বই: সত্যের সন্ধান; লৌকিক দর্শন (‘পাঠক সমাবেশ’ প্রকাশিত ‘আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র ১’ এর অন্তর্ভুক্ত)

বই: সত্যের সন্ধান; লৌকিক দর্শন (‘পাঠক সমাবেশ’ প্রকাশিত ‘আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র ১’ এর অন্তর্ভুক্ত)
লেখক: আরজ আলী মাতুব্বর
বিষয়বস্তু: আত্মা, ঈশ্বর, ধর্ম, পরকাল, প্রকৃতি ও বিবিধ বিষয়ে দার্শনিক প্রশ্ন
রচনাকাল: বাংলা ১৩৫৯ (ইংরেজি১৯৬৬)
প্রথম প্রকাশ: ১৯৭৩
.
বইটি সম্পর্কে আমার অভিমত:
.
একেবারে সহজ-সরল ভাষায় মৌলিক কিছু প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক কিন্তু সে প্রশ্নগুলোর গভীরে গেলে দার্শনিক চিন্তায় মগ্ন হয়ে যেতে পারেন পাঠক। ধর্ম ও দর্শন নিয়ে আগ্রহী ও ভাবতে ইচ্ছুক পাঠকদের অবশ্যই পড়া উচিত, সব প্রশ্ন না হোক কিছু প্রশ্ন হলেও আপনাকে ভাবনার খোরাক জাগাবে। পড়ার সময় পাঠককে তৎকালীন সমাজের অবস্থা বিবেচনা করতে হবে, কেননা ধর্মের নামে তখন সমাজে এমন অনেক ঘৃণ্য-হাস্যকর বিধান প্রচলিত ছিলো যা এখন আর প্রচলিত নেই।
.
বইটি সম্পর্কে লেখকের উপসংহারে লেখা কিছু কথা দিয়েই শুরু করি:
.
‘সমাজে এমন এক শ্রেণীর লোক পাওয়া যায় যারা হাতে ঘড়ি ও চক্ষে চশমা (বর্তমানে মোবাইলও) আঁটিয়া মাইকে বক্তৃতা করেন আর ‘বস্তুবাদ ‘ বলিয়া বিজ্ঞানকে ঘৃণা ও ‘বস্তুবাদী’ বলিয়া বিজ্ঞানীদের অবজ্ঞা করেন। অথচ তাহারা ভাবিয়া দেখেন না যে, ভাববাদীরা বস্তুবাদীদের পোষ্য।’

‘আধুনিককালের অধিকাংশ মানুষ চায় কুসংস্কার হইতে মুক্তি, চায় সত্যের সন্ধান।’

‘কুসংস্কার ত্যাগ করার অর্থ ‘ধর্ম ত্যাগ করা’ নহে। যদি কেহ কুসংস্কার ত্যাগ করিতে অনিচ্ছুক হন এবং বলিতে চাহেন যে, কুসংস্কার ত্যাগ করিলে ধর্ম থাকবে না, তাহা হইলে মনে আসিতে পারে যে, ধর্মরাজ্যে কি কুসংস্কার ভিন্ন আর কিছুই নাই? এ প্রসঙ্গে কেহ যেন মনে না করেন যে, আমরা ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করিতেছি। আমাদের অভিযান শুধু অসত্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। প্রত্যেকটি ধর্ম থাকিবে মিথ্যার আবর্জনাবর্জিত ও পবিত্র সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’
.
প্রেক্ষাপট:
.
ধর্ম,দর্শন ও বিজ্ঞান সম্পর্কে পড়ালেখা করতে গিয়ে এ তিনটি বিষয়ের সমন্বয় নিয়ে ভাবতে গিয়ে লেখকের মনে বেশ কিছু প্রশ্ন জেগেছিল, যা তিনি লিখে রেখেছিলেন। তাবলীগ জামায়াত তাকে দাওয়াত দিতে এলে তিনি সে লিখিত প্রশ্নগুলো তাদের আমিরকে দেন, যিনি জবাব দেওয়ার কথা বলে প্রশ্নগুলো নিয়ে ফৌজদারি মামলা করেন লেখকের বিরুদ্ধে, সে মামলা থেকে খালাস পেতে লেখককে আদালতে প্রশ্নগুলোর ব্যাখ্যা দিতে হয়, সে প্রশ্ন ও ব্যাখ্যাগুলো নিয়েই মূলতঃ বইটি।
.
প্রশ্নের কারণ:
.
পরস্পর বিপরীত বা সাংঘর্ষিক দুটি মত যেখানে সত্য হতে পারে না সেখানে শতাধিক ভিন্ন, অনেকক্ষেত্রে বিপরীত ধর্ম কিভাবে সত্য হতে পারে, এর একটা সত্য হলে কোনটা, সেটা কোন মাপকাঠিতে, কোন প্রমাণে, কোন রূপে সত্য সেটা লেখককে ভাবিয়েছে। মানুষের স্বভাবধর্ম (মানবধর্ম) অভিন্ন এবং সেটা মানুষ নিজের অজান্তেই পালন করে যাচ্ছে, কিন্তু মানুষের কল্পিত প্রায় সকল ধর্ম মূলতঃ একেশ্বরবাদী হলেও এদের মধ্যে মিলের পরিবর্তে আছে বৈপরীত্য, প্রায় সব ধর্মই নিজেকে সঠিক ও অন্য ধর্মকে ভুল বলে, এমনকি একই ধর্মের মধ্যেও আছে অনেক ভাগ যারা একে অপরকে ভুল বলে হানাহানিতে লিপ্ত। বিজ্ঞান,দর্শনের বইয়ে সাধারণত কেউ সজ্ঞানে ভুল কিছু লিপিবদ্ধ করে না, তারপরেও ভুল হলো তারা সংশোধন করে নেয় কিন্তু প্রচলিত ধর্মগ্রন্থগুলোকে দাবি করা হয় ঐশ্বরিক বা অপৌরুষেয় এবং বলা হয় কোনো ভুল নেই এগুলোতে, তাই এগুলোর সংশোধন বা সমন্বয়ের উপায় নেই, উপরন্তু এসবের সমালোচনাও নিষিদ্ধ। কিন্তু মানুষের ভাবনা কোনো বিধিনিষেধ মানে না, ধর্মে যা নিষিদ্ধ তাও ভাবে, বিজ্ঞান ও দর্শন দিয়ে বুঝতে চায়, দু একজন সাহস করে ধর্মগুরুদের প্রশ্ন করলেও ‘ঈশ্বরই ভালো জানেন’, ‘সব ঈশ্বরের লীলাখেলা’ ধরণের জবাব পান। মানুষ যাহা প্রত্যক্ষ করে, প্রত্যক্ষের ভিত্তিতে অনুমান করে, কার্য কারণ দিয়ে বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে গ্রহণ করতে পারে সেটাই বিশ্বাস করে, অন্যথায় বিশ্বাস হয়ে যায় অন্ধবিশ্বাস, সেটা টিকে থাকতে পারে না। ধর্মের বিধি-বিধান যুক্তিগ্রাহ্য না হলেই মানুষের মনে সে সম্পর্কে সন্দেহ ও প্রশ্ন জাগে, ফলে ধর্ম-কর্মে শিথিলতা আসে! তেমন কিছু প্রশ্ন নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে।
.
বইটিতে আলোচিত উল্লেখযোগ্য কিছু প্রশ্ন :
.
আত্মা বিষয়ক
.
আমি কে?
প্রাণ কি স্বরূপ না অরূপ?
মন ও প্রাণ কি এক?
আমি কি স্বাধীন?
অশরীরী আত্মার কি জ্ঞান থাকবে?
প্রাণ কিভাবে দেহে যাওয়া আসা করে?
.
ঈশ্বর বিষয়ক
.
আল্লাহর রূপ কি?
খোদাতাআ’লা কি মনুষ্য ভাবাপন্ন?
ঈশ্বর কি স্বেচ্ছাচারী না নিয়মতান্ত্রিক?
আল্লাহ ন্যায়বান না দয়ালু?
আল্লাহর অনিচ্ছায় কিছু ঘটে কি?
নিরাকারের সাথে নিরাকারের পার্থক্য কি?
স্থান,কাল ও শক্তি – সৃষ্ট না অসৃষ্ট?
ঈশ্বর কি দয়াময়?
সৃষ্টি যুগের পূর্বে কোন যুগ?
.
পরকাল বিষয়ক
.
জীব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি?
পাপ-পূন্যের ডায়রি কেন?
পরলোকের সুখ-দুঃখ শারীরিক নাকি আধ্যাত্মিক?
গোর(কবর) আজাব কি ন্যায়সঙ্গত?
ইহকাল ও পরকালে সাদৃশ্য কেন?
স্বর্গ – নরক কোথায়?
.
ধর্ম বিষয়ক
.
ভাগ্যলিপি কি অপরিবর্তনীয়?
আদমের পাপ কি?
শয়তান কি?
উপাসনার সময় নির্দিষ্ট কেন?
নাপাক বস্তু কি আল্লাহর কাছেও নাপাক?
ফেরেশতা কি?
ফেরেশতার কাজ কি?
মেরাজ কি সত্য না স্বপ্ন?
এক নেকী কতটুকু?
পাপের কি ওজন আছে?
ইসলামের সাথে পৌত্তলিকতার সাদৃশ্য কেন?
জীব হত্যায় পূণ্য কি?
পাথর চুম্বন কেন?
.
প্রকৃতি বিষয়ক:
.
মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য কেন?
আকাশ কি?
রাত্রে সূর্য কোথায় থাকে?
ঋতুভেদের কারণ কি?
উত্তাপহীন অগ্নি কিরূপ?
হযরত নূহ নবীর সময় মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হইয়াছিল কি?
.
বিবিধ
.
আদম কি আদি মানব?
হযরত মুসা সিনয় পর্বতে কি দেখিয়াছিল?
যীশু খ্রীষ্টের পিতা কে?
জ্বীন জাতি কোথায়?
সূর্য বিহীন দিন কিরূপ?
ফরায়েজে “আউল” কেন?
স্ত্রী ত্যাগ ও হিলা প্রথার তাৎপর্য কি?

 

শামস অর্ক

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *