মৃত্যুশঙ্কা আর ছাঁটাইভীতির হাত ধরে এবারকার মহান মে-দিবস

এবার এক অন্য আবহ নিয়ে, অন্য সংকেত নিয়ে মে দিবস এসেছে। সেটা বিপদসংকেত! মে-দিবস মানে শ্রমিকের বিজয়ের দিন। শ্রমিকদের বিজয়গাঁথা। এদিন শ্রমিকরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে অগাস্ট স্পীজসহ ১৮ জন শ্রমিকের আত্মাহূতির বিনিময়ে আট ঘণ্টা কাজের অধিকার পাওয়ার গৌরবকে। এর পর পেরিয়ে গেছে একশ চৌত্রিশ বছর!  সেই ১৮৮৬ সালের পয়লা মে শিকাগোর হে মার্কেটের শ্রমিকদের জীবনের মূল্যে যে আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি তা আজও বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বাস্তবায়ন হয়নি। এই একশ চৌত্রিশ বছর পৃথিবী তার কক্ষপথে নিয়ম করে ঘুরেছে। দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীর সরকার কায়েম হয়ে আবার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর ঘটেছে। গোলার্ধের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত এখনো ন্যুনতম শ্রমের মজুরির দাবি উপেক্ষিত। এখনো শ্রমিককে তার সেই আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন করতে হয়। এখনো শ্রমিককে আট ঘণ্টার বদলে দশ ঘণ্টা এমনকি বার ঘণ্টা কাজ করিয়ে সেই আট ঘণ্টার হিসেবেই মজুরি দেয়া হয়। এত কিছুর পরও বছরের এই একটি দিন, পহেলা মে, এই দিনটি যেন শ্রমিকদের বিজয়ের দিন! এই একটি দিনেই যেন সারা বিশ্বের শ্রমিক তার মুক্তির দিন মনে করে ক্ষণিকের উল্লাস করে।

 

তবে আর দশ-পাঁচটা দিবসের মত আপামর বাঙালির জীবনে এ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই। এখানে মে দিবস আসে নেহায়েত ৩০ এপ্রিলের পরের দিন ১লা মে, সেই হিসেবে। ওই দিন সরকারি ছুটি থাকে বলে মধ্যবিত্ত বাঙালিরা বউ বাচ্চা নিয়ে একটু ঘুরতে টুরতে বেরোয়। পয়লা বৈশাখের মত পান্তা ইলিশের জবজবানি নেই। ভ্যালেন্টাইন দিবসের মত রংচঙা কাপড় চোপড় পরে একে অপরকে খামোখা ভালোবাসার ছেনালি দেখাবার সুযোগও নেই।

দেশেসহ সারা বিশ্বে এখন প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের আক্রমণ কোভিড-১৯ এ প্রায় সোয়া দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশেও চেপেচুপে, গোপন করেও ১৬৮ বলা হচ্ছে। আক্রান্ত সাড়ে সাতশ! এটা অন্তত এই দেশের জন্য ‘খুব বড়’ কিছু নয়, কারণ এদেশের শাসকরা দেশের মানুষদের উপর নেমে আসা একের পর্ এক প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ‘নিয়মতান্ত্রিক’ বলে, এবং লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর পর যখন বেঁচে থাকা মানুষ স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন নির্লজ্জ বেহায়ার মত বলে- ‘এদেশের লড়াকু মানুষ প্রকৃতিকে জয় করেছে’! সেই জয়ে শাসকদের অবদান শূণ্য বলেই ধাপ্পাবাজীটা বেশি জোরে উচ্চারিত হয়।

করোনাভাইরাসে কতজন মারা যাবে সেটা এখনই বলা সম্ভব না হলেও শ্রমিকদের ওপর, সাধারণ মানুষের ওপর, খেটে খাওয়া মানুষের উপর এর বিরূপ প্রভাব অনুমান করাই যায়। দেশে প্রায় ৪ হাজারা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে প্রায় ৪৩ থেকে ৪৫ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করে। এদেরকে নিয়ে মালিকদের পোষক সংস্থা ‘বিজিএমইএ’ করানোভাইরাসের শুরু থেকেই বদমায়েশি-জালিয়াতি করে আসছে।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেছিলেন; এই শিল্পে শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে, যেকোনো মুহূর্তে তা বিস্ফোরিত হতে পারে।

সরকারের দেয়া যে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার কথা শুনি সেটাই প্রথম নয়। এর আগেও বহুবার এনাদেরকে প্রণোদনা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছে। রাখতে হয়।

এটা দেশের প্রধান রপ্তানি খাত। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিশেষত নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র এ খাত। শুধু দেশের অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক অগ্রগতিতেও রয়েছে এর বিরাট অবদান। এ খাতকে যেভাবেই হোক সচল ও উৎপাদনমুখী রাখতে হবে। বস্ত্র খাতের বর্তমান বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়লে প্রয়োজনে নতুন বাজার খুঁজতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। বড় সঙ্কটে রয়েছে বস্ত্র খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্পিনিং উপ-খাত। ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও এ খাত সরকারের সুদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত। খাতটি একটি অসম প্রতিযোগিতার। খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখানে কোন বাধা নেই। বাংলাদেশের মতো এমন মুক্তনীতি পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। কারণ কি? এখানকার মত এত সস্তা শ্রম বিশেষ আর কোথাও নেই। এখানকার মত এমন পশুর মত আর কোনো দেশ শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাতে পারে না। সস্তা শ্রম ও শুল্ক সুবিধার জন্য ভারতীয়সহ সারা বিশ্বের ব্যবসায়ীরা এখানে বিনিয়োগ করেছে।

এবার এই সবচেয়ে বড় শিল্পখাত থেকে দেদারছে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা নেওয়ার পরও অর্ধেক কারখানায় মার্চ-এপ্রিলের বেতন দেওয়া হয়নি। তারই মধ্যে চলেছে গোপনে ছাঁটাই। কোথাও ১২ ধারা বলে লে-অফ করে, কোথাও ১৬ ধারা বলে বন্ধ করছে। এর মধ্যে করোনার স্বাস্থ্যঝুঁকি তো আছেই। নির্মম পাশবিকভাবে একবার শত শত মাইল হাঁটিয়ে শ্রমিকদের ঢাকায় এনে আবার হাঁটিয়েই বাড়ি পাঠানো হয়েছে।

সরকারের মন্ত্রী বলেন- শ্রমিকদের আসতে বলা হয়েছে আমরা জানি না।
বিজিএমইএ বলে সরকারকে সব জানিয়েই করা হয়েছে।

মালিকরা বলে-আমরা আসতে বলিনি।

শ্রমিকরা বলে- আমাদের বলা হয়েছে না আসলে বেতন দেওয়া হবে না।

বিজিএমইএ- সভাপতি রুবানা হক প্রচণ্ড দাম্ভিবকতায় বলেন- ‘শ্রমিকরা কী পেয়েছে? আসবে না, কাজ করবে না বাড়ি চলে যাবে, আবার বেতনও পাবে? কেন? কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সরকার বলে- আমরা শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্যই ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছি।

 

এবার এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রায় সকল কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো সরকার বলছে- কাউকে আমরা ঢাকায় আসতে বলিনি। আসতে দেবও না!তাহলে? শ্রমিকদের কি পাখনা গজিয়েছে? তারা কি সেই পাখায় ভর করে উড়েস আসবে? না আসলে আবার বেতনও নেই, কাজও নেই! গার্মেন্ট মালিকদের কাছে ‘আজ্ঞাবহ’ সরকার, মালিকগং এবং এদের বেনিফিশিয়ারীরা মিলে প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিককে নিয়ে বেশুমার তামাশায় মেতেছে এবারকার সেই মহান মে-দিবসে!

 

এরই মধ্যে আর এক ভয়াবহ খবর প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।

“করোনাভাইরাস এবং তার মোকাবিলায় ধুঁকছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যে পড়েছেন অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মীদের বিরাট অংশ। জাতিসংঘের শেষ পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে এই অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বাড়ল। ওই রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, এই অসংগঠিত ক্ষেত্রে বিশ্বের মোট ১৬০ কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন। যা সারা বিশ্বে মোট কর্মী সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তৃতীয় রিপোর্টে উঠে এসেছে এমনই আতঙ্কের ছবি। তাই আইএলও-র ডিরেক্টর জেনারেল গাই রেইডার বলেছেন, এই শ্রমিকদের এখনই সাহায্য না করলে বিরাট সংখ্যক মানুষ কার্যত শেষ হয়ে যাবেন।

আইএলও-র হিসেবে সারা বিশ্বে চাকরি করেন প্রায় ৩৩০ কোটি মানুষ। তার মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি মানুষই অসংগঠিত ক্ষেত্রে। আইএলও আগের দুবারের পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে জানিয়েছিল, ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাসের জেরে এই অসংগঠিত ক্ষেত্রে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আরও বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ বার প্রকাশিত হল এল সংস্থার তৃতীয় পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট— কোভিড-১৯ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক। সেই রিপোর্টেই উঠে এসেছে এমন উদ্বেগের ছবি।

পরিস্থিতি যে কতটা শোচনীয় তা বোঝাতে গাই রেইডার বলেন, ‘‘লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কর্মীদের খাবার জোগাড় করার মতো কোনও আয় নেই। কোনও নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। লক্ষ লক্ষ সংস্থা ধুঁকছে। তাঁদের কোনও সঞ্চয় নেই। উপায় নেই ধার নেওয়ারও। এখনই এই শ্রমিক-কর্মীদের বাঁচানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘এটাই বিশ্বের কর্মসংস্থানের আসল মুখ। এখনই যদি আমরা এঁদের সাহায্য না করি, তাহলে এই মানুষগুলো শেষ হয়ে যাবে।“

 

তারপরও আর বছরের মত এবারও এই দিনটিতে সরকার প্রধান, মন্ত্রীবর্গ, রাষ্ট্র প্রধান, প্রধান বিরোধী দল, ছাও পোনা বিরোধী বা সহমতের দলগুলো বাণী দেবে। খুব সকালে পরিবহন শ্রমিকরা মাথায় লাল পট্টি বেঁধে বিনা ভাড়ার বাসে-ট্রাকে মিছিল করে হৈহুল্লোড় করবে না, কারণ করোনা। নেতা-নেত্রীরা এখানে ওখানে ভাষন টাষন দেবেন। মিডিয়ায় দিন ভর আরোপিত শ্রমিক দরদি কাসুন্দি বেটে দর্শককে খাওয়ানো হবে। রাতে তাবড় তাবড় সব বিদ্ব্যৎজনেরা স্টুপিড বাক্সো গরম করে ফেলবেন। বেসুরো হেঁড়ে গলায় এক স্বখ্যাত বিপ্লবী ‘জন হেনরী’  গান গেয়ে বাবরি চুল ঝাঁকিয়ে মাতম করবেন। পত্রিকাঅলারা প্রথম পাতার কোণায় এক ইট ভাঙ্গা শ্রমিকের বা নারী শ্রমিকের ছবি ছেপে ক্যাপশন লিখবে…..‘আজ ঐতিহাসিক মে দিবস’! ‘আজও কি শ্রমিকের মুক্তি এসেছে?’ এবং রাত ফুরোলেই ওই মহান মে দিবসের যবনিকা টেনে দেয়া হবে।

 

কিন্তু, যে শিশু শ্রমিকটি বাসা বাড়িতে অগুনতি ঘণ্টা ধরে গাধার খাটনি খেটে চলেছে, খুব ভোরে উঠে যার দিন শুরু, আবার রাতে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলে যার ঘুমোনোর সময়, তার জন্য কোন আট ঘণ্টার মহান মে দিবস নেই। সে জানেও না আট ঘণ্টা মানে কত ঘণ্টা? ট্যানারির নাড়িভুড়ি বেরিয়ে যাওয়া গন্ধময় পরিবেশে যে শ্রমিকরা কাজ করছে, তাদের সাথে যে শিশু শ্রমিকরা নোংরা ময়লা ঘেটে জীবনের সুকুমার শৈশবকে মাটি চাপা দিচ্ছে, বয়লারের পাশে গনগনে আগুনের পাশে দাঁড়ানো যে শ্রমিকটির মুখ সারাক্ষণই লাল হয়ে জ্বলছে, শহরের বাইরে মায়ের সাথে ইট ভাঙ্গছে যে কচি শিশুটি তার কাছেও মে দিবস কোন গুরুত্ব বহন করে না। সে জানে তার হাতে ধরা হাতুড়ি একটু বেসামাল হলেই আর এক হাতে পড়বে! চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাবে।

সায়েবদের বাজার বয়ে বয়ে বাড়ি পৌছে দেয়া শত শত কচি ছেলে মেয়েগুলো সেই কাক ডাকা ভোরে উঠে বাজারে আসে। ওখানেই খায়, ওখানেই ঘুমায়। ডাইং ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে তাদের কারো হাতে গ্লাভস নেই। কস্টিক সোডা, ব্লঙ্কা ফল, এসিটিক এসিড, রেজিন, ব্লিচিং পাউডার আর এমন হরেক রকম জটিল রাসায়নিকে ভিজে তাদের হাতগুলো থ্যাকথেকে সাদা সাদা হয়ে আছে। সেই দগদগে ঘা কখনোই শুকোয় না। ঝাল মরিচে রান্না তরকারি দিয়ে ভাত খেতে গেলই অন্তরাত্মা পর্যন্ত জ্বলে উঠে। চোখের পানি গাল বেয়ে ঠোঁটের কোণা দিয়ে মুখে চলে যায়। ওভাবেই দিন শুরু আর দিন শেষ! দয়াগঞ্জ ব্রিজের দুপাশে দাঁড়ানো যে শিশুরা তাদেরও জীবন শুরু হয় খুব ভোরে। বোঝাই রিকসা ঠেলে ঠেলে ব্রিজ পার করা তাদের কাজ। এখানে আট ঘণ্টা নামক কোনো ব্যাপার নেই। সারা ঢাকা শহরে শকুনের মত শ্যেন দৃষ্টি মেলে আরো হাজার হাজার শিশুর দিন শুরু হয়। তারা কাগজ কুড়োয়। এক হাতে পলিথিনের বস্তা আর এক হাতে ক্রমাগত কাগজ কুড়িয়ে চলে। ওদেরও শ্রম দিবস মানে বার থেকে ষোল ঘণ্টা।

এই মহানগরীতে ঠিক কত লাখ শ্রমিক এবং সেই সব শ্রমিকের কত লাখ অপ্রাপ্ত বয়সের শিশু শ্রমিক তার কোন খতিয়ান মহান রাষ্ট্রের কোন দপ্তরে নেই। ঠিক কত লাখ ‘কাজের মেয়ে’ এই মহানগরীতে শ্রম শোষণের শিকার, কত লাখ নারী-পুরুষ বাসা বাড়িতে যৌন হয়রানির শিকার, কত লাখ অপরিণত বয়সী মেয়ে বাড়ির কর্তা, দারোয়ান, গ্রামের আত্মিয়, ড্রাইভার আর এই টাইপ অফিসিয়াল ধর্ষকের দ্বারা ধর্ষিত তারও কোন অথেনটিক স্ট্যাটাস সরকারের হাতে বা তথাকথিত মানবাধীকার সংগঠনগুলোর কাছে নেই। এদের কেউ তার কর্ম জীবনে আট ঘণ্টা বলে যে একটা শব্দ আছে সেটাই জানেনি। বোঝেনি। তাদের জানতে বা বুঝতে দেয়া হয়নি।

 

শ্রম শোষণ বা শ্রম চুরির মত একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় নিয়ে এই রাষ্ট্র, সরকার, বিরোধী দল, ছোট বড় হেন-ত্যান দল এবং বুদ্ধিব্যাপারিদের কোন চিন্তা নেই। এ নিয়ে সংবিধান সংশোধনও হবে না, সংসদে কোনো বিলও পাশ হবে না। অথচ সারা দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি গতরখাটা শ্রমিকের সিংহভাগই শ্রম শোষণের শিকার। সেই অজ পাড়াগাঁ থেকে শুরু করে এই তিলোত্তমা মহানগরীতে বেশুমার সেই শ্রম শোষণ আর শ্রমচুরি চলছে। এদেশে যে কোটি কোটি ক্ষেতমজুর সারা দিনমান শ্রম দিয়ে চলে তারা অফিসিয়ালি শ্রমিক নয়! সরাসরি এই চুরির সাথে জড়িত এ দেশের প্রায় সকল বিত্তবান, মধ্যবিত্ত এবং ক্ষুদে বিত্তের মালিকগণ।

 

 

ওই যে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি গতরখাটা শ্রমিকের প্রায় এক তৃতীয়াংশই শিশু শ্রমিক। বিশ্বের আর কোথাও বিভিন্ন বিপজ্জনক সেক্টরে এত শিশু শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো হয় না। এখানে হয়, কারণ এখানকার শিল্পপতি থেকে শুরু করে হালের মডার্ণ আইটি স্পেশালিস্ট, টেকনোলজিস্ট, সিভিল ব্যুরোক্র্যাট, মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাট, বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত নিয়মর্ডানিস্ট, একেবারে হালের তরুণ প্রজন্ম সবাই সেই পিতৃপুরুষের এস্তেমালের সামন্তবাদে আক্রান্ত। ভীষণভাবে আক্রান্ত। সামন্ত প্রভুদের জুতো মোজা খুলে দেয়ার জন্য, অজুর পানি দেয়ার জন্য, মাথায় ছাতা ধরার জন্য, ভেতর বাড়ি থেকে পানটা সুপারীটা এনে দেয়ার জন্য একটা ‘পিচ্চির’ দরকার হয়। অথচ পুঁজিবাদে সক্ষম এবং স্কিল্ড শ্রমিক একটা এ্যাসেট। পুঁজিবাদ সেই এ্যাসেটকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে দিয়ে আগামী দিনেও যেন কারখানার চাকা চালু রাখা যায়। সে কারণে পুঁজিবাদের চরম উৎকর্ষেও স্কিল্ড শ্রমিকের চাহিদা ফুরোয় না।

 

কিন্তু সামন্তপ্রভুরা জানেন, ওদের না বাঁচলেও চলবে, কারণ কালই আবার ঝাঁকে ঝাঁকে পয়দা হতে থাকবে। সামন্তপ্রভুর কাছে শ্রমের বিনিময় মূল্য স্রেফ পেটেভাতে! পেট পুরে ভাত দেয়া হয়, এটাই সামন্তবাদের মহান বদান্যতা! আর বছর বছর জিডিপি নিয়ে রেমিট্যান্স নিয়ে ভেরেন্ডাভাজা আমলা-চামচাদের চিৎকার চেচামেচির পরও, লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে কাজ করে কড়কড়ে কারেন্সি নোট কামাই করে আনলেও, আইটি দিয়ে ডিজিটাল সিস্টেমে দেশ ভরিয়ে দেয়ার কেতাবি ঘোষণার পরও এদেশে যথাযথ পুঁজিবাদী সংস্কৃতি গড়ে উঠল না। অনুদান দেয়া আমেরিকা মাঝে মাঝে শিশু শ্রম নিয়ে, কল কারখানায় বিশেষ করে গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকদের সিবিএ বা বার্গেনিং অথোরিটি করার হুমকি টুমকি দিলে এদেশী চামচারা এক গাল হেসে দিয়ে বলেন- ‘স্যার ও দেখতে ছোট, কিন্তু লইতে পারে’! সাদা সায়েবরা এই জঘণ্য কুৎসিত ইঙ্গিত বোঝেন না। তারা ভাবেন গ্রোথ কম! তারা টিক মার্ক দিয়ে দেন। শিশুরা শ্রমিক ‘শ্রম বঞ্চিত’ হয় না! অর্থাৎ শিশুদেরও কাজের সুযোগ দেয়া হলো! এই আধা সামন্তবাদী- আধা পুঁজিবাদী জগাখিঁচুড়ি পাশবিক বণিক সমাজে তাই মে দিবস এবং সেই সেই দিবসের প্রতিপাদ্য এটুকুই যে দিনটি শ্রমিকদের দিন!

 

ইতিহাসের মে দিবসঃ

১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘন্টা শ্রমদিনের দাবীতে আন্দোলনরত শ্রমিকের ওপর পুলিশ গুলি চালালে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। এই ঘটনার আগে শ্রমিকদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘন্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন শ্রম দিতে হতো। বিপরীতে মজুরী মিলত নগন্য, এবং সেই কম মজুরি দিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো তাদের। কোথাও কোথাও তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেন ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবী মেনে নেয়নি। ৪ঠা মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেটে শ্রমিকরা মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। আগস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে একটি বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। এবং সাথে সাথে পুলিশবাহিনী শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে। হামলায় ঘটনাস্থলেই ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। আবার পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর প্রকাশ্যে ৬ জন শ্রমিকের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামে একজন একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্য একজনের পনের বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, “আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে”। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের “দৈনিক আট ঘন্টা কাজ করার দাবী সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবী আদায়ের দিন হিসেবে।

 

বাংলাদেশে সরকারি আধা সরকারি কল কারখানাগুলোতে যেখানে শিফ্ট চালু আছে সেখানে কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা কাজের নিয়ম পালিত হলেও সারা দেশে লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে দশ-বার ঘণ্টা, কোথাও কোথাও ষোল ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হয়। অফিসিয়ালি বলা হয়, অতিরিক্ত শ্রম ঘণ্টার জন্য ওভারটাইম দেয়া হয়। কিন্তু যে সব সেক্টরে শ্রমিকদের বার্গেনিং এজেন্ট বা সিবিএ আছে সেই সব সেক্টর ছাড়া আর কোথাও ওভারটাইমের টাকা যথাযথভাবে আদায় করা যায় না।  বিস্ময়করভাবে গার্মেন্ট সেক্টরে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য কোনো সিবিএ বা বার্গেনিং এজন্ট নেই। তার বদলে বিভিন্ন নামে সরকারি ছত্র ছায়ায় এবং কয়েকটি বিরোধী দলীয় সমর্থনপুষ্ট শ্রমিক সমিতি আছে যারা মাঝে মাঝে মালিক পক্ষের সাথে দেন-দরবার করে তাদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করে। এবং অবধারিতভাবে তাদের দাবি আদায় তো হয়ই না, বরং সেই দাবি আদায়ের পদ্ধতিকে দেশের তামাম বুজর্গ, বুদ্ধিজীবী, বিদ্যাজীবী এবং রংবেরঙের সুশীল সমাজপতিরা হঠকারি আখ্যা দিয়ে এর বিপক্ষে দাঁড়ায়।

 

 

এর পরও যদি শ্রমিকরা তাদের দাবি টাবি নিয়ে আরো একটু স্বোচ্চার হতে চায় তাহলে তাদেরকে কারখানার ভেতরে রেখে বাইরে থেকে দরোজা জানালা বন্ধ করে মেইন গেটে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে পালিয়ে যাবে সিকিউরিটি গার্ড নামক পোষা চামচারা। তারপর খুব ঠাণ্ডা মাথায় কারখানায় আগুণ ধরিয়ে দেয়া হবে। জ্যান্ত পুড়ে মরবে ডজন ডজন হতভাগা শ্রমিক। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা দিন শেষে প্রতিবেদন দেবে-‘সর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে’! সরকার এবং মালিক পক্ষ তিন বা চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করবে। সেই কমিটি দিন সাতেক বা দিন দশেক পরে একটা তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে। যা কোনো দিনও আলোর মুখ দেখবে না। মোদ্দা কথা হচ্ছে এই সেক্টরে যে হতভাগা শ্রমিকরা কাজ করে তারা নির্ভেজাল দাস। সেই দাসদের যতদিন সম্ভব শ্রম শুষে নিতে হবে। যখন তার শ্রম সসীম হয়ে যাবে, অর্থাৎ তাকে দিয়ে আর আগের মত গাধার খাটনি খাটানো যাবে না তখন তাকে বা সেই শ্রমিক গোষ্ঠিকে হয় ছাঁটাই করা হবে, নয়ত বাড়াবাড়ি করলে স্রেফ পুড়িয়ে মারা হবে। এবং বছরের পর বছর এই ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টরে। এ নিয়ে এই দেশের তাবড় তাবড় জ্ঞানীগুণী বুদ্ধিব্যাপারিদের কোনোও মাথা ব্যথা নেই।

এই সেক্টরের বাইরে সারা দেশ নয়, শুধু মাত্র ঢাকা শহরেই প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ শিশু শ্রমিককে দিয়ে অমানবিক কাজ করানো হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস তাদের অমানবিকতার বিরুদ্ধে কোনো বার্তা বয়ে আনে না। ঢাকাতে সব চেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক কাজ করে বাসা বাড়িতে আর হোটেল রেস্তোরাগুলোতে। বাসা বাড়িতে যারা কাজ করে তাদের কোন শ্রম ঘণ্টা নেই। ভোর থেকে শুরু করে রাত বারটা একটায় ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তাদের শ্রম ঘণ্টা।খাওয়া-পরা সমেত বেতন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। খাওয়া পরা বাদে বেতন দেড় হাজার থেকে দুই হাজার। হোটেল রেস্তোরাগুলোয় যে শিশু শ্রমিকরা কাজ করে তাদের বেতন আরো কম। খুব ভোর থেকে শুরু করে হোটেল রেস্তোরা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এদের কাজ করতে হয়। নোংরা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, গুমোট গরমে সেদ্দ হয়ে সারা রাত ঘুমোতে না পারা এই সব ক্রমিকরা জানেও না শ্রম দিবস কি, বা মে দিবস কি? শুধু যে এদের শ্রম শোষণ করা হয় তা নয়। এদের সাথে আরো জঘণ্য কর্মকাণ্ড করা হয়। সিনিয়র শ্রমিক বা হেড বেয়ারা যারা আছে তারা এই সব শিশু শ্রমিকদের উপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এবং প্রায় সবাইকেই কোনো না কোনো সময় বলাৎকারের শিকার হতে হয়।

 

একানব্বই সালে ক্রেমলিনের চার দেয়াল ভেদ করে পুঁজিবাদী দানব বেরিয়ে এসে সমগ্র পৃথিবীকে আবার নতুন করে গ্রাস করে ফেলার পরও এ দিন মস্কোর রেড স্ক্যয়ারে অশতিপর বৃদ্ধ বৃদ্ধারা লাল পতাকা নিয়ে হাজির হবেন। অপসারিত লেনিনের মুর্তির পাদদেশে ক্ষণিক তাকিয়ে থাকবেন। ১৯১৭ সালের পর এই রেড স্ক্যয়ারে মে দিবসে কি কি ঘটত সে সব ধূসর হয়ে যাওয়া স্মৃতি মন্থণ করবেন। তার পরও তারা সারা দিন ওই রেড স্ক্যয়ারে পড়ে থাকবেন। প্যারিসের ল্যূভার স্ক্যয়ারে, স্পেনের রাজ প্রাসাদের বাইরে, বনের ফ্রিডম স্ক্যয়ারে, তিরানার হোক্সা এভেন্যুতে, চীনের তিয়েনআনমেন স্ক্যয়ারে, ভিয়েতনামের হো চি মিন স্ক্যয়ারে, হাভানার চে স্ক্যয়ারে হাজার হাজার শ্রমিক এ দিনও সমবেত হবেন না। হয়ত নতুন করে শ্রমিকের মুক্তির শপথও নেবেন না। হয়ত কিছুই করবেন না। হয়ত সারা দিন দাঁড়িয়ে বা বসে সেই সব পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে একরাশ হতাশা বুকে নিয়ে আবার ঘরে ফিরে যাবেন। ইউরোপের দেশে দেশে গত এক দশক ধরে নতুন করে যে বিক্ষোভ দানা বেঁধে পাথরের মত শক্ত হতে শুরু করেছে। সেই পাথরের দৃঢ়তা নিয়ে তারা আরো একটু এগুতে চাইলে হয়ত পুলিশ গুলি ছুড়বে। হয়ত এই মে দিবসেই সারা বিশ্বে পুলিশের গুলিতে আরো শত শত শ্রমিকের মৃত্যু ঘটবে! তার পরও, এত সব হতাশার খণ্ডচিত্রের পরও সারা বিশ্বের শ্রমিক এ দিন তাদের মত করে পৃথিবীকে আরো একবার যাচাই করে দেখে নিতে চাইবে। নতুন একজন অগাস্ট স্পীজ তাদের সামনে এসে না দাঁড়ালেও তারা এই আশায় আবারো বুকের গহিনে বজ্র নিনাদ শুনবে। এক সময় মনের গহিনে ক্ষীণ হলেও সেই আশার সঞ্চার ঘটিয়ে ঘরে ফিরবে- একদিন এই পৃথিবীটা আমাদের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। একদিন আমরাই এই পৃথিবী থেকে মানুষে মানুষে শোষণ বঞ্চণা দূর করে বৈরী দয়ামায়হীন পৃথিবীটাকে সব মানুষের জন্য বাসযোগ্য করে তুলব। কেননা একমাত্র শ্রমিকরাই পারে একটি সোনালী আগামীর জন্ম দিতে। সেটা দেখার জন্য কেউ বসে থাকবে নিষ্ক্রিয়ভাবে, আর কেউ সক্রিয় হবে। মাঝামাঝি কোনো রাস্তা নেই। আসলেই নেই।

—————————

মনজুরুল হক

১ মে, ২০২০

 

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *