মুক্ত কর হে বন্ধ- তৃতীয় পর্ব (মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সমাজ )

মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থা

 

ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও ইউরােপের ইতিহাসের মধ্যযুগ ধরা হয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে ষষ্ঠদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছর সময়কে। এর শুরু হয় রােম সাম্রাজ্যের পতনের সময় থেকে এবং শেষ হয় ষােল শতকে রােমান ক্যাথলিক চার্চের সংস্কার আন্দোলনের সময়। এই যুগকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্থবিরতার সময় বলে কেউ কেউ মনে করেন। কিন্তু এই সময়কালে বাস্তবে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভব ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ছিল। এই সময় পশ্চিম ও উত্তর ইউরােপে স্থায়ী নগর গড়ে ওঠে। আধুনিক সময়ের অনেক রাষ্ট্রের উৎপত্তি এই সময়কালের ঘটনাবলীর কারণে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের আগে পর্যন্ত সবস্থানে কৃষিই ছিল সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশ। পূর্বের সুমেরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে রােমান সাম্রাজ্যে অধিকাংশ মানুষ কৃষিতে নিয়ােজিত থাকলেও নগরগুলিই সমাজ ও অর্থনীতিকে বেশী প্রভাবিত করত। মধ্যযুগীয় ইউরােপীয় সমাজে কৃষি যে শুধু প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ছিল তাই নয়, কৃষি ও গ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলাে সমাজের নিয়ামক শক্তি ছিল, যদিও নগরও বিস্তার লাভ করেছিল।

রােমান সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের সময় অত্যধিক কর আদায়, দুর্নীতি ও অপশাসনের কারণে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙ্গে পড়ে। নগর গুলির অবনতি হয় এবং ছােট ছােট রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এর উপর অষ্টম শতকে বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ শুরু হয়। এটা প্রায় দুই শতক স্থায়ী হয়। স্ক্যান্ডিনিভিয়া থেকে ভাইকিংরা আক্রমণ করে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আধিপত্য বিস্তার করে, ফ্রান্সের উত্তরাংশ দখল করে প্যারিস পর্যন্ত পৌছে যায়, এমনকি ভূমধ্যসাগরেও ঢুকে পড়ে। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলিমরা স্পেন অধিকার করে নেয় এবং সিসিলি, কর্সিকা এই সমস্ত দ্বীপ দখল করে ভূমধ্যসাগরে একক আধিপত্য স্থাপন করে। নবম শতাব্দীতে ম্যাগিয়ার গােষ্ঠীসমূহ কার্পাথিয়ান পর্বত অতিক্রম করে মধ্য ইউরােপ আক্রমণ করে। তারা উত্তর ইতালী, পূর্ব ফ্রান্স, ও দক্ষিণ জার্মানী অঞ্চলে লুটপাট ও ধ্বংস করে পরবর্তী শতকে হাঙ্গেরীতে বসবাস শুরু করে।

এইসব আক্রমণ মােকাবিলা করার জন্য মধ্য ইউরােপের ফ্রাঙ্ক রাজারা এক ধরনের সামাজিক কাঠামাে তৈরী করে। যুদ্ধের জন্য অশ্বারােহী যােদ্ধা প্রয়ােজন ছিল। কর সংগ্রহের কার্যকর কোন ব্যবস্থা না থাকায় রাজার পক্ষে তাদের ভরণপােষণ করার উপায় ছিল না। এ ছাড়া তাদের রাজ্যের প্রশাসন চালানর জন্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যে সব কর্মচারীর প্রয়ােজন ছিল, তাদেরও বেতন দেওয়ার কোন পথ ছিল না। রাজারা তাই রাজ্যের এক একটি অংশ এক একজন শাসকের (যাদের পরিচিতি ছিল কাউন্ট, ডিউক বা মাকুঁই নামে) দায়িত্ব দিয়ে দিত। এই শাসকেরা এইসব ছােট ছােট এলাকার প্রশাসন চালু রাখত, কর আদায় করত ও সৈন্য ভরণ পােষণ করত।

“They would purchase people from all over England and sell them off to Ireland in the hope of profit; and put up for sale maidservants after toying with them in bed and making them pregnant. You would have groaned to see the files of the wretches of people roped together, young people of both sexes, whose youth and beauty would have aroused the pity of barbarians, being put up for sale every day.”

 

অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে ম্যানর পদ্ধতি নামে আর এক ধরনের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। রােমান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ার ফলে অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা অনেক প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ বড় খামার স্থাপন করে। এগুলাে ল্যাটিফান্ডিয়া (Latifundia) নামে পরিচিত ছিল। স্যারাসেন, ম্যাগিয়ার ও ভাইকিংদের আক্রমণের ফলে শাসকশ্রেণীর মধ্যে আক্রমণকারীদের অনুপ্রবেশ ঘটে। জমির কৃষকেরা আইনের দ্বারা ভূমি দাস ছিল, যেসব স্থানে এই আইন ছিল না সেখানেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার কারণে কৃষকের নির্দিষ্ট জমির কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া বা কাজ করা সম্ভবপর হত না। ম্যানর ব্যবস্থার প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় নবম শতাব্দীতে। সেই সময় উত্তর ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানী ও উত্তর ইতালীতে এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে এটা ইংল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল ও পূর্ব ইউরােপেও বিস্তার লাভ করে। বিভিন্ন এলাকায় ম্যানর ব্যবস্থার কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও তার একটা সাধারণ গড়ন ছিল। ম্যানর বা বড় কৃষি খামার এর এক অংশ জমি ছিল মালিকের নিজের। এই জমির সঙ্গে তার নিজের বাসভবন, বাগান, শস্যের গােলা থাকত, আরও থাকত ঘােড়ার আস্তাবল, কামার ও কাঠমিস্ত্রীদের কাজ করার জায়গা। আর এক অংশ থাকত কৃষকদের জমি। পশুচারণ ক্ষেত্র, মাঠ, বনভূমি থাকত সর্বসাধারণের। কিন্তু মালিক এটার তত্ত্বাবধান করত। কৃষকেরা ম্যানর মালিকের বাসস্থানের কাছাকাছি গ্রামে ছােট ছােট বাড়ীতে থাকত।

কৃষকদের ম্যানর মালিকের জমিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হত। বাকী সময় তারা তাদের জমিতে কাজ করত। জমি চাষ করা, বীজ বােনা ও ফসল কাটা যৌথভাবেই কৃষকেরা করত। এ ছাড়াও তাদের ম্যানর মালিককে জমি ব্যবহারের জন্য খাজনা দিতে হত। মালিকের বাড়ী, বাগান, আস্তাবলেও কৃষক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিনা পারিশ্রমিকে অথবা সামান্য পারিশ্রমিকে কাজ করতে হত।

গ্রামের সমাজে বিভিন্ন স্তরের মানুষ থাকলেও সামগ্রিকভাবে বিভাজন করলে তিন প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়। উপরের স্তরে থাকত শাসক ও বিত্তবান শ্রেণী, এর মধ্যে রাজা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক শাসক ও বড় ভূস্বামীরা অন্তর্গত ছিল। জনসংখ্যার শতকরা পাঁচ ভাগ বা তার কম হলেও এরাই শাসন কাজ চালাতেন, শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন, শত্রুর আক্রমণ থেকে রাজ্য রক্ষা করতেন। এর পরের স্তরে থাকত ধর্মযাজকেরা, এদের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের ভাগ ছিল। ধর্মযাজকদের উচ্চতর পদগুলাে (যেমন বিশপ ও এ্যাবট) সমাজের উঁচুতলার ছেলেদের জন্য সংরক্ষিত থাকত। নিম্নতর পদগুলাে গরীব ঘরের ছেলেরা পেত।

সমাজে দাস ছিল। তবে নবম শতাব্দীতে এসে দাসের সংখ্যা কমে আসে। এরপর উচ্চবিত্ত লােকদের গৃহভৃত্য হিসাবেই পুরােপুরি দাস বলা যায়- এমনটি পাওয়া যেত। কিন্তু দরিদ্র কৃষকদের এমনই অবস্থা ছিল যে, তারা নামে দাস না হলেও কাজে তাই ছিল। তাদের নিজস্ব জমি জমা ছিল না, এমনকি জমির মালিকের অনুমতি ছাড়া তারা বিবাহ করতেও পারত না। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এই ধরনের বাঁধন কমতে থাকে। কিন্তু পূর্ব ইউরােপে এগুলি থেকে যায় এমনকি আরও শক্তিশালী হয়।।

ম্যানর কেন্দ্রীক সমাজ ব্যবস্থায় মালিকের জন্য কতটা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হবে তা নির্ভর করত কৃষকের নিজের কত পরিমাণ জমি ভােগ দখলের ইজারা থাকত তার উপর। কোন জমির ইজারা যাদের ছিল না তাদের সপ্তাহের তিন চার দিনই ম্যানর মালিকের কাজ করতে হত। যাদের জমির ইজারা ছিল তাদের কম শ্রম দিতে হত। কৃষক পরিবারের মেয়েরা সুতা ও বস্ত্র তৈরী করত, অনেক ক্ষেত্রে ম্যানর মালিকের কারখানায়, কখনও নিজেদের ঘরে। অনেক কৃষক পরিবারের ছেলে মেয়েরা ম্যানর মালিকের বাড়ীতে গৃহভৃত্যের কাজ করত। তাছাড়াও ম্যানর মালিককে জমির ইজারার জন্য কৃষকেরা খাজনা দিত। ত্রয়ােদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে একজন কৃষক তার আয়ের অর্ধেকটাই খাজনা দিত বলে হিসাব করা হয়েছে। এছাড়া ফসলের এক দশমাংশ দিতে হত গীর্জাকে। কম জমির ইজারাদাররা জমির আয় থেকে সংসার চালাতে পারত না। তারা অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন কৃষকদের জমিতে অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে আরও কিছু আয় করত।

কৃষকের লাঙল ব‍্যবহার

 

এই ম্যানর প্রথা কয়েক শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তৎকালীন সমাজে প্রায়ই যুদ্ধ বিগ্রহ লেগে থাকত। ব্যবসা বাণিজ্য ছিল কম, প্রযুক্তি ছিল কম উৎপাদনশীল। এর মধ্যেও ম্যানর ব্যবস্থা এক ধরনের সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে ও একটা সহনীয় পর্যায়ে জীবন যাত্রা চালু রাখে। মধ্যযুগে কৃষিতে দুটি উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন হয়, প্রথমটি হচ্ছে এর আগের দুই পালাক্রমে শস্য আবাদ পদ্ধতির পরিবর্তে তিন পালাক্রমের শস্য আবাদ পদ্ধতির প্রচলন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে চাকাযুক্ত ভারী লাঙ্গলের ব্যবহার।

এই যুগের আগে দুই পালাক্রমে জমি চাষ করা হত। এটা প্রধানতঃ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের শুষ্ক আবহাওয়ার উপযােগী ছিল। এই পদ্ধতিতে এক বছর জমিতে শস্য আবাদ করা হলে পরের বছর আবাদ না করে ফেলে রাখা হত। এতে জমির উর্বরতা বজায় থাকত ও জমির আর্দ্রতাও থাকত। উত্তর পশ্চিম ইউরােপ, রােম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার আগে সেখানকার অধিবাসীরা স্থায়ীভাবে জমিতে চাষাবাদ করত না। এই অঞ্চলের বিভিন্ন গল (Gaul) ও জার্মানিক (Germanic) গােত্রগুলি প্রধানতঃ তাদের গরুর পালের উপর নির্ভরশীল ছিল। তারা গাছপালা পুড়িয়ে জমি পরিষ্কার করে ফসলও বুনত। জমির উর্বরতা কমে গেলে তারা গরুর পাল নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যেত। রােমানরা এসে সেই অঞ্চলে দুই পালাক্রমের ফসল আবাদ শুরু করল। কিন্তু তাদের হালকা লাঙ্গল এখানকার শক্ত জমি চাষ করে আবাদ করার উপযুক্ত ছিল না। সেই কারণে তাদের চাষাবাদ এই অঞ্চলের অল্প কিছু অপেক্ষাকৃত কম শক্ত জমিতে সীমিত ছিল। ফলকযুক্ত ভারী লাঙ্গলের উৎপত্তির স্থান ও সময় জানা নেই। কিন্তু এর ব্যবহার শুরু হওয়ার ফলে উত্তর পশ্চিম ইউরােপের উর্বর কিন্তু শক্ত জমি চাষ করা সম্ভব হল। এতে উল্লেখযােগ্য জমির পরিমাণ বাড়ল, তবে ভারী লাঙ্গল ব্যবহার করতে কয়েকটি বলদের প্রয়ােজন হত।

অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে উত্তর ফ্রান্সে প্রথম তিন পালাক্রমের আবাদ শুরু হয়। এই পদ্ধতির একটি উদাহরণ হলঃ প্রথম যব বা ওট বসন্তকালে বুনে গ্রীষ্মকালে তােলা হত, এরপর আর একটি ফসল (গম অথবা রাই) হেমন্তকালে বুনে পরবর্তী গ্রীষ্মকালে তােলা হত। তারপর জমি এক বছর আবাদ না করে রাখা হত। তিন পালাক্রম পদ্ধতিতে জমির উৎপাদন প্রায় এক তৃতীয়াংশ বেশী হত এবং বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপাদন সম্ভব হত। এই কারণে যেখানে মাটি ও আবহাওয়া এই পদ্ধতির উপযােগী ছিল, সেই সব অঞ্চলে এই পদ্ধতির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। একাদশ শতাব্দী নাগাদ উত্তর ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানী, দক্ষিণ ইংল্যান্ড, হল্যান্ড এই সব এলাকায় তিন পালাক্রমের শস্য আবাদ প্রচলিত হয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বেশীরভাগ স্থানেই দুই পালাক্রমের আবাদ ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত চলতে থাকে।

কৃষি যন্ত্রপাতি

 

কৃষিতে আরও কিছু পদ্ধতিগত উন্নতি এই যুগে করা হয়। লােহা তৈরীর পদ্ধতি উন্নত হওয়ায় বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতিতে লােহার ব্যবহার বাড়ে। লাঙ্গলের ফলায় লােহার ব্যবহার শুরু হয়। লােহার তৈরী কাস্তে, কুড়াল, কোদাল, ইত্যাদি ব্যবহার হতে থাকে। গৃহপালিত প্রাণীর বর্জ্য বহুকাল আগে থেকেই সার হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছিল, কিন্তু এই যুগে সে গুলাে সংগ্রহ করার আরও সংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া হয়। ত্রয়ােদশ শতকে মটর ও ক্লোভার (clover) এর আবাদ করে সেগুলাে আবার লাঙ্গল দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার প্রচলন হয়। এর দ্বারা উর্বরতা বাড়ান হত। ফসলের ক্ষেত্রেও নুতনত্ব আসে। রাই (rye) ও ওট (oat) মধ্যযুগের আগে ইউরােপে খুব কম স্থানেই আবাদ হত। মধ্যযুগে এইগুলি উত্তর ও পূর্ব ইউরােপে ব্যাপকভাবে চাষ হতে থাকে। মটর, মসুর ও শীম পূর্বের চাইতে অনেক বেশী স্থানে আবাদ শুরু হয়। অনেক শবজী ও ফল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, এমনকি এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে মধ্য ও উত্তর ইউরােপে নিয়ে এসে ফলন শুরু করা হয়। অনেক ফলের উন্নত জাত কলম (grafting) এর মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়। কলম করার পদ্ধতিটি উত্তর আফ্রিকা থেকে আগত স্পেনীয় মুররাই (moor) ইউরােপে নিয়ে আসে। এই মুসলিম মুরদের কাছ থেকে ইউরােপীয়রা তুলা, ইক্ষু, লেবু জাতীয় ফল ও ধান চাষ শিখে। ইতালীর একটা বড় অঞ্চলে শেষ পর্যন্ত ভাত প্রধান খাদ্যের স্থান নেয়। মুসলিম সভ্যতার মাধ্যমে হুঁত গাছের চাষ ও রেশম উৎপাদন এর পদ্ধতি আসে উত্তর ইতালীতে ও উৎপাদন শুরু হয়। বস্ত্র উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিক কাপড়ের প্রাকৃতিক রং, যেমন ম্যাডার (madder), জাফরান, ওড (woad) এর উৎপাদনও বাড়ে। সংকর প্রজাতি সৃষ্টির (cross breeding) মাধ্যমে উন্নত ধরনের পশু (যেমন অধিক দুগ্ধ উৎপাদন সক্ষম গাভী, অধিক পশম সম্পন্ন ভেড়া) তৈরী করা হয়।

সামগ্রিকভাবে প্রাচীন যুগের তুলনায় মধ্যযুগে কৃষি উৎপাদনে বিভিন্নতা আসে ও সংকর প্রক্রিয়ার উন্নতির ফলে পরিমাণও বাড়ে। পশু পালনেও উন্নতি হয়। বস্ত্র উৎপাদনও গুণগতভাবে পরিবর্তিত হয়। পশম ও লিনেনের সঙ্গে তুলা ও রেশমের তৈরী বস্ত্র উৎপাদন শুরু হয়।

পশ্চিম ইউরােপের জনসংখ্যা ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৫০ লক্ষ ছিল বলে অনুমান করা হয়। চতুর্দশ শতকের শুরুতে তা বেড়ে হয় ৪ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে ৫ কোটির মধ্যে। এর বড় কারণ সম্ভবতঃ পুষ্টির উন্নতি। খাদ্যের পরিমাণ এই সময় বেড়েছিল এবং খাদ্যের বৈচিত্রও এসেছিল, ফলে সামগ্রিক পুষ্টির উন্নতি ঘটেছিল। স্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে একদিকে যেমন রােগের কারণে মৃত্যুর হার কমল, তেমনি জন্মের হার বাড়ল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য তাই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ছিল বড় কারণ।

এই বর্ধিত জনসংখ্যার একটি ছােট অংশ শহরবাসী হয়। বাকী অংশ গ্রামগুলিতেই কৃষিকাজে নিয়ােজিত থাকে। মােটামুটি তিন ধারায় এই অংশ ভাগ করা যায়। একভাগে বর্ধিত জনগােষ্ঠী তাদের নিজেদের গ্রামেই থেকে যায়, সে কারণে সেখানে পরিবার প্রতি আবাদী জমির পরিমাণ কমে। দ্বিতীয় অনেক অনাবাদী এলাকা পরিষ্কার করে নতুন স্থানে আবাদ শুরু করা হয় এবং নতুন বসতি হয়। দশম শতকের শুরুতে উত্তর পশ্চিম ইউরােপে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম ছিল অনেক দূরে দূরে। এগুলির মধ্যে ছিল অনাবাদি জমি বা-জঙ্গল। হল্যান্ড অঞ্চলে সাগরে বাঁধ দিয়ে নতুন জমি উদ্ধার করে চাষ করা হয়। এই সব এলাকার যারা শাসনকর্তা বা অধিপতি ছিলেন তারা জন বসতি বাড়ানর জন্য যারা অনাবাদি জমি বা জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষ শুরু করত তাদের জমির মালিকানা দিয়ে দিত। ফলে তারা মালিককে খাজনা দিত কিন্তু কয়েক দিক থেকে অর্থনৈতিকভাবে অধিপতিদের থেকে ছাড় পেল। যেমন-জমির মালিকানা স্বত্ব পেল, অধিপতিকে বিনামূল্যে শ্রম দেওয়া থেকে ছাড় পেল। তৃতীয়তঃ ভৌগলিকভাবে নতুন নতুন অঞ্চলে মানুষ ছড়িয়ে পড়ল। আইবেরিয়ান উপদ্বীপ (স্পেন ও পর্তুগাল সমন্বয়ে) অষ্টম শতাব্দী থেকে প্রায় ৪০০ বৎসর মুসলিম মুরগণ শাসন করে। এই মুররা ছিল কৃষিতে অত্যন্ত দক্ষ, তাদের শাসনামলে রাজধানী কর্দোভা ছিল পশ্চিম ইউরােপের সবচাইতে বড় শহর ও বিদ্যাচর্চার সবচাইতে বড় কেন্দ্র। এয়ােদশ শতাব্দী নাগাদ পীরেনিজ পর্বত এর উত্তর অর্থাৎ ফ্রান্স থেকে আসা খ্রিষ্টানরা প্রায় সম্পূর্ণ উপদ্বীপ দখল করে নেয়। ত্রয়ােদশ দশকের শেষদিকে পশ্চিম ইউরােপীয় নরম্যানরা মুসলিমদের কাছ থেকে সিসিলি দখল করল এবং তারপর দক্ষিণ ইতালী থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করে। জার্মান জাতিগােষ্ঠীর লােকেরা দশম শতকের পর পূর্ব ইউরােপে। ছড়িয়ে পড়ে। পােল্যান্ড, হাঙ্গেরী, রুমানিয়া এ সব অঞ্চলে দশম শতকের আগে আদিম স্লাভিক (slavic) জাতিগােষ্ঠীরা বাস করত। এরা সংখ্যায় খুব কম ছিল এবং শিকার করে ও ফলমূল আহরণ করে (hunter & gatherer) জীবন যাপন করত। বেশীর ভাগ জায়গায় জনবসতি ছিল না। জার্মান জাতিগােষ্ঠীর লােকেরা এই অঞ্চলগুলিতে তাদের উন্নত কৃষিপদ্ধতি চালু করল। তারা নগর ও নগরকেন্দ্রিক ছােট ছােট শিল্পও গড়ে তুলল। সময়ের সাথে সাথে রােমান ধর্মযাজকেরা এদের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করল। ত্রয়ােদশ শতাব্দী নাগাদ এই অঞ্চলে উৎপাদিত গম ও অন্যান্য শস্য বাল্টিক সাগর ও উত্তর সাগর দিয়ে পােল্যান্ড ও জার্মানী থেকে হল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে রফতানী শুরু হল। ক্রুসেড (crusade) শুরু হয় ১০৯৫ সালে। ইউরােপের খ্রিষ্টানরা জেরুজালেম পুনরুদ্ধার এর নামে আক্রমণ শুরু করে। কয়েক দফায় যুদ্ধ প্রায় একাদশ শতাব্দী থেকে ত্রয়ােদশ শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর ফলে যুদ্ধের প্রয়ােজন মেটানর জন্য রসদ সরবরাহ বাড়ে এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।

রোমান সাম্রাজ্য

 

রােমান সাম্রাজ্যের পতনের আগে থেকেই অর্থনৈতিক অবনতির ফলস্বরূপ নগর সমূহের জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। কোন কোন শহর একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়েছিল, কোন কোনটায় মানুষ খুবই কমে গিয়েছিল। এই শহরগুলাে তাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি থেকে প্রয়ােজনীয় জিনিষপত্র আহরণ করত। কিন্তু দূর-দূরান্তের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য খুবই কমে গিয়েছিল।

একাদশ শতাব্দীর আগে ইতালীর নগরগুলি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং মুসলিম সাম্রাজ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সপ্তম থেকে দশম শতক পর্যন্ত পূর্ব দিকের এই অঞ্চলগুলি ছিল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকা। পশ্চিম ইউরােপ ছিল পশ্চাদপদ ও দরিদ্র। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য চালিয়ে ইতালীর নগরগুলি লাভ করত। রােমান সাম্রাজ্যের পতন হলে ইতালীর নগরগুলির অবক্ষয় হলেও এই বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা টিকে ছিল। একাদশ শতাব্দী থেকে নগরগুলি আবার উন্নতি শুরু করল। কৃষি উৎপাদন বাড়ল, গ্রামের মানুষ নগরগুলিতে গিয়ে ব্যবসা ও শিল্পে কাজ নিল। এই উন্নতির ফলে গ্রামাঞ্চলে ম্যানর প্রথা আস্তে আস্তে ভাঙ্গতে লাগল। বিনা পারিশ্রমিকে মালিককে শ্রম দেওয়ার বদলে পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রথা চালু হল। ম্যানর এর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত জমিও ভাগ ভাগ করে আলাদা করা হল। জলসেচ ও সার ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ান হল।

আঞ্চলিক রাজা-রাজড়া বা বড় ভূস্বামীরা নগরগুলিতে কর্তৃত্ব চালাতে চাইলেও ধনী ব্যবসায়ী ও অন্যান্য নগরবাসীদের যৌথ চাপের মুখে প্রশাসনে পরিবর্তন ঘটে। প্রথমদিকে নগরবাসীরা সমিতি গঠন করে, পরবর্তীতে তারা নগর সরকার গঠন করে এবং রাজাদের কাছে স্বাধীনভাবে প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়ােগ করে। কোন কোন জায়গায় তাদের এজন্য যুদ্ধও করতে হয়। ১০৩৫ সালে মিলান যুদ্ধ করে এই স্বাধীনতা অর্জন করে। এই নগর রাষ্ট্রগুলি তাদের আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে তাদের শাসন ব্যবস্থা বিস্তার করে। ইতালীতে এইভাবে অনেকগুলি নগর রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। কিন্তু ইউরােপের অন্যান্য অঞ্চলে এটা হয়নি। অন্যান্য অঞ্চলে নগরায়ন দেরীতে শুরু হয় এবং এতটা শক্তি অর্জন করতে পারেনি। জার্মানী, ফ্রান্স, পূর্ব ইউরােপের বিভিন্ন এলাকায় নগরভিত্তিক কর্মকান্ড বাড়তে থাকে। কিন্তু আঞ্চলিক রাজাদের আধিপত্য থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারেনি। ত্রয়ােদশ শতকের শেষদিকে যেখানে মিলানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ এবং ভেনিস, জেনােয়া ও ফ্লোরেন্স প্রত্যেকটিতেই এক লক্ষের বেশী, সেখানে লন্ডনের জনসংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার এর কাছে এবং জার্মানীর কোলন এর জনসংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার এর মত।

একমাত্র যে অঞ্চল উত্তর ইতালীর সমৃদ্ধ নগরগুলির কাছাকাছি যেতে পেরেছিল সেটা হল ইউরােপের উত্তরাঞ্চল যা “Low countries” নামে পরিচিত। “Low countries” মধ্যযুগের ইউরােপের উত্তরাঞ্চলের একটি এলাকা। এটি রাইন ও আরও কয়েকটি নদীর ব-দ্বীপ জুড়ে অবস্থিত। বর্তমান নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, লাক্সেমবার্গ এবং উত্তর ফ্রান্স ও পশ্চিম

জার্মানীর কয়েকটি অঞ্চল নিয়ে এই এলাকা গঠিত ছিল। মােট জনসংখ্যা অনুপাতে নগরবাসীর সংখ্যা প্রায় এক তৃতীয়াংশ ছিল (উত্তর ইতালীর কাছাকছি)। এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন পদ্ধতি ছিল অগ্রবর্তী এবং এই অঞ্চল শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যেও ছিল অগ্রগণ্য। দ্বাদশ শতকে নগরায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলে উন্নতি হয়।

একাদশ শতাব্দীর আগেও ইতালী ও লেভান্ট (levant) (পূর্ব ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চল বর্তমান সাইপ্রাস, ইসরাইল, জর্ডান, প্যালেষ্টাইন, লেবানন,সিরিয়া ও দক্ষিণ তুরস্ক) এর মধ্যে পণ্য আদান প্রদান হত। এই ব্যবসায় প্রধানতঃ পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা মূল ভূমিকা পালন করত। এই ব্যবসায় যেসব পণ্য সামগ্রী ইউরােপে আনা হত সেগুলি বিলাসদ্রব্য বলে গণ্য করা হত, সিল্কের কাপড় ও চীনামাটির তৈজষ সামগ্রী আসত চীন থেকে, বিভিন্ন মসলা আসত মালাক্কা থেকে, ব্রকেড (brockade) আসত পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে। এছাড়াও সিরিয়া থেকে তুলা আসত, বদলে পাঠান হত উত্তর ইউরােপ থেকে উল ও লিনেনের কাপড়, ভেনিস থেকে কাঁচের তৈরী জিনিস, মধ্য ইউরােপ থেকে ধাতুর তৈরী কাজের জিনিষ। ইতালীর নগর রাজ্যগুলির মধ্যে ভেনিস ব্যবসা বাণিজ্যে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। আর একটি নগর রাজ্য জেনােয়া যুদ্ধে উত্তর আফ্রিকার মুর মুসলমানদের পরাজিত করে উত্তর আফ্রিকায় বাণিজ্য স্থাপন করে। অন্যান্য ইতালীর নগরগুলির সঙ্গে জেনােয়া ও ভেনিস পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা কাস্পিয়ান সাগর ও পারস্য উপসাগর পর্যন্ত নৌ বাণিজ্য বিস্তার করে। ক্রুসেডের ফলেও তাদের বাণিজ্যের কমতি হয় নি।

আরেকটি বাণিজ্য পথ ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠে। এটা মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সময় ঘটে। মঙ্গোল সাম্রাজ্য পূর্ব ইউরােপ থেকে পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং সেটা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে বড় সাম্রাজ্য। মঙ্গোল সম্রাটরা নিষ্ঠুর প্রকৃতির বলে পরিচিত হলেও তারা ব্যবসা বাণিজ্যে বাধা দেয় নাই। The great silk route নামে পরিচিত এই পথে ইউরােপ থেকে মধ্যএশিয়া হয়ে চীন পর্যন্ত বাণিজ্যের প্রচলন ছিল। তাছাড়া স্থলপথে পারস্য পর্যন্ত গিয়ে তারা নৌপথে ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্য চালাত। বিখ্যাত পরিব্রাজক মার্কোপােলাে এই পথে যাত্রা করে তার বিবরণ লিখে গেছেন।

ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম অংশের বাণিজ্য ছিল দুই ধরনের। প্রথমতঃ প্রাচ্যদেশ থেকে আসা বিলাদ্রব্য পশ্চিমাঞ্চলে বিতরণ করা; দ্বিতীয়তঃ খাদ্যশস্য, শুকানাে মাছ, লবণ, ভােজ্যতেল, মদ (wine) এই অঞ্চলের উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে ঘাটতি এলাকায় নিয়ে বিক্রি করা। এই ব্যবসায় ইতালীয়রা প্রধান হলেও স্পেনের অধিবাসীরা এবং উত্তর আফ্রিকার মুসলিমরাও অংশ নিত।।

উত্তর ইউরােপে উত্তর সাগর ও বাল্টিক সাগর এলাকায় স্ক্যান্ডিনেভিয়ানেরা বাণিজ্য চালাত। কিন্তু মধ্যযুগের পরবর্তী পর্যায়ে বিশেষতঃ ত্রয়ােদশ শতাব্দী থেকে জার্মানরা এখানে প্রাধান্য বিস্তার করে। জার্মানীর প্রায় ২০০ নগর সহযােগিতা করে এই অঞ্চলে বাণিজ্য করতে থাকে। ১৩৬৭ সালে ডেনমার্কের রাজা তাদের বাণিজ্য কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর তারা “হানসা” (Hansa) নামে সংগঠিত হয়ে বাণিজ্য চালাতে থাকে। ইউরােপের প্রায় সব বড় বড় শহরে তারা সহযােগিতা করে জার্মান এলাকা গড়ে তুলে। রিগা, ডানজিগ এগুলি ছিল বিদেশে পুরােপুরি জার্মান শহর।

ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম অংশের বাণিজ্য

 

দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চল পণ্যদ্রব্য তৈরীতে বিশেষত্ব অর্জন করতে শুরু করে। ইংল্যান্ড ভেড়ার উল তৈরীতে, বেলজিয়াম ও হল্যান্ড উলের কাপড় তৈরীতে, উত্তর ফ্রান্স মদ (wine) তৈরীতে, বাল্টিক সাগর অঞ্চল খাদ্যশস্য তৈরীতে এবং উত্তর ইউরােপ শুকনাে মাছ তৈরীতে দক্ষতা অর্জন করে। পর্তুগীজ, ফরাসী ও ইংরেজ জাহাজগুলাে উত্তরে মদ ও লবণ নিয়ে যেত এবং উত্তর ইউরােপ থেকে শুকনাে মাছ নিয়ে আসত।

স্থলপথে মালপত্র আনা নেওয়া করার চাইতে সমুদ্রপথে এটা করলে ব্যয় অনেক কম হয়। মধ্যযুগে যখন রেলগাড়ি বা মটর যান ছিল না তখন এটা আরও সত্য ছিল, কাজেই অধিক মালপত্র বহন সমুদ্রপথেই হত। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হত না। উত্তর ও দক্ষিণ ইউরােপের মধ্যে সমুদ্র পথ এত দীর্ঘ ও বিপজ্জনক ছিল যে এই পথে খুব কম বাণিজ্য হত। চতুর্দশ শতাব্দীতে জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্র যাত্রার কলাকৌশলের উন্নতি হওয়ায় সমুদ্র বাণিজ্য বাড়তে থাকে। এর আগে ইউরােপে দক্ষিণ ও উত্তর এর মধ্যে যােগাযােগ আল্পস পর্বতের কয়েকটি গিরিপথ হয়ে চলত। স্থল পথে এই যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন। রাজ্য কর আদায় করত আবার নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করত। মালপত্র আনা নেওয়ার জন্য কয়েকটি কোম্পানীও গড়ে ওঠে।

প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রগুলাে ছিল দক্ষিণে মিলান ও জেনােয়া নগর রাজ্য ও উত্তরে হামবুর্গ, ভিয়েনা, ক্র্যাকো (Cracow) লুবেক (Lubek) ও ব্লগে (Bruges)। আল্পস পর্বতের উত্তরে মধ্য ও পশ্চিম ইউরােপে কতকগুলাে বড় পণ্য বাজার (যে গুলি fair নামে পরিচিত) গড়ে ওঠে। এর মধ্যে লিপজিগ ও ফ্রাঙ্কফোর্ট এ বড় বাজার ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল উত্তর ফ্রান্সের শ্যাম্পেন নামক অঞ্চলের চারটি বড় শহর। শ্যাম্পেন এর অধিকর্তারা কাউন্ট (count) নামে পরিচিত। তারা এখানে বাজার বসার ব্যবস্থা করত, নিরাপত্তা দিত, এবং কোন বিবাদের জন্য বাণিজ্যিক আদালতের ব্যবস্থাও করেছিল। এই অঞ্চলের চারটি শহরে পালাক্রমে সারা বৎসরই বাজার বসত। এখানে ইতালীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা পণ্যের সঙ্গে ফ্রান্স ও জার্মানীর পণ্য এবং স্পেনের পণ্যের আদান প্রদান হত। এই বাজারগুলিতে বানিজ্যিক বিবাদ সমাধান করার জন্য আদালত সৃষ্টি করা হয় এবং অর্থ আদান প্রদানের জন্য ব্যবস্থার সৃষ্টি হয় যেমন: (letter of credit)। এগুলাে ব্যবসা বাণিজ্যে গূণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। বাজারগুলাের ব্যবসা বাণিজ্য ত্রয়ােদশ শতাব্দীর পর কমে গেলেও এই আর্থিক ব্যবস্থাপনা গুলাের প্রভাব থেকে যায়।

ত্রয়ােদশ শতকের শেষভাগে সমুদ্রপথে পণ্য আদান প্রদান ব্যবস্থার উন্নতি হয় জাহাজ চলাচল প্রযুক্তির উন্নতির কারণে। ভূমধ্যসাগর থেকে উত্তর সাগর পর্যন্ত জাহাজের বহর চলা সম্ভব হয়। এতে স্থলবাণিজ্য কমে আসে। এর ফলে আগের ছােট ছােট বাণিজ্যিক সংস্থার তুলনায় অনেক বড় বাণিজ্যিক ও আর্থিক (financial) কোম্পানী গঠিত হয়। এইসব কোম্পানীগুলাের প্রধান দপ্তর ইতালীর নগর রাজ্যগুলিতে থাকত কিন্তু তাদের শাখা ইউরােপের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে ছিল। এই পরিবর্তনকে “commercial revolution” বলে অনেকে আখ্যায়িত করেছেন।

এই ধরনের ব্যবসায় কেউ কেউ নিজের মূলধন খাটিয়ে কাজ করত। সময়ের সাথে সাথে একাধিক ব্যক্তির মূলধন যােগ করে ব্যবসা শুরু হল। এর মধ্যে একজন মালামাল নৌপথে নিজে নিয়ে যেত, অন্যেরা মূলধন খাটাত এবং কেউ কেউ মালামাল সংগ্রহ বা সরবরাহ করত। এটা commenda নামে পরিচিত ছিল। বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়তে থাকলে একটি ভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক সংগঠন তৈরী হতে থাকল যার নাম হল vera societa। এই সংগঠনে অংশীদারের সংখ্যা থাকত অনেকজন। এই সংগঠন গুলাের বেশীর ভাগই ইতালীর নগরগুলি (ফ্লোরেন্স, ভেনিস, মিলান)তে গড়ে ওঠে। এরা ব্যবসা বাণিজ্য পণ্য আনা নেওয়া ছাড়াও টাকা জমা রাখা, খাটান ও ধার দেওয়া এই সব কাজ করত। এদের অনেকের নিজস্ব জাহাজের বহর ও স্থলপথে চলাচলের উপযােগী মালবাহী ঘােড়ায় টানা গাড়ীর বহরও ছিল। এদের শাখা ইউরােপের অনেক শহরে থাকত। টাকা ধার নিয়ে বাণিজ্যে খাটানর প্রথাও চালু হয়। ত্রয়ােদশ শতাব্দীর শেষ দিকে জাহাজ ও তার পণ্য বীমা করার ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে।

মধ্যযুগের বাণিজ্যে ব্যাংক ও টাকা ধার দেওয়া (credit) একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। দ্বাদশ শতক থেকেই উত্তর ইতালীর ভেনিস ও জেনােয়াতে টাকা জমা রাখার জন্য ব্যাংক চালু হয়। পরবর্তীতে এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে অর্থ পাঠান শুরু হয়। প্রথমে এক ব্যাংকেই টাকা জমা রাখা ও তােলা এভাবেই শুরু হয়। পরবর্তীতে এক ব্যাংক হতে অন্য ব্যাংকে টাকা পাঠান বা একজনের টাকা অন্যজনকে দেওয়া এটাও চালু হয়। এরও পরে ব্যাংকগুলাে over draft (যে পরিমাণ টাকা জমা আছে তার চাইতে বেশী টাকা দেওয়া শুরু করে)। ইউরােপের অন্যান্য স্থানে,(যেমন- বারসেলােনা, লন্ডন, ব্রগে) ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয়। দূরবর্তী স্থানে বাণিজ্যের জন্য ব্যাংকগুলাে টাকা দেওয়া শুরু করে। অনেক পরিমাণ মুদ্রা বা স্বর্ণ দূর-দূরান্তরে নেওয়ার অসুবিধার জন্য bill of exchange ব্যবহার হত বেশী।

টাকা পয়সার লেন-দেনে আরেকটি সমস্যা ছিল-বিভিন্ন ধরনের মুদ্রার প্রচলন ও এদের মধ্যে মানের অনিশ্চয়তা। যেমন একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে অনেক জায়গায় পেনী নামে স্বল্পমূল্যের মুদ্রা চালু ছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে রাজা, ডিউক, কাউন্ট এমনকি পাদ্রীরাও এই মুদ্রা তৈরী করত। এগুলাের আকৃতি, ওজন, ও এর মধ্যে রূপার পরিমাণ এক এক স্থানে ছিল এক এক রকম। রাজারা অর্থনৈতিক দূরবস্থায় পড়লে অনেক সময় তাদের মুদ্রায় রূপার পরিমাণ কমিয়ে আরও অধিক মুদ্রা বাজারে ছেড়ে দিত। এই পরিস্থিতিতে কিছু কিছু মানুষ, যারা মুদ্রা ব্যবসায় জড়িত ছিল, এই মুদ্রাগুলি কিনতে ও তার আসল মূল্য নির্ধারণ করতে পারত। ত্রয়ােদশ শতকের শেষভাগে ইউরােপে ফ্লোরেন্স থেকে সােনার “ফ্লোরিন” নামে একটি মুদ্রা চালু হয়-যার মূল্য ছিল স্থিতিশীল।

মধ্যযুগে কৃষি ব‍্যবস্থা

 

মধ্যযুগে কৃষির তুলনায় শিল্প অর্থনীতিতে অনেক ক্ষুদ্র পরিসরে ছিল। কিন্তু ক্রমেই এটার গুরুত্ব বাড়ছিল। ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে নতুন উদ্ভাবন হতে থাকে এবং শিল্পের অগ্রগতি হতে থাকে। বস্ত্রশিল্প ছিল সবচাইতে বড় এবং ব্যাপক। প্রতিটি দেশের একটি অঞ্চলে বস্ত্র তৈরীর ব্যবস্থা ছিল। তবে কয়েকটি অঞ্চল বস্ত্র তৈরীতে পারদর্শিতা অর্জন করেছিল। এর মধ্যে ছিল উত্তর ফ্রান্স, বর্তমান বেলজিয়াম, ইতালীর উত্তরাঞ্চল, ইংল্যান্ডের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল। উল বা পশম ছিল বস্ত্র তৈরীর প্রধান কাঁচামাল। ফ্রান্স ও পূর্ব ইউরােপের অল্প কিছু অঞ্চলে লিনেন বস্ত্র তৈরী হত। রেশম ও তুলার বস্ত্র শুধুমাত্র ইতালী ও মুসলিম শাসিত স্পেনে তৈরী হত। অতীতের তুলনায় শ্রমিকের উৎপাদন ক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়েছিল, এর প্রধান কারণ ছিল তিনটি প্রযুক্তির উদ্ভাবনঃ চাকা দিয়ে সুতা তৈরী, পা দিয়ে চালান তাঁত ও পানির শক্তি দ্বারা চালিত মিল। ইংল্যান্ড ও ফ্ল্যান্ডার্স ব্যবসায়ীরা তাঁতীদের কাঁচামাল সরবরাহ করত। তাঁতীরা নিজেদের বাড়ীতেই বস্ত্র তৈরী করত। ব্যবসায়ীরা। তাদের কাছ থেকে নিয়ে তা বিক্রি করত। ইতালীতে তাঁতীদের এক জায়গায় নিয়ে এসে তত্ত্বাবধায়কদের অধীনে বস্ত্র তৈরী করত।

বস্ত্রশিল্পের চাইতে আকারে ছােট হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ধাতু শিল্প। মধ্যযুগের শেষদিকে এই শিল্পে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়। প্রাচীনকাল থেকে লােহা আবিষ্কার ও লােহার তৈরী অস্ত্র ও শােভাবর্ধনের জিনিষপত্র তৈরী হলেও এগুলাে তৈরীর প্রক্রিয়া ছিল কঠিন, তৈরী হত কম, দামও ছিল বেশী। ধনী ব্যক্তিরাই শুধু এগুলাে ব্যবহার করতে পারত। তামা ও পিতলের তৈরী জিনিষের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও সাধারণ মানুষ এগুলাে খুব কম ব্যবহার করত। মধ্যযুগে লােহা আকর আরও সহজলভ্য হয়। লােহা প্রস্তুতে সেই সময় অতি প্রয়ােজনীয় কাঠ কয়লা আরও বেশী পরিমাণে পাওয়া যায়। লােহা তৈরীর প্রযুক্তিরও উন্নতি হয়, ফলে লৌহজাত দ্রব্যের মূল্য কমতে থাকে এবং আরও বেশী পরিমাণে পাওয়া যেতে থাকে। চামড়ার তৈরী জিনিষ আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতে থাকে। তেমনই মাটি ও কাঠের তৈরী জিনিষপত্রও বিভিন্ন প্রয়ােজনে আরও বেশীভাবে ব্যবহার হত অনেক অংশে।

মধ্যযুগের কারিগররা বাস্তব প্রয়ােজনের কারণে প্রযুক্তির উদ্ভাবন করে। এই যুগে বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা আবিষ্কৃত কোন বস্তুর ব্যবহার বাস্তবে দেখা না গেলেও ঘড়ি ও চশমার এই সময় উন্নতি হয় ও ব্যবহার শুরু হয়। কম্পাস এর ব্যবহারও এই সময় বিস্তার লাভ করে। বারুদ ও বন্দুক ও এইসময় উদ্ভাবিত হয়। যদিও এগুলি ব্যবহারের ফল পরবর্তীকালে দেখা যায়। কাগজ তৈরী ও ছাপাখানার ব্যবহারও এই যুগে শুরু হয় এবং এটার অর্থনৈতিক পরিসর কম থাকলেও এর সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল অনেক বেশী।

পানি প্রবাহের দ্বারা চাকা ঘুরিয়ে বিভিন্ন কাজ কর্মের নিদর্শন খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকেই দেখা গেছে। চীন হতে শুরু করে ইউরােপ পর্যন্ত সব জায়গায় পানিপ্রবাহ বাহিত চাকার ব্যবহার ছিল। একাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ড উইলিয়াম দি কনকারার (William the Conquerer) এর সময়ে ৩০০০ গ্রামে জরিপ চালিয়ে ৫৬২৪টি পানির মিল (water mill) পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকেই পানির মিলের সাহায্যে শস্য ভাঙ্গা, কাপড় তৈরী, কাগজ তৈরী, কাঠ চেরাই, লােহা তৈরীর চুল্লীর হাপর চালান ইত্যাদি কাজ করা হত। তবে যে সমস্ত অঞ্চলে পানির অভাব ছিল সেখানে পানির মিল চালানর সুযােগ ছিল না। আবার সমতল ভূমিতে পানি পাওয়া গেলেও উপর থেকে নীচে পানির প্রবাহ না থাকায় এখানেও পানির মিল বসান যেত না। দ্বাদশ শতক থেকে বায়ুচালিত মিলের প্রচলন হয়। হল্যান্ড ও ফ্ল্যান্দার্সে বায়ুচালিত মিল এর বিশেষ প্রসার ঘটে। বায়ু ও পানি চালিত মিল গুলিতে যে চালক অংশ থাকত (gear) তা বেশ জটিল ছিল। যারা এই যন্ত্রাংশ গুলি তৈরী, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করত তারা যন্ত্র, বল ও গতি সংক্রান্ত বিদ্যার বাস্তব প্রয়ােগে পারদর্শিতা অর্জন করে। তারা যন্ত্রের ঘড়ি তৈরী করতে শুরু করে। চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ ইউরােপের প্রায় প্রতিটি শহরে কমপক্ষে একটি যান্ত্রিক ঘড়ি স্থাপন করা হয়। যন্ত্রের কর্ম পদ্ধতি সম্বন্ধে জ্ঞান ও দক্ষতা শুধু যে অর্থনৈতিক উন্নতি করেছিল তা নয়- মধ্যযুগের ইউরােপের মানুষের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীরও তা পরিবর্তন ঘটায়। বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সম্পূর্ণ অজানা এবং মানুষ প্রকৃতি, দেবতা ও অলৌকিক শক্তির হাতে অসহায়-এই ধারণা ক্রমে পরিবর্তিত হতে থাকে। মানুষ এটা আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে থাকে যে, বিশ্ব ও প্রকৃতিকে জানা যায়, তার শক্তিগুলিকে কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে কাজে লাগান সম্ভব। ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে অক্সফোর্ড এর জ্ঞানী ব্যক্তি রজার বেকন (Roger Beacon) লিখেছিলেন “(এটাও সম্ভব) পাল ও পঁাড় ছাড়া জাহাজ চলবে, কোন জন্তু জানােয়ার টানবে না কিন্তু গাড়ী চলবে, উড়ন্ত যান হবে, যন্ত্রের সাহায্যে নদী ও সাগরের গভীরে চলাচল করা যাবে”।

একাদশ শতকে জনসংখ্যার যে বৃদ্ধি হচ্ছিল তা ত্রয়ােদশ শতকে এসে থেমে যায়। সম্ভবত যতটা জনসংখ্যা তখনকার সম্পদ ও প্রযুক্তি দ্বারা ধারণ ও প্রতিপালন করা সম্ভব ছিল তার চাইতে সংখ্যা বেশী হয়ে যায়। চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে ঘন ঘন কৃষি উৎপাদনে ধ্বস নামে এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৩১৫ থেকে ১৩১৭ সাল পর্যন্ত সমস্ত উত্তর ইউরােপে একটি বড় দুর্ভিক্ষ হয় এবং মৃত্যুর হার স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দশগুণ বেড়ে যায়। এরপর ১৩৪৮ সালে শুরু হয় প্লেগ (plague)এর মহামারী। এই রােগ এশিয়া থেকে ইউরােপে আসে। দুই বৎসর যাবত মূলত শহরে মহামারী চলতে থাকে। কোন কোন শহরে অর্ধেক মানুষই মারা যায়। সমগ্র ইউরােপের জনসংখ্যা এই মহামারীর ফলে এক তৃতীয়াংশ কমে যায় বলে ধারণা করা হয়। এই রােগের নাম দেওয়া হয় “কৃষ্ণ মৃত্যু” (black death)। কিন্তু রােগ সম্পূর্ণ চলে যায় না। পরবর্তী শতকে প্রতি দশ থেকে পনের বছরে একবার করে এই মহামারী হতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যুদ্ধ। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতক জুড়ে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড এর মধ্যে “শত বছরের যুদ্ধ” (hundred years war) এর ফলে পশ্চিম ফ্রান্সের একটি বড় এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।

ত্রয়ােদশ শতকের শেষদিকে আবাদী জমির পরিমাণ আর বাড়ান সম্ভব হল না। পশু চারণভূমি ও পতিত জমি যতই আবাদ হতে থাকল। ততই পশুর সংখ্যা কমে গেল, পশুর থেকে পাওয়া সারও কমল। উৎপাদন বাড়ানর জন্য জমিতে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ধরনের ফসল লাগান ও “সবুজ সার ব্যবহার করেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় নাই। রাজা ও জমিদাররা কর বাড়ায় ও কৃষি শ্রমিকদের মজুরী কমতে থাকে। এই সমস্ত কারণে “মহা দুর্ভিক্ষ” ১৩১৫-১৩১৭ এর আগে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। দুর্ভিক্ষের সময়কালে ফ্লেমিশ (Flemish) কৃষকদের বিদ্রোহ এর একটা বহিঃপ্রকাশ। ১৩৫৮ সালে প্রায় সমস্ত ফ্রান্স জুড়ে কৃষকরা বিদ্রোহ করে। ১৩৮১ সালে ইংল্যান্ডে বিদ্রোহ হয় যা মহা কৃষক বিদ্রোহ (great peasant revolt) নামে পরিচিত। এইসব বিদ্রোহ শাসক ও রাজ রাজড়ারা কঠিন হস্তে দমন করে। তবে এই বিদ্রোহ গুলাের পরবর্তী কাল গুলিতে রাজা ও শাসকেরা কৃষকদের মজুরী কমানর ব্যাপারে এবং কর আদায়ের ব্যাপারে দমন নিপীড়ন আর আগের মত চালাতে পারত না। পশ্চিম ইউরােপে কৃষকদের আয় বাড়ে। চতুর্দশ শতকে দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর ধ্বংসের পর সমৃদ্ধির কাল আসে। পূর্ব ইউরােপে জনসংখ্যা আগেও কম ছিল। প্লেগ মহামারীর পর শহরগুলি প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। গ্রামে জমির মালিকেরা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কৃষকদের ভূমিদাসে পরিণত করে। পশ্চিম ইউরােপের শহরগুলিতে মহামারীর পর জনসংখ্যা কমে গেল, ব্যবসা বাণিজ্যও কমে গেছিল। পঞ্চদশ শতকে ধীরে ধীরে জনসংখ্যা, উৎপাদন, ও ব্যবসা বাড়তে থাকল। ষষ্ঠদশ শতকের শুরুতে জনসংখ্যা ও কাজকর্ম অন্য যে কোন সময়ের চাইতে বেশী ছিল।

তথ্যসূত্র:

  1. Burrow J. A History of Histories; Epics, Chronicles and Inquiries from Herodotus and

Thucydides to the Twentieth Century. London, 2009 p 416 1. http://en.wikipedia.org/wiki/low_countries, accessed 01 April, 2010 . Rondo C. A Concise Economic History of the World From Paleolithic Times to the Present.

Oxford. 1997 p 66

ধন্যবাদ

https://www.shottershondhane.com/প্রাচীন-যুগ-লৌহ-ও-সাম্রাজ/

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *