানে গতি কম বা বেশি হতে পারে ঐ যন্ত্রের! প্রায় ১/২-ঘন্টার এ পথ পরিক্রমা হাজিরা মাত্র ৭-সেকেন্ডে শেষ করলো। নারী হাজীদের লাগলো ৮ সেকেন্ড!
:
সাফা মারোয়া পাহাড়ের শেষ চক্করে রোবটচালিত চেয়ারগুলো প্রত্যেক হাজিকে চুল কাটার জন্যে নাপিতের দোকানের চেয়ারে নিক্ষেপের আগে একবার করে সবার চেয়ার উড়ে গেলো যমযম কুপের একদম উপর দিয়ে। এবং কুপের উপর ক’সেকেন্ড থামার সময়ে একটা যমযম পানিভর্তি গ্লাস চলে এলো সবার মুখের সামনে। প্রত্যেকে পান করলো পবিত্র যমযম পবিত্র কুল ওয়াটার। পানি পান শেষে তৃপ্তির সাথে তাদের বসানো হলো নাপিতের দোকানের চুল কাটা চেয়ারে। দোকানের “রোবট নাপিতগণ” ১ সেকেন্ডে মুন্ডল করলো বা ছোট করে কেটে দিলো হাজীদের চুল। এবার আবার ৩০০ নাপিতের দোকানের সামনে হাজির হলো ঐরূপ আরেক ট্রেন। সবার চেয়ারগুলো নাপিত রোবটেরা ঠেলে দিলো ট্রেনে। ট্রেন দৌঁড়ে চলে গেলো প্রথমে হাজিদের থাকার স্থানে এবং সেখানে নুতন করে এহরাম বাঁধার পর ট্রেনটি দৌঁড় দিলো আরাফাতের দিকে। হাজিদের অত্যন্ত সম্মানের সাথে আলতো করে ঠেলে দিলো আরাফাত ময়দানে রোবটরা।
:
এর পর ২য় তথা শেষ পর্ব

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *