ব্ল্যাকহোল এবং আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব!

সেই সুদূর আদিকাল থেকে মানুষের মহাকাশ সম্পর্কে অসীম বিস্ময় কাজ করত। মানুষ ভাবতো রাতের আঁধারে কি জ্বলে, দিনের বেলা আলোকিত হয় কিভাবে, আমরা যেভাবে আছি আমাদের মত অন্য কোথাও কেউ আছে কিনা, থাকলেও তাদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ স্থাপন করব, ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে-ভাবতে আজ আধুনিক সভ্যতা এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।

এখন ভিনগ্রহবাসীর সাথে যোগাযোগ এর জন্য কাজ করা হচ্ছে, অন্যান্য গ্রহ মানুষের জন্য কিভাবে বাসযোগ্য বানানো যায় সেটি নিয়ে এখনকার গবেষণার মাঠ তুমুল প্রতিযোগিতাপূর্ণ। আচ্ছা, সেসব নিয়ে আরেকদিন কথা হবে, আজকে বরং আমরা রিলেটিভিটি নিয়ে গল্প করি।

ধরা যাক, একদা একজন মহাকাশবিজ্ঞানী তার সহোদর ভাইকে পৃথিবীতে রেখে ৫ বছরের জন্য মহাকাশ ভ্রমণে গেলেন।  কিন্তু সে যখন ৫ বছর পর ফিরে এলো তখন দেখল তার ভাইয়ের বয়স ৫ বছরের চেয়েও অনেক বেশী বেড়েছে, তাকে বয়স্ক লাগছে। কিন্তু  বিজ্ঞানী তার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল যেন তার বয়স ৫ বছরের স্থলে ২ বছর বেড়েছে এবং তাকে তার ভাইয়ের তুলনায় অনেক বেশী প্রাণবন্ত লাগছে। তখন সে বলল, এই ঘটনাটি সময় সংকোচন এর দরূণ ঘটেছে, কেননা মহাকাশযানটি যখন ছুটে চলছিল তখন এটি আলোর বেগের  প্রায় ২০% গতিতে ছুটে চলছিল। আইনস্টাইন বলেছিলেন, “কোন বস্তু যদি আলোর কাছাকাছি বেগে যাত্রা করে তবে তার নিকট মনে হবে সময় ধীরে  চলছে”! ঠিক এই ঘটনাই সকল মহাকাশচারী সবসময় অবলোকন করেন।

চলুন, এবার একটি মজার বিষয় নিয়ে আলাপ করি।

সূর্য কি কখনো ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারবে?

চিত্রঃ তুলনামূলক বিশ্লেষণ; সূর্য, নিউট্রন তারকা , ব্ল্যাকহোল, শ্বেত বামন

উত্তরঃ না, ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে যে পরিমাণ ভর ও শক্তি দরকার তার কোনটিই সূর্যের নেই। সেটা লাভ করাও অসম্ভব প্রায়। সকল নক্ষত্র তিনটির যেকোনো একটিতে রূপান্তরিত হয়ে তাদের জীবন শেষ করে, সেই তিনটি অবস্থা হলঃ ১ শ্বেত নক্ষত্র, ২ নিউট্রন তারা, ৩ ব্ল্যাকহোল।

এই অবস্থার পরিবর্তন সম্পূর্ণ নির্ভর করে তারার ভরের উপরে।

যে সকল তারকার ভর সূর্যের ভরের ১.৪৪ গুণের চেয়ে কম সে সকল তারা শ্বেত বামনে পরিণত হবে, যাদের ভর সূর্যের ভরের ১.৪৪ গুণের থেকেও বেশী সে সকল তারকা নিউট্রন তারকায় পরিণত হবে। ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে গেলে তারকার ভর আরও বেশী হতে হবে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আমাদের সূর্য কখনোই ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে না, কেননা এর ভর অনেক কম।

সূর্যের পরিণতি হবে শ্বেত বামনের মত।

তারকা তখনি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে যখন সুপারনোভা সম্পন্ন হবার পরও এর ভর সূর্যের ভরের কমপক্ষে  তিনগুণ থাকে। ‘সোয়ার্জকাইল্ড ব্যাসার্ধ নির্ণয়ের সূত্র’ দ্বারা ব্ল্যাকহোলের পরিধি বের করা যায়, আমাদের সূর্য যদিওবা হবে না, তবুও এর সোয়ার্জকাইল্ড ব্যাসার্ধ হবে ২.৯৫৩ কিলোমিটার ,পৃথিবীর ক্ষেত্রে সেটা হবে ৯ মিলিমিটার!

আমরা যদি  পৃথিবীকে সোয়ার্জকাইল্ড ব্যাসার্ধ সূত্র প্রয়োগ করে ব্লাকহোলে পরিণত করতে চাই তবে এর আয়তন ৮৭ সে.মি-তে আনতে হবে। আর যদি সূর্যকে ব্লাকহোলে আনতে চাই তবে এর আয়তন হতে হবে ৩ কি.মি. বা ১০^৫ সে.মি।

তবে এই আলোচিত ব্ল্যাকহোল কত বিশাল? তার আগে জেনে নিই ব্ল্যাকহোল কি।

কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল (ইংরেজি: Black Hole; বাংলা বিকল্প নাম: কৃষ্ণ বিবর) মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও প্রকৃতি বিষয়ক একটি বহুল প্রচলিত ধারণা।[১] এই ধারণা অনুযায়ী কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু যা এত ঘন সন্নিবিষ্ট বা অতি ক্ষুদ্র আয়তনে এর ভর এত বেশি যে, এর মহাকর্ষীয় শক্তি কোন কিছুকেই তার ভিতর থেকে বের হতে দেয় না। এমনকি (তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণকেও (যেমন: আলো) নয়। প্রকৃতপক্ষে এই স্থানে সাধারণ মহাকর্ষীয় বলের মান এত বেশি হয়ে যায় যে এটি মহাবিশ্বের অন্য সকল বলকে অতিক্রম করে। ফলে এ থেকে কোন কিছুই পালাতে পারে না।

Black Hole-এর জন্মঃ

নক্ষত্র যখন তার জ্বালানি পুড়িয়ে শেষ করে ফেলে তখন নক্ষত্রগুলো সংকুচিত হতে থাকে। সাধারণত গ্যালাক্সিগুলোর মাঝে অবস্থানরত বড়-বড় নক্ষত্র তাদের বিবর্তনের সর্বশেষ পরিণতিতে সুপারনোভা বিস্ফোরনের মাধ্যমে ব্ল্যাকহোল সৃষ্টি করে। নক্ষত্রগুলো অনেক বেশি সংকুচিত হয়েই ব্ল্যাকহোলের জন্ম দেয়। কিন্তু সেই সংকুচিত হওয়ার মাত্রা কতটুকু? তা শুনে অবাক হবেন! উদাহরণস্বরূপ, সূর্যের ব্যাসার্ধ প্রায় ৬.৯৬০০০০০ কিলোমিটার। এই বিশালাকার আয়তনকে যদি কোনোভাবে মাত্র ১০ কিলোমিটারে(!) নামিয়ে আনা যায়, তাহলে সেটি একটি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। আর আমাদের পৃথিবীকেই যদি চেপেচুপে মাত্র দশমিক ৮৭ সেন্টিমিটার(!) বানানো যায়, তাহলে পৃথিবীও একটি ক্ষুদে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারে। ব্ল্যাকহোল হওয়া তাহলে সোজা ব্যপার না তাই না!

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ব্ল্যাকহোল বড়, ছোট, মাঝারি  হতে পারে। সবচেয়ে ছোট যে ব্ল্যাকহোল আছে সেটি শুধুমাত্র একটি অণুর তৈরি, কিন্তু এদের ভর প্রায় এভারেস্ট মাউন্টেন এর সমান হতে পারে! স্টেলার ব্ল্যাকহোল নামে সুবিশাল ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে যাদের ভর সূর্যের ভরের ২০ গুণ প্রায়। সবচেয়ে বৃহৎ ব্ল্যাকহোলের নাম হল ‘সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল’, ১ মিলিয়ন সূর্যের ভরের চেয়েও বেশী ভর এদের কেন্দ্রে আছে।

এখন পর্যন্ত ব্লাকহোলের কোন প্রত্যক্ষ দর্শন পাওয়া যায়নি, কারণ এ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতে পারে না। যেকারণে একে দেখা সম্ভব নয়, কিন্ত এর উপস্থিতির প্রমাণ আমরা পরোক্ষভাবে পাই। ব্লাকহোলের অস্তিত্বের প্রমাণ কোন স্থানের তারা-নক্ষত্রের গতি এবং দিক দেখে পাওয়া যায়। মহাকাশবিদগণ ১৬ বছর ধরে আশে-পাশের তারামন্ডলীর গতি-বিধি পর্যবেক্ষণ করে গত ২০০৮ সালে প্রমাণ পেয়েছেন, সকল গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল আছে, আমাদের আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সিতে যে ব্ল্যাকহোলটি আছে সেটির নাম ‘স্যাগিটারাস-A’, এবং এর ভর ৪ মিলিয়ন সূর্যের ভরের সমতুল্য।

আকর্ষণ করার  ক্ষমতার এলাকা:

ব্ল্যাকহোল থেকে আলো কিছু দূর যাওয়ার আগেই ব্ল্যাকহোলটির মহাকর্ষীয় আকর্ষণ দ্বারা তাকে পিছনে নিয়ে আসে, সব কিছু নিজের দিকে টেনে নেয়।

যেহেতু আলো পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারে না, তাহলে ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব কিভাবে দেখা যায় বা বুঝা যায়? মহাকাশবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময়েই মহাকাশে প্রচুর তারকারাশি দেখা যায় যারা একটি বিশেষ বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, অথবা সর্পিলাকার গ্যাসীয় বস্তু দেখা যায় যা কোন বিন্দুকে কেন্দ্র করে অবস্থান করছে। এই বিশেষ বিন্দুগুলোই হল ব্ল্যাকহোল, যেগুলোকে দেখা যাচ্ছে না ঠিকই কিন্তু তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে তারকারাশি বা গ্যাসীয় বস্তুগুলোর অবস্থান আর তাদের গতি-প্রকৃতির মাধ্যমে।

যখন একটি তারা এবং ব্ল্যাকহোল পাশাপাশি থাকে তখন সেখানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন উজ্জ্বল আলোর সৃষ্টি হয়, সেটা দেখে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেন এবং ব্ল্যাকহোল কালো হওয়া সত্ত্বেও সেটির উপস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারেন।

ব্ল্যাকহোল নিয়ে অনেক হয়েছে, এবার আমরা আপেক্ষিকতায় ফিরে যাই। পৃথিবীর নিকটতম ব্ল্যাকহোলের অবস্থান ২৬০০০ আলোকবর্ষ দূরে, যার চারিদিকে দ্রুত পরিভ্রমণকারী কিছু নক্ষত্র রয়েছে- এই এক্সট্রিম পরিবেশে মহাকর্ষীয় পদার্থবিদ্যার পরীক্ষা চালানো সম্ভব;  বিশেষ করে আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির সাধারণ তত্ত্ব।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব ক্লাসিক্যাল ফিজিক্স থেকে ভিন্ন, বিশেষভাবে এটি সময়ের গতিপথ, সময় সংকোচন, কালক্ষেপণ, মহাকাশের জ্যামিতিক গঠন, মুক্তভাবে বস্তুর পতন, আলোর গতি এবং এর দিক, গ্র্যাভিটেশলান লেন্সিং, গ্রাভিটেশনাল  রেডশিফট্ অফ লাইট, নিয়ার ব্ল্যাকহোল ব্যাখ্যা করে।

সাধারণ আপেক্ষিকতা মতে, ‘ঘটনা দিগন্ত’ হচ্ছে কোন একটি ঘটনার স্থান-কাল এর সীমানা, যার বাইরে অবস্থিত কোন পর্যবেক্ষকের উপর এর কোন প্রভাব পড়ে না। সাধারণ কথায় একে বলা যায় ‘প্রত্যাবর্তনের শেষ বিন্দু’ যেখানে মাধ্যাকর্ষণ টান এতই শক্তিশালী হয় যে, কোন কণার পক্ষে আর দূরে যাওয়া সম্ভব হয় না। ঘটনা দিগন্ত বিষয়টি মূলত কৃষ্ণ বিবর এর সাথে সংযুক্ত। ঘটনা দিগন্তের ভেতর থেকে নিক্ষিপ্ত আলো এর বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে পৌঁছুতে পারে না। একইভাবে এর বাইরে থেকে আসা কণার গতিও ধীর হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয় এবং তা দিগন্তকে পুরোপুরি অতিক্রম করে না, বরং সময়ের সাথে-সাথে এটির লোহিত সরণ বাড়তে থাকে। কণাটি বিরূপ প্রভাব অনুভব করে না এবং একটি সসীম মানের প্রকৃত সময়ে দিগন্ত অতিক্রম করে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে,

‘ইএসও’ এর ভেরি লার্য টেলিস্কোপ দ্বারা এস-২ নামে একটি তারা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি ঘন্টায় প্রায় ২৫ মিলিয়ন কিলোমিটার যা আলোর বেগের ৩% এবং ২০ বিলিয়ন কিলোমিটারের কম দূরত্বে থেকে একটি ব্ল্যাকহোলের পাশ দিয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা বলেন যে তারা দ্বিতীয় বারের মত এস-২ এর গতিপথ অবলোকন করেছেন, কিন্তু এবার তারা বেশ কিছু নতুন তথ্য পেয়েছেন। এছাড়াও তারা ‘গ্রাভিটেশনাল রেডশিফট’ নামে নতুন একটি ইফেক্ট এর দেখা পেয়েছেন যা ব্যাখ্যা করে যে ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষীয় টান এর জন্য, ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি থাকলে নক্ষত্রের আলো লম্বা আলোর তরঙ্গের  লাল আলোতে পরিণত হয়। যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বকে সমর্থন করে। যেখানে আলোর বেঁকে যাওয়া ধর্ম থেকে ‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং’ এর ধারণা লাভ করা যায় এবং আইনস্টাইনের তত্ত্বকে প্রমাণিত করা সম্ভব হয়েছে।

ছবিতে  ব্ল্যাকহোলের নিকটে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং বা আলোর বেঁকে যাওয়া দেখানো হয়েছে

ফলে বলা যায় ১০০ বছর পরে হলেও ‘আইনস্টাইনের সাধারণ তত্ত্ব’ ব্ল্যাকহোলের নিকটে গিয়ে প্রমাণিত হয়েছে এবং আশা করা যায়, এটি আমাদের জন্য নতুন দিক উন্মোচন করবে। সেইসাথে ব্ল্যাকহোলের গঠন, ধর্ম ইত্যাদি সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভবপর হবে।

সেই দিন খুব বেশী দূরে নয়, যখন আমরা ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষীয় টান উপেক্ষা করে এর আশেপাশে থেকে ঘুরে আসতে পারব!

মূল লেখার সোর্সঃ

https://www.sciencedaily.com/releases/2018/07/180730090158.html

ধন্যবাদার্হ

লেখক দেবাশীষ প্রান্ত

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *