মুক্ত কর হে বন্ধ- ষষ্ঠ অধ্যায় (শিল্প বিপ্লব)

 

শিল্প বিপ্লব

কৃষির আবিষ্কার ও নগর সভ্যতার উত্থানের পর পৃথিবীর ইতিহাসে শিল্প বিপ্লবকে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করা হয়। এই সময়ে মানব সমাজ এই প্রথম উৎপাদন শক্তির সীমাবদ্ধতা ভেঙ্গে ফেলে। এরপর থেকে মানুষ বিপুল পরিমাণে দ্রুত ও অবিরত পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হল। অতীতে কোন মানব সমাজই এত বিপুল পরিমাণে ও এই রকম অবিচ্ছেদ্যভাবে উৎপাদন করতে পারেনি। আগের সমাজ ও সভ্যতাগুলােতে সামাজিক গঠনের দুর্বলতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পশ্চাদপদতার জন্য উৎপাদন ক্ষমতা ছিল কম এবং তা প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির কারণে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হত।

শিল্প বিপ্লব কখন শুরু হল তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে। এর প্রস্তুতিপর্ব ছিল কয়েক শতাব্দী ধরে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে এ প্রক্রিয়া বেগবান হয়। ১৭৮০ দশক থেকে উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিসংখ্যানগুলাের উর্ধগতি দেখা যায়। বৃটেনে প্রথম এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটা কাকতালীয় ছিল না। শিল্প ও বাণিজ্যে পর্তুগাল থেকে রাশিয়া পর্যন্ত ইউরােপের কয়েকটি রাজ্যেই এই সময়কালে অগ্রগতি হয়েছিল। তবে মাথাপিছু উৎপাদনে বৃটেন তখন ইউরােপের সব দেশের চাইতে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু বৃটেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অন্যান্য দেশের চাইতে পিছিয়ে ছিল। কাজেই শিল্প বিপ্লব বৃটেনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বের জন্য ছিল না। বিজ্ঞানে ফরাসীরা এগিয়ে ছিল বিশেষত: পদার্থবিদ্যা ও অংকশাস্ত্রে। ফরাসী বিপ্লব বিজ্ঞান চর্চার জন্য প্রতিকূলতা দূর করেছিল যেটা বৃটেনে এর পরেও বিরাজ করছিল। ফরাসীরা উন্নত ধরনের জাহাজ তৈরী করত এবং অনেক বেশী প্রযুক্তিগত আবিষ্কার করেছিল। প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানসমূহ জার্মানীতে বৃটেনের চাইতে উন্নতমানের ছিল। বৃটেনের শিক্ষা ব্যবস্থা এই সময় ছিল পশ্চাদপদ। ইংল্যান্ডের তৎকালীন দুই বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড ও কেমব্রীজ এ বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ছিল শ্লথ। তবে শিল্প বিপ্লবের জন্য বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়ােজন ছিল। যে সব প্রযুক্তি এই সময় কাজে লেগেছিল সেগুলাে ছিল খুবই সাধারণ। Flying shuttle, spinning jenny, the mule ইত্যাদি নতুন প্রযুক্তি সাধারণ কারিগরদের পক্ষেই উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছিল। এমনকি সেই সময়ের সবচাইতে উন্নত উদ্ভাবন জেমস ওয়াটের বাস্প ইঞ্জিন তৈরী করার জন্য যে পদার্থবিদ্যার প্রয়ােজন হয়েছিল তা কয়েক দশক আগেই। জানা ছিল।

তবে অন্যান্য কিছু উপাদান বৃটেনে শিল্প বিপ্লবের জন্য আরও প্রয়ােজনীয় ছিল। একটা ছিল কৃষি উৎপাদনের আমূল পরিবর্তন। সংখ্যায় কম কিছু ভূমি মালিক প্রায় সমস্ত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে নিয়ে এসেছিলেন। তাদের জমি চাষ করত প্রজা কৃষকেরা। এতে কয়েকটি পরিবর্তন হয়। প্রথমতঃ কৃষি উৎপাদন বাড়ান হয় যাতে করে শিল্পবাণিজ্যে কর্মরত ক্রমবর্ধমান সংখ্যার মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। বৃটেনের কৃষিতে উৎপাদন ১৮৩০ এর শতকে যা ছিল, তা খাদ্যের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করার জন্য যথেষ্ট। এটা উল্লেখ করা দরকার যে এই সময়ের জনসংখ্যা একশ বছর আগের জনসংখ্যার চাইতে দুই গুণেরও বেশী ছিল। দ্বিতীয়তঃ কৃষিতে বড় সংখ্যায় মানুষ উদ্বৃত্ত হওয়ার ফলে শিল্পে শ্রমিকের যােগান দেওয়া সম্ভব হল। তৃতীয়তঃ কৃষি আয়ের অর্থ দিয়ে শিল্প উৎপাদনে পুঁজির ব্যবস্থা হল। কৃষিতে নিয়ােজিত মানুষরা শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের জন্য একটি বড় আকারে এর বাজার হিসাবে কাজ করল। এ ছাড়াও শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়ােজনীয় জাহাজ, বন্দর, রাস্তাঘাট, নদীপথ এগুলাে তৈরী করা হচ্ছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প উৎপাদন অনেক বেড়েছিল। কিন্তু এই বৃদ্ধি ছিল সবই আগের উৎপাদন ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে। উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রায় সব উপাদানই বৃটেনে তৈরী ছিল। দুটি জিনিষ এই পরিস্থিতিকে বিপ্লবের দিকে নিয়ে যায়। এক হলাে, এমন একটি শিল্প যা উৎপাদন বাড়াতে পারলে তার মালিকের জন্য প্রভূত লাভের ব্যবস্থা করে এবং যার জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রয়ােজন হয় খুবই সামান্য। দুই-পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজার যা একটি দেশের দখলে। বৃটেন এই দিক দিয়ে পরিস্থিতির উপযুক্ত ব্যবহার করতে সক্ষম হলাে। সুতী বস্ত্র উৎপাদনে তখন প্রথম শর্ত পূরণ করতে সক্ষম ছিল। আর ফ্রান্স ও বৃটেনের মধ্যে ১৭৯৩ থেকে ১৮১৫ সালের যুদ্ধের পর কার্যত: ইউরােপের বাইরে বৃটেনের আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না।

 

Lancashire-cotton-mill-steam-powered-weaving-shed-photo-published-in-More-Pictures-of-British-History-circa-1914

 

সপ্তদশ শতকে বৃটেনে মূলত পশমের বস্ত্র উৎপাদন করা হত। সুতীবস্ত্র আমদানী হত ভারত থেকে। এটা বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং পশমের কাপড়ের চাইতে কম দামে পাওয়া যেত। যদিও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারত থেকে আনা সুতীবস্ত্রের বাজার বাড়ানর জন্য চেষ্টা করত কিন্তু বৃটেনের পশম বস্ত্র প্রস্তুতকারকদের চাপে সুতীবস্ত্রের আমদানী সীমিত থাকত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃটেনেই সুতীবস্ত্র শিল্পের প্রসার ঘটল। বিশেষত লিভারপুল, ব্রিষ্টল ও গ্লাসগাে অঞ্চলে। ভারতের সুতীবস্ত্র লব্ধ অর্থ দিয়ে আফ্রিকায় দাস কেনা হত। এই দাসদের আমেরিকার পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপ সমূহে তুলা। উৎপাদনে লাগান হত। এই তুলা দিয়ে সুতী বস্ত্র তৈরী হত বৃটেনে। সুতীবস্ত্র বিক্রি করা হত আফ্রিকা ও আমেরিকায়। ১৭৫০ থেকে ১৭৬৯ সালের মধ্যে বৃটেন থেকে সুতীবস্ত্র রপ্তানী দশগুণের বেশী বাড়ে। এই সময় আন্তর্জাতিক বাজার বৃটেনের দখলে ছিল এবং বৃটিশ সরকার রপ্তানীকারক ও ব্যবসায়ীদের সব ধরণের সহযােগিতা দিত। ১৮২০ সালে বৃটেনের সুতীবস্ত্র রপ্তানী ছিল ইউরােপে ১২.৮ কোটি গজ ও আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া) আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছিল ৮ কোটি গজ। ১৮৪০ সালে ইউরােপে রপ্তানী ছিল ২০ কোটি গজ, কিন্তু আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া) আফ্রিকা ও এশিয়ায় বেড়ে হল প্রায় ৫৩ কোটি গজ। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আফ্রিকা ও এশিয়ায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্য বিস্তারের ফলেই এই বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল। ভারতের বস্ত্রশিল্প পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়, এবং ভারত পরিণত হয় বৃটেনের বাজারে। ১৮২০ সালে ভারত ১.১ কোটি গজ বস্ত্র বৃটেন থেকে আমদানী করে- ১৮৪০ সালে সেটা বেড়ে হয় ১৪.৫ কোটি গজ। এখানে উল্লেখ্য পৃথিবীর ইতিহাসে এটা একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ইতিহাসের শুরু থেকে এই সময় পর্যন্ত ইউরােপ এশিয়া থেকে রপ্তানীর চাইতে অনেক বেশী আমদানী করেছে। ইউরােপের খুব কম পণ্যদ্রব্যই ছিল যার চাহিদা ছিল এশিয়ায়। কিন্তু এশিয়ার মশলা, রেশম. ও সুতীবস্ত্র, মূল্যবান পাথর এগুলাের বিরাট চাহিদা ছিল ইউরােপে। বাণিজ্যের ঘাটতি ইউরােপ পুরণ করত স্বর্ণ ও রৌপ্য দিয়ে লুটপাট করে। এই প্রথম বাণিজ্যের পাল্লা ইউরােপের দিকে ঝুঁকল।

সাম্রাজ্যবাদী হিসাবে শক্তিধর হওয়ার জন্য বাজার দখল করে উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে পণ্য বিক্রি করার সুযােগ হল শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের। উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে তা বাড়ান হল- কিন্তু যে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রয়ােজন হল তা ছিল সাধারণ ও মূল্যও ছিল কম। এসব যন্ত্র একবারে স্থাপন করারও প্রয়ােজন ছিল না- এটা একটা একটা করে করা যেত, স্থাপন করাও কঠিন ছিল না। উৎপাদন বাড়ানর ব্যবস্থা করা ব্যবসার লাভ থেকেও করা সম্ভব ছিল। পুঁজির জন্য ধার করার প্রয়ােজন হত না। ১৭৮৯ সালে রবার্ট ওয়েন নামে এক দর্জির সহকারী ১০০ পাউন্ড দিয়ে ম্যানচেষ্টারে সুতীবস্ত্র উৎপাদন শুরু করেন। ১৮০৯ সালে তার নিজের ৮৪০০০ পাউন্ড দিয়ে তিনি তার অংশীদারদের স্বত্ব কিনে নেন। সুতীবস্ত্র উৎপাদনের কতকগুলাে অনুকূল পরিস্থিতি ছিল। সমস্ত কাঁচামালই আসত দেশের বাইরে থেকে। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দেশের কৃষিতে যে সীমাবদ্ধতা, তা বাইরে ছিল না। ১৭৯০ সালের দিক থেকে প্রায় সমস্ত তুলাই আমদানী হত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের রাজ্য (state) গুলি থেকে। শ্রম ছিল আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের কারণে সস্তা। আর বৰ্দ্ধিত উৎপাদনের জন্য প্রয়ােজনীয় জমির কোন অভাব ছিল না।

তুলা ও সুতীবস্ত্র উৎপাদনই ছিল প্রথম শিল্প যার বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়। ১৮৩০ সাল পর্যন্ত “শিল্প বা কারখানা” বলতে বস্ত্রশিল্পকেই বােঝা যেত। বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন তার প্রসার ও রপ্তানী বাণিজ্যে তার প্রসার ছিল এতই বিরাট যে দেশের অর্থনীতি নির্ভর করত বস্ত্রশিল্পের উপর। কাঁচামাল হিসাবে তুলা আমদানী ১৭৮৫ সালে ছিল ১.১ কোটি পাউন্ড- ১৮৫০ সালে তা হল ৫৮.৮ কোটি পাউন্ড। এই সময়ে সুতীবস্ত্রের উৎপাদন ৪ কোটি গজ থেকে বেড়ে হল ২০০ কোটি গজ। ১৮১৬ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত সুতীবস্ত্রই ছিল রপ্তানীর প্রায় অর্ধেক।

অন্যান্য শিল্পেও উৎপাদন বাড়ছিল। নগরগুলির আকার বাড়ে। ফলে খাদ্য, পানীয় ও ঘরে ব্যবহার করার জিনিষপত্রের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু এ গুলাের আকার বস্ত্র শিল্পের তুলনায় এত ছােট ছিল যে তাদের প্রভাব সমস্ত অর্থনীতির উপর ছিল খুবই কম।

শিল্পায়নের অগ্রগতির জন্য Capital goods শিল্প স্থাপন অপরিহার্য। Capital goods যা মূলধন জাতীয় পণ্য হল সেই সমস্ত পণ্য যা অন্য শিল্পের উৎপাদনের জন্য প্রয়ােজন। এগুলাের মধ্যে রয়েছে যন্ত্রপাতি, মেশিন, সেতু, রেলপথ। লৌহ শিল্প এগুলাের উৎপাদনের জন্য সবচাইতে বড় উপাদান। সাধারণ ভাবে Capital goods শিল্পে বিনিয়ােগকারীরা আগ্রহী হত না। কারণ বিনিয়ােগের পরিমাণ এ সব শিল্পে বড়। লাভ পেতে বেশী সময় লাগে, লাভের পরিমাণও থাকে কম। যুদ্ধের

সময় চাহিদা বাড়ার কারণে এই ধরনের শিল্পের প্রসার বেশী হয়। ১৭৫৬ থেকে ১৮১৫ পর্যন্ত কয়েকটা যুদ্ধের জন্য বৃটেনের লােহা উৎপাদন বাড়লেও এরপর থেকে তা কমতে থাকে। ১৮০০ সালে বৃটেনের লােহা উৎপাদন ইউরােপের বাকী দেশগুলাের লােহা উৎপাদনের অর্ধেকেরও অনেক কম ছিল।

A GIRL PUTTER Wearing a harness whose chain passes between her legs, a girl on all fours pulls a laden ‘hutchie’ through a low gallery, for 100-200 metres Date: 1842 Source: ‘Magasin pittoresque’ (1843) adapted from official report on the Condition & Treatment of Children in the Mines

কয়লা উৎপাদনে বৃটেন অনেক এগিয়ে যায়। শিল্প কারখানায় কয়লা চালিকা শক্তি হিসাবে ব্যবহার করা হত। উপরন্ত বৃটেনে বন জঙ্গল কম থাকার কারণে ইউরােপের তুলনায় কাঠ কম পাওয়া যেত। বাড়ীঘর শীতে গরম রাখার জন্য কয়লা ব্যবহার বৃটেনে বেশী ছিল। নগর এর প্রসার হওয়ায় ষষ্ঠদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কয়লার ব্যবহার বাড়তে থাকে। ১৮০০ সাল নাগাদ বৃটেন ১ কোটি টন কয়লা খনি থেকে আহরণ করত। যা ছিল সারা পৃথিবীর কয়লা উৎপাদনের শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশী। তুলনায় ফ্রান্স এই সময় আহরণ করত ১০ লক্ষ টনেরও কম। কয়লা উৎপাদনের ব্যাপকতা ও বৃদ্ধি শিল্পে উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের পরিবেশ সৃষ্টি করে। Capital goods শিল্পে বৃহৎ বিনিয়ােগও কয়লা শিল্পের কারণে ঘটে। কয়লা খনিতে পানি নিষ্কাশনের প্রয়ােজন থেকেই বাষ্প ইঞ্জিন উদ্ভাবিত হয় ও কয়লা খনিতেই প্রথম ব্যবহার হয়। পরবর্তীতে বাস্প ইঞ্জিন বস্ত্র শিল্পে ব্যবহার হয় ও উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। Capital goods শিল্পেও কয়লা উৎপাদন ব্যাপক বিনিয়ােগের সৃষ্টি করে। খনি সমূহে বিরাট পরিমাণের কয়লা স্থানান্তর করার প্রয়ােজন হত। খনি থেকে কয়লা বন্দর বা পরিবহনের কেন্দ্রে নিতে হত। এই প্রয়ােজনে প্রথম রেল ব্যবহার করা হয়, যার উপর দিয়ে কয়লা বহনকারী গাড়ীগুলাে আরও সহজে যেতে পারে। গাড়ীগুলাে টানার জন্য বাষ্প ইঞ্জিনের ব্যবহারও যৌক্তিক ছিল। ১৮২৫ সালে ষ্টকটন থেকে ডারলিংটন কয়লা পরিবহনের রেলপথ ছিল প্রথম আধুনিক রেলপথ। বলা যায় কয়লা খনি ছিল রেলপথের জন্মদাতা। রেলপথ বৃটেনে সফলভাবে চালু হওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই অন্যান্য দেশে রেলপথ তৈরী শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮২৭ সালে, ফ্রান্সে ১৮২৮ সালে, জার্মানী ও বেলজিয়ামে ১৮৩৫ সালে স্বল্প পরিসরে রেলপথ তৈরী হয়। মালামাল পরিবহনে এটা যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। স্থলপথে রাস্তায় মালামাল পরিবহন ছিল ধীর ও ব্যয়বহুল। তুলনায় রেলপথে ৫০-৬০ মাইল গতিতে বিপুল পরিমান মালামাল পরিবহন সম্ভব হল রেলপথে। রেলপথ তৈরী, রেলপথের জন্য ব্রীজ তৈরী, ষ্টেশন তৈরী এগুলােতেও অনেক Capital goods এর প্রয়ােজন হল। এর মধ্যে অন্যতম হল লােহা। রেলপথ তৈরীর প্রথম দুই দশকে (১৮৩০-১৮৫০) বৃটেনে লােহা উৎপাদন ছয় লক্ষ আশি হাজার টন থেকে বেড়ে ২২ লক্ষ ৫০ হাজার টন হল। অর্থাৎ তিন গুণেরও বেশী বাড়ল। কয়লা উৎপাদন এই সময়কালে দেড় কোটি টন থেকে বেড়ে প্রায় ৫ কোটি টনে পৌছাল। রেলপথ বিস্তীর্ণ হওয়ার ফলে বাজারও বাড়ল। অনেক জায়গা যে গুলােতে আগে মাল পরিবহন করা কঠিন ছিলসেখানে রেলপথের কারনে এখন উৎপাদিত জিনিষ সহজে পৌছান সম্ভব হল।

রেলপথ তৈরীতে ব্যাপক বিনিয়ােগ শুরু হল। ১৮৩০ সালে পৃথিবীতে মাত্র একশত মাইলের কাছাকাছি রেলপথ ছিল। ১৮৪০ সালে তা হল ৪৫০০ মাইল এবং ১৮৫০ সালে ২৩৫০০ মাইলেরও বেশী। ১৮৪০ সালে রেলপথে বিনিয়ােগ ছিল ২.৮ কোটি পাউন্ড, ১৮৫০ সালে ছিল ২৪ কোটি পাউন্ড। বেশীরভাগ পুঁজি ছিল বৃটিশ। বিনিয়ােগের লভ্যাংশ ছিল কমগড়ে ৩.৭ শতাংশ। তারপরও বিনিয়ােগ বাড়তে থাকে। এর কারণ হল এই সময় বৃটেনে ধনী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আয় এত দ্রুত বাড়ে যা ভােগে বা অন্যত্র বিনিয়ােগ করা কঠিন ছিল। ধারণা করা হয় ১৮৪০ এর শতকে বৎসরে ৬০ কোটি পাউন্ড উদ্বৃত্ত অর্থ ছিল, যা বিনিয়ােগ করা প্রয়ােজন হত। তুলনায় সুতীবস্ত্র শিল্পে fixed ও working capital মিলে ১৮৩৩ সালে ৩.৪ কোটি পাউন্ড ও ১৮৪৫ সালে ৪.৭ কোটি পাউন্ড ছিল বলে অনুমান করা হয়। আয়ের উপর করও ছিল খুব কম, অন্যান্য শিল্পে Capital cost এত কম ছিল যে বিনিয়ােগের সুযােগ ছিল সীমিত। বিদেশে বিনিয়ােগ ছিল একটা সম্ভাবনা- এবং এটা করাও হত। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় পুঁজি বিনিয়ােগ করা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সমস্ত পুঁজিই লােকসানের খাতায় চলে যায়। ১৮১৮ থেকে ১৮৩১ পর্যন্ত ২৫টি বিদেশী সরকারের কাছে ঋণ দেয়া ৪.২ কোটি পাউন্ড এর অর্ধেক ঋণ (১৬টি বিদেশী সরকারের কাছে) খেলাপী হয়ে যায়। এই তুলনায় রেলপথ বিস্তারে বিনিয়ােগ হয় অনেক বেশী।

 

শিল্পে উৎপাদনের যুগ যে শুধু মসৃণ উত্তরণের পথ ছিল তা নয়। বেশ কয়েক ধরনের সমস্যা এই যুগে শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়। একটি ছিল সামাজিক পরিবর্তনের কারণে গ্রাম থেকে শহরে আগত মানুষ শিল্প উৎপাদনের কাজ করে খুব কম মজুরী পেত। উৎপাদনের খরচ কমানর জন্য বেশীরভাগ মহিলা ও শিশুদের দিয়ে কাজ করাত ও খুব কম মজুরী দিত। ১৮৩৫ সালের দিকে বৃটেনের সমস্ত শ্রমিকদের অর্ধেকই ছিল নারী- এক চতুর্থাংশ আঠার বছরের নীচে বালক ও এক চতুর্থাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। জীবন যাত্রার মান ছিল নিম্ন। বড় ব্যবসায়ী ও মিল মালিকেরা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে মুদ্রা সরবরাহ ও কর প্রথা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। তারা প্রয়ােজনে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারত। ছােট ব্যবসায়ীদের করও বেশী দিতে হত, তাদের ঋণ পাওয়ারও সুযােগ ছিল কম। তারাও শ্রমিকদের মত বিক্ষুব্ধ ছিল। এই বিক্ষোভ কয়েকবারই ১৮৩০ ও ১৮৪০ এর দশকে বৃটেনে ব্যাপক আন্দোলনের রূপ নেয়। বৃটেনের ইতিহাসে এইরকম বিক্ষোভ ও আন্দোলনের ঘটনা এই প্রথম। ১৮৪৮ সালে শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের বিক্ষোভ সারা ইউরােপে ছড়িয়ে পড়ে।

আর একটি সমস্যা হল উৎপাদন বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং তার ফলে লাভের পরিমান কমে যাওয়া। এর একটি দিক হল মাঝে মাঝে প্রবৃদ্ধির হার বাড়া আর মাঝে মাঝে কমে যাওয়া (cycle of boom and slump)। অষ্টাদশ শতকেও মন্দা দেখা গিয়েছিল কিন্তু সে গুলাে বিশেষ কারণে (যেমন ফসল উৎপাদন কোন বছর কম হওয়া) ঘটে বলে মনে করা হত। উনবিংশ শতাব্দীতে কয়েকবার এই রকম মন্দা দেখা দেয় (১৮২৫-২৬, ১৮৩৬-৭, ১৮৩৯-৪২, ১৮৪৬-৪৮)। এই ধরনের মন্দা পুঁজিবাদী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বলে এই সময় স্বীকৃত হয়। কিন্তু কারণ মনে করা হয় আগের মতই বিশেষ কোন ঘটনা (যেমন কোন দেশের stock এ ফাটকাবাজী)। পুঁজিবাদী উৎপাদনের মধ্যে মন্দা যে অন্তর্নিহিত তা মনে করা হয়নি।

১৮১৫ সালের পর থেকে লাভের অংশ কমে যেতে থাকে, এটার একটা কারণ ছিল আরও বেশী প্রতিযােগিতা। এর ফলে উৎপাদনের খরচ কমল না, কিন্তু তৈরী পণ্যের দাম বাজারে কমতে থাকল। আর একটা কারণ ছিল মূল্যহ্রাস (deflation)। এ সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে উৎপাদন লাভজনক ছিল এবং বাজার প্রসার এর মাধ্যমে বিক্রির পরিমান বাড়াতে পারলে লাভও বাড়ত। কিন্তু লাভের হার বাড়ানর জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে একটা হল উৎপাদন খরচ কমান। এজন্য যেমন মানুষের শ্রমের পরিবর্তে ক্রমেই যন্ত্রের উদ্ভাবন করা হতে থাকল তেমনি শ্রমিকদের মজুরীও কমতে থাকল। তবে এর একটা সীমা হল বাঁচার জন্য যেটুকু প্রয়ােজন তা দেওয়া। শিল্পমালিকেরা এ জন্য বড় ভূস্বামীদের দায়ী করল । তারা কৃষি পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বৃটেনে বাড়িয়ে রেখেছে। অন্যান্য দেশের কৃষিপণ্য উচ্চ শুল্কের কারনে বৃটেনের বাজারে ঢুকতে পারত না। এছাড়াও ছিল ভূস্বামীদের কৃষিপণ্যের উপর আধিপত্য। ফলে কৃষিপণ্যের দাম না কমলে জীবন যাত্রার ব্যয় কমে না এবং শ্রমিকদের মজুরী কমান যায় না। এর ফলে শিল্পমালিক ও বড় ভূস্বামীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব তৈরী হল।

অনেকটা অপরিকল্পিত ভাবেই বৃটেনে শিল্প উৎপাদন গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই সময়ের মানদন্ডে বৃটেনের শিল্প উৎপাদন ছিল যুগান্তকারী । বৃটেনের বহির্বাণিজ্য তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের প্রায় দ্বিগুণ ছিল মধ্য ঊনবিংশ শতকে। বৃটেনের তুলা ব্যবহার ছিল ফ্রান্সের বারগুণ ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই গুণ। বৃটেনের লােহা উৎপাদন ছিল পশ্চিমা বিশ্বের মােট লােহা উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশী। শিল্প বিপ্লব বৃটেনে শুরু হলেও সারা পৃথিবীকে বদলে দিচ্ছিল।

 

পুঁজিবাদের-অভ্যুদয়-Image-credit-Barbara-Kelley

 

 

পুঁজিবাদের অভ্যুদয়ঃ

সপ্তদশ শতকে নেদারল্যান্ডের অধিবাসী বা ডাচরা একটা ক্ষুদ্র জাতিগােষ্ঠী হয়েও ইউরােপের সবচাইতে অগ্রণী অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। তাদের এই অর্জন হঠাৎ হয়নি, এর পিছনে আছে দীর্ঘ ইতিহাস। নেদারল্যান্ডের উন্নতির সঙ্গে পুঁজিবাদী উৎপাদন ও অর্থনীতির উত্থানের সম্পর্ক রয়েছে। তাই নেদারল্যান্ডের অর্থনীতির অভ্যুদয় সম্পর্কে জানা দরকার।

মধ্য যুগের শেষের দিকে ইউরােপের উত্তর পশ্চিম দিকে কতকগুলাে ছােট ছােট (Counties) স্বাধীন রাজ্য ছিল। বর্তমান ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডের কয়েকটা অংশ জুড়ে অবস্থিত ছিল এগুলাে। এদের একসঙ্গে বলা হত নিম্নভূমি (Low countries) বা নীচু অঞ্চলের রাজ্য। কারণ এই রাজ্যগুলির উচ্চতা সমুদ্রের উচ্চতার সামান্য উপরে ছিল। বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই রাজ্যগুলাে এক রাজ্যে বারগান্ডির ডিউকের (Burgandy) অধীনে আসল অষ্টাদশ শতকে। কোন কোন রাজ্য উত্তরাধিকারসূত্রে, কোনটা জয় করে, আবার কোনটা কিনে নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে এদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের চুক্তি হয়। এই রাজ্যগুলিকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে ভাগ করা হয়। বিভাজন হয় মিউজ (Meuse) নদী দ্বারা। উত্তর ও দক্ষিণের মাঝে সাধারণভাবে কিছু পার্থক্য ছিল। দক্ষিণাঞ্চল অন্যান্য ইউরােপীয় দক্ষিণ অঞ্চলের মত রােমান সাম্রাজ্যের অংশ থাকায় রােমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠান সমূহ এখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এর মধ্যে ছিল পশ্চিম ইউরােপের অন্যান্য অংশের মত সামন্ত ব্যবস্থা। তবে অর্থনৈতিক ভাবে দক্ষিণাঞ্চল ছিল সমৃদ্ধ। কৃষিতে তারা অন্য কোথাও যা ছিল না এমন একটি পালাক্রমে ফসল রােপণ ব্যবস্থা চালু করে, যা ছিল জটিল, তাতে উৎপাদন অনেক বেড়েছিল। এছাড়া জমি যখন অনাবাদি থাকত তখন শালগম লাগান হত। এটা গরুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হত। আবার গরুর গােবরের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বাড়ত। কৃষি উৎপাদন এর সাথে সাথে দুগ্ধজাত দ্রব্যের উৎপাদনও বাড়ল। শিল্পেও এই অঞ্চল উন্নতি করে। স্পেনের মেরিনাে ভেড়ার পশম থেকে উচু মানের বস্ত্র তৈরীতে এখানকার কারিগররা পারদর্শিতা অর্জন করে। এই বস্ত্র ইউরােপের সৌখিন পশম বস্ত্রের বাজারে স্থান করে নেয়।

দক্ষিণ নিম্নভূমি পশ্চিম ইউরােপের অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে অনেক বেশী নগরকেন্দ্রিক ছিল। ত্রয়ােদশ শতকেই এই অঞ্চলে অনেকগুলাে নগর ছিল। একমাত্র উত্তর ইতালীতে এত সংখ্যক নগর ছিল। এই নগরগুলি প্রধানত কারিগরী শিল্পের কেন্দ্র ছিল। বস্ত্র উৎপাদন ছাড়াও শহরগুলিতে আসবাবপত্র, গহনা, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি তৈরী হত। নগরায়নের ফলে গ্রামাঞ্চলের উপর নগরের আধিপত্য স্থাপিত ছিল। প্লেগ মহামারীর পর নগরের ধনী ব্যক্তিরা গ্রামে অর্থ লগ্নি (Invest) করা শুরু করল। জমি স্বল্পমেয়াদী ইজারা দেওয়া হত ও ফসলের বদলে কর আদায় করা হত টাকায়। ব্যবসা বাণিজ্যেও এই অঞ্চল সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ত্রয়ােদশ শতক থেকেই এখানে স্ক্যান্ডিনেভিয়া, জার্মানী ও পােল্যান্ডের ব্যবসায়ীরা কাজ করত। ইংল্যান্ডের পশম এখান থেকে পুনরায় রপ্তানী করা হত। এখানকার বণিক ও কারিগরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। পঞ্চদশ শতকে এসে কারিগরদের সংগঠন গিল্ড (Guild) প্রাধান্য বিস্তার করে। পঞ্চদশ শতকে এসে আরও একটি পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। শহরের ব্যবসায়ীরা গ্রামের ঘরে ঘরে পণ্য উৎপাদন সংগঠন করা শুরু করেছিল। বারগান্ডির ডিউকদের সহযােগিতায় এই প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।

উত্তরের রাজ্যগুলি রােমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এখানে কৃষি উৎপাদনে সামন্ত প্রথাও সংগঠিত ছিল না। তা সত্বেও প্রথমদিকে দক্ষিণের চাইতে এই অঞ্চল কম অর্থনৈতিক উন্নতি করেছিল। সমুদ্রে মাছ ধরায় এই অঞ্চলের মানুষ অগ্রগামী ছিল, তারা হারিংবুই ( Haringbuis ) নামে এক ধরনের জাহাজ তৈরী করেছিল। এই জাহাজগুলাে ছিল বড় আকারের এবং একবারে ছয় থেকে আট সপ্তাহ সমুদ্রে থাকতে পারত। ফলে অনেক দূরে দূরে গিয়ে মাছ ধরা সম্ভব হল। এই সঙ্গে নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে জাহাজেই মাছ প্রক্রিয়াজাত করা ও শুকানর ব্যবস্থাও তারা করেছিল। এই শুকান মাছ এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানী পণ্য ছিল, এর বিনিময়ে তারা বাল্টিক অঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য ও আইবেরীয় উপদ্বীপ থেকে লবণ আমদানী করত।

দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতকের মধ্যে এই অঞ্চল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করে। কৃষি জমির অভাব পূরণের জন্য তারা সমুদ্রে বাঁধ দিয়ে বাঁধের ভিতরের পানি নিষ্কাশন করার ব্যবস্থা করে। পানি যাতে আবার ঢুকে না পড়ে সে জন্য বাঁধগুলাের রক্ষণাবেক্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এইভাবে সমুদ্র থেকে অনেক জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। একজন লেখক হল্যান্ডকে এই জন্য “নতুন দেশ” বলেন। এই কর্মকান্ড শহরের ধনীলােকদের অর্থায়নে হয়। তারা জমি উদ্ধার এর পর তা বিক্রি করে দিত। যারা কিনত তারা এ জমি চাষ করত, অথবা পশু চারণের ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহার করত। উৎপাদিত খাদ্য শস্য শহরে ব্যবহার করা হত। কিন্তু দুগ্ধজাত পণ্য ও পশু রপ্তানী করা হত। ষষ্ঠদশ শতকের প্রথমদিকে এসে দেখা গেল অল্প সংখ্যক কৃষকের হাতে অধিকাংশ জমি এসে গেছে।”

পঞ্চদশ শতকে অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে উত্তর ও দক্ষিণের পার্থক্য অনেকটা কমে গেল। এই সময় এ্যান্টওয়ার্প শহর বাণিজ্যের কেন্দ্রমূল হয়ে ওঠে। এর আগে দক্ষিণের ব্রুগে (Bruges) ছিল বড় কেন্দ্র। এ্যান্টওয়ার্প শুধু এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে তাই নয়, এই শহর সমস্ত ইউরােপের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। ইউরােপের বাণিজ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তখন ডাচরা চালাত। জার্মান ব্যবসায়ীরা এখানে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করত, পর্তুগীজরা এশিয়া থেকে মশলা নিয়ে আসত এবং তা এখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় পাঠান হত। ইংল্যান্ডের পশমবস্ত্র ব্যবসায়ীরাও এইখানে ব্যবসা করত। একজন লেখক বলেন, ইতিহাসে এই প্রথম একটি সমগ্র ইউরােপীয় ও বিশ্ব বাজার সৃষ্টি হল।

এই অঞ্চলের জন্য সম্ভবত: সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাল্টিক অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য যা “mother trade” নামে অভিহিত হয়েছে। বাল্টিক অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হত। ইউরােপের মুদ্রাস্ফীতি সেই অঞ্চলকে স্পর্শ করেনি। এখান থেকে কম দামে খাদ্য শস্য নিয়ে এসে নিজেদের প্রয়ােজন মিটাত নিম্নভূমির রাজ্যগুলি এবং অনেক খাদ্যশস্য বেশী দামে পশ্চিম ইউরােপের দেশগুলিতে বিক্রি করে লাভ করত। আরও একটা ফল হল- খাদ্যশস্য উৎপাদন করার আবশ্যকতা না থাকায় নিম্নভূমিতে কৃষকেরা অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করার দক্ষতা অর্জন করতে থাকল। এখানে শন চাষ করা হল- যা থেকে লিনেন নামে বস্ত্র তৈরীর আঁশ পাওয়া যেত, নানা ধরনের উদ্ভিদজাত কাপড়ের রং, বাধাকপি, ফুলকপি, আপেল ও নাসপাতি, টিউলিপ ফুল ইত্যাদিরও চাষ করা হল। তাছাড়া গরু পালনও বাড়ল। কৃষির এই বৈচিত্র্য ইউরােপের আর কোথাও দেখা যায় নি। বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে কৃষি উৎপাদন করার উদ্যোগ এখানেই ছিল। বিভিন্নভাবে জমির উর্বরতা বাড়ানর প্রক্রিয়াও তারা উদ্ভাবন করল। চতুর্দশ শতকে যেখানে গম উৎপাদনের অনুপাত ছিল ১৪৪, সেটা। ষােড়শ দশকে বেড়ে হল ১৪১০।

এই সমৃদ্ধির মধ্যে ষােড়শ শতকেই নিম্নভূমির রাজ্যগুলি স্পেনের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। এই অঞ্চল ছিল স্পেনের রাজার অধীনে। স্পেনের রাজা তাদের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মিটানর জন্য এই অঞ্চলেই কর বেশী আরােপ করা শুরু করল। কারণ এই অঞ্চল ছিল সমৃদ্ধ। ষােড়শ শতকের ষাটের ও সত্তুরের দশকে প্রতিবাদ শুরু হয়। তবে ১৫৭৬ সালের ঘটনায় এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ স্পেনের শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আরও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিল। ১৫৭৬ সালে নিম্নভূমিতে অবস্থান করা স্পেনের সৈন্য বাহিনীর এক অংশ বেতন না পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ করে এ্যান্টওয়ার্প শহরে ব্যাপক ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। নিম্নভূমির রাজ্যগুলি ১৫৭৯ সালে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৫৮১ সালে স্বাধীনতা ঘােষণা করে। স্পেন দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়। উত্তরাঞ্চলের সাতটি রাজ্য নদীর বাধার কারণে স্পেনের আওতার বাইরে থেকে যায়। দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে নতুন উদ্যমে স্পেন শাসন ও শােষণ শুরু করে। ফলে হাজার হাজার মানুষ, যার মধ্যে অনেক দক্ষ কারিগর, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিও ছিল, এরা উত্তরের স্বাধীন নিম্নভূমি রাজ্যগুলিতে চলে আসল। এখানে আরও উদার ও উম্মুক্ত পরিবেশে তারা তাদের পেশা ও বাণিজ্য করার সুযােগ পেল। এর ফলে উত্তরাঞ্চল হয়ে উঠল সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলের শহর ও বন্দর হিসাবে আমস্টারডাম হয়ে উঠল ইউরােপের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এখানে সারা ইউরােপের ব্যবসায়ী ও বণিকেরা মুদ্রা বিনিময় করত ও বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থ বিনিয়ােগ করত। ১৬৩৯ সালে আমষ্টারডাম এর স্টক এক্সচেঞ্জ কাজ শুরু করে। ডাচরা নৌ বাণিজ্যের বীমা ব্যবসাও প্রথম চালু করে। বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প উৎপাদনেও নেদারল্যান্ড এগিয়ে ছিল। লৌহজাত দ্রব্যাদি, জাহাজ তৈরী, অস্ত্র তৈরী, বস্ত্রশিল্প, বই ছাপান, কাঁচশিল্প ইত্যাদি শিল্প শহরগুলিতে গড়ে উঠেছিল। ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত স্পেনের সঙ্গে ডাচদের যুদ্ধ চলতে থাকে। তা সত্ত্বেও সপ্তদশ শতকের প্রথম দিক থেকেই ডাচরা বাণিজ্যের দিক দিয়ে পৃথিবীতে সবচাইতে এগিয়ে ছিল। ডাচদের কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাও এ সময়ে পৃথিবীতে সবচাইতে উন্নত ছিল।

স্পেনের সঙ্গে এবং স্পেনের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়তে থাকে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলেও ডাচদের পণ্যদ্রব্য ক্রমশই ইতালীর নগর রাজ্যগুলির পণ্যদ্রব্যের স্থান দখল করে নেয়। আমষ্টারডামই ইংল্যান্ডের পশম কাপড়, সুইডেনের লােহা, আমেরিকার চিনি, নরওয়ের কাঠ এমনকি এশিয়ার মশলা কেনা কাটার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এশিয়ায় বাণিজ্যরত ব্যবসায়ীদের নিয়ে ডাচ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠিত হয় ১৬০২ সালে। এই কোম্পানী প্রথমে ইংরেজদের ইন্দোনেশিয়া থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর তারা পর্তুগীজ বাণিজ্য সাম্রাজ্যের উপর হামলা চালায়। ১৬৪১ সালে ডাচরা মালাক্কা দখল করে এবং ১৬৫৮ সালে সিলােন দখলের মাধ্যমে পর্তুগীজদের এশিয়ার সাম্রাজ্য শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসে। এশিয়ার বাণিজ্যে ডাচরা পর্তুগীজদের চাইতে বেশী লাভবান হয়।

ডাচ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সফলতায় উৎসাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে ও আমেরিকায় বাণিজ্যের জন্য ওয়েষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠন করা হল ১৬২১ সালে। প্রথমেই স্পেনিশ জাহাজ ও বাণিজ্য আক্রমণ করা শুরু হল। ১৬২৮ সালে আমেরিকা থেকে স্পেনে রৌপ্য নিয়ে আসা স্পেনীয় জাহাজের বহর করায়ত্ত করা হয়। এছাড়াও পর্তুগাল থেকে ব্রাজিলে পণ্য আদান প্রদানরত তিন শতেরও বেশী জাহাজ দখল করে নেয়। পর্তুগীজদের তারা আফ্রিকার স্বর্ণ উপকূল থেকে হটিয়ে দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত উত্তর পূর্ব ব্রাজিল দখল করার অভিযান ব্রাজিলিয়ানরাই ব্যর্থ করে দেয় এবং এই কোম্পানী দেওলিয়া হয়ে যায়। শিল্প ও বাণিজ্যে ডাচদের সাফল্যের একটা কারণ ছিল, শ্রমিকদের কম মজুরীর কারণে তাদের পণ্যের দাম অন্যান্য দেশের পণ্যের চাইতে কম ছিল। গ্রামাঞ্চলে খামারগুলি ছিল অল্প কিছু মানুষের হাতে, বেশীরভাগ মানুষই ছিল কৃষি শ্রমিক। কাজের জন্য তারা শহরে চলে আসতে বাধ্য হত। শহরগুলির লােকসংখ্যা বাড়তে থাকল। এক সময় প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ শহরবাসী ছিল। শহরের শিল্প কারখানাগুলাে কম মজুরীতে মানুষ নিয়ােগ করতে পারত।

১৬৬০ সাল নাগাদ নেদারল্যান্ডের অর্থনৈতিক অবনতি হওয়া শুরু করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আটলান্টিক অঞ্চলের বাণিজ্যে ডাচদের ভূমিকা নগন্য হয়ে যায়।১৭ নেদারল্যান্ডের অবনতির কারণ হিসাবে কয়েকটা উল্লেখ করা যায়, সপ্তদশ শতকে প্রতিবেশী ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ে কর্তৃক প্রতিযােগিতা। তাছাড়া তাদের পণ্য ডাচদের বাণিজ্য পণ্য বহরে বহন বন্ধ করার জন্য ইংল্যান্ড নেভিগেশন এ্যাক্ট নামে একটি আইন পাশ করে। এর ফলে ডাচদের বাণিজ্য কমে যায়। তাছাড়া ফ্রান্সও ডাচ পণ্য তাদের বাজারে কম প্রবেশ করতে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কর বসায়। ডাচদের যে উৎপাদন ক্ষমতা ছিল তা নিজেদের বাজারে সম্পূর্ণ বিক্রি করা সম্ভব হত না। ডাচদের এই অবক্ষয় ডাচ ব্যবসায়ীরাও উপলব্ধি করেছিল। তারা দেখল ইংল্যান্ড ডাচদের চাইতে অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য আরও ভাল ক্ষেত্র এবং তারা সেখানে পুঁজি বিনিয়ােগ করা শুরু করে।

 

England crisis of the Late Middle Ages

 

ইংল্যান্ডের ক্রান্তিকালঃ

আধুনিক যুগের শুরুতেও ইংল্যান্ড ছিল একটি পশ্চাদপদ দেশ। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরী নিজেকে “ইউরােপের প্রান্তে একজন ক্ষুদ্র রাজা” বলে বর্ণনা করেছিলেন। ইউরােপের অন্যান্য অঞ্চলে অগ্রগতির যে সব চিহ্ন দেখা গিয়েছিল, তা ইংল্যান্ডে ছিল না। এরপরেও ইংল্যান্ড যে পরবর্তীতে অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে এগিয়ে যেতে পেরেছিল তা তার অর্থনৈতিক ভিত্তির জন্য, প্রযুক্তিগত উন্নতির জন্য নয়। এর কারণ ছিল কতকগুলাে সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন যার কারণে পরবর্তীতে দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব হয়।

মধ্যযুগের শেষে ইংল্যান্ড ইউরােপের অন্যান্য এলাকার চাইতে কম উন্নত ছিল। এখানে নগরায়নও তুলনামূলকভাবে কম হয়েছিল। অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে ভূমির উর্বরতা বেশী হওয়ায় এবং বৃষ্টিপাত যথেষ্ট হওয়ায় খাদ্য শস্য উৎপাদন যথেষ্ট ছিল। প্লেগ মহামারী পরবর্তী সময়ে রপ্তানীমূল্য বেশী থাকায় পশমের জন্য জমিতে কৃষিকাজ করার চাইতে অনেক জমিতে পশুপালন করা শুরু হয়েছিল। পশমই ছিল তখন একমাত্র রপ্তানীযােগ্য পণ্য।

পঞ্চদশ শতকে কৃষিভূমির অধিকাংশই চাষ করত কৃষকেরা যারা নিজেরা জমির মালিক ছিল না। এদের মধ্যে কারও কারও ইজারা ছিল দীর্ঘ কালের জন্য নির্দিষ্ট কর এর বিনিময়ে। এরা ছিল ভাগ্যবান। অধিকাংশই ছিল স্বল্প সময়ের ইজারাদারএদের জমি থেকে উৎখাত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বেশী- অথবা ইজারা শেষ হলেই কর বাড়ত। আরও ছিল অনেক প্রায় ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক যারা প্রায় দিন এনে দিন খাওয়ার পর্যায়ে দরিদ্র ছিল। পঞ্চদশ শতকে অভিজাত শ্রেণীর সুযােগ সুবিধারও অবনতি হয়েছিল। সিংহাসনের দাবিদার প্রতিপক্ষদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যা War of roses নামে পরিচিত (১৪৫৫-১৪৮৫ খ্রিষ্টাব্দে), এতে অভিজাত শ্রেণী ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের পর তাদের নিজস্ব বাহিনীগুলােও ভেঙ্গে দেওয়া হয়, তাতে তাদের সামরিক শক্তি কমে যায়। এছাড়া তাদের কর দিতে হত যা ইউরােপের মূল ভূখন্ডের অভিজাত শ্ৰেণী দিত না। দেনার দায়ে তাদের সম্পত্তিও নিয়ে নেওয়া হত। অভিজাত শ্রেণীর ভূমি মালিকরা অনেকেই নির্দিষ্ট হারে দীর্ঘকালের জন্য ইজারা দিয়েছিল। মূল্য স্ফীতির জন্য তারা ব্যয় মেটাতে না পেরে অনেকেই জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হল। সামাজিক স্তর গুলির পরিবর্তন ছিল ষােড়শ ও সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। রাজা অষ্টম হেনরী রােমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চার্চ অব ইংল্যান্ড স্থাপন করেন। সাথে সাথে রােমান ক্যাথলিক চার্চের যে প্রভূত ভূ সম্পত্তি ইংল্যান্ডে ছিল তার অনেকটা বাজেয়াপ্ত করেন ও রাজকোষে অর্থ সংগ্রহের জন্য তা বিক্রি করেন। এতে সাময়িকভাবে অর্থের প্রয়ােজন কিছুটা মিটাতে পারলেও সমাধান হল না। রাজার অর্থ সংগ্রহের উপায় ছিল ভূমি রাজস্ব, বাণিজ্য শুল্ক ও তার নিজস্ব ভূমি থেকে আয়। এই সময় মূল্যস্ফীতি হওয়ায় রাজ্যের কাজকর্ম চালানর খরচও বেড়ে গিয়েছিল অথচ আয় বাড়ছিল না। ফলে তাদের নিজেদের জমি বিক্রি করে ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছিল। ১৫৬১ সালে রাজা ইংল্যান্ডের মােট জমির ৯.৫ শতাংশের মালিক ছিল। ১৬৪১ সালে সেটা ছিল মাত্র দুই শতাংশ।

দরিদ্র কৃষকেরা সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হল। সাধারণের ব্যবহারের জমি ভূমি মালিকেরা দখল করে কৃষিকাজ করায় এর উপর নির্ভরশীল দরিদ্র কৃষক শ্রেণী কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়ে শহরে চলে আসতে বাধ্য হল। অনেকের জমি ধনী লােকেরা কিনে নিল তাদের উৎপাদন বাড়ানর জন্য। কিছু কিছু ভূমিহীন কৃষক শহরে চলে আসলেও অনেকেই গ্রামাঞ্চলে কৃষি মজুর হিসাবে রয়ে গেল।

যদিও ইংল্যান্ডে অধিকাংশ শ্রেণীর অবনতি ঘটল কিন্তু এর মধ্যে একটি শ্রেণী প্রভূত উন্নতি করল। Gentry নামে অভিহিত এই শ্রেণী সাধারণ কৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে উৎপত্তি লাভ করে। অন্যান্য শ্রেণীর সংঘর্ষের সুযােগ নিয়ে তারা। জমি সংগ্রহ করল। প্রথমদিকে ছােট ছােট জমি কিনলেও তাদের আর্থিক ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা অভিজাত শ্রেণী, গীর্জার সম্পত্তি, এমনকি রাজার সম্পত্তিও কিনে নেয়। সপ্তদশ শতকের শুরুতে এরা ইংল্যান্ডের চাষযােগ্য জমির প্রায় ৫০ শতাংশের মালিক হয়ে যায়। গড়ে ২০০ একরের চাইতে বড় খামারে কৃষি মজুরদের কাজে লাগিয়ে তারা কৃষিপণ্য উৎপাদন করত। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার এই পরিবর্তন ছিল বৈপ্লবিক।

আর এক শ্রেণীর মানুষও উন্নতি করল, তারা হল বণিকেরা। মধ্যযুগে অন্যদেশের বণিকেরা পণ্য আনা নেওয়া করত। ষােড়শ শতকে ইংরেজ বণিকেরা বাণিজ্যে তাদের ভূমিকা বাড়াতে থাকে। এজন্য তারা সংঘবদ্ধ হয়ে কোম্পানী তৈরী করে। মার্চেন্ট এ্যাডভেঞ্চচারার নামে একটি সংঘের প্রায় ৩৫ হাজার সদস্য ছিল। আবার অন্য দিকে ছিল টার্কী (Turkey) কোম্পানী যার সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র বারজন। এই সময় থেকে জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর মাধ্যমে পুঁজি বিনিয়ােগের শুরু হয়। এর একটি উদাহরণ হল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যা ১৬০০ সালে স্থাপিত।

এই সময় লন্ডনের পুরনাে বণিকদের সঙ্গে অন্যান্য বন্দরের বণিকদের সংঘাত সৃষ্টি হয়। লন্ডনের মাধ্যমে সব বাণিজ্য পরিচালনার বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নেয়। ক্রমেই আইন করে অন্যান্য বন্দরের বণিকদের সুযােগ দেওয়া হয়। ১৬০৬ সালে ফ্রান্স, পর্তুগাল ও স্পেনে বাণিজ্য সব বণিকের জন্য উন্মুক্ত করে আইন করা হয়। ১৬২২ সালে তারা বস্ত্র রপ্তানীরও অনুমতি পায়। আরও একটি শ্রেণী এই সময় উন্নতি করে, তারা হল বস্ত্র উৎপাদনকারীদের সংগঠন যারা- clothier নামে পরিচিত ছিল। তারা গ্রামাঞ্চলে বাড়ীতে বাড়ীতে বস্ত্র উৎপাদন করার ব্যবস্থা করেছিল ব্যাপক আকারে। ইউরােপের কোন অঞ্চলে বস্ত্র উৎপাদন এতটা ব্যাপক ও সংগঠিত ছিল না। এটা সম্ভব হয়েছিল তার একটা অন্যতম কারণ হল- শহরের উৎপাদক সংঘ (Guild) শক্তিশালী ছিল না ফলে প্রতিরােধ ছিল কম। এই clothier রা গ্রামের বাড়ীতে বাড়ীতে পশম বিতরণ করে বস্ত্র তৈরীর ফরমায়েশ দিত, অনেককে প্রয়ােজনীয় কারিগরী সাহায্য দিত। বস্ত্র তৈরী হলে নির্দিষ্ট দামে এটা কিনে নিয়ে বাজারে বিক্রি করত। বাড়ীর বস্ত্র প্রস্তুতকারীরা বাধ্য হত কম দামে এ কাজ করতে- কারণ তাদের পক্ষে একা একা এই বস্ত্র উৎপাদনের ব্যবস্থা করা ও বিক্রির ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। clothier রা এইভাবে বড় আকারে বস্ত্র উৎপাদন করে অনেক লাভে ব্যবসা করতে পারত এবং তারা পুঁজি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। এইভাবে উৎপাদন বাড়তে থাকায় শিল্পে পুঁজির প্রয়ােজন বেড়ে যায়। এই প্রথম কারিগর ও উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত যারা তাদের সঙ্গতির চাইতে অনেক বেশী পুঁজির দরকার হল। আগের উৎপাদন ব্যবস্থা ও পুঁজির মালিক ও কারিগর এবং শ্রমিকদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে গেল। এতে পুঁজির মালিকদের নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হল উৎপাদনের উপর,এটা ছিল এই যুগের একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

 

The middle classes etiquette and upward mobility

 

সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের পরিবর্তনও এই সময়ের ইংল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অধিকাংশ মানুষ মধ্যযুগের মত কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে জড়িত ছিল এই যুগে। কিন্তু কতকগুলাে শ্রেণীর আবির্ভাব এই সময় হয় যারা আগে হয় ছিলই না বা থাকলেও ভূমিকা ছিল কম। এর মধ্যে ছিল gentry বা রাজণ্যবর্গের পরের অভিজাত সম্প্রদায়। সামরিক শক্তি বা সামাজিক প্রাধিকার ছাড়াই ইউরােপের কোথাও অন্য কোন শ্রেণী এত বেশী জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে নি। পেশাজীবীরা এই সময় প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। অন্যান্য শ্রেণীর মধ্যে বস্ত্র ব্যবসায়ীরা (clothier) অন্যান্য ব্যবসায়ী, ছােট উৎপাদনকারীরাও এই সময় সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সমষ্টিগত এই শ্ৰেণীগুলাে মধ্যযুগের সমাজের পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন সমাজ ব্যবস্থায় উত্তরণের প্রয়ােজনীয় অবস্থান সৃষ্টি করে। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড অর্থনীতিতে ও সমাজ ব্যবস্থায় মধ্যযুগের তুলনায় অনেক বদলে যায়।

সপ্তদশ শতকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ইংল্যান্ড উন্নতির সােপানের পাদদেশে অবস্থান করছিল। কিন্তু ইতিহাসে উন্নতির পূর্বশর্ত পূরণ করার পরও পিছিয়ে যাওয়ার বহু উদাহরণ আছে। মনে করা হয়, যদি পৃথিবীর অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের মত ইংল্যান্ডের রাজারাও তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করতে পারত তা হলে ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত এমনকি বন্ধ হয়ে যেতে পারত। ১৬৬০ সালে ইংল্যান্ডের রাজার ক্ষমতার সীমা বেঁধে দেওয়া নিশ্চিত হয়, এতেই ইংল্যান্ডের অগ্রযাত্রাও বাধামুক্ত হয়।

ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের রাজা জন এর বিরুদ্ধে রাজ্যের ব্যারনরা (Baron) বিদ্রোহ ঘােষণা করে। ইংল্যান্ডের উত্তর ফ্রান্সে কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফ্রান্সের রাজার সঙ্গে যুদ্ধে ব্যারনরা রাজাকে অর্থ ও সৈন্য জোগান দিত। ইংল্যান্ডের রাজারা আগে ব্যারনদের সঙ্গে আলােচনা করে কর নির্ধারণ করতেন। ১২০৪ সাল নাগাদ রাজা জন যুদ্ধে হেরে উত্তর ফ্রান্সের রাজত্ব হারাল। এরপর ব্যারনদের সঙ্গে আলােচনা না করে রাজা জন কর বাড়িয়ে দিল। তাদের উপর কর বাড়ান, ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার ফলে নরম্যান্ডিতে তাদের জমি-জমা চলে যাওয়া ইত্যাদি কারণে তারা বিক্ষুব্ধ হন। ইংল্যান্ডে এ ধরনের বিদ্রোহ আগেও হয়েছিল কিন্তু অতীতে তারা সিংহাসনের অন্য উত্তরাধিকারীকে সিংহাসনে বসিয়ে সমাধানের পথ খুঁজত। রাজা জনের কোন উত্তরাধিকারী না থাকায় ব্যারনরা নিজেরাই বিদ্রোহ করল। ১২১৫ সালে ফ্রান্স ও স্কটল্যান্ডের রাজার সমর্থনে বিদ্রোহীরা রাজা জনকে Articles of the Barons নামে একটি দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করল। এটা ছিল একটা চুক্তিপত্র যাতে রাজার ক্ষমতার কিছুটা সীমা নির্ধারণ করা হল যাতে রাজা প্রজা নিপীড়ন করতে না পারে। রাজা জন কিছুদিন পরই এই দলিল মানতে অস্বীকার করে এবং আবার ব্যারনরা বিদ্রোহ করে। ১২১৬ সালে রাজা। জন মারা যাওয়ায় তার নাবালক ছেলে হেনরীকে সিংহাসনে বসান হয়। হেনরীর সমর্থকরা বিদ্রোহী ব্যারনদের সমর্থন কমানর জন্য ১২১৬ সালেই আর একটি ঘােষণা দেয়। আগের চার্টার (charter) এর তুলনায় এটা একটু ছােট ছিল। পরবর্তীতে ১২৯৭ সালে রাজা এডওয়ার্ড চার্টার টি পুণরায় ঘােষণা করেন। ম্যাগনা কার্টার ফলে রাজারা রাজকোষের উপর পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়েছিলেন। স্টুয়ার্ট রাজারা এই নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেন। এর মধ্যে একটা পন্থা হল অর্থের বিনিময়ে ব্যবসার মনােপলি (monopoly) দেওয়া। স্টুয়ার্ট রাজা প্রথম চার্লস এর সময় প্রায় সাতশত মনােপলি (monopoly) দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া তারা রাজত্বে প্রশাসনের পদে অর্থের বিনিময়ে নিয়ােগ দেওয়া শুরু করল। রাজসভার পিয়ার (peer) এর অবস্থানও বিক্রি করা হল । এতে রাজাকোষে কিছু অর্থ আয় হলেও মানুষ মনে করা শুরু করল রাজা নিয়ম ভঙ্গ করে অর্থ আদায় করছে। এতে জনমত রাজার বিপক্ষে চলে যেতে লাগল। রাজা চার্লস ১৬২৯ সাল থেকে পার্লামেন্টের অধিবেশন না ডেকেই রাজ্যশাসন শুরু করেন। ১৬৪০ সালে স্কটিশ বিদ্রোহ শুরু হল। বিদ্রোহ দমন করার জন্য অর্থের প্রয়ােজন হয়ে পড়ল এবং চার্লস পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাকতে বাধ্য হলেন। পার্লামেন্ট ছাড়া রাজার কর আরােপের বিরুদ্ধে পার্লামেন্ট সদস্যরা অবস্থান নেওয়ায় চার্লস পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে নতুন পার্লামেন্ট গঠন করলেন। নতুন পার্লামেন্টও তার বিরােধিতা করল। রাজার কর আরােপ করা ও ধর্মের ব্যাপারে কড়াকড়ি করার বিরুদ্ধে gentry দের নিয়ে একটা বিরুদ্ধ পক্ষ গড়ে উঠল। চার্চ অব ইংল্যান্ডের নিয়ম কানুন অন্যান্য খ্রিষ্টান গােষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রাজা চার্লস করেছিলেন। চার্লস পার্লামেন্টের সঙ্গে সমঝােতা না করে অধিবেশন বন্ধ করে দিলেন।

ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের কোন স্থায়ী অস্তিত্ব ছিল না। রাজা যখন অতিরিক্ত কর ধার্য্য করতে চাইতেন তখন তা অনুমােদন দেওয়ার জন্য পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকতেন। কর আদায় করত জেন্ট্রিরা (gentry)। ইংল্যান্ডে স্থায়ী সৈন্যবাহিনী ছিল। প্রশাসনিক কাঠামাে ছিল খুবই দুর্বল। স্থানীয় জেন্ট্রিরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করত, বিচার ব্যবস্থা চালাত ও প্রশাসন চালাত। যুদ্ধের সময় তারাই সৈন্যবাহিনী তৈরী করত। এটা ছিল ফ্রান্সের সম্পূর্ণ বিপরীত। পার্লামেন্টে থাকত জেন্ট্রিদের। প্রতিনিধিরা। তারা পার্লামেন্ট আলােচনা করে রাজার কাছে বিল আকারে প্রস্তাব পাঠাত, বিশেষত কর সংক্রান্ত ব্যাপারে। যেহেতু জেন্ট্রিরা রাজার হয়ে কর আদায় করত, তাই তাদের বাদ দিয়ে কর আদায় করা রাজার পক্ষে সম্ভব ছিল না। জেন্ট্রিদেরও রাজাকে কোন ব্যাপারে বাধ্য করার একমাত্র উপায় ছিল কর আদায় করতে অস্বীকৃতি জানান।

স্কটল্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধে রাজার বাহিনী হেরে গিয়ে উত্তর ইংল্যান্ডের বিস্তৃত এলাকা হারাল। রাজা বাধ্য হয়ে ১৬৪০ সালেই আবার পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকলেন। সুযােগ পেয়ে পার্লামেন্ট বিভিন্ন আইন পাশ করল- এর মধ্যে ছিল, পার্লামেন্টের অনুমােদন ছাড়া রাজা নতুন কর আরােপ করতে পারবেন না। রাজা পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিতে পারবেন না, রাজা না ডাকলেও তিন বছর পর পর পার্লামেন্ট বসবে। ১৬৪২ সালে রাজা পার্লামেন্টের নয়জন নেতাকে গ্রেপ্তার করার জন্য সৈন্য নিয়ে অভিযান চালালেন-কিন্তু তাদের ধরতে পারলেন না। লন্ডনে তার কর্তৃত্ব দৃঢ় নয় এটা অনুভব করে রাজা লন্ডন ছেড়ে চলে গেলেন। রাজা ও পার্লামেন্ট এর মধ্যে বিরােধ নিষ্পত্তির চেষ্টা ফলপ্রসূ হল না। রাজ্যের বিভিন্ন অংশ ক্রমেই রাজা অথবা পার্লামেন্টের পক্ষে অবস্থান নিল। কয়েক বছর ধরে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হল। প্রথম দিকে রাজার অনুগত বাহিনী জয়লাভ করতে লাগল। ১৬৪৫ সালে পার্লামেন্টের সৈন্য বাহিনী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হল। সৈন্যরা ছিল ক্লান্ত, তারা ঠিকমত বেতনও পেত না। অনেকেই পালিয়ে যেতে লাগল। কোন কোন স্থানে বিদ্রোহের সম্ভাবনাও দেখা দিল। উপরন্ত ভয় ছিল স্কটল্যান্ডের বাহিনী রাজার সঙ্গে আপােষ করে ফেলতে পারে।

 

Oliver Cromwell reorganizes the parliamentary forces, setting up the well-trained New Model Army to turn the tide against King Charles’s royalist forces – “Cromwell” (1970)

 

এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল ক্যামব্রিজশায়ারের নেতা অলিভার ক্রমওয়েলের বাহিনী। তার আয়রনসাইড (ironside) নামে পরিচিত বাহিনীর গঠন ছিল ভিন্ন। তিনি স্বচ্ছল কৃষকদের মধ্য থেকে যারা স্বেচ্ছায় সেবা দিতে চাইত তাদের নিয়ে এই বাহিনী গঠন করেছিলেন। এরা অন্যান্য বাহিনীর মত বাধ্যতামূলকভাবে যােগ দেওয়া বেতনভূক বাহিনী ছিল না। এ ছাড়া ক্রমওয়েল তাদের মনােবল দৃঢ় রাখার জন্য ও অনুপ্রাণিত করার জন্য তাদেরকে নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণীর উন্নয়নের জন্য সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার ব্যবস্থা করেছিলেন। এই প্রচার কার্য চালানর জন্য সৈন্য বাহিনীর সঙ্গে সব জায়গায় যাজকেরা যেত। কাজেই তার বাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল। ১৬৪৪ সালে রাজার বাহিনীকে মারসডেন মুর (Marsden Moor) নামক স্থানে পরাজিত করার পিছনে আয়রনসাইডদের বড় ভূমিকা ছিল। পার্লামেন্টের সম্পূর্ণ সৈন্য বাহিনীকে আয়রনসাইডদের মত পুনর্গঠন করার জন্য উদ্যোগ নিলেন ক্রমওয়েল। এতে পার্লামেন্টের কিছু সদস্য বিরােধিতা করলেও গ্রামাঞ্চলের ব্যবসায়ী, কারিগর, এবং কিছু পার্লামেন্ট সদস্যের সমর্থনে সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠনের দায়িত্ব পান ক্রমওয়েল। মূলতঃ অশ্বারােহী বাহিনী আয়রনসাইডদের মত অনুপ্রাণিত হয়ে যারা স্বেচ্ছায় যােগ দিতে রাজী ছিল তাদের নিয়ে তৈরী করা হল। এরা হল পুনর্গঠিত সৈন্যবাহিনী যা দি নিউ মডেল আর্মি (the new model army ) নামে পরিচিত হল। এরাই হল পার্লামেন্টের সৈন্যবাহিনীর মূল শক্তি। ১৬৪৫ সালেই এর ফল পাওয়া গেল। রাজার পক্ষের বাহিনী পরাজিত হল এবং পার্লামেন্ট বাহিনী রাজার সদর দপ্তর অক্সফোর্ড দখল করে নিল। রাজা পালিয়ে গেলেন ও স্কটল্যান্ডের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলেন।

পার্লামেন্ট পক্ষের রক্ষণশীলশক্তি এরপর এই বৈপ্লবিক নিউ মডেল আর্মি ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করলেন এবং বড় ভূস্বামীদের শ্ৰেণীগত নিয়ন্ত্রণ আবার ফিরিয়ে আনতে চাইলেন। সৈন্যরা এর বিরােধিতা করতে লাগল এবং সমস্ত বাহিনীতে তাদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে লাগল। তারা সৈন্যদের দাবী দাওয়ার পক্ষে, ছােট ও মধ্য ভূস্বামীদের ভােট ও অন্যান্য অধিকারের পক্ষে এবং প্রেসবাইটারিয়ানদের কঠোর অনুশাসনের বিপক্ষে সােচ্চার হল। সৈন্য বাহিনীর বাইরে একদল গণতন্ত্রমনা লােক এদের সঙ্গে যােগ দিল- এরা লেভেলার (leveller) নামে পরিচিত হল। রক্ষণশীল প্রেসবাইটারিয়ানরা সৈন্যবাহিনীর উপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করল। ক্রমওয়েল ও তার সহযােগিরা নিউ মডেল আর্মির সঙ্গেই থাকলেন ও রাজাকে তাদের শর্ত মেনে নেওয়ার দাবী জানালেন। রাজার শর্ত মেনে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। তিনি ১৬৪৭ সালে বন্দী অবস্থা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন।

এরপর গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বে রাজার সমর্থকদের সাথে আবার ক্রমওয়েলের বাহিনীর যুদ্ধ হয়। কয়েকটি যুদ্ধের পর ১৬৪৮ সালে রাজার বাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় ও রাজা চার্লস বন্দী হন। পার্লামেন্টে এরপর আলােচনা শুরু হয় রাজা চার্লস এর বিচার করা নিয়ে। পার্লামেন্টের অনেক সদস্য তখনও চার্লসএর সঙ্গে সমঝােতার পক্ষে ছিল, এতে উত্তেজিত সৈনিকরা পার্লামেন্টে এসে যারা আপােষকামী ছিল তাদের হয় বন্দী করল অথবা বহিস্কার করল। বাকী সদস্যরা বিচার করে রাজাকে মৃত্যুদন্ড দিল। ১৬৪৯ সালের ৩০ শে জানুয়ারী তা কার্যকর করা হয়।

ক্রমওয়েল ও তার সহযােগীদের সঙ্গে এরপর নিউ মডেল আর্মীর মতাদর্শ সংগঠক এবং লেভেলারদের বিরােধ হয়। ১৬৪৯ সালের বসন্তকালে ক্রমওয়েল লেভেলার নেতাদের বন্দী করেন এবং নিউ মডেল আর্মীর বিদ্রোহ দমন করেন, এর নেতাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় ও সৈন্যবাহিনীকে আয়ারল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পুনর্গঠিত সৈন্যবাহিনী ও লেভেলাররা ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আগত এবং সংখ্যায় কম। সংখ্যায় অধিক দরিদ্র শ্রেণীর দাবী দাওয়া তারা তােলে নাই এবং তাদের সংগঠিত করে নাই। তাই তাদের পরাস্ত করা কঠিন হয় নাই। তবে এই ঘটনাসমূহের পর সামাজিক পরিবর্তন ঘটে যায়। ১৬৪৯ সালের পর ইংল্যান্ডে ও পরবর্তীতে স্কটল্যান্ডে মধ্যশ্রেণী থেকে আগত সামরিক অফিসাররাই প্রশাসন চালাতে থাকে- যা আগে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর করায়ত্ত ছিল।

প্রায় এক দশক ক্রমওয়েল শাসন করলেন- প্রায় সম্পূর্ণই সামরিক বাহিনীর শক্তির উপর নির্ভর করে। রক্ষণশীল জেনট্রি ও পরিবর্তনকামী সামরিক অফিসারদের দ্বন্দ্ব সম্পূর্ণ মিটে নাই। ১৬৬০ সালে ক্রমওয়েলের মৃত্যুর পর এই দুই পক্ষের একটা বড় অংশ একমত হয়ে আবার রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনে। রাজা চার্লস-যাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল, তার ছেলেকে নিয়ে এসে সিংহাসনে বসান হয়। রাজতন্ত্র আবার প্রতিষ্ঠিত হল। লর্ডরা তাদের উপাধি ফিরে পেল, তাদের জমিও ফিরে পেল।

চার্চ অব ইংল্যান্ড আবার আগের অবস্থানে ফিরে গেল। আপাতদৃষ্টিতে নতুন রাজার রাজত্বে সব আবার আগের অবস্থানে ফিরে গিয়েছিল বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে একটা ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে গেছিল। রাজকীয় প্রশাসন যন্ত্র ও আমলাতন্ত্র ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল। এই গৃহযুদ্ধ যা ঐতিহাসিক হিল বৃটেনের ইতিহাসে সবচাইতে যুগান্তকারী ঘটনা বলে আখ্যা দিয়েছেন। সামন্ততন্ত্রের অবশিষ্ট কাঠামােও ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল। সর্বসাধারণের জমি ব্যক্তি বিশেষ কর্তৃক দখল করার অনুমােদন (endorse) পেল। কৃষিপণ্য রপ্তানী, যা আগে বন্ধ ছিল আবার চালু হল। মনােপলি (monopoly) ব্যবসা বন্ধ করা হল। সরকার দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আইন করা শুরু করল এর মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল দেশীয় পণ্যের বাজার নিশ্চিত করার জন্য বিদেশী পণ্য আমদানী বন্ধ করা, যেমন- ১৬৭৮ সালে ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্পের স্বার্থে ফ্রান্স থেকে সিল্ক ও লিনেন কাপড় আমদানী বন্ধ করা হল।২৫ এইসব কাঠামােগত প্রশাসনিক পরিবর্তনের ফলে জমিতে টাকা খাটান কম লাভজনক হয়ে পড়ল। প্রশাসন পণ্য উৎপাদন ও ব্যবসা উৎসাহিত করতে লাগল। ফলে ব্যবসা ও উৎপাদনে পুঁজি আসতে শুরু করল। জি এইচ জর্জের মতে সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে ইংল্যান্ডের সঞ্চয় ও বিনিয়ােগের হার উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এই পরিবর্তনসমূহ ইংল্যান্ডকে পৃথিবীর অর্থনীতিতে প্রাধান্য স্থাপন করার ভিত্তি স্থাপন করে। এই পরিবর্তনগুলাে ছাড়া ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে বিকাশ যেভাবে ঘটেছিল তা হত কিনা সন্দেহ।

 

Sign Picture of A-Guide-to-the-French-Revolution

 

ফরাসী বিপ্লব

বৃটেনের শিল্প বিপ্লব ঊনবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও আদর্শ নুতনত্ব লাভ করে ফরাসী বিপ্লব থেকে। ১৭৮৯ থেকে শুরু করে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ইউরােপের ও কার্যত সারা পৃথিবীর রাজনীতি ছিল ফরাসী বিপ্লবের রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শকে কেন্দ্র করে, তার পক্ষে এবং বিপক্ষে সংঘাতের মধ্য দিয়ে। ফরাসী বিপ্লব থেকে উৎপত্তি হল উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আদর্শ। এমন কি যে সমস্ত শব্দ ও সংজ্ঞা এ সম্পর্কে ব্যবহার করা হয়, সে গুলির উৎপত্তি এই বিপ্লবের মধ্য থেকে। ফরাসী বিপ্লব থেকে ফ্রান্সে যে আইনের কাঠামাে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কর্মকান্ডের গঠন তৈরী হল তা ইউরােপের সর্বত্র অনুকরণ করা হল। পৃথিবীর পুরাতন সভ্যতাসমূহে ইউরােপীয় ধ্যানধারণা তখন পর্যন্ত প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে নাই। ফরাসী বিপ্লবের নতুন আদর্শ ও চিন্তাধারা এই সব সভ্যতাকে এরপর থেকে পরিবর্তন করতে পারল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরােপের অনেকগুলাে দেশে ক্ষমতাসীন গােষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। কোন কোন দেশে তা বিদ্রোহের পর্যায়েও পৌছে। কিন্তু এর মধ্যেও ফরাসী বিপ্লব ছিল অনন্য। একমাত্র ফরাসী বিপ্লবই ছিল সত্যিকার সামাজিক বিপ্লব। এই বিপ্লবে সাধারণ মানুষ সম্পৃক্ত ছিল। এই বিপ্লব ছিল অন্যান্য বিপ্লবগুলাের চাইতে অনেক বেশী মৌলিক (Radical)। পরবর্তী যুগ সমূহের বিপ্লবী আন্দোলনগুলােতে এই বিপ্লবের ধরনধারন (pattern) আমলে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ও কমিউনিষ্ট চিন্তাধারায় এই বিপ্লবের শিক্ষাসমূহ অন্তর্ভূক্ত হয়।

বিপ্লবের ভিত্তি ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর বিবরণ বর্ণনায় গুরুত্ব পায়। কিন্তু বড় ঘটনাসমূহ সামাজিক শক্তিগুলির ভারসাম্য পরিবর্তন হলে ঘটে। তবে সাধারণতঃ ভারসাম্যের পরিবর্তনের পিছনে দীর্ঘকাল ধরে ধীরে ধীরে এবং অনেক সময় অপ্রকাশ্য পরিবর্তন কাজ করে। ফরাসী বিপ্লবের ক্ষেত্রেও সামাজিক শক্তিগুলির পরিবর্তন অনেক কাল ধরে ঘটে আসছিল।

বিপ্লবপূর্ব ফরাসী সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে ছিল রাজা ও তার পারিপার্শ্বিক অভিজাতকুল। অভিজাতবৃন্দের মধ্যে একদল ছিল সামন্ত প্রভূরা (nobelesse de epee বা nobility of the sword), এরা অনেক সুযােগ সুবিধা ভােগ করত এবং অনেক ক্ষমতারও অধিকারী ছিল। কিন্তু ষােড়শ ও সপ্তদশ শতকে রাজারা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে রাজসভা ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদ বিক্রি করে আরেক অভিজাত শ্রেণী সৃষ্টি করেছিল (noblesse de robe বা nobility of the robe)। এই দ্বিতীয় অভিজাত গােষ্ঠী রাজ্যের আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রণভার পেয়েছিল এবং এদের হাতেই ছিল রাজকীয় আদেশসমূহ বাস্তবায়নের ভার। এছাড়া আরও এক গােষ্ঠী অভিজাত ছিল তারা হল উচ্চ পদস্থ ধর্মযাজকেরা (bishop ও abbot)। এই ধর্মযাজকদের নিয়ােগ করত রাজা, যার ফলে ধর্মযাজক হওয়ার গুণাবলী নাই এমন মানুষও প্রভাবের ফলে এই সব পদ পেতে পারত। সব অভিজাতরাই বড় বড় জমিদারীর মালিক ছিল এবং জমিদারী থেকে কৃষি উৎপাদনের উপর আরােপিত

কর পেত এবং কৃষি ভূমির খাজনা পেত। এ ছাড়াও ধর্মযাজকেরা কৃষকদের উপর ধার্য করা কৃষি উৎপাদনের একটা অংশ উপাসনালয়ের জন্য পেত (church tithes)।

বিলাসী জীবন যাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে, খরচ মেটানর জন্য অভিজাত শ্রেণী তাদের এলাকাভুক্ত কৃষকদের উপর করের বােঝা বাড়াতে থাকে। তাছাড়া রাজস্ব, প্রশাসন ও উচ্চপদস্থ ধর্মযাজকদের লাভজনক নিয়ােগগুলি নিজেদের দখলে রেখে আয় বাড়াতে থাকে, এতে ধনবান ব্যবসায়ীরা যারা এই পদগুলি কিনে অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারত তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

ধনী ব্যবসায়ীরা পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ক্রমবর্ধমান আয় দিয়ে আরও সংখ্যায় বেশী ও ধনবান হতে থাকে। অনেকে অভিজাত শ্রেণীর লােকের চাইতেও বেশী ধনবান ছিল। তাদের নিচে মাঝারী ব্যবসায়ীরা ছিল। এরা সবাই জমি কিনে সেখান থেকে আয় করতে পারত। আবার রাজ্যের ও প্রশাসনের লাভজনক পদ কিনে নিতে পারত। কিন্তু আইনগত ভাবে সামাজিক মর্যাদায় এরা অভিজাতশ্রেণীর নীচে বলে মনে করা হত। এতে তারা ক্রুদ্ধ ছিল। কিন্তু রাজার শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী অবস্থান নেওয়ার মত পরিস্থিতি ছিল না। এর নিচে ছিল ছােট ব্যবসায়ী ও কারিগররা। ঐতিহ্যগতভাবে তারা রাজ্য নিয়ন্ত্রিত guild বা কারিগরদের সমিতির উপর নির্ভর করত। উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে তাদের আয় সুরক্ষা করত। প্রতিযােগিতা বাড়তে থাকার কারণে তাদের আয় রক্ষা করার ব্যবস্থাও কার্যকর থাকল না। ১৭৮০ এর দশকে ও ১৭৯০ এর দশকের প্রথমদিকে কৃষি পণ্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় কারিগরদের প্রায় অভূক্ত থাকার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।

ফ্রান্সের অধিবাসীদের অধিকাংশই ছিল কৃষি নির্ভর। এর মধ্যে অল্পসংখ্যক ছিল বড় ভূস্বামী এবং আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। কিছু ছিল ক্ষুদ্র ভূস্বামী -যারা স্বল্প পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করত, আবার সুতা তৈরী করা ও কাপড় বােনার মাধ্যমে তাদের আয় বাড়াত। সবচাইতে বেশী সংখ্যায় ছিল ভূমিহীন কৃষকেরা, এরা জমির মালিকদের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য ভাগ করে নেওয়ার শর্তে জমি লীজ (Lease) নিত। এদের অনেকের অবস্থা মধ্যযুগের ভূমিদাসদের মতই ছিল। এরা অনেকভাবে শােষিত হত। জমির মালিকদের দিতে হত উৎপাদিত পণ্যের ভাগ এবং জমির জন্য খাজনা। তাছাড়াও দিতে হত গীর্জার পাওনা (tithe) যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের উৎপাদনের এক দশমাংশ পর্যন্ত ছিল। এর উপর ছিল রাজার ধার্য করা কর। কোন কারণে কৃষি উৎপাদন কম হলে তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ত।

সামাজিক স্তরগুলির জটিলতার কারণে কোন কোন গবেষক মনে করেন শ্রেণীবিভাজন ফরাসী বিপ্লবের মূল কারণ নয়। তাদের মতে যেহেতু ব্যবসায়ী ও কারখানার মালিক শ্ৰেণী বিপ্লব পূর্ব সমাজব্যবস্থায় সুবিধা ভােগ করত, তাদের জন্য রাজা ও অভিজাত শ্রেণীর বিপক্ষে গিয়ে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা গঠনের জন্য বিপ্লব করার কারণ ছিল না। এর পক্ষে তারা যুক্তি দেখান যে, বিপ্লবের নেতাদের মধ্যে খুবই কম ছিল উঠতি পুঁজিপতি। বরং ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ রাজার পক্ষ নিয়েছিল।

তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে এই ধারণা ঠিক নয়। অভিজাত শ্রেণী এবং উঠতি পুঁজিপতি ও বণিক শ্রেণীর স্বার্থ অনেক বিষয়ে এক হলেও তারা বিপ্লবের সময় বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু পুরাতন সমাজ ব্যবস্থায় উঠতি পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর অনেক সুবিধা থাকার জন্য তারা বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে নাই, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্তত করেছে। বিপ্লবের সময় পরস্পর বিরােধী যে দুই শক্তির দ্বন্দ্ব তৈরী হয়েছিল, তা ব্যবসায়ী- উঠতি পুঁজিপতিদের সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টার জন্য নয়। বরং তা হয়েছিল রাজা, অভিজাত শ্রেণী ও ভূস্বামীদের তাদের সুযােগ সুবিধা রক্ষা করার চেষ্টার ফলে।

 

Seven years of war

 

রাজার সম্পদ প্রায় শূন্য হয়ে গিয়েছিল ১৭৮০ এর দশকে। ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ পর্যন্ত স্থায়ী বৃটেন ও প্রশিয়ার বিরুদ্ধে “সাত বৎসরের যুদ্ধ” এবং তারপর আমেরিকায় বৃটেনের আধিপত্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধে ফরাসী সাহায্য ও সমর্থন দানের ফলে বিরাট ব্যয়ভার ফ্রান্সকে প্রায় দেওলিয়া করে ফেলে। সাধারণ মানুষের উপর কর বাড়ান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। গ্রামের মানুষের গড় জীবন যাত্রার মানের অবনতি হয়েছিল। শহরের সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার খরচও

বেড়ে গিয়েছিল। বেশী কর দেবার ক্ষমতা তাদের ছিল না। কর আদায়ের পদ্ধতি ছিল অকার্যকর। কর আদায়ের দায়িত্বে যারা ছিল তারা আদায় করা অর্থের অনেকটা নিজেরাই নিয়ে নিত।

কর ব্যবস্থা সংস্কার করার জন্য রাজা ১৭৮৬ সালে মন্ত্রীদের দায়িত্ব দেন। তারা একটি প্রস্তাব দেয় যাতে কর ব্যবস্থা কার্যকর করার সঙ্গে সঙ্গে অভিজাত শ্রেণী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর কর ধার্য করার কথা বলা হয়- যেগুলাে এ পর্যন্ত কর মুক্ত ছিল। এতে অভিজাত শ্রেণী বিক্ষুদ্ধ হয়। প্রস্তাব কিছুটা পরিবর্তন করে যখন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন অভিজাত শ্রেণীর যে সমস্ত উচ্চ কর্মকর্তা প্রশাসনে ছিল, তারা এটা কার্যকর করতে অস্বীকার করে। এ সত্ত্বেও মন্ত্রীবর্গ যখন এটা কার্যকর করতে চেষ্টা করে তখন অভিজাত শ্রেণীর লােকেরা সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ দেখানর ব্যবস্থা করে। কোন কোন স্থানে তা সহিংস হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয় কারণ তারা এমনিতেই অর্থনৈতিক দূরবস্থার মধ্যে ছিল, তারপর কর বাড়ানর প্রস্তাব তাদের কাছে সঙ্গত মনে হয় নি।

অভিজাত শ্ৰেণী ধরে নিল তারাই সমাজের নেতৃত্ব দিতে পারে। কারণ তারা দেখল কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সাধারণ মানুষ তাদের নির্দেশনা মেনে নিচ্ছে। তারা রাজার কাছে Estates General এর সভা ডাকার দাবী জানাল। এই সভা ১৬১৪ সালের পর অর্থাৎ প্রায় দু’শ বছর ধরে হয় নি। কিন্তু এই সভা সাধারণ মানুষের দাবীর কারণে ডাকা হয় নাই- এটা ডাকা হয়েছিল অভিজাত শ্রেণীর চাপের মুখে । Estates General ছিল একটি পরিষদ যাতে তিন শ্রেণীর প্রতিনিধি থাকার বিধান ছিল। প্রথম শ্রেণী হল অভিজাতরা, দ্বিতীয় শ্রেণী হল উচ্চ পর্যায়ের ধর্মযাজকেরা, তৃতীয় শ্রেণী (the third estate) হল সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিরা।।

কিন্তু সভা ডাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আলােড়ন ও সংগঠন শুরু হল- কারণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে। শহরে ও গ্রামে কৃষক, কারিগর, দরিদ্র জনগােষ্ঠীর মধ্যে প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হল। প্রতিনিধিরা তাদের পক্ষে কি কি দাবী তুলে ধরবে তা আলােচনা হতে লাগল। এই প্রথমবারের মত দরিদ্র মানুষরা তারা সমাজের কাছে কি চায় তা ভাবতে শিখল ও দাবী দাওয়ার তালিকা তৈরী করা হল। যদিও তাদের হয়ে কথা বলার জন্য তারা মধ্যশ্রেণীর শিক্ষিত মানুষ, বিশেষত আইনজীবীদের বেছে নিল, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় প্যারিসের দরিদ্র এলাকাগুলিতে রাজনৈতিক কর্মীদের গােষ্ঠী তৈরী হল। এরাই ১৭৮৯ এর জুলাই মাসে বাস্তিল দখল করে এবং অক্টোবর মাসে ভার্সাই প্রাসাদে অভিযান চালায়। গ্রামে এই কর্মীগােষ্ঠী গ্রামের অভিজাতদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়।

তথ্য সূত্র:

  1. Hobsbawm E. The Age of Revolution. New York, 1996 p 29 <. Hobsbawm E. p 30 9. Wadsworth AP and Mann. J Del. The Cotton Trade and Industrial Lancashire 1600-1780.

Manchester. 1965 chapter-VII. 8. Hobsbawm E. p 35 (. Hobsbawm E. p 35 y Van Houtte JA. An Economic History of the Low Countries, 800-1800. New York, 1977 p 70 9. Nicholas D. Town and Countryside: Social, Economic ad Political Tensions in Fourteenth

Century Flanders. Bruges, 1971 p 302 b. Dobb M. Studies in the Development of Capitalism. New York, 1963 p 156 à. Lambert A. The making of the Dutch Landscape. London, 1971 p 171 so. de Vries J. The Dutch Rural Economy in the Golden Age,1500-1700. Yale, 1994 p 26,55 ss. Van Houtte JA. p 68 12. Koenigsberger HG and Moose G. Europe in the Sixteenth Century. London, 1968 p 50 so. de Vries J. p 152 38. Van Houtte JA. p. 133-135 se. Lambert A. p 171 sy. Lambert A. p 173,187 19. Davis R. The Rise of the Atlantic Economies. Cornell, 1973 p 193 Sb. Russel C. The Crisis of Parliaments. Oxford, 1971 p 26 Sa. Clarkson L. The Pre Industrial Economy of England, 1500-1750. London, 1971 p 62 10. Clarkson A. p 62 ps. Tawney RH. The Agrarian Problem in the Sixteenth Century. London, 1912 p 46 2. Dobb M. p 143 10. Harman C. A Peoples History of The World. London, 2008 p 216 18. Hill C. From Reformation to Industrial Revolution. London, 1967 p 76 se. Tawney RH. p 394 fy. George CH. The Making of the English Bourgeoisie, 1500-1750. Science and Society, 1971,

35,394 39. Hobsbawm E. p 53 36. Harman C. p 288

মুক্ত কর হে বন্ধ- পঞ্চম অধ্যায় (উপনিবেশের যুগ)

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *