ফাঁদ!

‘মিথ্যা’র পৌনঃপুনিকতার কথা উঠলেই চট করে গোয়েবলসের নাম এসে যায়। “একটি মিথ্যা বারবার বলে গেলেই মানুষের কাছে সেটি ‘সত্য’ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়”- মানবতার জঘন্য দুশমন হিটলারের বিশ্বস্ত দোসর গোয়েবলসের এই উক্তিটি মানুষ বোধহয় কোনো দিনই ভুলবে না। বলা যেতে পারে, এই একটি মাত্র উক্তির জন্যই গোয়েবলস ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। শুধু ‘অমর’ নয়, সে তো দার্শনিকেরই মর্যাদা পেয়ে গেছে- মিথ্যার দার্শনিক। দুনিয়াতে এই দার্শনিকের শিষ্য-প্রশিষ্যের সংখ্যাও অনেক এবং প্রতিনিয়তই সে সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটে চলেছে। নিপুণতায় গুরুকে অনেকদূর ছাড়িয়ে গেছে তার শিষ্যরা। গুরুর দর্শনকে তারা রীতিমতো শিল্পে রূপান্তরিত করে ফেলেছে! তাদের সেই শিল্প ক্রমেই অধিক থেকে অধিকতর উৎকর্ষমণ্ডিত হয়ে উঠছে!

গোয়েবলসের কারবার তো ছিল নির্জলা মিথ্যা নিয়ে, তাতে একটুও সত্যের ভেজাল থাকত না। নির্ভেজাল মিথ্যাকে চিনে নেওয়া খুব কঠিন নয়। কিন্তু সত্যের ভেজাল-মিশ্রিত মিথ্যা সাংঘাতিক প্রতারক। সেই প্রতারণা ভেদ করে আসল সত্যকে বের করে আনা খুবই কঠিন- অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবও। সত্যের ভেজাল-মিশ্রিত মিথ্যা হলো ‘অর্ধসত্য’, এই অর্ধসত্য মিথ্যার চেয়েও মারাত্দক। অর্ধসত্য কেবলই বিভ্রম ছড়ায়।

অর্ধসত্যের একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি।

একটি ছেলে তার বাবার কাছ থেকে শিখেছে যে, ‘মিথ্যা কথা বলা পাপ, এই পাপের ফলে নরকবাস অনিবার্য।’ ছেলেটি বাবার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে ঠিক করল যে, কখনো মিথ্যা কথা বলবে না। কিন্তু স্কুলে যেতে তার মোটেই ভালো লাগত না। তাই স্কুলে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে এখানে-ওখানে আড্ডা মেরে বিকাল পাঁচটার দিকে ঘরে ফিরে আসে। এই সত্য কথাটা বাবাকে বললে গালি খেতে হবে, অথচ মিথ্যা বললে পাপ হবে। সে তখন একটা অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিল। ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই স্কুলে চলে গিয়ে বেঞ্চিতে সে কিছুক্ষণ বসে থাকত এবং শিক্ষক ক্লাসে ঢোকার আগেই স্কুল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যেত এবং যথারীতি আগের মতোই আচরণ করে বাড়ি গিয়ে বাবাকে বলত যে, সে স্কুলে গিয়েছিল।

ছেলেটি নিজে যা-ই ভাবুক, আমরা কি মনে করব যে, সে সত্য কথা বলেছিল? হ্যাঁ, স্কুলে যে সে গিয়েছিল, সে কথা এক অর্থে অবশ্যই সত্য। কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্কুলে যাওয়া বলতে যা বোঝায় সেই বিচারে সেটি মোটেই সত্য নয়, সত্যের ভেজাল মিশ্রিত অর্ধসত্য। এ রকম অর্ধসত্য কি নির্জলা মিথ্যার চেয়ে মারাত্দক ও ভয়ঙ্কর প্রতারক নয়?

আমরা তো আজকে এ রকম মারাত্দক ও ভয়ঙ্কর মিথ্যার জালেই আটকা পড়ে গেছি। এই জাল বিস্তার করেছেন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কৃতির সব মহাজন।

রাজনীতির ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা বেশি মাত্রায় ঘটছে। বিশেষ করে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে। আরও বিশেষ করে স্বাধীনতার ঘোষণা ও ঘোষক নিয়ে। ১৯৭৫-এর আগস্টের পর থেকে একদল রাজনীতিক তারস্বরে বলতে শুরু করেছেন যে, ‘স্বাধীনতার ঘোষক হলেন মেজর জিয়াউর রহমান।’ তাদের ভাবটা এ রকম যে, এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের কথা কোনোদিনই ভাবেনি; হঠাৎ একদিন একটি বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান নামক এক ব্যক্তি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বসলেন, আর দেশের সব মানুষ যেন বাঁশির আওয়াজ শুনেই যুদ্ধের মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল, ফলে দেশটি স্বাধীন হয়ে গেল।

জিয়ার মুখ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছিল, এ কথা মোটেই মিথ্যা বা অসত্য নয়। তবে অর্ধসত্য। পুরো সত্যটি হচ্ছে- তিনি সেই ঘোষণাটি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। জিয়া ঘোষক ছিলেন না, ছিলেন ঘোষণার পাঠক। জিয়া কিংবা এ রকম আর কেউ-ই স্বাধীনতার ঘোষক হওয়ার অধিকার অর্জন করেননি। ওই সময় জনগণ সেই অধিকার প্রদান করেছিল একমাত্র বঙ্গবন্ধু মুজিবকেই।

সে রকম অধিকারপ্রাপ্ত হয়েই বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। বঙ্গবন্ধুর সেই অসাধারণ অবদানকে অস্বীকার করলে তা হবে জঘন্য মিথ্যাচার।

আবার সেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে অঙ্গীকার করে যারাই নানাভাবে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে আপন আপন সাধ্যমতো অবদান রেখেছেন, তাদের কারও অবদানকেই অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করাও হবে সত্যের অপলাপ। তাদের মধ্যে কোনো কোনো পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন যারা, তাদের কথা তো একান্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই স্মর্তব্য। এ রকম স্মর্তব্যদেরই একজন হলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধের উষালগ্নে কোনো একটি বেতারের ক্ষীণ তরঙ্গে ভেসে আসা মেজর জিয়ার কণ্ঠনিঃসৃত সামান্য কয়েকটি ধ্বনিই আমাদের সবাইকে নতুন প্রত্যয়ে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল। জিয়ার নামের সঙ্গে যুক্ত ‘মেজর’ পদবিটিই আমাদের জন্য প্রত্যয়ের প্রধান উপাদান। পাকিস্তানের পক্ষেই শুধু নয়, আমাদের পক্ষেও আছে মেজর, মেজর জিয়া পঠিত স্বাধীনতার ঘোষণা তো এভাবেই আমাদের চিত্তে অসীম সাহসের সঞ্চার ঘটিয়েছিল। তাই এরপরও মেজর জিয়ার নামটি আমরা ভুলতে পারিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামে ১১ সেক্টর কমান্ডারের একজন হয়েও জিয়া আমাদের চিত্তালোকে স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট মর্যাদার আসনটিই দখল করে রেখেছিলেন। কিন্তু এরপরে তার মর্যাদা যে আর অটুট থাকল না, এরও কারণটি একটি অর্ধসত্যকে পূর্ণ সত্যরূপে প্রচারের অপপ্রয়াসের মধ্যেই নিহিত। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের সপ্তম দিনে জিয়ার নব-উত্থানের প্রায় অব্যবহিত পর থেকেই এই অপপ্রয়াসটির সূচনা এবং তখন থেকেই প্রকৃত মর্যাদার আসনটি থেকে তার পতনেরও সূত্রপাত। যে জিয়া মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বিশিষ্ট নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত থাকতে পারতেন, তিনিই নিজেকে অবনমিত করলেন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ অপহরণকারী খলনায়কে। আর সেই কাজে তার মতলববাজ চেলাচামুণ্ডারা শুধু ইন্ধনই জোগায়নি, তারাই আসলে বারবার একটি অর্ধসত্য বলে বলে জিয়াকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বানাতে চেয়েছে এবং এভাবেই তার প্রকৃত ও প্রাপ্য মর্যাদার আসন থেকে তাকে টেনে নামিয়েছে। জিয়ার এই অতি চালাক চেলারা হয়তো ভেবেছে এবং এখনো ভাবছে যে, এভাবেই বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে অপসৃত করে তার স্থানে জিয়াকে বসিয়ে দেওয়া যাবে। হায়, অতি চালাকের দল! অতি চালাকির অনিবার্য পরিণতি যে ‘গলায় দড়ি’ সেই অমোঘ সত্যটিই এরা ভুলে বসে আছে। মিথ্যার দার্শনিক গোয়েবলসের একালীন চালাক শিষ্যদের ‘অর্ধসত্যের দর্শন’ ও কোনোমতেই হালে পানি পাবে না।

অন্যদিকে স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকেও নানা অর্ধসত্য বিশেষণে চিহ্নিত করেছে তার অতি উৎসাহী অন্ধ অথবা কপট ভক্তরা, আর এদেরই বিপরীতে বিভিন্ন অপ-বিশেষণে তাকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছে নীচাশয় ও দুর্বৃত্ত শত্রুরা। এই শত্রুদের উদ্দেশ্য অর্ধসত্যের পর্দায় বঙ্গবন্ধুর সব সার্থকতা ও সবলতাকে ঢেকে রেখে তার নঞর্থকতা তথা দুর্বলতাগুলোর ওপর আলো ফেলা। আর যারা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী রূপে নিজেদের পরিচিত করেন তারা তো বঙ্গবন্ধুর স্বাভাবিক মনুষ্যোচিত কোনো দুর্বলতা ছিল বলেও স্বীকার করতে চান না। বঙ্গবন্ধুকে মানুষের বদলে অতিমানব বানাতে গিয়েই অনেক অর্ধসত্যের আশ্রয় নিতে হয় তাদের। অর্ধসত্যের আশ্রয় নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুর স্তাবক হয়েই থাকেন কেবল, তার প্রকৃত অনুসারী হতে পারেন না, তার উত্তরাধিকারের ধারাটিকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন না। অকারণ আবেগকে দমন, নির্মোহ সত্যকে আপন চৈতন্যে ধারণ এবং স্তাবকতামুক্ত শ্রদ্ধায় উজ্জীবিত হয়েই বঙ্গবন্ধুর কৃতী ও কীর্তির যথার্থ উত্তরাধিকারী হওয়া সম্ভব। গণমানুষের কবি দিলওয়ার (২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রয়াত) এ রকম বোধ থেকেই একান্ত নির্লিপ্ততার সঙ্গে সুতীব্র সত্যনিষ্ঠাকে মিলিয়ে সশ্রদ্ধ অথচ নির্মোহ ‘মুজিব প্রশান্তি’ উচ্চারণ করেছিলেন-

তোমার সমস্ত ত্রুটি যেখানে আমার উদ্দীপনা/ পরিণামে সেইখানে নির্লজ্জ জারজ স্তাবকতা/ তোমাকে বানিয়ে দিল ধূ ধূ মাঠ শোকের ত্রিশূল/ নিজগৃহ জতুগৃহ প্রবল বিশ্বাস ছিন্নমূল/ বহুমুখী মধ্যবিত্ত, ক্ষুধিতা নদীর প্রমত্ততা,/ পলিকে ছাড়িয়ে গিয়ে কর্দমাক্ত করে শস্যকণা।

শুধু বঙ্গবন্ধু নন, যে কোনো মানুষের মূল্যায়নের জন্যই প্রয়োজন মিথ্যা ও অর্ধসত্যের এবং অযৌক্তিক নান্দী ও বিদ্বিষ্ট নিন্দার জাল থেকে তাকে মুক্ত করে আনা। বঙ্গবন্ধুকেও ত্রুটিমুক্ত অতি মানব না ভেবে তার সব মানবিক ত্রুটিকে ‘উদ্দীপনা’র উপকরণ রূপে ধরে নিয়েই বর্তমান প্রজন্মকে সে সব ত্রুটি থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব বর্তেছে তার উত্তরসুরিদের ওপর। এর জন্যও তো প্রয়োজন অর্ধসত্যের বেড়া ভেঙে ফেলে প্রকৃত সত্যের খোলা মাঠে বিচরণ করা।

যে কোনো ঘটনা বা ঘটনাপ্রবাহের তাৎপর্য উদঘাটনের জন্যও প্রয়োজন মোহমুক্ত বিচারবুদ্ধির অনুশীলন। সে রকম অনুশীলন না করতে পারলে ঘটনার তাৎপর্য উপলব্ধির বদলে ঘটনাপ্রবাহের স্রোতে ভেসে যাওয়াই হবে অনিবার্য নিয়তি।

ঘটনা হিসেবেও এ প্রসঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার কথাই বিশেষভাবে মনে পড়ে। ভারতের ভূমিকা নিয়ে এমন সব অসত্য ও অর্ধসত্যের জাল বিস্তার করা হয়েছে যে, একটা জাল ছেঁড়া হলো তো আরও ১০টা জালে আটকে পড়তে হয়। ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আসলে ভারতীয় আগ্রাসন ছাড়া আর কিছুই নয়, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর কোনোমতেই বাংলাদেশের জন্য বিজয় দিবস নয়, এদিনে ভারতই বাংলাদেশকে দখল করে একটা পুতুল সরকারকে এখানে বসিয়ে দিয়েছিল’- তারস্বরে এমন কথা বলে যাচ্ছে যারা তাদের সংখ্যা মোটেই কম নয়। ‘একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর নয়, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে হত্যা করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে’- এমন কথা বলার মতো নির্লজ্জ কুলাঙ্গারও এই বাংলার মাটিতেই জন্মেছে। আবার ভারতীয়দের মধ্যেও এমন অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী আছে যাদের বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধটুদ্ধ কিছুই হয়নি, যুদ্ধটা হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে, ভারতীয় সেনারাই অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে এবং নিতান্ত দয়াপরবশ হয়েই তারা এদেশ ছেড়ে চলে গেছে। এই অপধারণাটিকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত একটি ভারতীয় ছায়াছবি ‘গুন্ডে’।

এমন সব অসত্য অর্ধসত্যই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি সব কিছুকেই, বলতে গেলে স্বাধীনতাকেই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। অর্ধসত্যের কাঁধে ভর করেই জামায়াত-শিবিরসহ স্বাধীনতাবিরোধী সব অপশক্তি স্বাধীন দেশের রাজনীতিকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করে যেতে পারছে। সর্বদা অর্ধসত্য উচ্চারণ করে করে গণবিভ্রান্তি ঘটিয়ে চলছে কর্তৃত্বশীল ও কর্তৃত্বাভিলাষী প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীই। নির্ভেজাল সত্যবাক্য কেউ উচ্চারণ করতে পারে, এমনটি কল্পনা করাও যেন আজ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনীতিকরা আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দুর্গতি নিয়েও নানা ধরনের ধূম্রজালের সৃষ্টি করে চলেছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে অবস্থানকারী একদল রাজনীতিক আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে আড়াল করে দুর্গতির চিত্রই কেবল তুলে ধরছেন। এরাই আবার ক্ষমতার আসনটি দখল করতে পারলে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মতোই দেশজুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জোয়ার বয়ে যাওয়ার কল্পকথা প্রচার করতে থাকবেন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মোটা অঙ্কের কথা বলে সবার মাথা ঘুরিয়ে দিতে চাইবেন। সেই মোটা অঙ্ক যে সামান্যসংখ্যক ভাগ্যবানকেই মোটা-তাজা করছে, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পেটকে পিঠে লাগিয়ে তাদের মাথায় দুর্ভাগ্যের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে- সেই নির্মম সত্যটিকে তারা বেমালুম চেপে যাবেন। অর্থাৎ সর্বত্রই চলেছে, চলছে ও চলবে অর্ধসত্যের তেলেসমাতি কারবার।

শুধু তাই নয়, প্রতিনিয়ত অর্ধসত্যের প্রবৃদ্ধি ঘটতে ঘটতে পূর্ণ অসত্যই এখানে-ওখানে শিকড় গেড়ে বসেছে। ধর্মের ব্যবসায়ীরাই আজ ‘মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছে নিপুণ হাতে।’ কোনো সন্দেহ নেই যে, বহুসংখ্যক সরলপ্রাণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে সেই ফাঁদে তারা আটকে ফেলতে পেরেছে। সেই ফাঁদে আটকেপড়া মোহগ্রস্ত মানুষকেই তারা চাঁদের বুকে জঘন্য যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে দেখাতে পেরেছে।

এখানেই এসে যায় আমাদের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ। পাকিস্তান আমলে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যদিয়েই যে আমাদের স্বাধিকার চেতনার বিস্তার ঘটেছিল, সেই চেতনা থেকেই যে এক সময় আমরা সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পতন ঘটিয়েছিলাম- সে সব কথা অবশ্যই সত্য। কিন্তু সেই সত্যের ফাঁকগুলো আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন শহুরে মধ্যবিত্তের ভাব-ভাবনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে যতটুকু ধারণ করেছে, তার শতাংশের একাংশও ধারণ করেনি সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে। শহুরে মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক আন্দোলন মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, বাংলা বর্ণমালাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে, রবীন্দ্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করেছে, নজরুলের খণ্ডায়ন রোধ করেছে। এ রকম আরও অনেক অনেক সুকৃতিরই ধারক সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলন। কিন্তু সে সব সুকৃতি একান্তভাবে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি বিশেষ অংশেই বৃত্তাবদ্ধ। সে বৃত্ত ভাঙার কোনো সচেতন ও সক্রিয় প্রয়াসই আন্দোলনের ধারক-বাহকদের মধ্যে অদ্যাবধি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। লোকসংস্কৃতি নামে যা পরিচিত, আবহমানকাল ধরে প্রবাহিত সেই সংস্কৃতির পরিচর্যা বা পৃষ্ঠপোষকতার নামে শহুরে মধ্যবিত্ত যা করে তা তো টবে ফুলগাছ লাগানো বা টেবিলে ফুলদানি রেখে দেওয়ার মতো শৌখিনতারই নামান্তর মাত্র। সেই বৃত্ত ভেদ করে তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকসাধারণের সংস্কৃতির ধারাপ্রবাহের সঙ্গে সম্মিলিত হতে পারছে না।

এরই সুযোগ গ্রহণ করছে ধর্মধ্বজী ও ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদীরা। তারা আজ গ্রামগঞ্জে লোকসাধারণের একেবারে ভেতর মহলে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যাভাষ্যের বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। বাংলার লোকসাধারণকে তাদের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভুলিয়ে দেওয়ার অপপ্রয়াসে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষান্ধ ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদীরা অনেক পরিমাণেই সফল হয়ে উঠেছে, তাদের এই সাফল্য আশঙ্কাজনক দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে।

এ রকম অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানোর প্রযত্ন গ্রহণ করতে হবে এখনই, এই মুহূর্তেই। সব সংস্কৃতিকর্মী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকারীদের নিজেদের চিত্তলোকে পরিবর্তন ঘটাতে হবে প্রথমে। ভালো করে জানতে হবে লৌকিক ধর্মের মর্মকথা, লোকায়ত সংস্কৃতির আদ্যোপান্ত, রাজনীতি সম্পর্কে লোকসাধারণের ভাবনাচিন্তা ও রাজনীতিকদের কাছে তাদের প্রত্যাশার প্রকৃতি, সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী ও গোষ্ঠীর ভূমিকা এবং গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের জীবনভাবনা ও জীবনাচরণের আরও অনেক কিছু। শুধু জানলেই হবে না, লোকসাধারণের সঙ্গে একাত্দ হয়েই সামাজিক রূপান্তর সাধনের লক্ষ্যাভিমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি করতে হবে। সেই জোয়ারেই খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদ, অসৎ রাজনীতি ও শোষণ-সহায়ক অর্থনীতি। বৈজ্ঞানিক প্রত্যয়দীপ্ত ও সর্বত্র প্রসারিত সাংস্কৃতিক আন্দোলনই কেবল পারে অসত্য ও অর্ধসত্যের ধূম্রজাল অপসারণ করে আলোকোজ্জ্বল অখণ্ড সত্যের প্রতিষ্ঠা ঘটাতে এবং মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ থেকে সবাইকে মুক্ত করে আনতে।

যতীন সরকার

লেখক : শিক্ষাবিদ

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *