মুক্ত কর হে বন্ধ-প্রথম পর্ব (আদিম সমাজ ও শ্রেণী বিভাগের উৎপত্তি)

“সম্পাদকের কথা: সবসময়ই ইচ্ছে ছিল, আছে এবং থাকবে সত‍্যের সন্ধানের পাঠকদের জন‍্য ভাল কিছু লেখা দেয়া। এবারের লেখাটায়ও পাঠকরা এমনটাই খুজে পাবেন। লেখককে সরাসরি ধন্যবাদ না দিতে পারা অনেকখানি কষ্টজনক। তবে আশা করব কোন ভাবে যদি লেখাটা মূল লেখকের হাতে গিয়ে পৌছায় সত‍্যের সন্ধানের পাঠকের মাধ্যমে এবং সে জানতে পারে তার এই লেখাটা ছিল হাজার পাঠকের মনের খোরাক, তাহলেই হবে সত‍্যের সন্ধানের আত্মতৃপ্তি। আর পাঠকের পড়ার আনন্দই হবে লেখকের জন্য কৃতজ্ঞতা। লেখাটা একটু বড়, অনুগ্রহ করে ধৈর্য্য ধরে পড়বেন। মোট ১৪ পর্বে আসছে, আজ রইল এর প্রথম পর্ব, ধন্যবাদ।”

মানবজাতির শুরুর দিক:

আধুনিক মানব প্রজাতি (যা বিজ্ঞানে species নামে অভিহিত) হােমাে সেপিয়েন্স (Homo Sapiens) species এর উৎপত্তি কমপক্ষে একলক্ষ বৎসরের আগে। এই প্রজাতির উৎপত্তি হয় প্রায় ৫০ লক্ষ বৎসর আগে আফ্রিকায় বাস করত এমন একটি ape প্রজাতি থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে। Ape রা হচ্ছে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে লেজবিহীন বানরদের একটা শাখা। এই ape প্রজাতি গাছে বসবাস করত। অজানা কারণে এরা গাছ থেকে নেমে মাটিতে বসবাস শুরু করে। আমাদের নিকটতম প্রজাতি শিম্পাঞ্জি এখনও গাছে বাস করে। এই প্রজাতি সােজা হয়ে দুই পায়ে ভর করে হাঁটাও আরম্ভ করে। মাটিতে জীবন ধারণের জন্য অন্যান্য প্রাণীর চাইতে এই প্রজাতির একে অপরের সঙ্গে সহযােগিতা করার প্রয়ােজন আরও বেশি ছিল। হাতিয়ার তৈরী করে মাটি খুঁড়ে গাছের শিকড় জোগাড় করত। ছােট ছােট জন্তু শিকার করতে ও শিকারী জানােয়ারদের থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রয়ােজন ছিল সবাই একসঙ্গে কাজ করার। যারা এই সহযােগিতার পথে চলতে পারত না এবং এই সহযােগিতার সঙ্গে যে চিন্তাধারায় পরিবর্তন তা আত্মস্ত করতে পারত না, বিবর্তনের ধারায় তাদের সংখ্যা কমে আসত। যারা তা পারত তাদের সংখ্যা বাড়ত।

লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে বিবর্তনের এই প্রক্রিয়া চলার ফলে অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর সঙ্গে এই প্রজাতির genetic inheritance এ পার্থক্য হয়ে গেল। অন্যান্য প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মত শারীরিক পরিবর্তন বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করে। যেমন শীতপ্রধান এলাকার প্রাণীর গায়ে ঘন পশম, হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করার জন্য লম্বা পা, অনেক উপর থেকে শিকার খোঁজার জন্য তীক্ষ্ম দৃষ্টিশক্তি ইত্যাদি শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করেছে। এ ব্যাপারে মানুষ কিছুটা পৃথক। মানুষের পূর্ব প্রজাতিগুলাে বিবর্তিত হয়েছে এভাবে যেন তারা সব ধরণের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। শারীরিক দিক থেকে কোন বিশেষ পরিবেশে বাস করার জন্য পৃথক বৈশিষ্ট্য তারা অর্জন করেনি। বিভিন্ন পরিবেশে জীবন যাপন করার জন্য কতকগুলাে বিশেষত্ব তারা অর্জন করেছে। এগুলাের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল তাদের হাত এভাবে তৈরী যে তারা হাত দিয়ে বিভিন্ন আকার আকৃতির জিনিষ ধরতে পারে। গলার স্বর ব্যবহার করে ভাষা তৈরী করে এবং অপরের সঙ্গে তথ্য ও ভাব আদান প্রদান করতে পারে। মস্তিষ্কের বিবর্তন হয়ে চিন্তাশক্তি অর্জন করে এবং চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ অনুসন্ধান করে তা সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করতেও মানব প্রজাতি পারে। শিশুদের পূর্ণতা পেতে দীর্ঘসময় লাগার জন্য এই সময়ে আরেক প্রজন্মের মানুষেরা তাদের অর্জিত জ্ঞান পরের প্রজন্মের মানুষদের দিতে পারে এবং এইভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পূর্বের জ্ঞানের সঞ্চয় চলে যেতে পারে। প্রতি প্রজন্মেই কিছু নতুন জ্ঞান যােগ হয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। মানব মস্তিষ্ক অন্যান্য প্রাণীর চাইতে এই কারণে ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয় ও বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন হয়। বিমূর্ত চিন্তা অর্থাৎ যে সমস্ত বস্তু ও ঘটনা চোখের সামনে নাই সে সম্বন্ধে চিন্তা করতে ও ধারণা করতে পারে। অন্যদের সঙ্গে যােগাযােগ করার জন্য ভাষার ব্যবহার এবং একে অপরের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক রাখা এগুলােও মানব মস্তিষ্কে অন্যান্য প্রাণীর চাইতে অনেক বেশি উন্নত। বিবর্তনের ধারায় এইসব গুণাবলি অর্জন করে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব সম্ভবতঃ প্রায় দেড় লক্ষ বৎসর আগে আফ্রিকায় হয়।

পরবর্তী ৯০ হাজার বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা দফায় দফায় আফ্রিকা থেকে অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় তারা মানুষের কাছাকাছি প্রজাতি নিয়েনডারথাল (Neanderthal) দের সরিয়ে দেয়। ষাট হাজার বৎসরের আগেই তারা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে বসতি স্থাপন করে এবং প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে তারা ইউরােপে পৌছায়। এই রকম সময়ে তারা কোনভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দ্বীপগুলি থেকে অস্ট্রেলিয়া যেতে সক্ষম হয়। কমপক্ষে ১২ হাজার বছরের আগেই মানুষ এশিয়া থেকে বেরিং সমুদ্র পার হয়ে আমেরিকায় পৌঁছায়। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সমস্ত স্থানে তারা ছড়িয়ে পড়ে। ছােট ছােট দলে তারা বিভিন্ন স্থানে বসবাস করা শুরু করে। যােগাযােগ রাখা ছিল দুঃসাধ্য, তাই এই | ছােট ছােট দলগুলি আলাদা ভাবে হাজার হাজার বছর ধরে জীবনযাত্রা চালাতে থাকে। ফলে তাদের সামাজিক রীতি-নীতি, অর্জিত জ্ঞান ও ভাষা পৃথক হয়। এছাড়া চোখের রং, চুলের রং ও ত্বকের রং এর মত ছােট খাট বংশগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যও একদল থেকে আরেক দল অর্জন করে। কিন্তু Genetic inheritance বিভিন্ন দল গুলির মধ্যে একই থেকে যায়। এক স্থানের মানুষ ও আরেক স্থানের মানুষের যে জেনেটিক (Genetic) পার্থক্য ছিল তা একই স্থানের বিভিন্ন মানুষের মধ্যে পার্থক্যের চাইতে কম ছিল। এক স্থানের মানুষ আরেক স্থানের মানুষের ভিন্ন ভাষা ও জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম ছিল এবং সব স্থানের মানুষের মধ্যে একই স্তরের বুদ্ধি বৃত্তি ছিল। কাজেই ভৌগলিক ভাবে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকলে মানুষ একই প্রজাতি ছিল। তাই একেক স্থানের মানুষ কিভাবে আচার-আচরণ, জ্ঞান ও জীবন যাত্রার পার্থক্য অর্জন করত তা নির্ভর করত পরিবেশের পার্থক্য ও সেই পরিবেশের সঙ্গে সেই স্থানের মানুষের খাপ খাওয়ানাের পদ্ধতির উপর, তাদের genetic গঠনের এর উপর নয়। এই খাপ-খাওয়ানাের পার্থক্যের উপরই নির্ভর করত একেক স্থানের মানুষের ভিন্ন। ভিন্ন ধরনের সামাজিক আচরণ। পৌরানিক কাহিনী ও অনুষ্ঠান সমূহের (myth and ritual) পার্থক্য সত্ত্বেও দশ হাজার বছর আগে পর্যন্তও বিভিন্ন স্থানের মানব গােষ্ঠীর মধ্যে অনেকগুলাে বিষয়ে মিল ছিল। এগুলাে হল তাদের খাদ্য সংগ্রহ, আশ্রয়স্থান তৈরী করা ও পােষাক জোগাড় করার উপায়। এর কারণ ছিল তারা ফলমূল, বন্যপ্রাণী, মাছ ইত্যাদি সংগ্রহ করা ও ব্যবহার করার জন্য একই পদ্ধতি অনুসরণ করত। এজন্য এই সমাজগুলােকে “hunter and gatherer” বা শিকারী ও সংগ্রাহক সমাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

প্রাচীন আমলের সমাজ ব্যবস্থা সম্পন্ন জনগােষ্ঠী পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কয়েক শত বৎসর আগেও ছিল। এখনও অল্প কিছু জনগােষ্ঠী কোন কোন জায়গায় রয়ে গেছে। নৃবিজ্ঞানীরা, যেমন রিচার্ড লি, এই জনগােষ্ঠীগুলির পরিবীক্ষণ এর মধ্য দিয়ে মানুষ তার অস্তিত্বের শতকরা ৯০ ভাগ সময় কি ভাবে কাটিয়েছে সে সম্মন্ধে সম্যক ধারণা দিয়েছেন। পশ্চিমা পৃথিবীতে বহুকাল ধরে এ ধারণা চলে আসছিল যে প্রাচীন মানুষ ছিল বর্বর। মনে করা হত প্রাচীন মানুষ ছিল সভ্যতা সংস্কৃতি বর্জিত। জীবনযাত্রার সংগ্রাম ছিল কঠিন এবং একে অপরের সঙ্গে আচরণ ছিল সহিংস। গবেষণার ফলে এটা এখন স্বীকৃত যে আদিম মানুষ ও সমাজ সম্বন্ধে এই ধারণা সঠিক নয়।

বর্তমান পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্র বৈষম্য, ক্ষুধা ও নিরক্ষরতার ফলে মানুষের দুর্দশা, ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বিগ্রহ, লােভ ও হিংসা আমাদের পীড়া দেয়। সাধারণভাবে প্রচলিত বিশ্বাস এই যে মানুষের প্রকৃতিই হচ্ছে হিংসুক ও যুদ্ধংদেহী এবং এর মধ্য দিয়ে অসাম্যপ্রিয়তা আমাদের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। এই ধারণা সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক প্রচারণার ফলে। অসংখ্য প্রকাশনায় এই মত প্রচার করা হচ্ছে যে মানব প্রকৃতির কারণেই এই বৈষম্য ও হানাহানির উৎপত্তি। এটা মানব সমাজের শুরু থেকে চলে এসেছে এবং এর কোন বিকল্প নাই।

কিন্তু গবেষণা করে অতীত সম্বন্ধে যা জানা গেছে তা এই ধারণার বিপরীত। প্রত্নতাত্বিক আবিষ্কারসমূহ মানব সমাজের আদি পর্যায় সম্বন্ধে আলােকপাত করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে সব মানবগােষ্ঠী গত শতাব্দীর প্রথমভাগেও প্রাচীন পদ্ধতিতে জীবন যাপন করত তাদের পর্যবেক্ষণ করেও অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এ সবের ভিত্তিতে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে,পাঁচ হাজার বছর আগে পর্যন্তও মানুষের সামাজিক জীবনে সম্পদের জন্য প্রতিযােগিতা, বৈষম্য ও নিপীড়ন মূল বৈশিষ্ট্য ছিল না। মানব জাতির ইতিহাসে এই বৈশিষ্ট্যগুলির আবির্ভাব এখন থেকে গত কয়েক হাজার বছরের মধ্যে এবং এ গুলাের কারণ মানব প্রকৃতিতে অন্তর্নিহিত নয়। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য মানুষের সামাজিক বিবর্তন হয়ে এই বৈশিষ্ট্যগুলি প্রাধান্য পেয়েছে। রাষ্ট্রের উৎপত্তি হওয়ার আগে সামাজিক বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ছােট ছােট পারিবারিক গােষ্ঠীতে বাস করে এসেছে। এই গােষ্ঠীগুলির অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য ছিল জমি এবং সম্পদের যৌথ মালিকানা, খাদ্য বন্টনে সমতা, সমঅধিকারের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক।

মানুষ বাস করত ৩০ থেকে ৪০ জনের গােষ্ঠীতে। মাঝে মাঝে কয়েকটি গােষ্ঠী মিলিত হত স্বল্পকালের জন্য। বর্তমান সময়ে উন্নত বা অনুন্নত বিশ্বে খেটে খাওয়া মানুষদের জীবনের চাইতে তাদের জীবন কঠিনতর ছিল না। গােষ্ঠীতে কোন শাসকও ছিল না, শ্রেণীবিভাগও থাকত না। কঙ্গোর বুতি পিগমীদের সম্মন্ধে টার্নবুল বলেন,“তাদের কোন গােষ্ঠীপ্রধান বা আনুষ্ঠানিক পরিষদ ছিল না। শৃংখলা রক্ষা ছিল সবার যৌথ দায়িত্ব। জীবন যাত্রার কোন কোন বিষয়ে এক একজনের নেতৃত্ব থাকত, কিন্তু সেটা তাদের সেই ব্যাপারে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার জন্য। জীবন ধারণের উপাদান সবাই সহযােগিতা করে সংগ্রহ করত”। ফ্রিডল তার গবেষণার পর বলেন,“পুরুষ ও নারী সারাদিন কি কাজ করবে বা কিভাবে কাটাবে সেটা বাধ্যবাধকতা ছাড়া নির্ধারণ করত”। আরেকজন গবেষক লীকক বলেন,“ব্যক্তিগত কোন ভূসম্পত্তি ছিল না। শ্রমের

বিভক্তি শুধু এটুকুই ছিল পুরুষ ও মহিলাদের উপযােগী কাজের বিভাজন। গােষ্ঠীর মধ্যে কাজের বিভাজন হত ঐক্যমতের ভিত্তিতে। একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল উদারতার, স্বার্থপরতার নয়। সবাই পারস্পরিক সহযােগিতার ভিত্তিতেই জীবনযাত্রা চালাত”। কেউ খাবার যােগাড় করে আনলে অন্যদের না দিয়ে নিজে খেত না। লী আফ্রিকার কালাহারিতে কুং গােষ্ঠীর (যারা বুশম্যান নামেও পরিচিত) মধ্যেও একই বিশেষত্ব পেয়েছেন। যতগুলাে মহাদেশে যতগুলাে পরিবেশে শিকারী সংগ্রাহকদের সমাজ ব্যবস্থা দেখা গেছে সবগুলিতেই দেখা গেছে পারস্পরিক সহযােগিতাই সমাজের মূলনীতি। যুদ্ধ বিগ্রহ কখনােই প্রাধান্য পায়নি।

পারস্পরিক সহযােগিতার এই প্রাধান্য বাস্তব প্রয়ােজনেই গড়ে উঠেছিল। শিকারী সংগ্রাহকরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল ছিল। সগ্রাহকরা ফলমূল সংগ্রহ করে খাবার এর মূল অংশ যােগান দিত। এটাই ছিল প্রতিদিনের খাদ্যের প্রধান উৎস। শিকারীরা মাঝে মাঝে প্রাণীর মাংস এনে এই খাদ্যে বৈচিত্র্য আনত ও সমৃদ্ধ করত। শিকার করা একজনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অনেকে মিলে করতে হত। সহযােগিতা ছাড়া এই গােষ্ঠীগুলাের টিকে থাকা সম্ভব হত না। নারীদের উপর পুরুষদের প্রাধান্যও ছিল না। কাজের বিভাজন ছিল ঠিকই। মেয়েরা সংগ্রাহক ছিল আর পুরুষরা ছিল শিকারী। এর কারণ মেয়েদের পক্ষে গর্ভধারণ করা ও শিশুপালন করার প্রয়ােজনে শিকার করার সঙ্গে যে বিপদের ঝুঁকি থাকে তা নিতে দেওয়া হত না। তাতে সমস্ত গােষ্ঠীর অস্তিত্ব হয়ে উঠত অনিশ্চিত। তবে গােষ্ঠীর সমস্ত সিদ্ধান্ত নারী পুরুষ মিলে সমবেত ভাবে নেয়া হত। যে ধারণা কেউ কেউ দেন যে “পুরুষ প্রাধান্য মানব সমাজে সহজাত”-তা সম্পূর্ণই ভুল।

প্রাচীন সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্থান ছিল না। প্রায়ই একটি অঞ্চলের ফলমূল ও শিকার কমে গেলে পুরাে গােষ্ঠীকে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে হত। একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকতে না পারার জন্য বহন করার মত সামান্য কিছু ব্যক্তিগত জিনিষ ছাড়া আর কিছু সংগ্রহ করা সম্ভব হত না। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণাই গড়ে উঠেনি।

আমাদের প্রজাতির মানুষের ইতিহাস প্রায় দেড় লক্ষ বৎসরের। মাত্র দশ হাজার বৎসর আগে পর্যন্তও সংগ্রাহক-শিকারীর গােষ্ঠীগত জীবন ধারার যে চিত্র বৈজ্ঞানিকরা গবেষণা করে নির্ধারণ করেছেন সেটাই ছিল মানুষের জীবন। স্থান ও পরিবেশ অনুযায়ী কিছু পার্থক্য থাকলেও মানব জাতির সামগ্রিক চরিত্র ছিল এরকমই।

নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লব প্রায় ১০ হাজার বছর আগে মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন ঘটে। মানব প্রজাতির অস্তিত্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ধরে (এক লক্ষ বছরেরও উপর) ছােট ছােট গােষ্ঠীর সমন্বয়ে মানুষ যেভাবে খাদ্য আহরণ, রীতি-নীতি, ও সামাজিক সম্পর্ক অনুসরণ করে আসছিল প্রথমবারের মত তার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। শত শত বৎসর লেগেছিল এই পরিবর্তন হতে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে এটা হয়। কিন্তু জীবন ধারার পরিবর্তন এর ফলে এতই ব্যাপক হয় যে এই পরিবর্তনকে অনেকে “বিপ্লব” বলে অভিহিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের Fertile Crescent বা উর্বর অর্ধচন্দ্রাকৃতি স্থানে এটা প্রথম হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই স্থানটিতে বর্তমান প্যালেস্টাইন, লেবানন, দক্ষিণ তুরস্ক, উত্তর সিরিয়া ও ইরাকের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ অন্তর্ভূক্ত ছিল। এই স্থানে সেই সময় অনুকূল জলবায়ুর কারণে প্রচুর ফলমূল ও শিকার পাওয়া যেত। ফলে সংগ্রাহক এবং শিকারী গােষ্ঠীরা একই স্থানে থেকে প্রয়ােজনীয় খাদ্য পেত। তাই একটি জনগােষ্ঠী কিছুদিন পরিশ্রম করেই সারা বছরের প্রয়ােজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করতে পারত এবং এটা অনেক বছর ধরেই পারত। অন্যান্য সংগ্রাহক-শিকারী | গােষ্ঠীর মত তাদের খাদ্যের সন্ধানে কিছু সময় পর পর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে যেতে হত না। ফলে তারা ধীরে ধীরে স্থায়ী বাসস্থান তৈরী করল। খাদ্য সংগ্রহ করে মাটি বা পাথরের পাত্রে জমা করে রাখা শুরু করল ও পাথরের যন্ত্রপাতির উন্নতি করতে থাকল। জনসংখ্যার দিক থেকে এক এক স্থানে আগের ৩০-৪০ জনের বদলে তখন কয়েক শত মানুষ এক স্থানে বসবাস করা শুরু করল।

একসময় এই স্থানের জলবায়ু বদলাতে থাকে এবং আরও শুষ্ক ও ঠান্ডা হয়। ফলমূল ও শিকার কমে যায় এবং এইসব সংগ্রাহক ও শিকারী, কিন্তু স্থায়ীভাবে বসবাসকারী এই সব জনগােষ্ঠীর খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তাদের সামনে দুটি পথ খােলা ছিল। একটি ছিল আবার আগের মত খাদ্যের সন্ধানে কিছুদিন পর পর একস্থান থেকে আরেক স্থানে চলতে থাকা।

কিন্তু শত শত বৎসর একই স্থানে থাকার ফলে তারা তাদের এই জীবন যাত্রার কৌশল ভুলে গেছিল। দ্বিতীয় পথটি ছিল একই স্থানে থেকে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানাে। বাস্তব প্রয়ােজন থেকে তারা দ্বিতীয় পথের চেষ্টা শুরু করেছিল।

এইসব জনগােষ্ঠীর মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে বনে পাওয়া ফলমূল সংগ্রহ করতে থাকায় গাছপালা সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে গেছিল। তখন তারা এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এমন সব গাছ-গাছড়া নিজেরা লাগানাে শুরু করল যেগুলাে তারা জানতাে ভাল পরিমাণে খাবার দেবে। সময়ের সাথে সাথে তারা আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করল যে রােপন করলে কোন ধরনের বীজ থেকে ভাল ফলন পাওয়া যায় এবং সেগুলাে তারা পরবর্তীতে ব্যবহার করতে থাকলাে। এই ভাবে এই | গােষ্ঠীগুলাে ফলমূল সংগ্রাহক থেকে উৎপাদকে পরিণত হয়। কৃষিজাত ফসল নিয়মিতভাবে পাবার ফলে তারা ভেড়া, ছাগল, গরু, গাধা এই সব জন্তুদের মধ্যে যেগুলাে অপেক্ষাকৃত ভাবে অনুগত সেগুলােকে আটকে রেখে পালন করা শুরু করল । এভাবে পশুপালন শুরু হল। প্রথমদিকে কৃষি কাজ হত জঙ্গলের গাছ কেটে ফেলে যে টুকু অবশিষ্ট থাকত তা পুড়িয়ে ফেলা। হত, তারপর ফসল বােনা হত। বছর কয়েক পর জমির উর্বরতা কমে গেলে এই জমি ছেড়ে দিয়ে নতুন জঙ্গল পরিষ্কার করা হত। খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতি বদলে যাবার ফলে জীবনধারাও বদলে গেল। মানুষকে তার ফসলের যত্ন নেওয়ার জন্য জমির কাছাকাছি বাস করতে হত। জমিতে ফসল বােনা, আগাছা পরিষ্কার, পানি দেওয়া, ফসল তােলা, ফসল জমা রাখা, ভাগ-বাটোয়ারা করা, শিশুদের দেখাশােনা করা এসব কাজ একজন করতে পারত না, একে অপরকে সাহায্য করতে হত। এই নতুন জীবনযাত্রা থেকে নতুন আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি ও গল্পগাঁথা চালু হলাে। এটাকেই নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লব’ বলা হয়েছে।

নব্যপ্রস্তর যুগের পরিবর্তন শুরু হওয়ার হাজার হাজার বছর পরেও শাসক বা কোন শাসনকর্তা দেখা যায়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগেও “সম্পদের বন্টনে সমতার অভাব ছিল না এবং সমাজে শ্রেণীবিভাগ তেমন অগ্রসর হয়নি।” পুরুষদের প্রাধান্যও তখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমাজ বিবর্তনের এই স্তরে বিগত শতাব্দীতে যে সব জনগােষ্ঠী পৃথিবীতে পাওয়া গেছে ও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে বিভিন্নতা থাকলেও এই সব বৈশিষ্ট্য সব গােষ্ঠীরই ছিল। প্রতিটি গৃহ সম্পূর্ণ সমাজের অংশ ছিল। সমাজে প্রত্যেকেই নিজের দায়িত্ব ও অধিকার সম্মন্ধে সচেতন ছিল এবং পালন করত। যাদের খাদ্য কম থাকত যে গৃহে বেশী থাকত তারা দিত। সম্মান বেশি ছিল যাদের কম তাদের সাহায্য করায়, নিজে ভােগ করায় নয়।”

নব্যপ্রস্তর যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেড়ে যায়। সগ্রাহক-শিকারী সমাজে প্রায় সময়ই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার প্রয়ােজন হত। শিশুদের বহন করে নিতে হত, তাই বহন করতে হয় এরকম একজনের বেশি শিশু একই সময়ে পালন করা সম্ভব ছিল না। তিন-চার বছর পর পর শিশু জন্মই ছিল নিয়ম। গর্ভপাত বা শিশু হত্যার দ্বারা হলেও শিশুর সংখ্যা কম রাখা হত। স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু হলে বেশি ছেলে-মেয়ে পালন করা সম্ভব হত এবং প্রয়ােজনও দেখা দিল। বেশি মানুষ জঙ্গল কাটা, কৃষিকাজ ও উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করত। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়তে থাকল। এই হার খুব বেশি না হলেও (০.১ শতাংশ প্রতি বছর) বহু সহস্র বছর ধরে এই বৃদ্ধি মানুষের ইতিহাসে উল্লেখযােগ্য। নব্যপ্রস্তর যুগের শুরুতে পৃথিবীর মােট অনুমিত জনসংখ্যা এক কোটি থেকে বেড়ে পুঁজিবাদের শুরুর সময় ২০ কোটিতে পৌঁছায়।

আরও একটি বিরাট পরিবর্তন হয় নব্যপ্রস্তর যুগে। সংগ্রাহক-শিকারী সমাজে গােষ্ঠীর ব্যক্তিদের মধ্যে বিদ্বেষ দেখা দিলে পৃথক মতাবলম্বী দল ছেড়ে চলে যেত। অনেকে জড়িত থাকলে দল দুই ভাগ হয়ে আলাদাভাবে জীবনযাত্রা শুরু করত। একই স্থানে বসবাসকারী নব্যপ্রস্তর যুগে কৃষিকাজে নিয়ােজিত মানুষদের মধ্যে বিরােধী পক্ষের কৃষি জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না। বসতির আকার হল বড়, মানুষের সংখ্যাও হল বেশি, কাজের পরিধি ও প্রকৃতিও আগের চাইতে জটিল হল। কর্মকান্ড চালানাের জন্য সদস্যদের মধ্যে যােগাযােগ ও মতবিনিময় আরও দরকার হয়ে উঠল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও পদ্ধতি তৈরী হল। বয়ােজ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পরিষদ সৃষ্টি হল। আরও একটা বিরাট পরিবর্তন হল। কৃষিভিত্তিক সমাজে শস্য মজুত থাকত। এতে আক্রমণ করে অন্যান্য গােষ্ঠীর শস্য লুট করার ঘটনা ঘটতে থাকল। যুদ্ধ বিগ্রহ সংগ্রাহক-শিকারী সমাজে ছিল বিরল-তা এখন প্রায়ই হতে থাকল। দলগত সংগঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের এ কারণেও প্রয়ােজন হয়ে পড়ল।

পরবর্তী কয়েক হাজার বছরে পৃথিবীর কয়েকটি জায়গায় পৃথকভাবে মানব গােষ্ঠী শিকারী সংগ্রাহক ব্যবস্থা থেকে কৃষি ভিত্তিক সমাজে পরিবর্তিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে মধ্য আমেরিকা (বর্তমান মেক্সিকো ও গুয়াতেমালা), দক্ষিণ আমেরিকার এন্ডিজ পর্বতাঞ্চল, আফ্রিকার কয়েকটি স্থানে, ইন্দোচীনে ও পাপুয়া-নিউগিনিতে। এই সমাজগুলাে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে প্রাচীন কালের সমাজ ব্যবস্থা যে ভাবে পরিবর্তন হয়েছিল এগুলাের পরিবর্তন একই ভাবে হয়েছে। তবে বিভিন্ন স্থানে পৃথক ধরণের গাছপালা ও প্রাণী থাকার কারণে পরিবর্তনের ধারায় কিছুটা বিভিন্নতা দেখা যায়। এ থেকে বলা যায় যে, কোন বিশেষ জনগােষ্ঠীর এমন কোন বিশেষ প্রতিভা বা শ্রেষ্ঠত্ব ছিলনা যার দ্বারা তারা মানবগােষ্ঠীর পথপ্রদর্শক হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন স্থানে মানবগােষ্ঠী পরিবেশ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানাের জন্য একই ধরনের বিবর্তনের পথে অগ্রসর হয়েছে। ছােট ছােট ভ্রাম্যমান গােষ্ঠীগুলাে ধীরে ধীরে একই স্থানে স্থায়ী ভাবে বসবাসকারী বড় জনগােষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই স্থায়ী জনগােষ্ঠীসমূহ ছিল আরও দৃঢ় স্তরে সংগঠিত, তাদের আচরণ বিধি ছিল আরও নিয়ন্ত্রিত এবং তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সমূহ ও কাহিনী সমূহ ছিল আরও বিশদ।

কোন কোন স্থানে জলবায়ুর প্রতিকূলতা, উপযুক্ত গাছপালা ও প্রাণীর অভাব এইসব কারণে কোন কোন গােষ্ঠী কৃষিকাজ শুরু করতে পারেনি। তারা শিকারী সংগ্রাহকই রয়ে গেল।১২ তারা হাজার হাজার বছর ধরে এইভাবে জীবনযাপন করতে থাকে। কোন কোন গােষ্ঠী পরবর্তীতে অন্যান্য গােষ্ঠীর সংস্পর্শে এসে ক্রমে কৃষি সমাজে রূপান্তরিত হয়। যেসব গােষ্ঠী কৃষি কাজ শুরু করেনি তারাও কৃষি সমাজের সংস্পর্শে ক্রমে পরিবর্তিত হয়। কোন কোন গােষ্ঠী শুধু পশুপালনই জীবনধারনের উপাদান হিসাবে গ্রহণ করে। ব্যবহারিক জিনিসপত্রের আদান-প্রদান পারস্পরিক কাজে লাগে। জন্তু-জানােয়ার থেকে উৎপাদিত পণ্য (যেমন-চামড়া), মাছ এগুলাের বদলে খাদ্যশস্য, কাপড় পশুপালক গােষ্ঠী কৃষিজীবীদের সঙ্গে বিনিময় করত। কখনও কখনও পশুপালক গােষ্ঠীরা সুযােগ পেলে কৃষি ভিত্তিক জনপদে আক্রমণ করে লুটপাটও করত।

কৃষিভিত্তিক জনপদ ও পশুপালক-এই দুই গােষ্ঠীতেই এক একজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত এবং অন্যদের চাইতে অধিক সম্মান পেত। কখনও কখনও এই সমস্ত ব্যক্তি গােষ্ঠীর প্রধান হিসেবে গণ্য হত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে গােষ্ঠী প্রধান বংশানুক্রমে হত। কিন্তু অন্যদের শ্রমের ফল গােষ্ঠীপ্রধান ভােগ করেছে এ রকম এই সমাজগুলিতে দেখা যায়নি। যারা প্রধান হিসেবে গণ্য হত ও সম্মান বেশি পেত, তারা বরং সমাজের জন্য অন্যদের চাইতে বেশি কাজ করত। দূর্বলদের সাহায্য করা ও নিজের উৎপাদন থেকে যাদের কম থাকত তাদের সাহায্য করাই ছিল এই সমাজ ব্যবস্থাগুলাের বৈশিষ্ট্য। রিচার্ড লী এ সম্পর্কে বলেন, “গােষ্ঠী প্রধান অন্যদের কাছ থেকে যা পেতেন তার বেশির ভাগই অন্যদের মধ্যে বিতরণ করতেন। গােষ্ঠী প্রধানের ক্ষমতা সমাজের সংগঠন ও জনমত দিয়ে সীমিত থাকত” । যেসব কৃষি ভিত্তিক সমাজ পরবর্তী কালেও টিকে ছিল ও পর্যবেক্ষণ করা গেছে তাতে এর স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে। দক্ষিণ আমেরিকার “নাম্বিকাওরা”দের সম্বন্ধে বলা হয়েছে, নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল দানশীলতা। গােষ্ঠী প্রধান সব সময় প্রস্তুত থাকত তার উদ্বৃত্ত খাবার, কাজ করার হাতিয়ার, অলঙ্কার ইত্যাদি গােষ্ঠীর কোন একজন বা একটি পরিবারের প্রয়ােজন হলে তা দিয়ে দেওয়ার জন্য। তাতে এমনও হত যে গােষ্ঠী প্রধানকেই বেশি কষ্ট করতে হত। নিউগিনির ‘বুসামা’ জনগােষ্ঠীর নেতাকে অন্যদের চাইতে বেশি কাজ করতে হত সবার চাহিদা পূরণ করার জন্য।

নব্যপ্রস্তর যুগে মানুষের পরিবর্তন হল। মানুষ কৃষি কাজ শুরু করল এবং স্থায়ী আবাসন গড়ে তুলল। এক গােষ্ঠীর সঙ্গে আরেক গােষ্ঠীর যুদ্ধ শুরু হল। কিন্তু পরবর্তী সমাজগুলাের কতকগুলাে বিশেষত্ব তখনও দেখা দেয়নি, যেমন সমাজে শ্রেণীবিভাগ,একটি স্থায়ী রাষ্ট্রযন্ত্র যা পরিচালনা করে আমলারা, অস্ত্রবাহী বাহিনী ও মেয়েদের অধীনস্ত করা। এগুলাে। এসেছে আরাে পরে যখন নব্য প্রস্তর যুগের বিপ্লবের সঙ্গে যােগ হল নগরায়নের বিপ্লব।

সভ্যতার শুরু (The First Civilization)

নগর সভ্যতার ইতিহাস মাত্র ৫ হাজার বছরের। এগুলাের চিহ্ন পাওয়া যায় মিশর ও মধ্য আমেরিকার পিরামিডে, মহেনঞ্জোদারাে ও হরপ্পার সাজানাে শহর গুলিতে, ইরাকের “সিগুরাট” গুলিতে, ক্রিট দ্বীপের নেসােসের প্রাসাদে। নগর সভ্যতা যারা শুরু করল তারা মাত্র কয়েক পুরুষ আগে সাধারণ কৃষিকাজ ছাড়া আর কিছু জানত না। অথচ যখন তারা নগর তৈরী করা শুরু করল, বড় বড় পাথর চাক কেটে তা নগর পর্যন্ত নিয়ে আসা, ইমারত তৈরীর জন্য পাথর প্রস্তুত করা এবং অনেক জায়গায় পাথর খােদাই করে সুন্দর নকশা বানানাে, এগুলাের দক্ষতা তারা অর্জন করেছিল। মেসােপটেমিয়া, মিশর, চীন, ইথিওপিয়া ও মধ্য আমেরিকায় তারা অক্ষর আবিষ্কার করে পাথরে মনের ভাব লিখেছিল। এই সময়ে এশিয়া, ইউরােপ ও আফ্রিকার মানুষ টিন ও তামা সংগ্রহ করতে শিখল। এরপর এই দুই ধাতু মিশিয়ে ব্রোঞ্জ নামে একটি ধাতু তৈরী করল-যা তুলনামূলকভাবে শক্ত ছিল। ব্রোঞ্জ দিয়ে হাতিয়ার ও অলংকার তৈরী হত। এই যুগকে সেজন্য তাম্রযুগ ও ‘ব্রোঞ্জযুগ বলা হয়।

জীবন যাত্রার প্রয়ােজনেই এই আবিষ্কারগুলাে হয়। আদিম কৃষি ছিল প্রকৃতিতে পাওয়া শস্য খুবই সাধারণ কৃষি-হাতিয়ার দিয়ে উৎপাদন করা। উৎপাদন হত কম। জনসংখ্যাও বাড়ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল কম হলে দুর্ভিক্ষ হত।১৫ খাদ্যাভাব হলে অন্য এলাকার জনগােষ্ঠীর সঞ্চিত খাদ্য লুট করার জন্য হামলা করা হত। এভাবে যুদ্ধ বিগ্রহ বাড়তে থাকল। যুদ্ধের প্রয়ােজনে উন্নত ধরনের অস্ত্রের প্রয়ােজন দেখা দিল। পাথরের তৈরী ছুরি ও কুঠার এর উন্নতি হল। আবার অন্যদিকে খাদ্যাভাব এড়ানাের জন্য উৎপাদন বাড়ানাের ব্যবস্থাও চলতে লাগল। যেসব জনগােষ্ঠী উৎপাদন বাড়াতে পারল তারাই টিকে থাকল।

কৃষি পদ্ধতির উন্নয়ন নানা ভাবে করা হল। শস্যের জাত উন্নয়ন করা ও গৃহপালিত প্রাণীর জাত উন্নয়ন করা আগেই শুরু হয়েছিল। এরপর আসল পালিত পশু (প্রথম দিকে ষাঁড়) জমি চাষ দেওয়ায় ব্যবহার করা-যা আগে মানুষ পাথরের কোদাল দিয়ে করত। ছােট ছােট বাঁধ দিয়ে জমিকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করা এবং শুষ্ক জায়গায় দেওয়ার জন্য পানি জমিয়ে রাখাও মানুষ শিখে নিল। জমিতে সার হিসেবে জন্তুর গােবর ব্যবহার শুরু হল। আস্তে আস্তে আরও জটিল পদ্ধতিও চালু করা হল। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের গাছ কেটে কেটে স্তরে স্তরে চত্বর (terrace) বানিয়ে তাতে চাষ করা, পানির জন্য কূপ খনন করা, জলাভূমির পানি সেঁচে চাষযােগ্য করা ইত্যাদি।

নতুন পদ্ধতিগুলাের ফলে সমাজের কাজকর্মের ধারা বদলাতে লাগল। জমি চাষ দেওয়ার মত ভারী শারীরিক পরিশ্রম পুরুষদেরই উপযুক্ত হওয়ায় নারীরা এ কাজ থেকে বাদ পড়ল। বাঁধ তৈরী, জমি সেচ দেওয়া এগুলােতে অনেক মানুষ লাগত ও পরিকল্পনারও প্রয়ােজন হত। পরিকল্পনা ও পরিচালনা করার জন্য কিছু মানুষ নিয়ােজিত হল তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানাের জন্য। খাদ্য জমা রাখার ব্যবস্থা করা হল। মজুত খাদ্যের দেখাশােনা, হিসাব রাখা ও বিতরণের জন্য কিছু মানুষ প্রয়ােজন হল। খাদ্য উৎপাদন বাড়ার ফলে কিছু খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকতে লাগল। এতে মানুষের ইতিহাসে এই প্রথম কিছু মানুষের পক্ষে কৃষিকাজ না করে যুদ্ধের প্রস্তুতি, হস্তশিল্প ও অন্যান্য জনপদের সঙ্গে জিনিসের আদান-প্রদান, এই ধরনের পেশায় নিয়ােজিত থাকা সম্ভব হল।

উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য জমা রাখার জন্য উঁচু জায়গায় একটা বড় ঘরের ব্যবস্থা করা হত। সমাজের স্থিতি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে দাঁড়াল এই শস্যের ঘর। এই শস্যের ঘর দেখাশােনা, শস্যের হিসাব রাখা ও বিতরণের কাজ যারা করতেন তারা হয়ে দাঁড়ালেন বিশেষ সম্মানের পাত্র। ক্রমে ক্রমে তারা আলৌকিক শক্তির অধিকারী বলে মানুষ মনে করতে লাগল। এভাবে শস্য গুদামগুলােই আদিম যুগের প্রথম মন্দির ও এর রক্ষকরা প্রথম পুরােহিত হলেন। সময়ের সাথে সাথে এই শস্যগুদামকে ঘিরেই বিভিন্ন কর্মকান্ড শুরু হল। খাদ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা, খাদ্যের বদলে অন্যান্য জিনিষের আদান-প্রদান এই ঘরকে ঘিরেই শুরু হল। হস্তশিল্পীরাও এখানেই তাদের কাজের জায়গা করে নিল। শত শত বৎসর ধরে এই ভাবেই গড়ে উঠল গ্রাম থেকে শহর। মেসােপটেমিয়া, মিশর, চীন, ইত্যাদি অঞ্চল যেখানে প্রথম এই প্রক্রিয়া শুরু হয় তার প্রায় আড়াই হাজার বছর পর মধ্য আমেরিকায় ঠিক একই প্রক্রিয়া ঘটে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।১৭

আরও একটা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন এই সময় হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য আমেরিকা দুই অঞ্চলেই এটা ঘটে। যারা শস্য রক্ষণাবেক্ষণ ও বিতরণের কাজে নিয়ােজিত থাকত এবং যারা সময়ের সাথে সাথে পুরােহিতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হলেন, তারা শস্যের হিসাব রাখার জন্য পাথরের গায়ে দাগ কেটে রাখা শুরু করলেন। বহু বছর ধরে চলতে চলতে এই দাগগুলাে বিশেষ শস্য বা বিশেষ মাপের সূচক হিসাবে একটা বড় অঞ্চলে স্বীকৃত হল এবং প্রমিত বলে ধরে নেওয়া হল। কোন শস্য বা একটি বিশেষ মাপ যে শব্দ দ্বারা পরিচিত ছিল দাগ বা চিহ্নগুলাে সেই শব্দের পরিচায়ক হয়ে গেল। এইভাবে শুরু হল লিখা। পুরােহিতদের হাতে ছিল সময়। তারা চাঁদ-তারাদের পর্যবেক্ষণ করে এগুলাের গতি সম্বন্ধে আগেই বলতেন

এতে মানুষের মধ্যে তাদের ক্ষমতা সম্বন্ধে ধারণা বাড়ত। তারা বর্ষপঞ্জিও তৈরী করত ও ফসল বােনার সঠিক সময় ঠিক করে দিতে পারত। এর থেকেই শুরু হল জ্যোতির্বিদ্যা ও অঙ্কশাস্ত্র, এবং এটা সম্ভব হল উদ্বৃত্ত খাদ্য থাকার কারণে।।

মেসােপটেমিয়া ও মধ্য-আমেরিকায় হস্তলিপি আবিষ্কার ও ব্যবহার শুরু হওয়ার পর যে সমস্ত জনগােষ্ঠী এদের সংস্পর্শে আসল, তারা এটা গ্রহণ করে তাদের নিজেদের চিহ্ন দিয়ে ব্যবহার করা শুরু করল। এইভাবে ৫০০০ বছর আগে লিখিত ভাষার ব্যবহার মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমস্ত এশিয়া, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় ইউরােপে ছড়িয়ে পড়ল।

শিকারী সংগ্রাহক সমাজ থেকে কৃষি ভিত্তিক সমাজে পরিবর্তন সম্পূর্ণ আলাদাভাবে পৃথিবীর কয়েকটি স্থানে ঘটে। কোন একটি বিশেষ জনগােষ্ঠী বা স্থান এর দাবীদার এটা ঠিক নয়। সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রয়ােজনের কারণে মানুষ কয়েকটি স্থানেই এই উন্নয়ন ঘটায়। সমাজে শ্রেণী বিভাগের উৎপত্তি

মানব সমাজের যাত্রা শুরু থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে পর্যন্ত কাজে বিভক্তি থাকলেও সমাজ শ্রেণী বিভক্ত ছিল না। অর্থাৎ কোন এক শ্রেণীর মানুষ আরেক শ্রেণীর উপর কর্তৃত্ব করত না বা তাদের শ্রমলব্ধ ফল নিজেরা নিয়ে নিত না। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগের উত্তীর্ণ লিপি সংবলিত ফলকে প্রথম নারী দাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। তার কিছু কাল পরে পুরুষ দাসের চিহ্ন পাওয়া যায়। এরপর থেকেই “পূর্ণ নাগরিক” ও “অধস্তন মানুষ” এই বিভাজনের সমার্থক পরিভাষা দেখা যায়। শ্রেণী বিভাগের পরিষ্কার প্রমাণ এই সময়কালেই পাওয়া গেছে। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের এশনুনা (Eshnunna) নামক স্থানে প্রত্নতত্ত্ববিদরা পেয়েছেন প্রধান রাস্তার সাথে বড় বাড়ী গুলাে প্রায়ই ২০০ বর্গমিটার বা তারও বেশি এলাকা জুড়ে। কিন্তু বেশিরভাগ বাড়ীর এলাকা ছিল অনেক ছােট-৫০ বর্গ মিটারের বেশি নয়।

সভ্যতার শুরু মানুষের ইতিহাসের একটা বড় ধাপ বলে মনে করা হয়। কিন্তু যে সমস্ত স্থানে সমাজ পরিবর্তন হয়েছিল সেই সমস্ত স্থানে কতকগুলি নেতিবাচক দিক দেখা যায়। এগুলি হল, সমাজে শােষণভিত্তিক শ্রেণীবিভাগের উৎপত্তি। এক শ্রেণীর মানুষের শ্রমের ফল ভােগ করে আরেক শ্রেণীর মানুষ এভাবেই দাস প্রথার শুরু করল। আরও দেখা গেল সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্ৰেণীর শাসন সমাজে চাপিয়ে দেয়ার জন্য অস্ত্রধারী বাহিনী তৈরী এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য উপাদানের উৎপত্তি। এই পরিবর্তন মেসােপটেমিয়া ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে দেখা গেছে।

মেসােপটেমিয়ার সভ্যতায় দাস-দাসীদের শ্রমের ফল দাস মালিকেরা আত্মসাৎ তাে করতই-কিন্তু এর চাইতে বেশি লাভজনক ছিল অধীনস্ত শ্রেণীর কৃষকদের বিনাপারিশ্রমিকে অথবা খুব কমপারিশ্রমিকে খাটান। এদের উচ্চ শ্রেণীর মানুষের জমিতে অথবা পুরােহিতদের জমিতে চাষের কাজ, খাল কাটার কাজ এগুলি করানাে হত। বিনিময়ে বছরের চার মাস কোন রকমে প্রাণ ধারণের যােগ্য মজুরী দেওয়া হত এবং একখন্ড চাষ করার জমি দেওয়া হত। অথচ এই শ্রমজীবী শ্রেণী একসময় স্বাধীন কৃষক ছিল। অন্য শক্তিশালী গােষ্ঠী বিশেষতঃ পুরােহিতদের চাপে তারা অধস্তন কৃষকে পরিণত হয়েছিল।

শ্রেণীগত শােষণ বাড়তেই থাকল। মেসােপটেমিয়ার “লাগাশ” (Lagash) নামক স্থানে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ শতাব্দীতে বারটি বা তার কিছু বেশি উপাসনালয় বেশিরভাগ কৃষি জমির মালিক ছিল। উৎপাদন খরচ হত ফসলের অর্ধেক। চার ভাগের একভাগ ছিল রাজার খাজনা। বাকী চার ভাগের একভাগ পেত পুরােহিতরা।”

মানুষের পৃথিবীতে আবির্ভাবের পর হাজার হাজার বৎসর ধরে মানবমন্ডলীর মাঝে যে সামাজিক কাঠামাে ছিল তা অপরজনকে শােষণ করার সুযােগ দেয় নাই। এই সময় কেন শােষণ প্রক্রিয়া শুরু হল? কেনই বা শােষিত মানুষ এটা মেনে নিল? মানব সভ্যতার হাজার হাজার বৎসরের যে ইতিহাস পাওয়া গেছে তা থেকে নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, এই আচরণ মানব প্রকৃতিতে আপনা-আপনি আসে নাই।২১

মানুষ শুরু থেকেই জীবন-যাত্রার প্রয়ােজনীয় জিনিষ তৈরী করে আসছে এবং সর্বকালেই নতুন ও উন্নত পদ্ধতিতে তা করার চেষ্টা করেছে। পদ্ধতি পরিবর্তন হলে সমাজে একজনের সঙ্গে আরেকজনের সম্পর্কও বদলাতে থাকে। পরিবর্তনের এক পর্যায়ে সবাইকে এই নতুন পদ্ধতি মেনে নিতে হয়। জীবনযাত্রার পদ্ধতির পরিবর্তনের এক পর্যায়ে শ্রেণী বিভাগ তৈরি হয়।

পরিবর্তনের এই পর্যায়ে, অর্থাৎ কৃষি উৎপাদনে এসে একটি মানবগােষ্ঠী যা উৎপাদন করত তার এক অংশ উদ্বৃত্ত থাকত। প্রয়ােজন দেখা দিল উৎপাদনের কাজগুলাে সমন্বয় করার ও উদ্বৃত্ত জিনিষ জমা রাখা, কিভাবে খরচ করা হবে তা ঠিক করা ও হিসাব রাখা। এই প্রয়ােজনে কিছু মানুষ প্রত্যক্ষ উৎপাদনে অংশ না নিয়ে এই কাজগুলাে করতে শুরু করল। কিন্তু উৎপাদন তখনও এত বাড়ে নাই যে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত থাকত। অনাবৃষ্টি, শস্যে পােকা লাগা এসব কারণে খাদ্য সংকট প্রায়ই সৃষ্টি হত। ক্ষুধার্ত মানুষ উদ্বৃত্ত খেয়ে ফেলতে চাইত। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য উদ্বৃত্ত রাখতে হত। যারা সংগ্রহশালা রক্ষণাবেক্ষন করত তাদেরকে উদ্বৃত্ত রাখার জন্য জোর প্রয়ােগ করতে হত। ক্ষুধার্ত মানুষকে দিয়ে কাজ করাতেও হত। এইভাবে এই শ্রেণীর মানুষ সমাজের অন্যান্য মানুষের উপর কর্তৃত্ব খাটানাের সুযােগ পেল। সমাজের সামগ্রিক প্রয়ােজনে তারা অন্যান্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করল। কৃষিকাজ যতই বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে লাগল, ততই নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা বাড়তে থাকল। কৃষির প্রক্রিয়া পরিবর্তন যেমন, সেচের পানি বন্টন, জঙ্গল কেটে নতুন কৃষি জমির পত্তন ইত্যাদির জন্য আরও সংগঠন ও নেতৃত্ব প্রয়ােজন হত, যা এই নিয়ন্ত্রকেরা দিত। এইভাবে একে একে এই শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা বাড়ল। যুদ্ধবিগ্রহের ফলে এই শ্রেণীর হাতে লুটপাটের সম্পদও সঞ্চিত হত। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। মানব সমাজ ক্রমেই প্রকৃতির উপর তার নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। কিন্তু এর ফলে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ যারা সংখ্যায় কম, তারা সমাজের বাকী অংশের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেছে। ক্রমে এই নিয়ন্ত্রণ সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য প্রয়ােজনীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে অন্য শ্ৰেণীকে শােষণের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তবে এই শ্রেণী বিভক্ত সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়ােজন হল শক্তির। ক্ষুদ্র এই শ্রেণী সমাজের বাকী অংশকে শােষণ ও শাসন করার জন্য ক্রমে গড়ে তুলল রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার সঙ্গে অস্ত্রবাহী একদল মানুষ, যারা শাসক শ্রেণীর আজ্ঞাবহ। তারা তৈরী করল আইন কানুন যার দ্বারা অন্যান্য। শ্রেণীকে আবদ্ধ রাখা যায়।

ধর্মবিশ্বাস শ্রেণীবিভক্ত সমাজ গঠিত হওয়ার আগেও ছিল। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা অতি প্রাকৃত শক্তি নিয়ন্ত্রণ করত বলে মনে করা হত। শ্রেণী বিভাগ শুরু হওয়ার পর এই বিশ্বাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া শুরু হল। শােষক শ্ৰেণী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলল তাদের নিয়ন্ত্রণকে দৃঢ় করার জন্য। এইভাবে এক গােষ্ঠী মানুষ যাদের উৎপত্তি হল সমাজের অগ্রগতির কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য যারা তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে শাসক শ্রেণীতে রূপান্তরিত হল। তবে এই সময়েও জমির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। উৎপাদন সমষ্টিগতভাবেই করা হত। কিন্তু উৎপাদনের উদ্বৃত্ত অংশ চলে যেত মুষ্টিমেয় শাসকের হাতে। মধ্য আমেরিকায় আজটেক ও ইনকা সভ্যতায় পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত এই প্রথা চলে এসেছিল।২২ এশিয়া ও ইউরােপে কৃষিভিত্তিক সমাজ চালু হওয়ার পর ক্রমেই জমির উপর ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়যদিও এটা অনেক শতাব্দী ধরে অনেক সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহের মধ্য দিয়ে রূপ নেয়।

নারী বৈষম্য ও অবদমন (Oppressor)

সমাজের প্রকৃতির পরিবর্তন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সব জায়গায়ই নারীর সামাজিক অবস্থান বদলে যায়। তারা মানব সমাজের শুরু থেকে হাজার হাজার বছর ধরে পুরুষদের সঙ্গে সব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সমান অংশগ্রহণ করত। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে তারা ক্রমেই পুরুষের উপর নির্ভরশীল ও অধীনতার পর্যায়ে চলে আসল। এই অধীনতার রূপ বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন রকম ছিল। কিন্তু যেখানেই শ্রেণী বিভাগ দেখা দিল সেখানেই নারীর ভূমিকা হল। অধস্তনের। এটা এতই বিস্তার লাভ করল ও স্থিতিশীল হল যে, বর্তমান কালেও প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে নারীর অধস্তন ভূমিকা মানব প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটা একেবারেই সঠিক নয়। এই পরিবর্তন নিহিত ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে।২৩ সংগ্রাহক ও শিকারী সমাজে নারীদের খাদ্য সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা গর্ভধারণ, মাতৃদুগ্ধ দান ও শিশু পালনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কৃষিকাজ শুরুর প্রথম দিকেও এটা সম্ভব ছিল। কিন্তু লাঙ্গলের সাহায্যে চাষ শুরু, গরুর পাল দেখাশােনা করা এগুলাে কঠিন হয়ে পড়ল। যেসব সমাজে নারীরা পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে এসব কাজ করতে থাকল তাদের জন্মহার কমে গেল ও গােত্রের জনসংখ্যা কমতে থাকল। অন্যদিকে যে সমস্ত গােষ্ঠীতে নারীরা মূল কৃষিকাজে জড়িত হত না, তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বেশি হল। এই সমস্ত গােষ্ঠীই বিস্তার লাভ করল। উৎপাদনে মূল ভূমিকা পালন করার জন্য পুরুষরাই সমাজ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান ভূমিকা রাখা শুরু করল। ব্যবসা-বাণিজ্য ও যুদ্ধেও এই পরিবর্তন হােল। ছােট খাট স্থানীয় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারলেও দূরপাল্লার

বাণিজ্য ও যুদ্ধে মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। যেহেতু সমাজের প্রধানদের মধ্যে ব্যবসায়ী ও সেনাপতিরা ছিল প্রভাবশালী-উৎপাদনের উদ্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকল-নারীদের হাতে নয়। নারীরা যদিও সমাজের অন্যান্য কাজে কঠোর পরিশ্রম করতে থাকল-কিন্তু উৎপাদনের উদ্বৃত্তের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তাদের ভূমিকা হল অধস্তনের। এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার উৎপত্তি হল পৃথিবীর প্রায় সব স্থানেই। কিন্তু সব জায়গায় এর ধরন একরকম হল না। কোন কোন সমাজে নারীর কোন অধিকারই স্বীকার করা হত না।

সমাজে শাসক ও শােষক শ্রেণীর আবির্ভাব সমাজের বিবর্তনকে আরও প্রভাবিত করতে থাকল। শাসন বজায় রাখার জন্য দাস-দাসী, সৈন্যবাহিনী রাখার জন্য ব্যয় বাড়ল। বড় বড় উপাসনালয়, প্রাসাদ ও সমাধিস্থল তৈরী করার জন্য ব্যয় করা হতে থাকল, তাদের ক্ষমতার গৌরব দেখানাের প্রয়ােজনে, তাতেও খরচ বাড়তে থাকল। এইসব মেটান হত উৎপাদনের উদ্বৃত্ত দিয়ে, অতএব শােষণ বাড়তে থাকল। অন্য গােষ্ঠীর উপর আক্রমণ করে তাদের সঞ্চয় লুট করে নেওয়াও আকর্ষণীয় হতে থাকল। তাতে সাধারণ কৃষকদের কষ্ট আরও বেশি হল। কিন্তু শাসক শ্রেণীর যথার্থতা এতে আরাে বাড়ল-কারণ সবাই মনে করল কেন্দ্রীয় শাসক শ্রেণী প্রতিরক্ষার জন্য দরকার। কিন্তু শােষণ বাড়তে থাকায় একসময় সমাজের কাজ চলার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। এটা অত্যন্ত পরিষ্কার ভাবে দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যের সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতায় প্রথম সভ্যতার বিকাশের ১০০০ থেকে ১৫০০ বৎসর পর।

প্রথম অন্ধকার যুগ

প্রথম সভ্যতার বড় বড় নিদর্শন গুলি (যেমন পিরামিড) যারা দেখেছেন তারা এগুলির বিশালত্বে মােহিত না হয়ে পারেন

। এ ছাড়া আশ্চর্য হল সেই সময়ের পাথরের তৈরী বাড়ীগুলাে যে গুলাে, এমনভাবে তৈরী ছিল যে, সেগুলাে বৃষ্টি ও বাতাস আটকাতে পারতাে। কোন কোন বাড়ী গুলিতে পানি সরবরাহ ও পয়: নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ছিল। অথচ এই সময়কালে মানুষ পাথর ও কাঠের হাতিয়ার বেশি ব্যবহার করত। কোন কোন স্থানে তামা, পিতলের হাতিয়ার ছিল। কোন শক্ত ধাতুর হাতিয়ার তাদের ছিল না। যারা বড় বড় স্থাপনাগুলির কাছাকাছি থাকত তাদের উপর এর প্রভাব অনুমান করা যায়। গাজায় অবস্থিত পিরামিড, উরুক এর জিগুরাত ক্ষমতার নিদর্শন হিসাবে প্রতিভাত হত।

কিন্তু এইসব সমাজ একসময় সংকটে পড়ে যায়। মেসােপটেমিয় শহর রাষ্ট্রগুলিতে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। খ্রিষ্টপূর্ব ২৩০০ এর কাছাকাছি সময়ে সারবান নামে একজন এই রাষ্ট্রগুলিকে এক করে একটি বড় রাজ্য তৈরী করে, কিন্তু তার মৃত্যুর পরেই এগুলাে আবার ভেঙ্গে যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ২১৮০ থেকে ২০৪০ এর মধ্যে মিশরের প্রাচীন সাম্রাজ্য (old kingdom) আভ্যন্তরীন যুদ্ধবিগ্রহে ভেঙ্গে যায়। সিন্ধুর হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারাে প্রায় একহাজার বৎসর পর্যন্ত টিকে থাকার পর খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে পরিত্যক্ত হয়। এর ১০০ বৎসর পর ক্রিটের সভ্যতা ভেঙ্গে পড়ে এবং তারপর গ্রীসের মিসেনিয়ান সভ্যতা ভেঙ্গে যায়।

এই সভ্যতাগুলি ধ্বংস হওয়ার কারণ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। কতকগুলাে উপাদান চিহ্নিত করা হয়েছে। যেগুলাে সব সভ্যতার মধ্যে দেখা গেছে। শাসক শ্রেণী তাদের নিজেদের ভােগের জন্য সম্পদের ব্যবহার বাড়াতেই থাকে। প্রাসাদ, উপাসনালয় ও সমাধিস্থলের আকার বাড়তেই থাকে। এর জন্য প্রয়ােজনীয় সম্পদ যােগান দিত কৃষক শ্ৰেণী। মিশরের প্রধান লিপি থেকে জানা যায় প্রশাসন প্রধানত কৃষকদের সম্পদ শাসকশ্রেণীর কাছে হস্তান্তরে ব্যস্ত থাকত, আর ব্যস্ত থাকত বড় বড় নির্মাণ কাজের তদারকিতে। কৃষির উন্নতি করার কোন প্রচেষ্টা তাদের ছিল না। ২৫ মেসােপটেমিয়ার অবস্থাও ছিল একই, তবে এখানে যােগ হয়েছিল নগর রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ। ক্রমবর্ধমান হারে সাধারণ মানুষের উদ্বৃত্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের জীবনযাত্রার মান ক্রমেই কমতে থাকে এবং এক পর্যায়ে জীবনধারণের জন্য যা দরকার তার চাইতেও কমে যায়। যদিও উপাসনালয় ও প্রাসাদ তৈরীতে নিযুক্ত কারিগররা নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন ও উন্নত হাতিয়ার ব্যবহার করত কিন্তু সাধারণ কৃষকেরা নতুন হাতিয়ার সংগ্রহ করতে পারত না। এমনকি সিন্ধু সভ্যতায় শহরগুলিতে বেশিরভাগই পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার হত।

ক্রমেই বাড়তে থাকা শােষণের কারণে যেমন সাধারণ কৃষকের জীবনযাত্রার মান কমতে থাকল, তেমনি প্রকৃতিকে জানা ও তাকে ব্যবহার করার ব্যাপারে মানব সমাজের অগ্রগতি এই সময় প্রায় থেমে যায়। গর্ডন চাইল্ড কৃষিভিত্তিক সমাজের ১৪

আগের কম উন্নত ও অজ্ঞ মানব সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে এই যুগের মানব সমাজের তুলনা করেছেনঃ “খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছরের আগের ২০০০ হাজার বছরের কতকগুলি আবিষ্কার ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হয়েছিল যা প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত করেছিল এবং প্রজাতি হিসাবে পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান শক্তিশালী করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে খাল ব্যবহার করে কৃত্রিম সেচ চালু করা, লাঙ্গল আবিষ্কার, জন্তু-জানােয়ার ব্যবহার করে পরিবহনের কাজে লাগানাে, চাকার ব্যবহার, নৌ-পরিবহনে পালের ব্যবহার, বাগান তৈরী করে ফল উৎপাদন, তামা ও ব্রোঞ্জের উৎপাদন ও এগুলাে দিয়ে হাতিয়ার তৈরী, ইট তৈরী, সৌর ক্যালেন্ডার তৈরী, হস্তলিপি আবিষ্কার, সংখ্যা গণনা। কিন্তু কৃষিভিত্তিক উৎপাদন শুরুর পরবর্তী দুই হাজার বৎসর (খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালের পর) এর তুলনায় তেমন কোন উদ্ভাবন দেখা যায়না”।২৭ অগ্রগতি কিছুটা হয়েছিল- যেমন লােহার ব্যবহার, পানি ব্যবহার দ্বারা চাকা ঘুরিয়ে বিভিন্ন যন্ত্র বানান, অংকশাস্ত্র। কিন্তু এই অগ্রগতিগুলি নগর সভ্যতাগুলিতে হয় নাই। এগুলাে হয়েছিল নগর সভ্যতার বাইরে তুলনামূলক ভাবে “বর্বর” মানবগােষ্ঠীর দ্বারা। একজন গবেষক মিশরের খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ৩০০০ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বিশাল সৃষ্টিমূলক ও উদ্ভাবনের সময় বলে উল্লেখ করেছেন। তুলনায় এর পরের সময় ছিল কেরানী ও আমলাতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কাল যা নতুন কাজ নিরুৎসাহিত করেছিল এবং অগ্রগতি বন্ধ হয়ে গেছিল। ২৮

সমাজের শাসক শ্রেণী যারা বাকী সমাজের উৎপাদনের উদ্বৃত্ত ভােগ করত তাদের প্রকৃতিকে জানা ও তার মাধ্যমে জীবনযাত্রার উন্নয়নের কোন আগ্রহ থাকল না। প্রথম দিকের যে সমস্ত আবিষ্কার তার অনেকগুলি যেমন, ধাতুর তৈরি হাতিয়ার, নৌযানে পালের ব্যবহার, প্রাণীকে পরিবহনের কাজে লাগানাে, এগুলাে উদ্ভাবন হয়েছিল শ্রম সাশ্রয় করার জন্য। কিন্তু কৃষিভিত্তিক পরবর্তী যুগে শাসক শ্রেণীর প্রয়ােজনে শ্রম দেওয়ার জন্য অনেক মানুষকে লাগানাে সম্ভব ছিল। তাই শ্রম সাশ্রয়ের প্রয়ােজন ছিল না। তারা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা-যার মাধ্যমে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল-সেটাই টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করল। সুমেরিয়ার রাজারা ও মিশরের ফারাওরা তাই সমাজের শিক্ষিত শ্রেণী ও কারিগর শ্ৰেণীকে নতুন অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে উৎসাহ দেওয়ার কোন প্রয়ােজন অনুভব করত না। কৃষিভিত্তিক সমাজ গঠন ও নগর সভ্যতার পত্তনের আগে যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি আহরিত হয়েছিল তাকেই প্রায় ধর্মীয় শ্রদ্ধার আসনে আবদ্ধ রেখে নতুনত্ব নিরুৎসাহিত করা হল। বিজ্ঞানকে শত শত বৎসর ধরে ধর্ম ও যাদুর পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তার গতিরুদ্ধ করে রাখা হল। মানব জাতির প্রকৃতি অনুসন্ধান ও নতুন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে সমাজ প্রগতি বন্ধ হয়ে গেল। সমাজের যারা শিক্ষিত তারাই জ্ঞানের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। ইতিহাসে এই ঘটনা পরবর্তীতে আরও ঘটেছে।

সমাজের প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে সৃষ্টি হল কৃষিভিত্তিক সমাজ ও নগরজীবন। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে উদ্বৃত্ত উৎপাদন কিছু মানুষকে শ্রম থেকে মুক্তি দিয়ে সাংগঠনিক ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নিয়ােজিত করল। এরাই পরিণত হল শােষক ও যাজক শ্ৰেণীতে। তাদের চাহিদা বাড়তে থাকল ও শােষণের মাত্রা বাড়তে থাকল। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কমতে থাকল। উপরস্তু শােষণ টিকিয়ে রাখতে শাসক শ্রেণী উদ্ভাবন বন্ধ করে রাখল। শােষণ ও উৎপাদন শক্তির এই বন্ধ্যাত্বের ফলে ক্রমেই সমাজের সম্পদের উপর চাপ বাড়তে থাকল। সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার ন্যূনতম প্রয়ােজনও মেটানাে যাচ্ছিল না। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এই পর্যায়ে জলবায়ুর পরিবর্তন বা যুদ্ধবিগ্রহের কারণে ফসলের উৎপাদন কমলে বিপর্যয় সামলানাে এইসব সমাজের পক্ষে সম্ভব ছিল না। নীল নদের বন্যার পানি কমে যাওয়ার কারণে সেচের পানির অভাবে ফসলের ফলনে ঘাটতি হওয়ায় মিশরের প্রাচীন সাম্রাজ্যের (Old Kingdom) শেষে এটা ঘটেছিল। মধ্য আমেরিকায় মায়া সভ্যতার ধ্বংসের কারণও অতি-শােষণ বলে গবেষকরা মনে করেন।

শাসক শ্রেণী ও শােষিত কৃষকদের মধ্যে দ্বন্দ্বের থেকে সংঘর্ষের উৎপত্তি হত। এ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা যায়না, কারণ উপাসনালয়ের উত্তীর্ণ লিপি ও সমাধিস্থলের চিত্রকর্মে শাসকরা এর বহিঃপ্রকাশ ঘটায় নি। এটাই ছিল স্বাভাবিক। তবে ঐতিহাসিক ও প্রত্মতাত্বিকদের মতে কৃষক বিদ্রোহের ফলে মিশরের প্রাচীন সাম্রাজ্য ও মায়া সভ্যতার পতন ঘটে। তবে এই সংঘর্ষ শুধুমাত্র শাসক ও কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মেসােপটেমিয়া ও মধ্য-আমেরিকায় প্রথমে শাসক শ্রেণী ছিল উপাসনালয়ের পুরােহিতরা। এই দুই স্থানেই ক্রমেই আরেক শ্রেণীর আবির্ভাব হল-এরা হল জমির মালিক এবং সেনাধ্যক্ষরা। মিশরের প্রাচীন সাম্রাজ্যে রাজারা সুদীর্ঘ ৫০০ মাইল লম্বা নীল নদের উপত্যকায় খনন কাজ এবং কর আদায় করার জন্য নির্ভর করত আঞ্চলিক শাসকদের উপর। তারাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা স্বাধীন আচরণ করতে শুরু করে। মিশরের প্রাচীন সাম্রাজ্যের পতনের আর একটি কারণ ছিল এই আঞ্চলিক অধিপতিদের বিদ্রোহ। এছাড়াও কৌশলী ও কারিগর শ্রেণীর সংখ্যাও বাড়ে। শাসক শ্রেণী যতই বড় বড় নির্মাণ কাজে হাত দিল ততই এদের চাহিদা বাড়ল ও সংখ্যা বাড়তে থাকল। একটা ব্যবসায়ী শ্রেণী গড়ে উঠল। শত শত মাইল দূর থেকে জিনিষপত্র আনা-নেওয়া করা একটা পেশায় পরিণত হল।

কিন্তু যখন সংঘাত ও বিপর্যয় দেখা দিত তখন শাসক শ্রেণীকে উৎখাত করে সেখানে নিজেদের অবস্থান নেওয়ার মত ক্ষমতা কৃষক কুলেরও ছিল না বা কারিগর ও ব্যবসায়ীদেরও ছিল না। ফলে সংঘাতের ফল হত ধ্বংস। কৃষকেরা বিদ্রোহ করার পর কৃষি উৎপাদন চালুর রাখার জন্য সেচ ব্যবস্থা ও সংগঠন চালানাের শক্তি তাদের ছিল না। ফলে অনেক স্থানেই সংঘাতের পর নগর ও জনপদ পরিত্যক্ত হয়ে যেত। ক্রিট ও মিসেনি সভ্যতা, মায়া সভ্যতার নগরগুলি এভাবে পরিত্যক্ত হয় বলে অনেকে মনে করেন।

এই ধরনের দূর্যোগের পর শতাব্দীর ব্যবধানে মিশর ও মেসােপটেমিয়ার সভ্যতা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। মিশরে ও মেসােপটেমিয়ায় নতুন শাসক শ্রেণীর সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে আবার নগর গড়ে তােলে। কিন্তু উদ্ভাবন ও নতুন জীবনযাত্রার ধারা সৃষ্টি করতে পারে নাই। বিপর্যয়ের পরের সমাজগুলিতে সেনাধ্যক্ষ, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকা বেশি থাকত। কিছু কিছু উদ্ভাবনের ফলে উৎপাদন শক্তিও বেড়েছিল। এর মধ্যে ছিল তামার বদলে ব্রোঞ্জের ব্যবহার। ব্রোঞ্জ তামার চাইতে শক্ত। কাজেই আরও মজবুত হাতিয়ার তৈরী করা যেত। ঘােড়ায় টানা চাকাওয়ালা গাড়ী যুদ্ধেও ব্যবহার করা যেত। আবার মালামাল হস্তান্তরেও গতি আনল।

তথ্যসূত্রঃ

. Harman C. A People’s History of the World. London, 1999 p 3-4 2. Turnbul C.The Forest People. New York, 1962 p 107 0. Friedl E. Women and Men, The Anthropologist’s View. New York, 1975 p 28. 8. Leacock E. Myths of Male Dominance. New York, 1981 p 139-140 G. Lee R. The !Kung San. Cambridge, 1979 p 118 ☺. Maisels CK. The Emergence of Civilization From Hunting and Gathering to Agriculture,

Cities and State In the Near East. London, 1993 p 297 4. Harman C. p 10 b. Adams RM. The Evolution of Urban Society. London, 1966 p 96 1. Benedicts R. Patterns of Culture. London, 1935 Jo. Harman C. p 12 Ss. Katz F. Ancient American Civilization. London, 1989 38. Diamonds J. Guns, Germs and Steel. New York, 1997 p 139 so. Lee R. Reflections on Primitive Communism.in T.Ingold D.Riches and J.Woodburn. (Edit),

Hunters and Gatherers, Vol-1. Oxford, 1988 p 262. 38. Sahlins M. Stone Age Economics. London, 1974 p 135 se. Katz F. sy. Harman C. p19 19. Katz F. Sb. Adams RM. P 96 Jd. Adams RM. P 104 10. Jones TB. Quoted in Maisels CK. The Emergence of Civilization. P 184

  1. Mann M. The Sources of Social Power. Vol-1. Cambridge, 1986 p 39 33. Adams RM. P 104 10. Sachs K. Sisters and Wives. London, 1974 p 117 18. Diakhanov IM. The Stucture of Near Eastern Society Before the Middle of 2nd Millenium BC.

Oikumene,3:1, Budapest, 1982 Re. Trigger BG, Kemp BJ, O’Connor D and Loyd AB. Ancient Egypt: A Social History.

Cambridge, 1983 p 176 fy. Gordon Child V. What Happened in History. Harmondsworth, 1948 p 117 39. Gordon Child V. Man Makes Himself. London, 1956 p 227 36. Trigger BG. et.al. page 67 Ro. Culbert. TP (Ed) The Classic Maya Collapse. Albuquerque, 1973 p 459 vo. Trigger BG et al. p115

ধন্যবাদ।

You may also like...

1 Response

  1. বদিউল আলম says:

    PDF আকারে রাখলে ভালো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *