মুক্ত কর হে বন্ধ- চতুর্থ পর্ব (নবজাগরণ ও সংস্কার)

Renaissance to Reformation

পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে ইউরােপে রাজনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে বিপুল পরিবর্তনের সূচনা হয়। এর ফলে মানুষের জীবনযাপনের পদ্ধতি বদলে যায়। রাজনীতির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের গঠনের নতুন পদ্ধতি চালু হয়। এই নতুন ধরনের রাষ্ট্র কয়েক রকম আকারে পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস বর্ণনায় বিভিন্ন এলাকার “দেশ ও রাষ্ট্র” সম্বন্ধে বলা হয়। কিন্তু সেই সময়কার দেশ বা রাষ্ট্রের গঠন আধুনিক যুগের রাষ্ট্রের গঠনের চাইতে অনেকটা ভিন্ন ধরনের ছিল। আধুনিক যুগের রাষ্ট্র বলতে আমরা ধরে নেই তার একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানার মধ্যে একটি প্রশাসনিক কর ও শুল্ক কার্যক্রমের কাঠামাের আওতায় একটি জনগােষ্ঠী থাকবে। এই সীমানার মধ্যে মালপত্র আনা নেওয়ায় কোন আমদানি রপ্তানি শুল্ক আরােপ করা হবে না। এটাও ধরে নেওয়া হয় যে এই সীমানার মধ্যে জনগণ প্রশাসন কর্তৃক প্রদত্ত কিছু সুযােগ সুবিধা ভােগ করবে। বিনিময়ে তারা এই রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে। সাধারণত রাষ্ট্রের এক বা একাধিক স্বীকৃত ভাষা থাকে এবং সাধারণ নাগরিক ও শাসক বর্গ উভয়েই এই ভাষা বা ভাষাসমূহ ব্যবহার করেন।

মধ্যযুগে ইউরােপের রাষ্ট্রগুলির এই চরিত্র ছিল না। প্রাকৃতিক ও ভৌগলিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এবং একই ভাষা ভিত্তিক জনগােষ্ঠীর উপর ভিত্তি না করে রাষ্ট্র গঠিত ছিল। ইংল্যান্ডের রাজা ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে বর্তমান ফ্রান্সের এক অংশে ফ্রান্স ভাষা-ভাষী জনগােষ্ঠীর উপর আধিপত্য রাখার যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। ফ্রান্সের রাজারা আল্পস পর্বত পেরিয়ে উত্তর ইতালীতে তাদের কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিল। কিন্তু পূর্ব ফ্রান্স, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্স তাদের দখলে ছিল না। বিবাহ সূত্রে অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে রাজারা অন্য কোন রাজ্য বা রাজ্যের অংশ পেয়ে যেতেন। এই রাজ্য তাদের নিজের রাজ্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হতে পারত। কখনও কখনও যুদ্ধের ফলে রাজ্য স্থানান্তর হত। রাজ্যের একীভূত প্রশাসন, কর ও শুল্ক ব্যবস্থা বিরল ছিল। বেশীর ভাগ রাজ্য খন্ড খন্ড এককে বিভক্ত ছিল। সেগুলাে বিভিন্ন নামে পরিচিত হত: ব্যারনী (Barony), বরাে (Borough) ইত্যাদি। এগুলির নিজস্ব প্রশাসন, কর ব্যবস্থা, শুল্ক এমনকি আলাদা আইন, আইন প্রয়ােগকারী সংস্থা ও আদালত থাকত। রাজার প্রতি আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রেই ছিল নাম মাত্র। অনেক সময় অন্য রাজার কাছে বেশী সুবিধা পেলে এই আঞ্চলিক শাসকরা আনুগত্য পরিবর্তন করত। রাজারা তাদের প্রজাদের ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করত না। সরকারী দলিলপত্র প্রায়ই ভিন্ন ভাষার হত।

পঞ্চদশ শতকের শেষ দিক থেকে পরিবর্তন শুরু হল। রাজারা তাদের রাজত্বের উপর আরও কর্তৃত্ব স্থাপন করা শুরু করল। তবে এই প্রক্রিয়া বহুকাল ধরে চলে। স্পেনের রাজারা তাদের কাটালান (Catalan), ভ্যালেন্সিয়ান (Valencian), কাষ্টিলিয়ান (Castilian), আরাগনিজ (Aragonse), অংশ গুলাের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানর জন্য প্রচেষ্টা শুরু করল, সাথে সাথে দেড় শতক ধরে ইতালি ও Low countries এর কর্তৃত্ব রাখার জন্য যুদ্ধ চালাতে থাকল। ফ্রান্সের রাজারা আঞ্চলিক শাসকদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দীর্ঘকাল যুদ্ধ করেছিল, তারপরও পৃথক আঞ্চলিক আইন ব্যবস্থা ও আভ্যন্তরীন মাল আদান-প্রদানে শুল্ক ব্যবস্থা বন্ধ করতে পারেনি।

পরিবর্তন হয়ে যে নতুন রাজ্যগুলাে রূপ নিল সেগুলাের কর্মকান্ডও কিছুটা আলাদা ছিল। মূলত সামন্ত প্রথার উপর ভিত্তি করে হলেও কৃষি বহির্ভূত উৎপাদন ও এগুলাের আদান-প্রদানে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটানও এ রাজ্যগুলাে শুরু করল। ফলে কৃষি ভিত্তিক সামন্ততন্ত্র ও নগর ভিত্তিক ব্যবসায়ী শ্রেণীর মধ্যে একটা সমতা তৈরী হল। তবে এই রাজারা রাজ্য জয় করে তাদের শাসনাধীন এলাকা বাড়ান-এই পুরাণ পদ্ধতি ছেড়ে দেয়নি।

ফার্দিনান্দ ও ইসাবেল মুসলিম মুরদের পরাজিত করে গ্রানাডা রাজ্য জয় করে নিল। কিন্তু মুসলিমরা যা খ্রিষ্টানদের উপর কখনাে চাপিয়ে দেয়নি, তাই তারা করল। তারা মুসলিমদের খ্রিষ্টান হতে বাধ্য করল। যারা খ্রিষ্টান হল না তারা হয় পালিয়ে গেল নয়তাে ধরা পঢ়লে তাদের হত্যা করা হল। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে নয়শত বৎসর ধরে যে মুসলিমরা ঐ অঞ্চলে বসবাস করছিল তারা বিতাড়িত হল। এমনকি যারা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করল তারাও রেহাই পেল না। ১৫৭০ এর দশকে অন্যত্র এক যুদ্ধে পরাজয়ের দিক থেকে দেশের মানুষের মনােযােগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তারা নির্যাতনের শিকার হল। ইহুদী ধর্মাবলম্বী মানুষ যারা আটশত বছরের বেশী সময় মুসলিম শাসনামলে গ্রানাডায় শান্তিতে বসবাস করে আসছিল, তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হল। তারা উত্তর-আফ্রিকা, পূর্ব ইউরােপ এবং অটোমানশাসিত বলকান দেশগুলােতে চলে গেল। অটোমান সাম্রাজ্যে (তুর্কী-মুসলিম) ইহুদীরা কোন নির্যাতন ভােগ করে নি। বিংশ শতকে মহাযুদ্ধের সময় পর্যন্ত ইহুদীরা এসব অঞ্চলে বসবাস ও কাজকর্ম চালিয়ে গেছে।

Renaissance to Reformation and the rise of Nation

নতুন চেতনার উন্মেষ পঞ্চদশ শতকে যখন রাজ্যশাসনে এই পরিবর্তন গুলি ঘটছিল, তখন ইউরােপের চিন্তাজগতে আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। ইউরােপীয় মধ্যযুগ ছিল ধর্মীয় কুসংস্কার, পৃথিবী সম্বন্ধে সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, শিল্প-সাহিত্যে বন্ধ্যাত্ব দিয়ে আচ্ছন্ন। ইতালী থেকে শুরু করে ইউরােপের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ল প্রাচীন গ্রীক ও রােমান যুগের জ্ঞানের বিস্তার, যা ছিল মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার চাইতে আরও বুদ্ধিনির্ভর ও উদার। পরবর্তী একশত বৎসরে ইউরােপের শিল্প-সাহিত্যে নতুন চেতনার ফলে সৃষ্টিশীলতা আসল এবং বিজ্ঞানের উন্নতি হল। প্লেটো, আরিষ্টটল ও ইউক্লিডএর সময়ের পর ইউরােপের চিন্তাজগতে এত নতুনত্ব ও প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়নি। গ্রীক ও রােমান জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যকে ঘিরে এই নবযাত্রা শুরু হওয়ায় একে রেনেসাঁ (Renaissance) বা পুনর্জাগরণ বলা হয়। ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে ইউরােপীয় সংস্কৃতি ও চেতনার জগতে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। স্পেনের টলেডােতে মূর শাসনামলে ল্যাটিন, গ্রীক ও আরবী ক্লাসিক্যাল রচনা সমূহ অনুবাদ করা হয়। চতুর্দশ শতকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় ধর্মযাজকদের যৌথ নিষ্পেষণে তা বন্ধ হয়ে যায়। রেনেসাঁ এই পরিবর্তনের ধারা আরও বড় পরিসরে আবার শুরু করে। ইতালীর নগর রাজ্য (city-state) গুলিতে শুরু হয় এই পরিবর্তন। শুরুতেই কিন্তু এই পরিবর্তন মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণাকে প্রত্যক্ষভাবে বিরােধিতা করেনি। ইতালীর নগর রাজ্য গুলিতে প্রভাবশালী ছিল বড় ব্যবসায়ীরা। ভূস্বামীরা এখানে প্রভাবের দিক থেকে তাদের চাইতে কম ছিল। কিন্তু যে সমাজ ও যে উচ্চ স্থানগুলি ব্যবসায়ীরা অধিকার করত তা ছিল ভূস্বামীদের তৈরী সামন্ততান্ত্রিক সমাজের। তার ফলে এই ব্যবসায়ীরা যারা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপােষকতা করত তাতে বিপরীতমুখী ভাবধারা দেখা যেত। তারা সাধারণ কারিগরদের মধ্য থেকে শিল্পকর্ম তৈরী করার কাজ দিত। শিল্পকর্মগুলি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে হলেও তাতে মানবতার বিজয়ের বাণী থাকত। মাইকেল এঞ্জেলাের Last judgement, God giving life to Adam শীর্ষক চিত্র গুলি এই পরিচয় দেয় । রেনেসাঁ সাহিত্যিকদের যে ভাষা ব্যবহার করতে ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত করত তা ছিল ল্যাটিন। ল্যাটিন ভাষা সাধারণ মানুষ ব্যবহার করত না। এটা ছিল খুব অল্পসংখ্যক উচ্চবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীদের ভাষা। ফলে নগর-রাষ্ট্রগুলির সাধারণ মানুষরা এই সাহিত্যকর্ম সম্বন্ধে জানতে পারত না। কিন্তু ল্যাটিন ব্যবহারের ফলে ইউরােপের অন্যান্য স্থানের সাহিত্যকর্মীদের সঙ্গে আদান-প্রদান সহজ হয়ে ছিল।

রেনেসাঁর ভাবধারা যতই ইউরােপের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ততই তা শুধুমাত্র প্রাচীন গ্রীক-রােমান যুগের পুনর্জীবন না থেকে নতুন ধ্যান-ধারণার সৃষ্টিতে পরিণত হল। মানুষের মধ্যে পুরাতন দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ও সমালােচনা করার পরিবেশ তৈরী হল। এতে নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হল যা কপারনিকাস ও গ্যালিলিওর সত্য সন্ধানে দেখা যায়। ষষ্ঠদশ শতক শুরু হল ক্লাসিকাল গ্রীক ও রােমান জ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যকে নিজ নিজ স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে এর চেতনাকে আত্মস্ত করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে। একশ বৎসরের মধ্যে তা পরিণত হল নিজ নিজ ভাষায় নতুন চেতনায় কাল জয়ী সাহিত্য সৃষ্টিতে। ইংরেজীতে শেকসপীয়র, মারলাে ও বেন জনসন, ফরাসীতে রাবেলাই (Rabelais),স্প্যানিস ভাষার সারভান্তে (Cervantes) ভাষার ও চিন্তা সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে। ধর্ম কাঠামাের পরিবর্তন স্পেনে মুসলিম মুরদের কাছ থেকে গ্রানাডা জয় করার ২৫ বৎসর পর ১৫১৭ সালে দক্ষিণ জার্মানীর উইটেনবার্গ শহরে মার্টিন লুথার নামে ৩৪ বৎসর বয়স্ক একজন ধর্মযাজক তার গীর্জার দরজায় ৯৫টি অংশ (thesis) বিশিষ্ট একটি অভিযােগপত্র টাঙ্গিয়ে দিল। অভিযােগগুলি ছিল ক্যাথলিক ধর্মের নেতাদের বিভিন্ন আচার আচরণকে সমালােচনা করে। মার্টিন লুথার এর এই সমালােচনার ফলে ক্যাথলিক চার্চে এক বিরাট ভাঙ্গন শুরু হয়। বারশত বৎসর আগে কনস্ট্যানটিন এর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর এত বড় ভাঙ্গন পশ্চিমের খ্রিষ্টধর্মে আর ঘটেনি। দক্ষিণ জার্মানী ও সুইজারল্যান্ডের শহরগুলিতে মার্টিন লুথার এর মতবাদ সমর্থন পেল। জার্মান অঙ্গরাজ্যগুলির কয়েকজন শক্তিশালী রাজা তাকে সমর্থন করল। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডেও অনেকের মধ্যে তার মতবাদ সমর্থন পেল। এসবই হল ক্যাথলিক চার্চ এই মতবাদকে দমন করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরী ক্যাথলিক চার্চ থেকে ইংল্যান্ডকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। রাজা তার স্ত্রী ক্যাথরীনকে তালাক দিতে চেয়েছিল। পােপ তাতে সম্মতি না দেওয়ায় অষ্টম হেনরী এই সিদ্বান্ত নেয়। ক্যাথলিক ধর্ম সম্বন্ধে মার্টিন লুথার এর সমালােচনা ছিল ব্যাপক। গীর্জার আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা, পােপের তার অধীনস্ত ধর্মযাজকদের উপর খবরদারীর অধিকার, ধর্মযাজকদের সৃষ্টিকর্তা ও মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন ও পাপস্খলন এর দলিল বা Indulgence এর বিক্রয়ের এর বিরুদ্ধে তিনি লিখেছিলেন। Indulgence হল পােপের পক্ষ থেকে যাজকদের একটি দলিল যা বলা হত পাপ মুছে দিয়ে স্বর্গে প্রবেশে সাহায্য করতে পারে। অর্থের বিনিময়ে এই দলিল যাজকরা বিক্রি করত। এই অর্থে পােপ একটি নতুন গীর্জা তৈরী করছিলেন আর Mainz এর আর্চবিশপ তার এই পদের জন্য Fugger এর ব্যাংক থেকে যে টাকা নিয়ে পােপকে দিয়েছিলেন-সেই টাকা ফেরত দিচ্ছিলেন ব্যাংকটিকে। গীর্জার অবস্থান সমাজে এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ধর্মযাজক ও গীর্জার বিরুদ্ধে সমালােচনা সমাজের ও রাজনীতির বিরুদ্ধে সমালােচনায় পরিণত হয়। তাই যারা সেই সময়ের সমাজব্যবস্থার সুবিধাভােগী ছিল তারা স্বভাবতই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ফলে পরবর্তী একশত পঁচিশ বছর ধরে ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চল যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকে। জার্মানীর Smalkaldic যুদ্ধ, ফ্রান্সের ধর্মকেন্দ্রিক গৃহ যুদ্ধ, স্পেনের অধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নেদারল্যান্ডের দীর্ঘ যুদ্ধ, ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ, ত্রিশ বৎসরের যুদ্ধ যা জার্মানীকে বিধ্বস্ত করেছিল, এগুলাে সবই বিভিন্ন ভাবে ক্যাথলিক ধর্মের সমালােচনার পর থেকেই শুরু হয়েছিল।

মার্টিন লুথার তার চিন্তাভাবনার ব্যাপারে অত্যন্ত কুশলী ছিলেন। তিনি তার পক্ষে যুক্তিতর্ক উত্থাপন করে অনেক বই লিখেছিলেন। তিনি জার্মান ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করলেন। ফলে ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ আরও বেশী জানতে পারল। এগুলাে গুরুত্বপূর্ণ হলেও যে পরিবর্তনের সূচনা তিনি করেছিলেন তার জন্য এগুলাে যথেষ্ট ছিল না। এর আগেও ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে এই ধরনের আন্দোলন হয়েছিল। প্রায় দুইশত বৎসর ধরে ইউরােপের অনেক নগরে গােপন প্রতিবাদী Wadensian চার্চ ছিল। বােহেমিয়াতে একশত বৎসর আগে Hussite রা চার্চের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই সময় এবং আরও অন্যান্য প্রতিবাদী আন্দোলন বিস্তার লাভ করেনি এবং চার্চকে বিভক্ত করতে পারেনি। মার্টিন লুথার এর প্রতিবাদ এত ব্যাপক হয়ে চার্চকে বিভক্ত করল তার কারণ ছিল চতুর্দশ শতক থেকে আরও অন্যান্য পরিবর্তন সমাজে হচ্ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি উপাদান হল আগে বর্ণিত রাজ্যশাসন পদ্ধতির ক্রমপরিবর্তন, রেনেসাঁর ফলে নতুন চিন্তা ভাবনা, উদার দৃষ্টি ভঙ্গি ও সমালােচনার ধারা সৃষ্টি হওয়া। তবে সর্বোপরি ছিল আর্থসামাজিক গঠনের পরিবর্তন। সামন্ত অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা একটা নতুন সমাজ ব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছিল। আর মার্টিন লুথার এর শুরু করা প্রতিবাদ থেকে জন্ম নেওয়া প্রটেষ্ট্যান্ট (Protestant) মতবাদ ছিল তার একটি বহিঃপ্রকাশ।

Bernardo Bellotto (Canaletto) A View at the Entrance of the Grand Canal, Venice, c.1741 Oil on canvas, 59.3 cm x 94.9 cm (detail)

Credit: © The Fitzwilliam Museum, Cambridge.

“My research has built a picture of the evolution of markets across the long span of history using one particularly abundant data source – the prices of goods.”

Dr Victoria Bateman

অর্থনীতির ক্রমবিকাশ

পশ্চিম ইউরােপের সমাজ ব্যবস্থা শত শত বৎসর ধরে ধীর গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছিল। উৎপাদনের পদ্ধতির পরিবর্তন হচ্ছিল, এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আনা নতুন প্রযুক্তি আত্মস্ত করে তার সঙ্গে তাদের নিজেদের উদ্ভাবন যােগ করে শিল্প দ্রব্য, জাহাজ তৈরী ও যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরীতে উন্নতি হয়েছিল। এর ফলে ষষ্ঠদশ শতকের শুরুতে যে সব জিনিস তৈরী হত তা দ্বাদশ শতাব্দীতে – এমনকি অনেক জিনিস চতুর্দশ শতাব্দীতেও ছিল না। প্রায় প্রতিটি শহরে কলের ঘড়ি ছিল, বাতাস ও পানি চালিত মিল, ব্লাস্ট ফার্নেস (blast furnace) এ তৈরী ঢালাই লােহা, জাহাজ তৈরী, জাহাজের পাল -মাস্তুল তৈরী, জাহাজ নেভিগেশন এর নতুন পদ্ধতি, যুদ্ধের জন্য বন্দুক ও কামান তৈরী শুরু হয়েছিল। ছাপাখানার ব্যবহার অল্পসংখ্যক লাইব্রেরীতে রক্ষিত বই ব্যাপক মানুষের নাগালের মধ্য নিয়ে এসেছিল।

প্রযুক্তির এইসব পরিবর্তন ছিল অন্যান্য পরিবর্তনের পূর্বশর্ত। বলা যেতে পারে কলম্বাস হয়তাে আরবদের কাছে পাওয়া astrolabe, চীনাদের কাছে পাওয়া কম্পাস ছাড়া আমেরিকা পর্যন্ত পৌছাতে পারত, কিন্তু এই যন্ত্রগুলি ছাড়া যাওয়া আসার নিয়মিত নৌ পথ চিহ্নিত করা তার পক্ষে সম্ভব হত না। এইগুলি ছাড়া আবার আমেরিকায় ফিরে আসা ও স্পেনীয়দের আমেরিকা মহাদেশে বিভিন্ন এলাকা দখল করাও সম্ভব হত না। ইউরােপীয় রেনেসাঁর অগ্রদূতরা হয়ত প্রাচীন গ্রীক ও

রােমান জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু শিক্ষিত মানুষের আগ্রহ জাগাতে পারত, কিন্তু জ্ঞান চর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির যে ব্যাপক পরিবর্তন রেনেসাঁর ফলে দেখা গিয়েছিল তা ছাপাখানার সাহায্যে এই সমস্ত বইয়ের হাজার হাজার কপি মানুষের কাছে না পৌছালে হওয়া সম্ভব ছিল না। একই ভাবে পােপের বিরুদ্ধে মার্টিন লুথার এর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়াও সম্ভব ছিল না। ছাপার মাধ্যমে তা সর্বত্র ছড়িয়ে না পড়লে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এই প্রযুক্তির দ্বারা জিনিস তৈরীর জন্য সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনও হয়েছিল। তা না হলে ব্যাপক হারে শিল্পদ্রব্য তৈরী সম্ভব হত না। সামন্ততান্ত্রিক যুগের প্রথম দিকে উৎপাদন পদ্ধতি যা ছিল তাতে সীমিত প্রয়ােজন মেটান সম্ভব হত। কৃষকদের জীবন ধারণের পর যে সামান্য উদ্বৃত্ত থাকত তা ভূস্বামীর জন্য কিছুটা বিলাস দ্রব্যের যােগান দিত। এই সমাজ ব্যবস্থায় মুদ্রার ভূমিকা খুব বেশী ছিল না। কারও সম্পদ বাড়ানাের সুযােগ থাকলে সে মুদ্রা বা স্বর্ণের বদলে জমির পরিমাণ বাড়াত। অষ্টাদশ শতকের শুরুতেই পরিবর্তন দেখা যায়। পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করে তার বিনিময়ে বিক্রয়ের জন্য পণ্যদ্রব্য উৎপাদন বাড়তে থাকে। সােনা বা রূপার জন্য পণ্য উৎপাদন বা বিক্রী করা এবং সােনা ও রূপার বিনিময়ে অন্য পণ্য কিনা ক্রমেই বাড়ে। কৃষকের টাকার দরকার হয় খাজনা দেওয়ার জন্য, কৃষিতে ব্যবহৃত হাতিয়ার কেনার জন্য বা দুর্দিনে বাঁচার জন্য। ভূস্বামীরাও আরও বেশী বিলাস দ্রব্য ব্যবহার করত। দূরপাল্লার বাণিজ্য বাড়ার জন্য অন্যান্য দেশ থেকে বিলাস দ্রব্য ইউরােপে আসা শুরু করল। এই ভাবে সময়ের সাথে সাথে কাজের ধরন বদলে যেতে থাকল। আগে মানুষ কাজ করত উৎপাদনের জন্য যা তার প্রয়ােজন মিটাত। ক্রমেই তা পরিণত হল উৎপাদন করা অর্থ উপার্জনের জন্য, আবার সেই অর্থ দিয়ে আরাে অর্থ উপার্জন করার জন্য। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতেও এই প্রক্রিয়া যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছে তা নয় – কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছিল কয়েক শতক ধরে। শহর ও গ্রামাঞ্চলে বাজার গড়ে ওঠা ও পণ্যের আদান প্রদানও ছিল এই পরিবর্তনের অংশ। বড় শহর ও বন্দর এর আশেপাশে কৃষিভূমিতে শিল্পে ব্যবহৃত কৃষি উৎপাদন শুরু হয়েছিল। বড় বড় আকারের জমিতে কাপড় তৈরীতে ব্যবহৃত লিনেন এর জন্য ফ্লাক্স (Flax), তেলের জন্য জলপাই, মদ তৈরীর জন্য আঙ্গুর ও কাপড় এর রং হিসেবে জাফরান এর উৎপাদন বাড়ে। শহরের বণিকেরা গ্রামাঞ্চলে কারিগরদের দিয়ে শিল্পদ্রব্য উৎপাদন করতে শুরু করে-অতীতে যেখানে কারিগররা নিজেদের উদ্যোগেই এটা বানাত। বণিকেরা এই উৎপাদিত দ্রব্য বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতে থাকে। এই ভাবে গ্রাম ভিত্তিক শিল্প উৎপাদন গড়ে ওঠে। আবার বােহেমিয়া, দক্ষিণ জার্মানী ইত্যাদি যেসব জায়গায় খনিজ পদার্থ পাওয়া যেত সে সমস্ত জায়গায় মজুরীর ভিত্তিতে খনিশ্রমিক নিয়ােগ করা হয়। উৎপাদন সম্পর্কের এই পরিবর্তনের ফলে চতুর্দশ শতকে যে সামাজিক সংকট দেখা দেয় তার পরিণতি পঞ্চম শতকে রােমান সাম্রাজ্য এবং তৃতীয় ও ত্রয়ােদশ শতকে চীন সাম্রাজ্য যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল তার তুলনায় আলাদা হয়। রােমান সাম্রাজ্য ও চীন সাম্রাজ্যের বিপর্যয়ের ফলে গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের ফলে সাম্রাজ্য ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঙ্গরাজ্যের সৃষ্টি হয়, যেগুলাের একটার সঙ্গে আরেকটার অর্থনৈতিক লেনদেন খুবই কমে গিয়েছিল। তুলনায় চতুর্দশ শতকে ইউরােপীয় সমাজে যে সংকট দেখা দেয় তার একটা বড় কারণ ছিল মহামারী আকারে প্লেগ রােগের আবির্ভাব। এই দুর্যোগের ফলে গ্রামাঞ্চল দুর্ভিক্ষ ও মহামারীতে প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। কিন্তু শহরগুলাে টিকে থাকে। যেহেতু আগে থেকেই শহর ও তার আশেপাশের গ্রামাঞ্চল বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করত এবং সেগুলাে বিক্রি করা হত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে, তাই পঞ্চদশ শতকেই শহরগুলি আবার ধীরে ধীরে কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে। জাহাজ নির্মাণ শিল্প, ছাপাখানা এই রকম নতুন কর্মকান্ডও যােগ হয়। উৎপাদন ও আদান প্রদান এর ফলে শহরভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন হয়। তবে সব শহর একইভাবে উন্নতি করতে পারেনি। আগের বর্ধিষ্ণু শহরগুলির মধ্যে বারসেলােনা, ভেনিস ও বাল্টিক সাগর তীরবর্তী শহরগুলি ও উত্তর ইউরােপের শহরগুলি পিছনে পড়ে-আর বর্তমান নেদারল্যান্ডের শহরগুলি, ইংল্যান্ড, স্পেন, ও দক্ষিণ পূর্ব জার্মানীর শহরগুলি বেশী এগােতে থাকে। চতুর্দশ শতকের পর সাধারণ মানুষের গড় মজুরী প্রায় দুই গুণ বেড়েছিল। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে অনেক জিনিষের দাম বাড়তে থাকে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান কমতে থাকে। কৃষকদের উপর ভূস্বামীদের বিভিন্ন ধরনের খাজনা বাড়তে থাকে। শহর ও গ্রামে ধনী মানুষেরা অর্থ উপার্জনে মেতে ওঠে। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কর্তেজ (Cortes) ও পিজারাে (Pizzaro) স্বর্ণ ও রৌপ্য আনার ব্যবস্থা করেন।

মধ্যযুগে গীর্জা ও ধর্মযাজকরা ছিল সামাজিক মূল্যবােধের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ধর্মযাজকেরাই টাকার লােভে পড়ে যান। পাপমােচনের সনদ (indulgence) বিক্রী করে যাজকেরা টাকা উপার্জন করতে থাকেন, যার বিরুদ্ধে মার্টিন লুথার আন্দোলন করেন। টাকা দিয়ে ধর্মযাজকদের আসনে বসা যেত। অনেক ধনী পরিবার তার অল্পবয়স্ক ছেলেদের জন্য আসন (যেমন Bishop) কিনে নিত। বড় ব্যবসায়ী পরিবার মেডিসি ও বর্গিয়া টাকার জোরে পােপ (Pope) হয়ে গেল এবং তার

ফলে আরও টাকা বাড়ানাের সুযােগ পেল। ধর্মযাজকেরা গরীব কৃষকদের উঁচু হারে সুদে টাকা ধার দিত যদিও সুদ খাওয়া তাদের ধর্মে পাপ বলে গণ্য। এই সময়কালে খ্রিষ্টধর্মের মধ্যে পরিবর্তনের আন্দোলন ও কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শিল্প উৎপাদন শুরু হওয়ায় সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে অনেক মতামত রয়েছে-যার মধ্যে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক ওয়েবার (Weber) অন্যতম। সামন্ততান্ত্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে ক্রমেই শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা বাণিজ্যের ভূমিকা বাড়তে থাকে। ভূস্বামী প্রভাবিত সামাজিক ধ্যান-ধারণায় নতুন উৎপাদন সম্পর্কের ফলে পরিবর্তন আসে। ধর্ম ও ধর্মযাজকেরা যেহেতু পূর্বতন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন তাই পরিবর্তিত জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক ও চিন্তাধারা ধর্মের পালিত রীতিনীতি, ধ্যানধারণার পরিবর্তনের জোয়ার আনে। এই পরিবর্তনের আন্দোলনে মার্টিন লুথার, আঁ কালভিন (Jean Calvin), জন নক্স (John Knox) এবং আরও অনেক ধর্মযাজক ও চিন্তাবিদ অংশ নেন। উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন, সামাজিক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব ও খ্রিষ্টধর্মের ভিতরে পরিবর্তনের আন্দোলন-এইসব একসূত্রে গ্রথিত। এই পরিবর্তনগুলাে অনেক বছর ধরে ইউরােপে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় পর্যায়ে আলােড়নের সৃষ্টি করে-যা অনেক যুদ্ধবিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ইউরােপীয় সমাজ ও রাষ্ট্রকে বদলে দিলাে। এই পরিবর্তিত ইউরােপের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামাে ইউরােপের বর্তমান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবস্থার সূচনা।

Martin Luther & the German Reformation Late Medieval German lacked the political unity to enforce large scale religious reforms

জার্মানীর সংস্কার আন্দোলন

ষষ্ঠদশ শতকের প্রথমার্ধে বর্তমান জার্মানী ছােট ছােট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। শহরগুলাে কাউন্সিল বা সিনেট দ্বারা পরিচালিত হত। আর এই কাউন্সিল বা সিনেটে বংশ পরস্পরায় আধিপত্য করত ধনী ব্যবসায়ী ও অভিজাত শ্রেণীর লােকেরা। গ্রামাঞ্চলে এলাকাগুলােতে বড় ভূস্বামী ও ধর্মযাজকেরা প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল।

মার্টিন লুথার ও পরবর্তীতে ফ্রান্সে জঁ কালভিন (Jean Calvin) খ্রিষ্টধর্ম পালনের ব্যাপারে কিছু সমালােচনা উপস্থাপন করেন। তাঁদের রাষ্ট্রকাঠামাে বা সমাজ বদলের কোন চিন্তা ছিল না। কিন্তু তারা যে ধর্মসংস্কার এর প্রক্রিয়া শুরু করেন তা শেষ পর্যন্ত ইউরােপে সামাজিক আন্দোলন ও যুদ্ধের সৃষ্টি করে এবং সমাজ ও রাষ্ট্র যন্ত্রে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। মার্টিন লুথার এর বক্তব্য ছিল যীশুখ্রিষ্ট ও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা (apostle) বাইবেলে ধর্মীয় যে অনুশাসন দিয়ে গিয়েছিলেন তা ক্যাথলিক ধর্মের প্রতিষ্ঠান বিকৃত ও কলুষিত করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে ধর্মযাজকদের মধ্যস্থতা সঠিক নয় – বিশেষতঃ এই মধ্যস্ততা যদি অর্থের বিনিময়ে হয়। মার্টিন লুথার এর মতবাদ দক্ষিণ জার্মানীতে নিম্ন ও মধ্যশ্রেণীর মানুষদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। এই মানুষেরা ক্যাথলিক ধর্মের ধর্মযাজক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলাের অনাচার এর বিরুদ্ধে আগে থেকেই অসন্তুষ্ট ছিল। তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরী করে। প্রায় পঁচিশ বৎসর পর জাঁ কালভিন এর আন্দোলন একই অবস্থার সৃষ্টি করে ফ্রান্সে।

Martin Luther

মার্টিন লুথার এর মতবাদ ১৫২১ সাল থেকে শুরু করে প্রথমে শহরগুলােতে ব্যাপক সমর্থন পায়। শহরের ব্যবসায়ী শ্রেণী ধর্মযাজকদের উপর নানা কারণে বিক্ষুদ্ধ ছিল। বিশেষতঃ ধর্মযাজকদের কর দিতে হত না অথচ ব্যবসায়ীদের তা দিতে হত। আর একদিকে ধর্মযাজকেরা কৃষকদের কাছ থেকে যে খাজনা নিত তার ভাগ ব্যবসায়ীরা পেত। কাজেই ব্যবসায়ীরা চাচ্ছিল আন্দোলনের মাধ্যমে যাজকদের প্রভাব কিছুটা কমিয়ে আনা। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগর শ্রেণীর লােকেরা যাজকদের সুযােগ সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে চাচ্ছিল। এই শ্রেণীর লােকেরা একের পর এক শহরে আন্দোলন করে গীর্জা ও যাজকদের বিরুদ্ধে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। একের পর এক জার্মানীর শহরগুলাের দুই-তৃতীয়াংশ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যােগ দেয়। তবে শহরগুলির কর্তৃপক্ষ (কাউন্সিল বা সিনেট) যেগুলাে ধনী ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করত – তারা ধর্মের নিয়ম কানুন এ কিছু পরিবর্তন এনে আন্দোলন প্রশমিত করেছিল।

১৫২৪ সালে আরও সহিংস আন্দোলন দেখা যায়। এটা কৃষকদের যুদ্ধ (peasant war) বলে পরিচিত। কারও কারও মতে আধুনিক যুগের আগে এটা ইউরােপের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান। এর আগের অর্ধ শতকে জার্মানীতে বিচ্ছিন্ন ভাবে এবং সীমিত এলাকায় কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল। কিন্তু এই সময় হাজার হাজার কৃষক ও গ্রামের দরিদ্র জনগােষ্ঠী দক্ষিণ ও মধ্য জার্মানীতে গীর্জা দখল ও লন্ডভন্ড করে ফেলল ও ধনী সামন্তদের দূর্গ আক্রমণ করা শুরু করল। প্রথমদিকে গ্রামের বড় ভূমি মালিক ও ধর্মযাজকেরা দিশেহারা হয়ে গেল ও কৃষকদের সঙ্গে আপােষের চেষ্টা চালায়। অনেক জায়গায় তারা বিদ্রোহ দমনের জন্য শহরের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ও রাজ্যগুলির রাজাদের সঙ্গে যােগাযােগ করে। তারা তাদের এলাকায় বিদ্রোহ চলার কারণে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। ধর্ম বিষয়ে দাবীর সাথে সাথে বিদ্রোহীরা আর্থসামাজিক দাবীও তুলে ধরে। ভূমিদখল প্রথা বাতিল, জমিদারদের দেয় বিভিন্ন খাজনা বাতিল, সর্বসাধারণের ব্যবহৃত জমি জমিদারদের দখল বন্ধ করা ইত্যাদি দাবী তােলা হয়। বিদ্রোহীদের ধারণা ছিল তাদের দাবী দাওয়া শাসকেরা মেনে নেবে। বিদ্রোহ করলেও কৃষকেরা সংযত আচরণ করে।

শাসকদের পক্ষে দাবী মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তারা এক দিকে আপােষ আলােচনার ভান করতে থাকে, অন্যদিকে ভাড়াটে সৈন্য সংগ্রহ করতে থাকে। মার্টিন লুথার নিজে এই আন্দোলন শুরু করলেও কৃষকদের বিদ্রোহের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং শাসকদের পক্ষে দাঁড়ান। তিনি লিখেন “রাজন্য ও বিচারকদের মৃত্যুর চাইতে সব কৃষকের মৃত্যু হওয়া ভাল।” “তাদেরকে পাগলা কুকুরের মত হত্যা করা উচিত”। ১৫২৬ সালের মধ্যে বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল এক লক্ষেরও অধিক বিদ্রোহীর প্রাণের বিনিময়ে। *

তথ্য সূত্র:

Febvre L. Martin Luther: A Destiny. New York, 1929 p 73-76 1. Elton GR. Reformation Europe. Glasgow, 1963 p 59 0. Harman C. A People’s History of the World. London, 2008 p 88 8. Bronowski J and Mazlish B. The Western Intellectual Tradition. New York, 19

ধন্যবাদ

মুক্ত কর হে বন্ধ- তৃতীয় পর্ব (মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সমাজ )

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *