প্রাকৃতিক নির্বাচন – শেষ পর্ব

Process of Natural Selection

প্রাকৃতিক নির্বাচনের জেনেটিক্স:

এমনকি যখন জীববিজ্ঞানীরা শুধু সাধারন শারীরিক বৈশিষ্টগুলোর দিকে নজর দিয়েছেন (বীক, বাইসেপ আর ব্রেইন) এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন বিবর্তনের মুল চালিকা শক্তি, তারা তখন প্রায়শই কিন্তু অন্ধকারে ছিলেন, বিষয়টি আসলে কিভাবে ঘটছে। সাম্প্রতিক কাল ছাড়া, অ্যাডাপটিভ বিবর্তনের মুল ভিত্তি রচনাকারী জীনগত পরিবর্তনগুলো সম্বন্ধে খুব কমই আসলে জানা ছিল জীববি‌জ্ঞানীদের। কিন্তু জীনতত্ত্বের নতুন অগ্রগতির সাথে সাথে জীববিজ্ঞানীরা  এই সমস্যার সমাধানে মুখোমুখি হতে পেরেছেন সরাসরি এবং এখন তারা চেষ্টা করছেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ব্যাপারে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে। যখন কোন অর্গানিজম প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোন নতুন পরিবেশে অভিযোজিত হয়, তারা কিভাবে সেটি করতে সক্ষম হয়?একটি জীনের পরিবর্তনের মাধ্যমে নাকি অনেকগুলো জীনের পরিবর্তনের মাধ্যমে? সেই জীনগুলো কি শনাক্ত করা সম্ভব? এবং এই একই জীনগুলো কি  একই পরিবেশে অন্যান্য স্বতন্ত্র অভিযোজনের ঘটনাগুলোকে সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া কিন্তু সহজ না। প্রধান সমস্যা হলো, কোন উপকারী মিউটেশনের ফলে ফিটনেস বৃদ্ধি হতে পারে খুবই সামান্য, যা বিবর্তনীয় পরিবর্তনকে বেশ মন্হর করে ফেলে। এই সমস্যাটিকে বিবর্তন জীববিজ্ঞানীরা  মোকাবেলা করেছেন যে উপায়ে তা হলো, দ্রুত বংশবৃদ্ধিকারী কোন অর্গানিজমদের পরীক্ষাধীন জনগোষ্ঠীকে একটি কৃত্রিম পরিবেশে রাখা, যেখানে ফিটনেস এর পার্থক্য অনেক বেশী আর সেকারনে বিবর্তন প্রক্রিয়াও দ্রুত। জীববিজ্ঞানীদের ব্যাপারটা বুঝতে আরো সাহায্য করে, যদি যদি অর্গানিজমদের জনগোষ্ঠীর আকারটি অনেক বড় হয়, যা একটি নির্দিষ্ট হারে জনগোষ্ঠীর জীন পুলে নিরবিচ্ছিন্নভাবে নতুন মিউটেশন যোগ করতে থাকে। পরীক্ষামুলক বিবর্তন প্রক্রিয়ায় পরীক্ষাধীণ কোন অনুজীব জনগোষ্ঠী, একই রকম জীন সম্পন্ন এই জনগোষ্ঠীকে সাধারনত নতুন একটি পরিবেশে রাখা হয়, যে পরিবেশের সাথে তাদের অবশ্যই অভিযোজিত হতে হবে এধরনের একটি নির্বাচনী চাপ বা সিলেকশন প্রেশার প্রয়োগ করার কৌশল হিসাবে। যেহেতু সবাই শুরুতে একই ডিএনএ সিকোয়েন্স বা অনুক্রম দিয়ে শুরু করেছিল, প্রাকৃতিক নির্বাচনকে কাজ করতে হয় অল্প কিছু মিউটেশনের উপর, যারা এই পরীক্ষার সময় সৃষ্ট হয়েছে। গবেষকরা এরপর এই জনগোষ্ঠীর ফিটনেস কেমন ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে সময়ের সাথে, সেটি গ্রাফে প্লট করে দেখতে পারেন, নতুন এই পরিবেশে তাদের প্রজনন হার পরিমাপ করার মাধ্যমে।

পরীক্ষামুলক বিবর্তনের কিছু কৌতুহলোদ্দীপক গবেষনা করা হয়েছে ব্যাক্টেরিওফাজদের উপর, এরা হচ্ছে একধরনের ভাইরাস, তবে এরা খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির এবং তারা শুধু ব্যাক্টেরিয়াদেরই আক্রমন করে। এছাড়া ব্যাক্টেরিওফাজদের জীনোমও খুবই ছোট, বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে সুবিধার, কারন তারা এর প্রতিটি জীন পরীক্ষার শুরুতে, শেষে এবং মধ্যবর্তী যে কোন সময় সিকোয়েন্স বা অনুক্রম করতে পারেন। সেকারনে তারা প্রতিটি জেনেটিক পরিবর্তনকে শনাক্ত করতে পারেন, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন ‘নির্বাচন’ করে এবং সময়ের সাথে সাথে এর সংখ্যাও বৃদ্ধি করে।

কে কিচলার হোলডার এবং জেমস জে বুল, অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই গবেষক এরকম একটি পরীক্ষা করেছেন দুটি কাছাকাছি সম্পর্কযুক্ত প্রজাতি, ΦX174 এবং G4 ব্যাক্টেরিওফাজ এর  উপর। এই দুটি ভাইরাসই আমাদের অন্ত্রনালীর সবচেয়ে কমন ব্যাক্টেরিয়াম,  Eschericia coli কে সংক্রমন করে। গবেষকরা এই ফাজগুলোকে খুব উচু তাপমাত্রার পরিবেশের মুখোমুখি করেন এবং এই নতুন এবং উষ্ণ পরিবেশে বাচার জন্য সুযোগ দেন তাদের অভিযোজিত হবার। পরীক্ষা চলা কালীন সময়ে এই দুটো প্রজাতির  ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়, এই নতুন পরিবেশে তাদের ফিটনেসও বৃদ্ধি পেয়েছে নাটকীয়ভাবে। উপরন্তু গবেষকরা উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করেন একটি সদৃশ্য প্যাটার্ন: পরীক্ষার শুরুতে ফিটনেস বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার পর সময়ের সাথে সাথে  এটি একটি স্থির পর্যায়ে নেমে আসে। লক্ষ্যনীয় বিষয়টি হলো, হোলডার এবং বুল সফল হয়েছিলেন এই ফিটনেস বৃদ্ধির কারন, সঠিক সেই ডিএনএ মিউটেশনটিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে।

বন্য প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক নির্বাচন:

যদিও পরীক্ষামুলক বিবর্তন গবেষনাগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচন কিভাবে কাজ করছে সে সম্বন্ধ অভুতপুর্ব তথ্য যোগান দিয়েছে, কিন্তু তারপরও সেই প্রক্রিয়া শুধু সীমাবদ্ধ আছে সহজতর অর্গানিজমের গবেষনায়, যাদের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন শনাক্ত করার জন্য বার বার জিনোম অনুক্রম করা সম্ভব হয়। কিছু গবেষকরা অবশ্য বলছেন, এই ধরনের পরীক্ষামুলক বিবর্তন গবেষনাগুলোতে সিলেকশন প্রেশার বা নির্বাচনী চাপটি অনেক বেশী শক্তিশালী (উল্লেখিত ব্যাকটেরিওফাজদের ক্ষেত্রে যেমন উচ্চ তাপমাত্র) এবং অপ্রাকৃতিক, অর্থাৎ হয়ত প্রকৃতিতে যে নির্বাচনী চাপ কোন অর্গানিজম অনুভব করে থাকে তা এই কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্ট চাপের চেয়ে মৃদু হয়। যে কারনে আমাদের প্রয়োজন আছে আরো জটিলতর উন্নত জীবের মধ্যে আরো বেশী প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাকৃতিক নির্বাচন সংক্রান্ত গবেষনা পরিচালৈনা করা। আর সে কারনে আমাদের অন্য একটা পথ খুজে বের করতে হবে অনেক বিবর্তনীয় পরিবর্তনের অতি মন্থর গতিটি।

ছবি: প্রজাতিকরণ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন ইলাসট্রেশন: Tommy Moorman

এ কাজটা করতে সচরাচর বিবর্তনবিদরা এমন প্রজাতির জনগোষ্ঠীকে বেছে নেন যারা এত দীর্ঘদিন ধরে পৃথক থাকে যে, তাদের মধ্যে  তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্ট হওয়া অ্যাডাপটিভ পার্থক্যগুলোর খুব সহজে লক্ষ্য করা যায়। জীববিজ্ঞানীরা তার পর সেই পার্থক্যগুলোর জীনগত ভিত্তি খুজে বের করেন। যেমন মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডগলাস ডাবলিউ শেমস্কে এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচ ডি ব্র্যাডশ (জুনিয়র) দুই প্রজাতির মাঙ্কি ফুলের উপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাব বিশ্লেষন করেছিলেন তাদের গবেষনায়। যদিও মাঙ্কি ফুলের এই দুই প্রজাতি বেশ কাছাকাছি সম্পর্কের প্রজাতি হলেও Mimulus lewisii কে প্রধানত: পরাগায়ন করে বাম্বল বি বা মৌমাছি, অন্যদিতে Mimulus cardinalis এর পরাগায়ন করে প্রধানত হামিংবার্ডরা। Mimulus  জেনাসের অন্যান্য প্রজাতির উপরে গবেষনায় দেখা গেছে, এদের প্রজাতিদের মধ্যে পাখির মাধ্যমে পরাগায়ন বিবর্তিত হয়েছে মৌমাছির মাধ্যমে পরাগয়ন থেকে।

শুধুমাত্র যদি ফুলের রং ধরা হয়,যেমন, M.lewisii যার ফুলের রং গোলাপী ( অন্য নাম পিঙ্ক মাঙ্কি ফ্লাওয়ার) এবং M. cardinalis এর ফুলের রং লাল (স্কারলেট মাঙ্কি ফ্লাওয়ার) (উপরে ডায়াগ্রাম দেখুন), এই দুই প্রজাতির ভিন্ন পরাগায়নকারী বেছে নেবার কারন কিন্ত অনেকাংশে ব্যাখ্যা করতে পারে। যখন শেমস্কে এবং ব্র্যাডশ এই দুই প্রজাতির মধ্যে ক্রশ বা আন্ত:প্রজনন করান এবং দেখান যে, এই রঙ এর পার্থক্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রন করে জীনোমের যে অংশ, সেটি হচ্ছে সম্ভবত একটি একক জীন,Yellow Upper,বা YUP;এই আবিষ্কারটির উপর ভিত্তি করে তারা দুই ধরনের শংকর বা হাইব্রিড প্রজাতির মাঙ্কিফ্লাওয়ার তৈরী করেন। এক ধরনের হাইব্রিডে YUP জীনটি এসেছে  M. cardinalis  এর কাছ থেকে, কিন্তু বাকী জীনোমের উৎস M.lewisii; এই M.lewisii হাইব্রিডগুলোর ফুলের রং হয় কমলা। দ্বিতীয় ধরনের হাইব্রিডটি প্রথমটারই মিরর ইমেজ: অর্থাৎ এর YUP জীনটি এসেছে M.lewisii র কাছ থেকে, এবং জীনোমের বাকী অংশ এসেছে M. cardinalis এর কাছ থেকে, এক্ষেত্রে ফুলের রং হয়েছিল গোলাপী (M. cardinalis হাইব্রীড) । এই হাইব্রিড প্রজাতিদের তারা যখন প্রকৃতিতে বা বন্য পরিবেশে রোপন করেন, তারা লক্ষ্য করেন এই YUP জীনটি পরাগায়নকারী প্রানীদের ফুলটিতে বেড়াতে আসার ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব ফেলছে। হাইব্রীড M.lewisii প্রজাতি, যার YUP জীনটি M. cardinalis  এর, সেখানে বিশুদ্ধ M.lewisii প্রজাতির ফুলের তুলনায় হামিংবার্ড বেড়াতে আসছে ৬৮ গুন বেশীবার। এবং সমতুল্য অপর পরীক্ষায় দেখা যায়, হাইব্রিড M. cardinalis , যাদের YUP জীনটির উৎস M. lewisii, সেখানে বিশুদ্ধ M. cardinalis এর প্রজাতির ফুলের তুলনায় বাম্বল বি বা মৌমাছি বেড়াতে এসেছে ৭৪ গুন বার বেশী। কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, যে এই YUP জীনটি M. cardinalis প্রজাতির পাখী পরাগায়নকারীর বিবর্তনের ক্ষেত্রে অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রেখেছে। শেমস্কে এবং ব্র্যাডশ‘র গবেষনা প্রমান করে প্রাকৃতিক নির্বাচন মাঝে মাঝে এমন  অভিযোজনীয় বৈশিষ্ট তৈরী করে যার ভিত্তি খুবই সাধারন কিছু জীনগত পরিবর্তন।

মাঙ্কি ফ্লাওয়ার ১ Mimulus lewisii  ২ Mimulus cardinalis

প্রজাতির উৎপত্তি:

প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে ডারউইনের সবচেয়ে সাহসী দাবী ছিল, যে এটি প্রজাতি কিভাবে উৎপত্তি হয় তার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম ( সর্বোপরি ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার মাষ্টার পীস এর শিরোনামই ছিল On the Origin of Species); কিন্তু আসলেই কি তা পারে ? আজ  অবধি এটি বিবর্তন জীববিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ গবেষনার বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বোঝার আগে স্পষ্ট করে বুঝতে হবে বিবর্তন জীববিজ্ঞানীরা আসলে  ‘প্রজাতি বা স্পিসিস‘ বলতে কি বোঝাচ্ছেন। ডারউইন থেকে ভিন্নভাবে, আধুনিক জীববিজ্ঞানীরা, প্রজাতির যে সংজ্ঞাটিকে অনুসরন করেন, সেটি হলো, ’বায়োলজিক্যাল স্পিসিস কনসেপ্ট’, এর মুল বিষয়টি হলো, প্রজাতিরা প্রজননের দিক থেকে অন্য প্রজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন, অর্থাৎ তারা জীনগত কিছু ট্রেইট বা বৈশিষ্ট ধারন করে যা তাদের অন্য কোন গ্রুপের সাথে জীন আদান প্রদানে বাধা দেয়। অন্য ভাবে বলা যেতে পারে পৃথক পৃথক প্রজাতির পৃথক পৃথক জীন পুল থাকে।

সাধারনত: ভাবা হয়, দুটি জনগোষ্ঠীকে অবশ্যই ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে হবে তাদের ’প্রজনন বিচ্ছিন্নতা’ ‍বা ’রিপ্রোডাক্টিভ আইসোলেশন’ বিবর্তিত হবার জন্য। গালাপাগোস দ্বীপপুন্জ্ঞের দ্বীপগুলোতে ফিন্চ প্রজাতির পাখিরা যারা আলাদা আলাদা দ্বীপগুলোতে বসবাস করতো-যাদের কথা ডারউইন তার ’অরিজিন অব স্পিসিস’ বইটিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন- ভৌগলিকভাবে তারা বিচ্ছিন্ন হবার পর অবশ্যই বিবর্তিত হয়ে ভাগ হয়েছে বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রজাতিতে, যা আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি।

একবার যখন প্রজনন বিচ্ছিন্নতা বিবর্তিত হয়, এটি নানা আকার ধারন করতে পারে, যেমন, কোন প্রজাতির স্ত্রী সদস্যরা প্রাকপ্রজনন আচরণ বা কোর্টশীপ এর সময় অন্য প্রজাতির পুরুষদের সাথে প্রজনন বা মেটিং এ অস্বীকৃতি জানাতে পারে ( যদি এই দুই প্রজাতি কখনো ভৌগলিকভাবে পরস্পরের সংস্পর্শে আসে); প্রজাপতির প্রজাতি, Pieris occidetalis এর স্ত্রী সদস্যরা নিকটবর্তী সম্পর্কিত প্রজাতি Pieris protodice এর পুরুষ সদস্যদের সাথে প্রজনন করে না, সম্ভাব্য কারন মনে করা হয় এই দুই প্রজাতির পুরুষ সদস্যদের ডানা বা উইং এর প্যাটার্ণ বা নকশার ভিন্নতা;  যা স্ত্রী প্রজাতিতের স্বপ্রজাতি শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এবং এমনকি যদি দুটি প্রজাতি কোর্টশীপ এবং প্রজনন করেও, তবে এদের হাইব্রীড হয় স্বল্পায়ু বিশিষ্ট নতুবা প্রজনন অক্ষম বা বংশ বৃদ্ধির ক্ষমতাহীন; এই বিষয়টি আবার এক ধরনের প্রজনন বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে: কারন জীন এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনা, যেহেতু এদের হাইব্রীডরা হয় মারা যায় বা স্টেরাইল বা পরবর্তী বংশধর সৃষ্টিক্ষম থাকেনা। আধুনিক জীববিজ্ঞানীদের কাছে তাহলে, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজাতির উৎপত্তির প্রক্রিয়ায় কোন ভুমিকা রাখে কিংবা রাখে না, এই প্রশ্নটি আসলে রুপান্তরিত হয়েছে, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজনন বিচ্ছিন্নতা উৎপত্তির প্রক্রিয়ায় ভুমিকা রাখে, কি রাখে না এই প্রশ্নে।

ছবি: ১ Pieris protodice ( নর্থ আমেরিকার ক্যাবেজ বাটারফ্লাই) ২ Pieris occidetalis  ওয়েষ্টার্ন হোয়াইট বাটারফ্লাই (ছবিসুত্র: ইন্টারনেট)

বিংশ শতাব্দীর বেশীর ভাগ সময় ধরেই অনেক বিবর্তনবাদী এর উত্তর মনে করতেন, ’না‘; বরং তারা বিশ্বাস করতেন ’জেনেটিক ড্রিফট’ হলো স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণের সবচে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রজাতির উৎপত্তি সংক্রান্ত আধুনিক গবেষনা থেকে পাওয়া একটি গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হলো, প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে জেনেটিক ড্রিফট হাইপোথিসিসটি সম্ভবত ভুল, বরং প্রাকৃতিক নির্বাচনই প্রজাতিকরন প্রক্রিয়ায় মুখ্য ভুমিকাটি পালন করে।

এর একটি ভালো উদহারন হতে পারে, আগে বর্ণনা করা  দুই ধরনের মাঙ্কি ফ্লাওয়ারের বিবর্তন ইতিহাস; যেহেতু তাদের পরাগায়নকারী প্রানীগুলো ( বাম্বল বী এবং ‍হামিংবার্ড) অত্যন্ত কদাচিৎ ’ভুল’ প্রজাতির ফুলের নেকটার বা মধূ পান করতে যায়, সেকারনে দুটি প্রজাতি প্রায় পুরোপুরি ‘প্রজনন বিচ্ছিন্ন’; যদিও উত্তর আমেরিকায় এই দুই প্রজাতি মাঝে মাঝে একই জায়গায় হতে পারে, কোন একটি মৌমাছি যে M. lewisii এর ফুলে যায়, প্রায় কখনোই সে M. cardinalis এর ফুলে বসে না, এবং একটি হামিংবার্ড যে M. cardinalis এর ফুলে মধু পান করত আসে, সে M. lewisii ফুলে প্রায় কখনোই যায়না। এভাবে দুই প্রজাতির মধ্যে ফুলের রেণু আদান প্রদানও হয়না প্রায় কখনোই। শেমস্কি এবং তার সহযোগীরা দেখিয়েছেন পরাগায়নকারীদের মধ্যে এই পার্থক্য আসলেই একক ভাবে ৯৮ ভাগে আন্ত: প্রজাতি জীনপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতার জন্য দায়ী। এই ক্ষেত্রে, সে কারনেই কোন সন্দেহ নেই, প্রাকৃতিক নির্বাচন এই উদ্ভিদটির নির্দিষ্ট একটি পরাগায়নকারীর প্রতি নির্ভরশীল হবার অভিযোজনীয় বৈশিষ্টটির আকার দেয় এবং শক্তিশালী প্রজনন বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে।

প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভুমিকা সংক্রান্ত অন্যান্য প্রমানগুলো পাওয়া গেছে কিছু অপ্রত্যাশিত গবেষনার ক্ষেত্র থেকে। প্রায় গত একদশক ধরে বিবর্তনীয় জীনতত্ত্ববিদরা প্রায় আধা ডজন জীন শনাক্ত করেছেন, যা হাইব্রিড প্রজাতির বংশবৃদ্ধি করার অক্ষমতা বা বেচে থাকতে না পারার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। যে জীনগুলোর কথা বলা হচ্ছে, তাদের নিয়ে গবেষনা হয়েছে Dorsophila ফ্রুট ফ্লাই বা ফলের মাছিতে। এই জেনাসের প্রজাতিদের মধ্যে, সেখানে এরা নানা ধরনের স্বাভাবিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত: কেউ উৎসেচক বা এনজাইম এর সংকেত বহন করে,কেউ বা গঠনতান্ত্রিক বা স্ট্রাক্চারাল প্রোটিনের সংকেত কিংবা ডিএনএ এর সাথে সংযুক্ত হওয়া প্রোটিন তৈরীর সংকেত বহন করে।

এই জীনগুলো দুটি লক্ষনীয় বৈশিষ্ট প্রদর্শন করে,প্রথমত, যে জীনগুলো কোন হাইব্রিড প্রজাতির মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি করে, তাদের বেশীর ভাগই দেখা গেছে খুব বেশী দ্রুত বিভাজিত বা ‍ভাইভার্জ হয়েছে, দ্বিতীয়ত, পপুলেশন জেনেটিসিস্টদের পরিসংখ্যানগত পরীক্ষার তথ্য দেখাচ্ছে, তাদের দ্রুত বিবর্তনের পরিচালিত হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায়।

মাঙ্কি ফ্লাওয়ার এর উপর গবেষনা এবং হাইব্রিডদের বংশবৃদ্ধি করার অক্ষমতা সংক্রান্ত এই গবেষনাগুলো শুধুমাত্র ক্রমশ বাড়তে থাকা অসংখ্য গবেষনার শুধু উপরিপৃষ্ঠ, যারা প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভুমিকার গুরুত্ব প্রকাশ করেছে। আসলেই, বেশীর ভাগ জীববিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন বিবর্তন প্রক্রিয়া মুল চালিকা শক্তি, যা শুধু  প্রজাতির মধ্যে বিবর্তনীয় পরিবর্তনই না নতুন প্রজাতির উৎপত্তিতেও ভুমিকা রাখে। যদিও কিছু অপেশাদার মানুষ এখনও অব্যাহতভাবে এর অকাট্যতা বা পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে যাচ্ছেন, কিন্তু গত কয়েক দশকে বিবর্তন জীববিজ্ঞানীদের কাছে এর অবস্থান, হয়তো খানিকটা আইরোনীর সাথে, আরো বিশ্বাসযোগ্য এবং আরো সুরক্ষিত হয়েছে।

 

https://www.shottershondhane.com/প্রাকৃতিক-নির্বাচন-প্রথম/

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *